বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন
  • খেলা
  • »
  • এশিয়ান গেমসে তাস: শিরোপার স্বপ্ন ভারতীয় নারীদের

এশিয়ান গেমসে তাস: শিরোপার স্বপ্ন ভারতীয় নারীদের

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট, ২০১৮ ০২:২৭ অপরাহ্ন

শীর্ষনিউজ ডেস্ক: প্রথমবারের মত এশিয়ান গেমসে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে তাসের খেলা ব্রিজ। আর প্রথমবারেই স্বর্ণ জয়ের আশা দেখছেন ভারতের নারীদের দল।

দিল্লীর বাসিন্দা হেমা দেওরা ৫০'এর কোঠা পর্যন্ত তার পুত্রদের নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। কখনো কখনো হয়তো বেড়াতে যেতেন তার রাজনীতিবিদ স্বামী মুরলি দেওরা'র সাথে। এখন ৬৭ বছর বয়সে এমন একটি খেলায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি, যেটি মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় খেলতেন।

তার দলের আরেক সদস্য রিতা চোকসির বয়স ৭৯, যিনি জাকার্তায় চলতে থাকা এশিয়ান গেমসের প্রবীণতম অংশগ্রহণকারীদের একজন।

ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা তো অনেক দূরের বিষয়, মিজ. দেওরা এবং মিজ. চোকসি কখনো চিন্তাও করেননি যে এশিয়ান গেমসের মতো একটি আসরে তারা কখনো অংশ নিতে পারবেন। ২০১৮ সালে এশিয়ান গেমসে অন্তর্ভূক্ত হয় তাসের খেলা ব্রিজ। সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং তাসের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই ব্রিজ খেলা হয়ে থাকে। ব্রিজের সবচেয়ে বড় বিশ্ব আসর বিশ্ব ব্রিজ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হয় ১৯৬২ সালে।

৬৭ বছর বয়সী হেমা দেওরা বলেন, ব্রিজে মনোনিবেশ করলে একাকীত্ববোধ থাকে না।  শৈশব-কৈশোরে তার অভিভাবকরা তাকে তাস খেলতে দিতো না। কারণ তখন এটিকে শুধুমাত্র বড়দের জন্য উপযোগী কাজ বলে মনে করা হতো। তবে বিয়ের পর পরিবর্তন আসে তার জীবনে।

তার স্বামী ব্রিজ খেলা পছন্দ করতেন এবং মাঝে মধ্যে তার বন্ধুরা বাসায় আসতেন ব্রিজ খেলতে। একসময় নিয়মিতভাবেই ব্রিজের আসর বসতে লাগলো মিজ. দেওরা'র বাসায়।

"আমি সেসময় ভাবতাম, এই খেলায় কী এমন আছে, যার জন্য মানুষ নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়?"

শুরুতে খেলার বিষয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না মিজ. দেওরা। কিন্তু সন্তানরা বড় হওয়ার পর যখন নিজের জন্য কিছুটা বেশি সময় পেলেন, তখন ব্রিজ খেলাটা শিখে নেন তিনি।

তিনি বলেন, "শেখাটা শুরুতে কঠিন ছিল। কিন্তু প্রাথমিক নিয়মকানুন শেখার পর একজন কোচের কাছে শিখতে শিখতে পাকা খেলায়াড় হয়ে উঠি আমি।"

ব্রিজ খেলার নিয়ম
ব্রিজ ব কন্ট্রাক্ট ব্রিজে ৫২ তাসের একটি সেট ব্যবহার করা হয়। চারজন খেলোয়াড় দুই দলে বিভক্ত থাকেন। একই দলের খেলোয়াড়ার মুখোমুখি বসেন। খেলোয়াড়দের মধ্যে নিলামে ডাকাডাকির মত নিয়মে নির্ধারিত হয় কোন দলের লক্ষ্য কী হবে।

তাসের স্যুট বা প্রতীকের মর্যাদাক্রমের ধারা অনুযায়ী প্রতীকগুলো হলো চিরতন বা ক্লাবস, ইস্কাপন বা ডায়মন্ডস, রুইতন বা হার্টস এবং হরতন বা স্পেডস।

নিলাম বা ডাকের সময় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলে ওই গেইমে দল জয়ী হয়। এভাবে সবচেয়ে বেশি গেইম জেতা দল ম্যাচের বিজয়ী নির্ধারিত হয়।

মিজ. দেওরা কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয় ক্লাব এবং প্রতিযোগিতায় খেলা শুরু করেন এবং শিরোপাও জিততে থাকেন। মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের সাথে একটি অনুষ্ঠানে খেলার সুযোগ হয়েছিল তার, যা তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিগুলোর একটি।

আর মিজ. চোকসির জীবনে এই খেলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি বলেন, "ব্রিজ আমাকে আমার দ্বিতীয় স্বামী দিয়েছে।"

প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর ব্রিজ খেলতে গিয়ে হরেন চোকসি'র সাথে দেখা হয় মিজ. চোকসির। শুরুতে শুধু ব্রিজ খেলায় পার্টনার হলেও পরবর্তীতে বিবাহিত যুগলে পরিণত হন দু'জন। ১৯৯০ সালে চোকসি মারা যাওয়ার পর ব্রিজ খেলাই একাকিত্ব ভুলতে সহায়তা করে মিজ. চোকসিকে।

৭৯ বয়সী রিতা চোকসি এবারের এশিয়ান গেমসের প্রবীনতম অংশগ্রহণকারীদের একজন। তিনি বলেন, "ঐ সময়টা আমার জীবনে খুব কঠিন সময় ছিল। আমি একা থাকলেও একাকীত্বে ভুগিনি কারণ আমার সাথে আমার কার্ড ছিল।"

ভারত দলে যে শুধু মিজ. চোকসি আর মিজ. দেওরাই বয়স্ক খেলোয়াড়, তা নয়। দলের অনেকের বয়সই ৬০'এর বেশি। এশিয়ান গেমসের মত ক্রীড়াযজ্ঞে এরকমটা খুব একটা দেখা যায় না। 

মিজ. চোকসি বলেন, "ব্রিজ আপনার মন পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি আপনাকে কর্মতৎপর ও সতেজ রাখে।"

এশিয়ান গেমসে এই নারীদের অংশগ্রহণের ফলে ভারতে ব্রিজ খেলার জনপ্রিয়তা বাড়বে বলে মনে করেন অনেকে।

ভারতের অন্যতম সফল ব্রিজ খেলোয়াড় আনন্দ সামন্ত বলেন, "ভারতে তাসের যে কোনো খেলাকেই মনে করা হয় জুয়া। এশিয়ান গেমসে নারীদের খেলার সাফল্যের সঠিক প্রচারণা হলে ভারতের মানুষজনের মানসিকতা পরিবর্তন হতে পারে, পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকরাও আগ্রহী হতে পারেন অর্থায়নে।"

তবে মিজ. চোকসি বা মিজ. দেওরার কাছে এই খেলা আরো অনেক বেশী গুরুত্ব বহন করে।

২০১৪ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর ব্রিজ খেলা মিজ. দেওরাকে 'আত্ম পরিতৃপ্তি' দিয়েছে বলে জানান তিনি।

"আপনি যদি ব্রিজের পেছনে বিনিয়োগ করেন, তাহলে জীবনে কখনো একাকীত্বে ভুগবেন না।" সূত্র: বিবিসি।

শীর্ষনিউজ/এইচএস