Shershanews24.com
রাজনীতিতে টান টান উত্তেজনা
মঙ্গলবার, ০৯ অক্টোবর ২০১৮ ০৬:৫৮ অপরাহ্ন
Shershanews24.com

Shershanews24.com

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: আবার সেই অক্টোবর মাস। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সারাদেশের আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা লগি-বৈঠা হাতে ঢাকা এসেছিল সেদিন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত এবং বিরোধীদল আওয়ামী লীগের মধ্যে রাজধানী দখলের লড়াইয়ের এক পর্যায়ে গোলাগুলি, প্রকাশ্য দিবালোকে নিরস্ত্র মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার মতো নৃশংস দৃশ্যও দেখেছে বিশ্ববাসী, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার বদৌলতে।
আবারও সেই হুংকার। মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিম ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা দখলের। সারাদেশের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তিনি এক মাসের জন্য ঢাকা আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, তাদের অন্য কোনো কাজ নেই, ঢাকার মাঠ দখল ছাড়া। রাজধানী ঢাকা আওয়ামী লীগেরই, এটা আবারও প্রমাণ করতে চান তিনি। 
হুংকার-পাল্টা হুংকার চলছিল। হঠাৎ দ্রুত যেন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছিল। অবশ্য, শুরুতে যেভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তাতে অক্টোবর আসার আগেই ২৯ সেপ্টেম্বরই হয়তো বড় একটা কিছু ঘটে যেতো। একই দিনে উভয় পক্ষের কর্মসূচি পালন নিয়ে এ উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। অবশেষে উভয় পক্ষই তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করায় এ যাত্রায় রক্ষা হয়েছে। কিন্তু তাই বলে সংঘর্ষের সম্ভাবনা মোটেই শেষ হয়ে যায়নি। যেহেতু এ মাসের শেষে অথবা আগামী মাসের প্রথমদিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলা হচ্ছে এবং সেই হিসেবে এটিকে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য শেষ মাস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহেই মাসটা উভয় পক্ষের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আর এ কারণেই মাঠ দখলের প্রতিযোগিতা এবং উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। 
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে কঠিন সময়
এটা সবাই বুঝতে পারছেন, এবারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কতটা চরম! সম্ভবত স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ পর্যন্ত যেসব সংকট তৈরি হয়েছিল তারমধ্যে সবচে’ চরম এবং কঠিনতম সংকট হিসেবে এখানকার সময়টাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যেই বলছেন, ক্ষমতার পালাবদল হলে অর্থাৎ ক্ষমতা থেকে পড়ে গেলে তাদের যে কী অবস্থা হবে এটা তারাও কল্পনা করতে পারছেন না। কেউ কেউ অস্তিত্ব বিলীন হওয়ারও আশংকা করছেন। সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এ বিষয়ে আশংকা প্রকাশ করে বলেছেন, প্রথম দিনেই এক লাখ লোক মারা যাবে। সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামসহ সরকার এবং দলের প্রায় সকলেই একবাক্যে নিজেদের ভবিষ্যত পরিণতি সম্পর্কে এমন আতংকজনক বক্তব্যই রাখছেন। দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরাও কমবেশি সবাই বুঝতে পারছেন, ক্ষমতায় ফিরে না আসতে পারলে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। পাশাপাশি দেশের সাধারণ রাজনীতি সচেতন মানুষও আঁচ করতে পারছেন, পরিস্থিতি এখন কতটা চরমে।
এদিকে বিএনপি-জামায়াতও মনে করছে, তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই- একমাত্র বর্তমান সরকারের পতন ছাড়া। তারা এ কারণে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে, সবকিছুর বিনিময়ে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে। শুধুমাত্র বদরুদ্দোজা চৌধুরী আর তার ছেলে মাহী শুরু থেকেই চেষ্টা করছিল ঐক্য ভ-ুল করতে। তাদের চেষ্টা এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্তও অব্যাহত ছিল। তবে বোদ্ধা মহল মনে করছেন, এটা সাময়িক। শিগগিরই ঐক্যের প্রক্রিয়া নতুন আঙ্গিকে শুরু হতে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে এরসঙ্গে এরশাদসহ আওয়ামী লীগের বাইরে অন্য সবাই এক কাতারে দাঁড়ানোরও সম্ভাবনা দেখছেন বোদ্ধা মহল। সর্বশেষ গত ৫ অক্টোবর শুক্রবার জাতীয় ঐক্যের ৬ সদস্যবিশিষ্ট লিয়াজোঁ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এরা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, আসম রব, মাহমুদুর রহমান মান্না ও মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। ড. কামাল হোসেন ৬ অক্টোবর শনিবার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তিনি আসার পর এই লিয়াজোঁ কমিটি আরো সম্প্রসারিত হবে বলে জানানো হয়েছে। ৭ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যের মানববন্দন কর্মসূচি পালিত হবে তাদের ৫ দফা দাবিতে। এরপরই নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। 
বিএনপি নিজেরাই সক্ষম
নিজেদের সক্ষমতার ব্যাপারে বিএনপি নেতারা এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সফল জনসভার পর। অবশ্য, এর আগেও তাৎক্ষণিক সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনে বিএনপি নেতা-কর্মীদের আশাতীত উপস্থিতিতে বোঝা যাচ্ছিল সক্ষমতা সম্পর্কে। কিন্তু, গত ৩০ সেপ্টেম্বরের জনসভাটি ছিল অভূতপূর্ব সাফল্যের প্রমাণ। জনসভা নয়, যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল সেদিনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং এর আশপাশের শাহবাগ থেকে কাঁকরাইল পর্যন্ত পুরো এলাকা ছিল লোকে লোকারণ্য। সবচেয়ে বড় কথা হলো, একেবারেই সর্ট নোটিসে এই জনসভাটি ডাকা হয়েছিল। জনসভার অনুমতি পাওয়া গিয়েছিল মাত্র দেড় দিন আগে, তাও ২২ শর্তে। এছাড়া গ্রেফতার আতংকসহ আরো নানাবিধ সমস্যা তো ছিলই। দু’দিন আগে থেকে ঢাকার সঙ্গে বাইরের জেলাগুলোর সব পরিবহন যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, যাতে বাইরে থেকে লোক আনতে না পারে বিএনপি। এদিকে বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা- বেগম খালেদা জিয়া জেলে আর তারেক রহমান বিদেশে। কিন্তু তারপরও যে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছে সেটি ছিল আশাতীত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বৃহৎ স্থানে এতো কম সময়ে এতো বিশাল জনসভার আয়োজন করার সাহস অতীকে কেউ দেখাতে পারেনি, এমনকি আওয়ামী লীগও নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো বিশাল খোলা স্থানে জনসভা আয়োজন করতে অন্তত এক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। তাই এতো সীমাবদ্ধতা ও এতো স্বল্প সময়ে এখানে জনসভা আয়োজনটা ছিল বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ বেশ সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করে দেখিয়ে দিয়েছে বিএনপি এখন অনেক বেশি সক্ষম। 
ওবায়দুল কাদেরের হতাশা?
আগেই বলা হয়েছে, বিএনপির সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভাটিকে শুধু জনসভা নয়, জনসমুদ্র বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। অথচ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই জনসভাকে ওইদিন তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় ‘হতাশাজনক উপস্থিতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, মাত্র ৫ হাজার লোক হয়েছে জনসভায়। আওয়ামী লীগের পথসভায়ই নাকি এরচেয়ে বেশি লোক উপস্থিত হয়।
কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্যে অবাক হয়েছে মানুষ। কারণ, যারা সমাবেশে যায়নি পত্র-পত্রিকায় ওই সমাবেশের ছবি দেখেছে। তাছাড়া এই ডিজিটাল যুগে তথ্য তেমন একটা চেপে রাখা যায় না। জনসভায় কত লোক হয়েছে এটা কোনো না কোনোভাবে সবাই জেনে গেছে। তাই ওবায়দুল কাদেরের এমন অসত্য উক্তি কেউই মেনে নিতে পারেননি। অনেকেই এ প্রতিবেদকের কাছে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ওবায়দুল কাদের সম্ভবত বিএনপির জনসভায় বেশি লোক সমাগম দেখে হতাশ হয়ে পড়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, সরকারের শেষ দিকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত ভুল তথ্য দিয়ে থাকে। সেই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি এ মন্তব্যটি করেছেন। তবে এমন ভুল তথ্যের উপর নির্ভর করলে বিপর্যয় অনিবার্য। 
বি চৌধুরী-মাহীর দ্বিমুখী ভূমিকা
জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিকল্প ধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং তার ছেলে মাহী বি চৌধুরীর নানারকমের টালবাহানায় সরকার বিরোধী নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে প্রচ- ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় সকলেই মনে করছেন, বি চৌধুরী ও মাহী মূলত ঐক্য চান না। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া যাতে সফল হতে না পারে সেজন্য তারা পেছন থেকে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছেন। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে তাদের এক ধরনের বোঝাপড়াও আছে। ইতিমধ্যে এমন কথা প্রচারিত হয়ে গেছে যে, মাহী বি চৌধুরী বর্তমান সরকারের বেনিফিসিয়ারী গ্রুপেরই একজন। ভিওআইপি সেক্টরের ব্যবসায় সালমান এফ রহমানের মাধ্যমে একটা উল্লেখযোগ্য অংকের ভাগ পান তিনি। এই টাকা অন্যত্র পরিশোধ করা হয়। আর এ কারণেই মাহী বি চৌধুরী সরকার বিরোধী ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করছেন শুরু থেকেই।  
তবে বি চৌধুরী নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা বাংলাদেশ- এর মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ইতিমধ্যেই এই লিয়াজোঁ কমিটিতে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। বি চৌধুরী আর মাহী না আসলেও এখন সমস্যা নেই। বরং এক পর্যায়ে দেখা যাবে তারা বাপ-বেটা নিজেরাই মাইনাস হয়ে গেছেন। কারণ, ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে বিকল্প ধারায় তাদের দু’জনকে ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়ার একজন নেতা শীর্ষ কাগজের এই প্রতিবেদককে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, বাপ-বেটার তখন ঘরে বসে লুডু খেলা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না।
নানা কৌশলে বিএনপি
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং ২০১৫ সালের লাগাতার আন্দোলনে বিএনপির যে সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয় হয়েছিল এবং ইমেজ সংকটে পড়েছিল তা এখন বেশ ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি দলটিতে এখন বেশ উদ্দীপনাও সৃষ্টি হয়েছে। দলের কমবেশি সবাই তাদের সাফল্যের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। তারা বুঝতে পারছেন, সময় এখন তাদের। হাওয়া তাদের দিকেই বইছে। তারা মনে করছেন, নিজেরা ক্ষমতায় আসতে না পারলেও আওয়ামী লীগের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। 
অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও বিএনপি নেতারা ছিলেন এ ব্যাপারে অত্যন্ত হতাশ। বিএনপির সিনিয়র নেতা, এমনকি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বললেও এক রাশ হতাশার কথা শোনাতেন। সরাসরি একথা বলতেন, আওয়ামী লীগকে কোনো ক্রমেই টেনে নামানো যাবে না। এখন সেই নেতারাই নিজেদের সাফল্যের ব্যাপারে বেশ উচ্চকণ্ঠ। তাদের কারো কারো মতে, বিএনপি এখন অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। এছাড়া জামায়াতও সাংগঠনিক দিক থেকে আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী বলে সরকারি সংস্থার রিপোর্টেই বলা হয়েছে। 
বিএনপি গতবার ধোঁকা খাওয়ার পর এবার অনেকটাই পেকে গেছে। অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় এগিয়েছে। গত এক-দেড় বছরে তাদের পদক্ষেপে বা কৌশলে কোনো ভুল হয়নি। এ মুহূর্তে কোনো রকমের সহিংসতার পক্ষে নয় বিএনপি। কোনো উস্কানিতে পা দেবে না তারা। তারা মনে করছেন, নিয়মতান্ত্রিক পথেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সুপরিকল্পিতভাবে বেশ ক’টি ছক বা পরিকল্পনা তারা এঁটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একটি ব্যর্থ হলে যাতে সঙ্গে সঙ্গে অন্যটি ব্যবহার করা যায় সেজন্যই ধাপে ধাপে পরিকল্পনা আঁকা হয়েছে। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নিজেরা হুট করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার আয়োজন করা নানামুখী পরিকল্পনারই অংশ। ঐক্য প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে যাতে নিজেরা একাই মাঠ দখলে নিতে পারেন সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে পুরোমাত্রায়। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় ঐক্যে না আনা হলেও জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ নিয়মিতই আছে। নানামুখী কৌশল প্রণয়নে তাদেরও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিদেশি শক্তিগুলো হঠাৎ বৈরি আচরণ করলেও যাতে সমস্যায় পড়তে না হয়, সেটিও মাথায় রেখেছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। অবশ্য, বিদেশি প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে এবার ভালোই সমঝোতা আছে বিএনপির। তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক আশ্বাসও পেয়েছে। তারা মনে করছেন, এই আশ্বাস নির্বাচন পর্যন্ত বজায় থাকবে।
বেগম খালেদা জিয়ার জেলমুক্তির আন্দোলন বা ২১ আগস্টের মামলায় তারেক রহমানের সম্ভাব্য দ-কে বিএনপি নেতারা এ মুহূর্তে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সামনে একটাই টার্গেট, আওয়ামী লীগ যাতে ক্ষমতায় ফিরে না আসতে পারে। তারা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের পতন ঘটাতে পারলে এসব সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। ১০ অক্টোবর গ্রেনেড মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারিত আছে। এমন কথা প্রচারিত আছে যে, এই রায়ে তারেক রহমানের ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হতে পারে। কিন্তু বিএনপি নেতারা একেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না খুব একটা। আওয়ামী লীগ এসবের মধ্য দিয়ে যাতে পার পেয়ে যেতে না পারে, এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক তারা। 
সর্বশেষ, ৬ অক্টোবর এ রিপোর্ট লেখার সময় আদালতের নির্দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে আনা হয়েছে। এখানে তার পছন্দের চিকিৎসকদের অধীনে তিনি আছেন। অন্যান্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধাও তিনি পাচ্ছেন হাসপাতালে। এটিকেও বিএনপি নেতারা তাদের একটি বিজয় হিসেবে দেখছেন। বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে বিএনপি নেতাদের যে টেনশন ছিল তা এখন আপাতত কেটে গেছে। 
প্রশাসন নির্ভর আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে বর্তমানে নেতাকর্মীর কোনো অভাব নেই। বরং নেতা এতো বেশি যে, নিজেরা প্রতিনিয়ত ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। কিন্তু অভাব একটাই, আর তা হচ্ছে ত্যাগী নেতা-কর্মী। এক সময় এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ত্যাগী নেতা-কর্মী ছিল আওয়ামী লীগেই। গত ১০ বছরে ক্ষমতার স্বাদ ও ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা ত্যাগের মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে। বরং এখন তাদের মধ্যে আরাম-আয়েসের মানসিকতা তৈরি হয়েছে অনেক বেশি। 
অন্যদিকে, বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো চরম অত্যাচার-নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তাদের সামনে আওয়ামী লীগের পতন ছাড়া অন্য কোনো টার্গেট নেই। এছাড়া নানা কারণে জনক্ষোভ এখন অনেকটাই যে চরমে- কোটা আন্দোলন আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেই এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ সরকারের বিরুদ্ধে চরমভাবে ক্ষুব্ধ। মনে করা হচ্ছে, এই জনক্ষোভ থেকেও বিশেষ সুবিধা পাবে বিএনপি-জামায়াত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিএনপিসহ বিরোধীদলকে রাজপথে মোকাবেলা প্রায় অসম্ভব। আওয়ামী লীগ এ মুহূর্তে বিরোধীদের মোকাবেলার জন্য শুধুমাত্র প্রশাসনের উপরই নির্ভর করছে। যদিও মোহাম্মদ নাসিম মাঠ দখলের কথা বলেছেন, আদতে তাদের পক্ষে সেটি এখন আর তেমন একটা সম্ভব নয়, ইতিমধ্যেই টের পেয়েছেন। কারণ, কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি আগের তূলনায় অনেক কমে গেছে।
এসব কারণে আওয়ামী লীগ এখন পুরোপুরি প্রশাসন নির্ভর হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনের অনেকেই নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন, ২০১৩-১৪ সালের তূলনায় এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই সময় আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ছিল পুরোপুরি আওয়ামী লীগের পক্ষে। বিশেষ করে ভারত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। তারা প্রকাশ্যে একচেটিয়াভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছে। কিন্তু এবার ভারত বলছে, তারা নিরপেক্ষ থাকবে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করবে না। আবার এও বলছে, বাংলাদেশে অংশগগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় তারা। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আওয়ামী লীগের অপ্রিয় কথাগুলোই তারা বলছে। বস্তুত তাদের অবস্থান প্রকারান্তরে বিএনপির পক্ষেই যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, চীন গতবার ব্যবসায়িক মানসিকতা থেকে আওয়ামী লীগের পক্ষেই ছিল। কিন্তু এবার তারাও বলছে, বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র গতবার প্রকাশ্যে বিএনপির সঙ্গে ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে ‘ডুয়েল রোল প্লে’ করেছে। যা বিএনপির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছিল। আন্তর্জাতিক এই প্রভাবশালীরা কেউই এবার আর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে না। বরং এরা অনেকেই এখন সরকারের পতন ত্বরান্বিত করার চক্রান্ত করছে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভিযোগ আনা হচ্ছে বার বার। জানা গেছে, এগুলোর প্রভাব পড়ছে প্রশাসনেও। পত্র-পত্রিকায় ইতিমধ্যে এই মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেকেই এখন সরকারের কথা শুনছেন না। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনের সময়ে অর্থাৎ কঠিন দিনগুলোতে আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে কতটা পাশে পাবে সেই প্রশ্ন সামনে এসে যাচ্ছে। 
অপেক্ষা তফসিলের
বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার অপেক্ষা করছে। তারা আশা করছে, আন্তর্জাতিক চাপ, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ঐক্যসহ নানা কারণে সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে নমনীয় হবে। তফসিল ঘোষণার আগেই এ ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ নেবে। কারণ, এ মুহূর্তে সবাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চাইছে বাংলাদেশে।
কিন্তু সরকার সেই ধরনের কোনো পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা অনেকেই আশংকা করছেন।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ অক্টোবর ২০১৮ প্রকাশিত)