মঙ্গলবার, ২২-জানুয়ারী ২০১৯, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন
  • স্বাস্থ্য
  • »
  • ভয়ানক এক ‘সুপারবাগ’ সংক্রমণের ঝুঁকিতে কোটি কোটি মানুষ!

ভয়ানক এক ‘সুপারবাগ’ সংক্রমণের ঝুঁকিতে কোটি কোটি মানুষ!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:৪২ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ১৯৪১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ঘটে গেল এক যুগান্তকারী ঘটনা। মানবদেহে প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিনের সফল প্রয়োগ করলেন বিজ্ঞানীরা। মানব কল্যাণে নিজের এ আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠেছিলেন আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। অ্যান্টিবায়োটিক-আবিষ্কারের আগে সংক্রামক ব্যাধি ছিল মরণব্যাধি। যা ছড়িয়ে পড়েছিলো মহামারির মতো। যা ধ্বংস করেছে একের পর এক শহর, জনপদ আর সভ্যতা। বুবনিক প্লেগ, সিফিলিস, কলেরা, ম্যালেরিয়া আর যক্ষ্মার মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে কোটি কোটি মানুষের জীবন; ধস নেমেছে অর্থনীতিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দেওয়া এই ওষুধকে ডাকা হতো ‘মিরাকাল ড্রাগ’।
চিকিৎসাশাস্ত্রে পৃথিবীজুড়ে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসা এই অ্যান্টিবায়োটিকই এখন ভয়ানক সংকেত নিয়ে এসেছে গোটা বিশ^বাসীর জন্য। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন এক ধরনের সুপারবাগ বা ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকাংশ, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী এন্টিবায়োটিকও এই সুপারবাগ প্রতিরোধ করতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভয়াবহ এই সুপারবাগ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষ ‘সুপারবাগ’ অর্থাৎ প্রচ- শক্তিশালী জীবাণুর সংক্রমণে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অনেক ব্যাকটেরিয়া এখন বেশিরভাগ প্রচলিত ওষুধে কাবু হচ্ছে না। ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো এসব ব্যাকটেরিয়ার মোকাবেলা করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে না নিলে তাদের আক্রমণে ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) জনস্বাস্থ্য ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ভয়াবহ দুর্যোগের’ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। ওইসিডি বলছে, হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সাধারণ মান উন্নত না করলে এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার না কমালে এই দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। ওষুধে মরে না এমন ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপে ২০১৫ সালে ৩৩ হাজার মানুষ মারা গেছে বলে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র থেকে জানা গেছে। ওইসিডি বলছে, ইউরোপে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে সুপারবাগে! সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলছে, উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সুপারবাগের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ২৪ লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে। 
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, সুপারবাগের কারণে ‘সাংঘাতিক বিপর্যয়’-এর মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওইসিডি বলছে, দরকারি নয় এমন অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না হলে এবং জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতালের মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির পেছনে ব্যয় না বাড়ালে, পরিণাম মারাত্মক হতে পারে। সুপারবাগ হলো অ্যান্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়া। এসব ব্যাকটেরিয়াকে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে ঠেকানো যায় না। ২০১৫ সালে সুপারবাগের আক্রমণে শুধু ইউরোপেই ৩৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ওইসিডি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলেছে, অ্যান্টিবায়োটিক-সহনশীল ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসায় বিপুল ব্যয় হবে। প্রতিটি দেশের এই খাতে গড়ে বছরে প্রায় তিন বিলিয়ন ইউরো করে খরচ হবে। ওইসিডির গবেষক দল জানিয়েছে, সুপারবাগে সংক্রমণের ব্যয় সাধারণ জ্বর বা এইচআইভি সংক্রমণের চেয়ে অনেক বেশি। আর বিভিন্ন দেশ এ ব্যাপারে সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ না নেওয়ায় খরচ আরও বাড়ছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে সুপারবাগ আরও অপ্রতিরোধ্য রূপে দেখা দিতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলে এ ধরনের ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের হার ৬০ শতাংশ। আর এসব ব্যাকটেরিয়া ন্যূনতম একটি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের প্রতি সহনশীল। আগে এসব অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে ওই নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া ঠেকানো গেলেও, এখন আর যায় না। ওইসিডির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপারবাগের কারণে রান্নার সময় হাত কেটে যাওয়া বা নিউমোনিয়ার মতো অসুখও জীবনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত ব্যবহারই এর কারণ বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। 
ওইসিডি’র যুগান্তকারী প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০৫০ সালের মধ্যে ২৪ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। এসব সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিবেদনে উল্লেখিত দেশগুলোর প্রতিবছর ৩৫০ কোটি ডলার খরচ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। ওইসিডি’র জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মাইকেল চেচ্চিনি বলেছেন, এই দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের স্বাস্থ্য বাজেটের ১০ শতাংশ ওষুধ থেকে সুরক্ষিত জীবাণু বা এএমআর-এর চিকিৎসায় ব্যয় করছে। এইচআইভি’র চিকিৎসার খরচের চেয়েও এর খরচ বেশি। দেশগুলো এই সমস্যার মোকাবেলাকে প্রাধান্য না দিলে এই খরচ আরও বেড়ে যাবে। 
ইউরোপে বছরে ৩৩ হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় সুপারবাগ
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা সুপারবাগের কারণে প্রতিবছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে প্রাণ হারাচ্ছে ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ। নতুন একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভয়াবহ। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে গ্রিস আর ইটালিতে সুপারবাগ সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল ইসিডিসির এই গবেষণা ল্যানসেট জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এই সুপারবাগ হলো এইচআইভি, ফ্লু এবং যক্ষার মিলিত রূপ। গবেষকরা লিখেছেন, ‘বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় আঘাত হেনেছে সুপারবাগ। ২০০৭ সাল থেকে এর প্রকোপ বেড়ে চলেছে, কেননা, এর আগে পর্যন্ত সুপারবাগে বছরে ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হতো। সুপারবাগের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে থাকে নবজাতক এবং বয়স্করা। তিন চতুর্থাংশ সংক্রমণ ঘটে হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে। জার্মানিতে প্রতি বছর সুপারবাগে অন্তত ৫৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে মারা যায় অন্তত আড়াই হাজার মানুষ। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞরা সুপারবাগ সংক্রমণ নিয়ে বহু আগে থেকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা, মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে এই সংক্রমণ বাড়ছে। রয়টার্সে প্রকাশিত ইসিডিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যখন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, তখন এই সংক্রমণকে মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিন সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু ঘটাবে সুপারবাগ
বিশ^ জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ব্যাকটেরিয়া সুপারবাগ প্রতি তিন সেকেন্ডে একজনকে হত্যা করবে। বৈশ্বিক এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপারবাগ থেকে বাঁচার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে গণহারে প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে ওষুধ ব্যবহার করে ইনফেকশন থেকে বাঁচার পদ্ধতি খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। 
হুমকিতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য 
বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে এমন একটি ওষুধ যা দ্বারা ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রামনজনিত রোগের চিকিৎসা করা হয়। এসব ওষুধের প্রতি যখন ব্যাক্টেরিয়া আর সংবেদনশীল থাকে না তখনই অ্যান্টিবায়োটিক ওই ব্যাক্টেরিয়াটির বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে যায়। ফলে ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনজনিত রোগের চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অত্যন্ত সাধারণ ইনফেকশন/সংক্রমন-এর চিকিৎসাও জটিল হয়ে যায়। সারাবিশে^ এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা এখন একটি বৃহৎ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিশে^র জনস্বাস্থ্যের প্রতি একটি ক্রমবর্ধমান গুরুতর হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে যে, কেবলমাত্র ইউরোপেই প্রতি বছর ৩৩ হাজার মানুষ এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারণে মৃত্যুবরণ করে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এই অবস্থা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে যদি এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে রোধ করা না যায়। যদি এভাবেই এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার হার বৃদ্ধি পেতে থাকে তবে ভবিষ্যতে অতি সাধারণ রোগেও মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। 
অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কিছু কারণ 
বিশেষজ্ঞরা অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার যেসব কারণ খুঁজে পেয়েছেন এর মধ্যে রয়েছে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা। রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যাতিরেকে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কোর্স সম্পন্ন না করা। অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত পশুখাদ্য এবং পোলট্রি-ফীড গ্রহণকারী প্রাণির মাংস খাওয়া। পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধব এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ শেয়ার/ভাগাভাগি করে নেয়া। প্রেসক্রিপশন ব্যতিরেকে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ জনসাধারণের নিকট বিক্রয় করা।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি
মনে করা হচ্ছে যে, ৭ লাখের বেশি মানুষ প্রতি বছর অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাজনিত সংক্রমনের কারণে মৃত্যুবরণ করতে পারে। যদি এই অবস্থা চলতে থাকে তবে ২০৫০ সাল নাগাদ এই মৃত্যুর সংখ্যা এক কোটি ছুঁতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশসহ এশিয়ার ১১ টি দেশে অ্যান্টিবায়োটিক-অকার্যকারিতার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্যমতে, বাংলাদেশের অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধসমূহের অর্ধেকেরও বেশি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবস্থাপত্র প্রদান, বিতরণ কিংবা বিক্রয় করা হয়ে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শপর্বের সংক্ষিপ্ততা, রোগীর পরীক্ষানীরিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান না করা, সঠিক রোগ নির্ণয়কে গুরুত্বারোপ না করা এবং চিকিৎসকের দ্বারা সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান না করার ফলে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকারিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের চিকিৎসকের সংখ্যা রোগীর অনুপাতে অপ্রতুল। এছাড়াও গ্রামাঞ্চলের রোগীরা, যারা চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে শহরে আসেন, তারা সাধারণত রোগ নির্ণয়ের সঠিক ল্যাবরেটরি-রিপোর্ট পাওয়ার অপেক্ষা করতে চান না এবং ফলোআপ ভিজিটের জন্য পুনরায় শহরে আসতে চান না বা অপারগ হন এবং তাঁরা সাধারণত তাৎক্ষাণিকভাবে সুস্থ হবার জন্য চিকিৎসা করিয়ে থাকেন। এছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের মূল্য বেশি হবার কারণে অনেক রোগীর পক্ষে ফুলকোর্স সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওষুধ ক্রয় করা সম্ভব হয় না এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা তাঁদের লক্ষণ কমে আসলে ওষুধ গ্রহণ করা বন্ধ করে দেন, যদিও তখনও তাদের শরীরে রোগজীবাণু সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হয় না। আর্ক ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য সাধারণ ওষুধের মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারেন না, যে কারণে তাঁরা অনেকসময় নিজের অজান্তে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকেন। গবেষণায় এই তথ্যটিও উঠে এসেছে যে, মুদি দোকানে পর্যন্ত ওষুধ বিক্রয় করা হয়ে থাকে। এছাড়াও কখনও কখনও কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ সরবরাহের অপর্যাপ্ততার কারণে রোগীদের সম্পূর্ণ কোর্সের ওষুধ একবারে না দিয়ে পুনরায় আসতে বলা হলেও তারা কিছুটা ভাল বোধ করলে আর বাকি ওষুধ সংগ্রহ করতে কমিউনিটি ক্লিনিকে ফিরে আসে না । আর এভাবে কোর্স অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। 
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, অধিকাংশ গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগীর খাদ্যে পশু-চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অপরিমিত কিংবা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত করা হয়ে থাকে, যা পরবর্তীতে মানবদেহে প্রবেশ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা সৃষ্টি করে। পশুখাদ্য এবং পোলট্রিফিডে অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত করার ফলে পরবর্তীতে সেটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করেও এই সমস্যা সৃষ্টি করছে। যদিও পশুখাদ্য আইন ২০১০ এবং ২০১৩ অনুযায়ী শারীরিক বৃদ্ধি/ মোটাতাজাকরণের জন্য পশুখাদ্যে ও পোলট্রিফিডে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শুধুমাত্র রোগের চিকিৎসার জন্য খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু বিশ^ব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা এখন ব্যাপক আকার ধারণ করছে, তাই এই অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে প্রতিরোধ করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকরী ব্যবহার সুনিশ্চিত করা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতাকে কমিয়ে আনতে দেশের স্বাস্থ্যনীতিকে পুনর্গঠন করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারকদেরকে প্রাসঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের উপর জোর দিতে হবে। গ্রামের এবং শহরের মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার এবং এর অপব্যবহারের কারণে সৃষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সুপারবাগ বনাম মানুষ: এ লড়াইয়ে মানুষ জিততে পারবে কী? 
অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে শুধুই সংক্রামক রোগ নয়, অন্যান্য অনেক রোগ যেমন ক্যানসার, আর্থ্রাইটিস এবং কিডনি রোগের চিকিৎসাও সম্ভব নয়। কেননা এসব ক্ষেত্রে রোগীকে এমন সব ওষুধ দিতে হয় যা আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে ফেলে, যাতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা বেড়ে যায়। মোদ্দা কথা, ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণ থেকে মৃত্যুঝুঁকির আতংক হবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী।
সুপারবাগের হুমকিতে আমাদের অর্থনৈতিক জীবনও নিরাপদ নয়। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াকে এখনই না থামানো গেলে বিশ্ব এক চরম অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত হবে যা ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক মন্দাও ছাপিয়ে যাবে, প্রায় তিন কোটি মানুষকে ঠেলে দিবে চরম দারিদ্র্যে।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিকভাবে। সত্যি বলতে কী, কোনো এক দেশ এককভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কেননা উন্নত যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সারা বিশ্বের মানুষ এখন একই সূত্রে বাঁধা। দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যতই নিñিদ্র হোক না কেন, সাদা চোখে অদৃশ্য, এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সুপারবাগের প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। এর প্রমাণ হল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখান থেকে কোনো না কোনো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। সুপারবাগ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে এখনই তাই যুদ্ধ ঘোষণার সর্বশেষ সময়। আশার কথা হল, সম্প্রতি জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে লড়তে একমত হয়েছে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ২০১৬ সালের জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ নিয়ে বিশেষভাবে আলোচনা হয়েছে। সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এবার নিয়ে মাত্র চার বার।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৬ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)