shershanews24.com
নুসরাত হত্যা : ফেনীর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নানা প্রশ্ন
মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০১৯ ০৮:১৫ অপরাহ্ন
shershanews24.com

shershanews24.com

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: কয়েক সপ্তাহ আগেও নুসরাত জাহান ছিলেন পৌর শহরের স্কুল বা মাদ্রাসাপড়ুয়া আর দশজন সাধারণ মেয়ের একজন- কিন্তু যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করে আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এখন দেশজুড়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে তার নাম। নুসরাত হয়ে উঠছে প্রতিবাদের প্রতীক। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করার প্রেক্ষাপটে গায়ে আগুন লাগিয়ে নুসরাতকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেই নির্মম ঘটনা সারাদেশের মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। 
বাংলাদেশে যেখানে শহরাঞ্চলেও যৌন নির্যাতনের অনেক অভিযোগ লোকলজ্জার ভয়ে লুকিয়ে রাখার কথা শোনা যায়, সেখানে মফস্বল শহর এবং রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা এই মেয়েটি তার অভিযোগ নিয়ে আদালত পর্যন্ত গিয়েছিলো। কিন্তু তাতেও বিচার মেলেনি। বরং উল্টো ফল হয়েছে। নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়া হয়েছে শুধুমাত্র বিচার চাওয়ার অপরাধে।
শরীরের ৮০ শতাংশ দগ্ধ হবার পর ঢাকায় নিয়ে আসার পথে তার ভাইয়ের মোবাইলে রেকর্ড করা এক অডিওতে তাকে বলতে শোনা গেছে- “শিক্ষক আমার গায়ে হাত দিয়েছে, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো।” কিন্তু কতজন নুসরাত এভাবে প্রতিবাদ করবে? আবার সেই প্রতিবাদের মাসুল হিসেবে জীবনও দিতে হবে- সে হিসাব জানা নেই। কারণ নুসরাত যে জনপদে জন্ম নিয়েছে সেখানকার সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। শুধুমাত্র যৌন হয়রানির মতো একটি ঘটনার প্রতিবাদ করায় নুসরাতকে যে নির্মম বিনিময় দিতে হয়েছে এবং এটিকে ধামাচাপা দিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকায় উদ্বেগজনক সেই সামাজিক পরিস্থিতি একেবারেই স্পষ্ট। 
ফেনীর সোনাগাজীর স্থানীয় একজন স্কুল শিক্ষিকা জানিয়েছেন, নুসরাত রাফির ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনার পর কয়েকশো ছাত্রীকে নিয়ে প্রথম প্রতিবাদ মিছিলটি তারাই বের করেছিলেন। 
সোনাগাজী গার্লস পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষিকা বীথি রাণী গুহ বলছেন, এই ঘটনায় সারাদেশের মতো সোনাগাজীর মানুষও ছিলেন বিক্ষুব্ধ, কিন্তু স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর ভয়-ভীতি-হুমকির মুখে হয়তো অনেকে সেভাবে সোচ্চার হতে পারেননি। 
নুসরাত জাহান রাফির ওপর যৌন নিপীড়নের এবং তাকে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার পরও কেন স্থানীয়ভাবে এর কোন প্রতিবাদ হয়নি, তা নিয়ে আলোচনা চলছে ঘটনার পর থেকেই। 
তবে শিক্ষিকা বীথি রাণী গুহ বলছেন, ‘মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তারের পরে ২৮ মার্চ সকাল ১১টা আমরা মেয়েদের নিয়ে রাস্তায় প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সমাবেশ করেছি। সব শিক্ষক এবং প্রায় সাতশোর বেশি ছাত্রী সেখানে ছিল। একটা নিরপরাধ মেয়েকে কেন একজন শিক্ষক নির্যাতন করলেন, কেন একটি মেয়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হলো, ওই অধ্যক্ষের শাস্তির জন্য আমরা মানব বন্ধন করেছি।’
কিন্তু এই প্রতিবাদ সমাবেশ করার সময় স্থানীয়ভাবে কোন সমর্থন তারা পাননি। 
বীথি রাণী গুহ বলছেন, “সরাসরি কেউ কিছু বলেনি, তবে পরে ফেসবুকে অনেকে লিখেছে যে, মাদ্রাসায় হলেও সেখানের কেউ প্রতিবাদ করছে না, আশেপাশের স্কুল থেকে প্রতিবাদ হচ্ছে না, অথচ অন্য স্কুলের ছাত্রীরা প্রতিবাদে নেমেছে, এটা তাদের পছন্দ হয়নি।”
স্কুল শিক্ষিকা বীথি রাণী গুহের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, যখন নুসরাত জাহানের শরীরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়, অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তখন ফেনীতে স্থানীয়ভাবে কতটা কী প্রতিবাদ হয়েছে?
বীথি রাণী বলছেন, ‘তেমন কোন প্রতিবাদ হয়নি। কারণ প্রশাসন সক্রিয় থাকায় পক্ষে-বিপক্ষে তেমন কোন কথা হয়নি। ভেতরে ভেতরে সবাই ক্ষোভের আগুনে জ্বলছিল। মারা যাওয়ার পর কিছুটা প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। এর আগে পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে তেমন সোচ্চার প্রতিবাদ হয়নি। ‘’ 
স্থানীয় কিছু ক্ষমতাশালী লোকজনের কারণে এই প্রতিবাদ হয়নি বলে তিনি মনে করেন। 
ম্যাজিস্ট্রেটের বয়ানে ফেনীর উদ্বেগজনক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র 
ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ওই জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। ফেনীতে হওয়া বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জেলার সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা। 
সোহেল রানা লিখেছেন, ‘আপনারা সবই জানেন, তাও বলি, সত্য সূর্যের মতই। দিনে-দুপুরে ছিনতাই হয়েছে বিজয়সিংহ দিঘীতে। ছিনতাইয়ের শিকার যুবকের করা মামলা নেয়নি ওসি রাশেদ চৌধুরী। মামলা নিতে চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে। তারপরও নেয়নি মামলা। এরপর, অন্তত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আমি থানায় পাঠিয়েছি ভিক্টিমদের। ওসি মামলা নেয়নি। জিডি করতে বাধ্য হয়েছে ভিক্টিমেরা। আমার জিজ্ঞাসা কেন মামলা নেয়নি ওসি? ছিনতাইয়ের কি জিডি হয়? ফেনীতে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে জায়গা দখল করেছে এক কাউন্সিলর, অন্যখানে আর একজন প্রভাবশালী নেতা। তাকে জায়গা দখলে সুরক্ষা দিয়েছে স্বয়ং সদর থানার ওসি। আমি বাধা দিতে চেয়েছি, আমাকে থামানো হয়েছে। কে থামাতে চেয়েছে সেটা আর না-ই বললাম। ফেনী শহরজুড়ে অনেকগুলো পতিতালয় আছে। যেখানে মানুষকে নিয়ে ভিক্টিম বানিয়ে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা উদ্ধার করা হয়। এরকম ঘটনা আমার কাছে এসেছে অসংখ্য।’
সোহেল রানা আরও লিখেছেন, ‘এসব পতিতালয়ের নিয়ন্ত্রক কারা? প্রকাশ্যে জনিকে অস্ত্রসহ ধরার পর পুলিশকে আসতে বলি স্পটে। সেখানে পুলিশ আসে এবং আমাকে সাহায্য করে। আমি পুলিশকে অস্ত্র আইনে মামলা করতে বলি, পুলিশ মামলা করতে অপারগতা জানায়। কিন্তু কেন? আমাকে পুলিশ এও বলে যে, আমি ধরেছি আমাকেই মামলা করতে হবে। অথচ পুলিশ আমার সঙ্গে ছিল। হাস্যকর না? ফেনীর এক চেয়ারম্যান আমাকে চোরাচালানের তথ্য দেয়ার জন্য রাজনৈতিক বড় নেতা থেকে শুরু করে সিন্ডিকেটের সবাই তাকে শাসিয়েছে। ডিবির এএসপি আমিনুল তাকে বলেছে, সে কীভাবে নির্বাচন করে সেটা সে দেখে নেবে। ফেনীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি জমির মাটি কাটা নিয়ে শুরু করে, মাদক, স্বর্ণ চোরাচালান প্রায় প্রতিটি বিষয়ে যতটা না অপরাধীদের সঙ্গে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে এ সিন্ডিকেটের সঙ্গে। ফেনীর বালুমহাল নিয়ন্ত্রকদের শাস্তি প্রদানে কাজ করতে পারিনি আমি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘একটা বছর ধরে পুরো সিন্ডিকেট মিলে আমাকে পদে পদে বাধা দিয়েছে। নির্বাচনে আমার গাড়ি থেকে প্রটেকশন উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। সারারাত জেগে আমার পরিবারকে পাহারা দিতে হয়েছে। এ শহরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি চিনি। শহরের প্রতিটি ইটের ভাষাও আমি জানি। সংগ্রামটা অবিশ্বাস্য হলেও শুধু আমার একারই ছিল, আমি ভয়ানক একাই ছিলাম। শুধু আমার দু’একজন বস আর ফেনীর সাধারণ মানুষ ছিল সঙ্গে। তাদের কারণে এক ইঞ্চি মাঠও ছাড়ি নাই। তবে অনেক সময়ই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারিনি, থামিয়ে দেয়া হয়েছে। এজন্য নিজেকে প্রায়ই অপরাধী মনে হয়। পুরো প্রশাসন হয় উদাসীন, নয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত, সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত, অন্যায়ের সঙ্গে, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ঔদাসীন্যও এক ধরনের অপরাধ। এদের মুখে বঙ্গবন্ধুর কথা শুনলে আমার থুতু দিতে ইচ্ছে হতো। এগুলো কিছুই সাংবাদিকরা লেখেনি। আমি লিখতে বলেছি, এরা ভয়ে লেখে নাই। রয়েছে এমন শত শত ঘটনা।’
সোহেল রানা আরও লিখেছেন, ‘এসব ঘটনা বলার কারণ, এগুলো অন্যায়, ভয়াবহ অন্যায়। এই সমাজ এই অন্যায়গুলোর ধারক ও বাহক। এদের কাছে আপনি কীভাবে নুসরাত হত্যার বিচার পাবেন? স্বেচ্ছায় বিদেশে এসেছি পড়তে, দেশে ফিরব পড়াশোনা শেষে। সরকার চাইলে কাজ করব, নাহলে চাকরি ছেড়ে দেব। প্রত্যয় এটুকুই- যুদ্ধের জীবন চলছে, চলবে।’
এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে, নুসরাতকে বলেছিলেন ওসি
যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে আরেক দফা হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে। ওসি নিয়ম ভেঙে জেরা করতে করতেই নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন। মৌখিক অভিযোগ নেওয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনও নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ওসির ভিডিও ধারণের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে নুসরাতের পরিবারের। ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, আইন না মেনে অভিযোগ করতে যাওয়া কারোর ভিডিও করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
ভিডিও করার সময় নুসরাত অঝোরে কাঁদছিলেন এবং তার মুখ দু’হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও ছিল ওসির আপত্তি। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’
দায়িত্বে অবহেলার দায়ে গত ৯ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কে এই ভিডিও করেছিল প্রশ্নে সোনাগাজী থানার ওসি (তদন্ত) বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না।’
ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ভেতরে নুসরাতকে জেরা করা হচ্ছে-‘কিসে পড়? ক্লাস ছিল?’ ঘটনা জানাতে গিয়ে নুসরাত বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। সে সময় তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়- ‘কারে কারে জানাইসো বিষয়টা?’ নুসরাত যখন জানায় তাকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তখন প্রশ্ন করা হয় ‘ডেকেছিল, নাকি তুমি ওখানে গেছিলা?’ পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল বলে নুসরাত জানালে প্রশ্ন করা হয় ‘পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল? পিয়নের নাম কী?’ নুসরাত সে সময় পিয়নের নাম বলেন-‘নূর আলম।’
পুরো ভিডিও’তে নুসরাত কাঁদছিলেন। একসময় ভিডিওধারণকারী তাকে ধমকের সুরে বলে-‘কাঁদলে আমি বুঝবো কী করে, তোমাকে বলতে হবে। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে কাঁদতে হবে।’
ভিডিও’র শেষে নুসরাতের কথা বলা শেষ হলে ধারণকারী আরও কিছু অশালীন উক্তির পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন-‘এটা কিছু না, কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেবো। কিছু হয়নি। রাখো। তুমি বসো।’
নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা এর আগে তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অধ্যক্ষকে গ্রেফতারের পর মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।
গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে কৌশলে ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়। ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যান।
নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর গত ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। 
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার কী সাংঘাতিক আয়োজন!
যৌন হয়রানির বিচার চাওয়ার পরে নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশ দেয় আওয়ামী লীগ নেতা লম্পট অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা। পুড়িয়ে মারার আয়োজন করতে ঐ মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের এক শিক্ষক আবদুল কাদের পরিকল্পনা সাজায় এবং যোগান দেয় ৫ হাজার টাকা। হত্যাকান্ডে ব্যবহার করতে বোরখা, কেরোসিন এসব কেনার জন্য একজন জনপ্রতিনিধি পৌর কাউন্সিলর মকছুদ যোগান দেয় ১০ হাজার টাকা। পুড়িয়ে মারার আগে মাদ্রাসার গেটে পাহারা বসানো হয়। নুসরাতের ভাইকে ঢুকতে দেয়নি হত্যাকারীরা! বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করার ভুয়া খবর দিয়ে নুসরাতকে ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ছাত্রলীগ সভাপতি শামীম, নুরুসহ আরও তিন জন নুসরাতের হাত পা বেঁধে গায়ে কেরেসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, তাতে শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে যায়। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার পরে খুনি ছাত্রলীগ সভাপতি শাহাদাত উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিনকে আগুন দেওয়ার বিষয়টি ফোনে জানায় তখন তিনি শান্ত গলায় বলেন, ‘আমি জানি, তোমরা চলে যাও’! পরে এরা লম্পট সিরাজের পক্ষে মিছিলও করে। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি মামলায় থানা ও প্রশাসন ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন!
এর আগে ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির পরে মাদ্রাসার সভাপতি, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যিনি একজন নারী, স্থানীয় ইউএনও, জেলা প্রশাসক এবং থানার ওসির কাছে বিচার ও নিরাপত্তা চাওয়া হয়। কেউ নুসরাতের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, নিরাপত্তা দেয়নি। উল্টো ওসি মোয়াজ্জেম জিজ্ঞাসাবাদের নামে দ্বিতীয়বার হয়রানি করে এবং তা বেআইনিভাবে ভিডিও করে অনলাইনে ছেড়ে দেয়- উদ্দেশ্য লম্পট সিরাজকে বাঁচানো। ৬ এপ্রিল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার পরে শরীরের ৮০ ভাগ পোড়া নিয়ে যখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে নুসরাত, তখন ওসি মোয়াজ্জেম বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে এটাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা শুরু করে। একটি দৈনিকের এক সাংবাদিককে দিয়ে রিপোর্টও করায়! অবনতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট নজির হচ্ছে- নুসরাত হত্যার পর ওসি মোয়াজ্জেমের কুকীর্তি ধরা পড়ে গেলে তাকে রক্ষা করতে এসপি জাহাঙ্গীর আলম পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠায়, আর তাতে দায়ী করা হয় নুসরাত পরিবারকে! স্থানীয় এমপি নিজাম হাজারী এক অভিযুক্ত রুহুল আমিনকে নিয়েই নুসরাতদের বাড়িতে যান সান্ত্বনা দিতে মামলা তুলে নেয়ার তদবির করতে!
একটি সাধারণ পরিবারের ক্ষমতাহীন মেয়ে, যে কিনা তার ইজ্জতের সুরক্ষা চেয়েছিল, তাকে পুড়িয়ে মারার জন্য পুরো চক্র নিয়ে শক্তিশালী অধ্যক্ষ লম্পট সিরাজ ও শিক্ষক কর্মচারীরা, ছাত্রলীগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতিসহ তার লোকজন, থানার ওসির উল্টো কীর্তি, ইউএনও/ ডিসির অবহেলা, সব মিলিয়ে কী সাংঘাতিক আয়োজন! ২৫ জনের একটি বিরাট চক্র জড়িত!
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)