রবিবার, ১৮-আগস্ট ২০১৯, ০৩:৩৬ অপরাহ্ন
অপরাধ- শুধু মুসলমান!

শতাব্দীর ভয়াবহতম হত্যা ও ধ্বংসলীলা

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর, ২০১৭ ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন

এহসান রফিক: মানবসভ্যতা ধ্বংসের দুই কুখ্যাত নায়ক চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লংয়ের গণহত্যার পরে এমন বীভৎস মৃত্যুর মহোৎসব দেখেনি গোটা দুনিয়া। ইতিহাসখ্যাত খুনি তৈমুর ও চেঙ্গিসরা হত্যার পরে মানুষের মাথা কেটে পিরামিড তৈরি করতো। আর মিয়ানমারে অং সান সুচির বাহিনী গুলি করার পরে নড়াচড়া করলে জবাই করে দেহ থেকে মস্তক আলাদা করছে। জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। গণধর্ষণের পর নারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে পুড়িয়ে ফেলছে। গর্ভবর্তী মুসলিম নারীদের পেট কেটে শিশু বের করে উল্লাস করছে। মিয়ানমারের আরাকানে চলমান গণহত্যায় নারী ও শিশুদের পাশাপাশি সহস্রাধিক আলেম ওলামাকেও হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে কয়েকশ’ মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা শরীফ। এখন সেখানে আজান দেয়া ও নামাজ আদায়ের কেউ নেই। চেঙ্গিস ও তৈমুররা এসব করেছে দেশ দখল করতে গিয়ে। সেটি ছিলো ভিন্ন জাতির সঙ্গে যুদ্ধ। যুদ্ধে বীভৎসতা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় থেকে নিজ দেশের নাগরিক, হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠির সঙ্গে সুচি যে আচরণ করেছেন তা বিশে^ একেবারেই বিরল। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠি রয়েছে। যাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা ও দৈহিক গঠন সাধারণত আলাদা আলাদা হয়। ভাষা ও ধর্মে মিল না থাকলে ভিন্নমতের লোকদের মেরে ফেলতে হয়, এটা মিয়ানমার বিশ^কে দেখিয়ে দিলো। মিয়ানমারের জানা থাকা উচিত, যার যার ধর্ম ও সংস্কৃতি সে তার মতো করে পালন করবে, এটাই স্বাভাবিক। সব মানুষ কখনোই এক মতের হয় না। সুচি মানবজাতির সঙ্গে তামাশা করছেন। তিনি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছেন, ‘আমি আন্তর্জাতিক চাপকে ভয় পাই না। বিশ^ গণমাধ্যমে যা প্রচার হচ্ছে তা সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। রোহিঙ্গা মুসলিমরা কী কারণে দেশ ছাড়ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে’। তার সেনা প্রধান বলেছেন, ‘রাখাইনে পরিচ্ছন্ন অভিযান চলছে। যারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে তারা কখনোই মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী ছিল না। এটি ‘বাঙালি’ ইস্যু। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’  
অন্তহীন লজ্জায় নোবেল কমিটি
চরম মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সুচি’র কর্মকাণ্ড দেখে বিশে^র শান্তিকামি মানুষেরা ভীষণ হতাশ হয়েছেন। তাদের হৃদয় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ও সুচি ছিলেন গণতন্ত্রপন্থী ও শান্তিকামী মানুষের অহংকারের প্রতীক। মহত্ব ও উদারতা দিয়ে চির অমর ম্যান্ডেলা বিশ^নন্দিত ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারলেও সুচির কপালে জুটেছে মানবজাতির ধিক্কার ও ঘৃণা। এক সময় গণতন্ত্রপ্রেমী শান্তিকামী মানুষেরা বিশে^র দেশে দেশে তার মুক্তির জন্য দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সেটেছিলো। সুচির জঘন্য কর্মকা- তাদেরকে খুবই মর্মাহত করেছে। রাখাইনে সুচি যে মানবিক বিপর্যয়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বিশে^ বিরল। এডলফ হিটলারকেও হার মানিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধের সময় জার্মান প্রেসিডেন্ট হিটলার নিজ জাতির সঙ্গে যেমন আচরণ করেছিলেন সুচিও স্বজাতির সঙ্গে সেই কাজটিই করেছেন। সুচির কর্মকাণ্ডে নোবেল কমিটি পড়েছেন অন্তহীন লজ্জায়।  
জীব হত্যা মহাপাপ!
রাখাইনে শতশত গ্রাম জ¦ালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে সেখানকার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ যুবকরা। ছোট ছোট দুধের বাচ্চাদের মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে পাহাড়ের গুহা ও জলাশয়ে। শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ ও মস্তকের চিত্রও বিশ^বাসীকে দেখতে হয়েছে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে। আশ্চর্যের বিষয় যে, বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্রে বলা হচ্ছে, ‘বুদ্ধং সরনং গচ্ছামী’ বা ‘অহিংসা পরম ধর্ম আর জীব হত্যা মহাপাপ’। প্রেক্ষাপটের আলোকে এখন এটা বলাই যায় যে, হয়তো বৌদ্ধরা ধর্ম থেকে সরে গেছে নতুবা তাদের ধর্মের এই বাণী সম্পূর্ণ ভাওতাবাজি। দুুটো নয়, যে কোন একটা সঠিক। আধুনিক পৃথিবীতে চতুষ্পদ জন্তু-জানোয়ার অন্যায়ভাবে হত্যার শিকার হলেও উপযুক্ত বিচার হয়। নন মুসলিমকে প্রতিপক্ষ গালি দিলে বা তার বাড়িতে ঢিল পড়লে বিশে^ টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি হতে দেখা যায়। কিন্তু হাজার হাজার মুসলমান হত্যার শিকার হলেও বিশ^ পরিচালকদের তেমন একটা মাথা ব্যথা হতে দেখা যায় না। অথচ পৃথিবীর যেখানেই হোক একটা ককটেল বা বোমা ফুটলেই সর্বপ্রথম নাম আসে মুসলিমদের। তাদেরকে বলা হয় জঙ্গি। সেটা সত্য হোক কিংবা মিথ্যা। অথচ এতো কিছুর পরও বিশ্বের কোন এ্যাঙ্গেল থেকেই বৌদ্ধদের জঙ্গি বলা হচ্ছে না।
পশুর চেয়েও মূল্যহীন মুসলমান
অবস্থা দেখে মনে হয়, পশুদের চেয়েও মূল্যহীন হয়ে পড়েছে মুসলমানরা। মিয়ানমারে যেটা ঘটতে দেখছে তামাম দুনিয়া মানবজাতির ইতিহাসে এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ খুবই কম হয়েছে। চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লংয়ের পরে এমন বীভৎসতা আর ঘটেনি। এটাকে পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম নির্মম এবং জঘন্য গণহত্যা বলা যায়। ক্ষমতাধর কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্রের মদদে আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে মিয়ানমার এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনকে (আরাকান) খালি করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
ওদের বাঁচতে দেয়া হবে না
ওরা বাঁচতে চাইলেও পারবে না, কারণ ওরা মুসলমান। ওদেরকে জীবন্ত পুড়ে মরতে হবে। গুলি করার পর নড়াচড়া করা যাবে না। নড়লে জবাই হতে হবে। ওদের বাড়িঘরে আগুনের লেলিহান শিখা। রোহিঙ্গাদের কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। হাত-পা বেঁধে গাছে ঝুলিয়ে তীর দ্বারা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। পাশবিক নির্মমতার পর শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে ওদের হাত-পা এবং মাথা। ওদের আগুনে পোড়া দেহ, ছিন্নভিন্ন লাশ দাফন করার কেউ নেই। ওদের নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে খুবই জঘন্যভাবে। কেড়ে নেয়া হচ্ছে অর্থ, সম্পদ ও সহায় সম্বল সবকিছু। ওদের বাসস্থানগুলো আজ বিরান ভিটা। শিয়াল-কুকুর আর কাক-শকুনে খাচ্ছে ওদের যেখানে সেখানে পড়ে থাকা লাশ।
মর্মান্তিক সাঁড়াশি অভিযান
সৈন্যরা বিভিন্ন পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। লোকজনকে গুলি করে মেরে ফেলছে। ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে লোকজন যখন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে তখন হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। নারীরা প্রাণ ও সম্ভ্রম বাঁচাতে, একটু নিরাপত্তার আশায় ছুটছে সবচেয়ে কাছের বড় দেশটিতে। কিন্ত সে দেশের দরজা ওদের জন্য বন্ধ। কি স্থল কি নৌপথ সকল সীমান্ত। উপায়ান্ত না পেয়ে লাখে লাখে রোহিঙ্গা মুসলমান জীবনকে হাতে নিয়ে নদী ও সাগর পাড়ি দিয়ে আসছে বাংলাদেশে। অধিকাংশ পুরুষদের মেরে ফেলা হয়েছে। নারী আর শিশুদের কান্না জড়িত আর্তনাদ ভাসছে আকাশে-বাতাসে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৭ থেকে ৮ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। বিগত তিন সপ্তাহ যাবৎ তারা আসছেই। জাতিসংঘ বলেছে, মোট শরণার্থীর সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, রাখাইন রাজ্যে আগুন জ্বলছে, সেখানে মুসলিম গ্রামগুলোতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের একটি সংস্থা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যা, নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংস: আজান দেয়ার কেউ নেই!
মিয়ানমারের আরাকানে চলমান গণহত্যায় নারী ও শিশুদের পাশাপাশি সহস্রাধিক আলেম ওলামাকেও হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে কয়েকশ’ মসজিদ, মাদরাসা ও খানকা শরীফ। এখন সেখানে আজান দেয়া ও নামাজ আদায়ের কেউ নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধরা আরাকান থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের নাম নিশানা মুছে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এ গণহত্যা চালিয়েছে। এতে মারা পড়েছেন আলেম ওলামা ও পীর মশায়েখরা। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত তারা দুই শতাধিক মসজিদ, অর্ধশত মাদরাসা ও অসংখ্য খানাকাহ পুড়িয়ে দিয়েছে। কিছু আলেম বাংলাদেশ আসতে পারলেও অন্য সবাই মারা পড়েছেন। আরাকানের ২০টি দাওরায়ে হাদিস (কামিল) মাদরাসার সঙ্গে মাধ্যমিক স্তরের আরো ৩০টি মাদরাসা এখন বিরান। সায়দুল্লাহর চর এলাকার বড় মাদরাসার মুহাদ্দিস প্রবীণ আলেমে দ্বীন মাওলানা আহমদ হোছাইনকে (৯০) বর্মী সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তিনি ছিলেন ওই মাদরসার মুহাদ্দিস ও পরিচালক। গত ৬০ বছর ধরে তিনি সেখানে হাদিসের দরস দিয়ে আসছিলেন।
দেশত্যাগ
৮০ বছর বয়সি বাবাকে কাঁধে নিয়ে ৬৫ কিলোমিটার পায়ে হেটে বাংলাদেশে ঢুকেছেন জাফর। তিনি এখন উখিয়ায় অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। সাত বছরের বালক তার তিন বছরের ছোট ভাইকে কাঁধে নিয়ে কাদা-পানি, জঙ্গল-নদী মাড়িয়ে অন্যদের সঙ্গে সাতদিন পায়ে হেটে বাংলাদেশ ঢুকেছে। পথে তারা শুধু লাশ আর লাশ দেখতে পেয়েছে। ২৩ বছর বয়সী শফি বলেন, ‘যেদিন সৈন্যরা আমাদের ওপর চড়াও হলো ওই দিন কেবল আমরা ফজরের নামাজ পড়ে সকালের খাবারের প্রস্ততি নিচ্ছিলাম। তিনজন সৈন্য মেশিনগান নিয়ে আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে বললো, ‘তোরা বাঙালি, বাড়ি থেকে বের হ। যেখানে খুশি যা, এখানে থাকতে পারবি না।’  দেশ ও ভিটে মাটির মায়ায় আমরা বের হতে ইতস্তত করছিলাম। শুরু হলো হত্যাযজ্ঞ। তার বর্ণনা দেয়া ভারী কঠিন। সবাই মরলো। অল্পকিছু আমরা প্রাণ নিয়ে পালাতে পারলাম। অন্যদেরকে গুলি করার পর ওরা গরু-ছাগলের মতো জবাই করলো। রক্তে ভেসে গেলো বাড়ির উঠোন। তারপর গ্রামের রাস্তাঘাট। একযোগে বহু পরিবারের ওপর এমন বর্বরতা ও নৃশংসতা চালালো ওরা।
অসমিয়া, বাংলা ও আরাকানি ভাষার পার্থক্য
ওরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী। ধর্ম ইসলাম। ভাষা আরাকানি। যদিও ভাষাটি শুনতে উখিয়া টেকনাফের ভাষার কাছাকাছি। কিন্তু আসলে সেটি বাংলা ভাষা নয়। তবে কক্সবাজারের ভাষার সঙ্গে এটির খানিকটা সাদৃশ্য রয়েছে। যেমন সাদৃশ্য রয়েছে আসামের অসমিয়া আর বাংলা ভাষার মধ্যে। অসমিয়া এবং বাংলা শুনতে কাছাকাছি হলেও এক নয়। ঠিক তেমনি বাংলা ও আরাকানি ভাষা শুনতে কাছাকাছি। ওরা বহু পুরোনো। হাজার হাজার বছর আগ থেকে ওরা ঐ জায়গায় বসবাস করে আসছে। আর আজকের মিয়ানমার সরকার বলছে- রোহিঙ্গারা আমাদের নাগরিক নয়, ওরা বাঙালি। কথা বলে বাংলায়। অথচ ইতিহাস বলছে, বাঙালি নয়, ওরা রোহিঙ্গা মুসলমান। যেমন আমরা বাঙালি মুসলমান।
স্থায়ী বাসিন্দার সংজ্ঞা
কয়শ বছর বসবাস করলে একটা ভূখ-ের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া যায়? এই প্রশ্ন বিশে^র বিবেকবান মানুষের। রাখাইন রাজ্যের সাবেক নাম ছিলো আরাকান। আরাকান মানে ইতিহাস, আরাকান মানে মুসলিম প্রধান এলাকা। ওদের অপরাধ ওরা রোহিঙ্গা মুসলমান। আরাকানের মাটিতে শতশত নয়- ওরা হাজার হাজার বছর ধরে বসবাস করার পরও নিজেদের সরকার ওদের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। ওরা যদি মুসলমান না হত তাহলে হয়তো কিছুই হত না।
ওদের সব কেড়ে নেয়া হয়েছে
ওদের সব কেড়ে নিয়েছে মিয়ানমারের বৌদ্ধ সরকার। নি¤œমানের জীবন তাদের। কোনও অধিকার নেই। তারপরও ওরা নি¤œমানের জীবন নিয়েই বাঁচতে চেয়েছিলো ওখানে। কিন্তু পারেনি! শিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা মৌলিক অধিকার বলতে কিছুই নেই তাদের। নাগরিক স্বীকৃতিতো নেই-ই। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে চলছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী ধর্মীয়-রাজনৈতিক গ্রুপগুলোর নিষ্ঠুর নির্মূলীকরণ অভিযান। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সামনে মাত্র দুটি রাস্তা খুলে রেখেছে। আর তা হলো, মৃত্যু নতুবা দেশত্যাগ। বারো লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেয়া হয়নি।
যুগে যুগে রোহিঙ্গা নির্যাতন
মুসলিম বিরোধী সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা হয় ১৯৪২ সালে। জানা যায়, এ সময় বর্মীরা বিভিন্ন স্থানে ৫ হাজার মুসলিম ও শুধু রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ২০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। ১৯৬২ সালে বার্মায় জেনারেল নে উইন ক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ক্রমশ কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে।  এ অবস্থায় তাদের মধ্যে আত্মরক্ষার চেষ্টা শুরু হয়, যা দমন করতে সামরিক জান্তা ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গা নির্মূলীকরণ ‘কিং ড্রাগন অপারেশন’ চালায়।  প্রায় সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি এর শিকার হয়। হত্যা, ধ্বংস, নির্যাতন, গ্রেফতার থেকে রেহাই পেতে বানের স্রোতের মত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা ধেয়ে আসে বাংলাদেশে। বিপন্ন মানবতার প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার তাদের সাময়িক আশ্রয় দেয়। সেই সাথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদিআরব ও পাশের দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের জন্য ছড়িয়ে পড়েন অন্তত ১২ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম। তখনও হাজার হাজার রোহিঙ্গা মারা পড়ার পর, দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান হয় গৃহহীন। সে সময়কার বহু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে আজও মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।
অধিকার হারা জনগোষ্ঠি
রোহিঙ্গাদের কোনো সামাজিক অধিকার নেই। তাদের সন্তানদের মিয়ানমারের কোনো সরকারি স্কুল কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার নেই। রোগে-দুর্ঘটনায় কোনো সরকারি হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় না। দেশের কোনো সরকারি চাকরিতে নেয়া হয় না রোহিঙ্গাদের। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের আর কোনো অঞ্চলের মুসলমানদের সাথে যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। কোনো রোহিঙ্গা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো গ্রামে যেতে পারে না।  রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের বিয়ে করতে হলে সরকারের লোকদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। কেউ সন্তান নিতে চাইলে জানাতে হয় কর্তৃপক্ষকে। তাদের কাউকে আটক করা হলে কোনো আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে অসংখ্য রোহিঙ্গা বিনা বিচারে দিন কাটাচ্ছে বা বানোয়াট অপরাধে জেলের ঘানি টেনে চলেছে বছরের পর বছর।
যুবক হত্যা ও যুবতীকে ধর্ষণের পর...
রাখাইনের তিনটি জেলা মংডু, বুসিদং ও রাসিদংয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বীভৎসভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। বুসিংয়ের মেইটু মনটিং নামে একটি পাহাড়ের পাদদেশে হাজার হাজার যুবককে একসঙ্গে করে ব্রাশ ফায়ার করে মেরে ফেলতে দেখেছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গা। যুবতী মেয়েদের বাছাই করে ধর্ষণ করেছে তারা নিকৃষ্টভাবে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা দেখতে পেয়েছে, এমন সব বীভৎস ঘটনা। নোমান, মংডু শহরে একটি বড় জুতার দোকান ছিল তার। সেনা ও বৌদ্ধ যুবকরা পেট্রল দিয়ে জ্বালিয়ে ছাই করে দেয় তার দোকানটি। তাকে গুলি করা হলেও তিনি রক্ষা পেয়ে যান। কোনরকম জীবন নিয়ে পালিয়ে আসেন বাংলাদেশে। তার আটকাপড়া পরিবারের কী অবস্থা তা তিনি জানেন না! সব হারিয়ে রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশ পানে হাঁটা শুরু করেন। পথে তারা খেতে থাকেন লতাপাতাসহ কলাগাছের কচি থোড় আর ঝর্ণা, খাল ও নদীর পানি। এভাবে কেটে যায় আট দিন। অবশেষে তাঁরা বুকে বল ফিরে পেলেন তখন, যখন দেখলেন সামনেই বাংলাদেশ! বৃষ্টি হচ্ছিল। এত সব বিভীষিকা পেরিয়ে যখন তাঁরা বাংলার সীমান্ত পার হলো তখন তারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরলেন । এ ভেবে যে, কষ্ট যতোই হোক- অন্তত জীবনটা বেঁচে গেলো। চোখ বন্ধ করলেই প্রতিবেশীদের প্রাণহীন টুকরো টুকরো নিথর দেহ মনের মধ্যে সময় সময় ভেসে উঠে। তাদের কানে বাজছে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। যা সর্বদাই আমাকে তাড়া করছে। ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক অ্যানি গোয়েনকে কথাগুলো বলছিলেন, সব হারিয়ে বাংলাদেশে আসা খালেদা আক্তার।
শানুয়ারা খাতুন (২৫) সাংবাদিকদের জানালেন তার করুণ স্মৃতিকথা। তিনি বললেন, ‘মনে করেছিলাম, তারা শুধু অবিবাহিত তরুণী ও কিশোরীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করছে, আমার মতো গৃহবধূদের হয়তো কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। তাদের লালসা থেকে রেহাই পাইনি আমি। একসঙ্গে তিন সেনা বাড়িতে ঢুকে একের পর এক অমানবিকভাবে নির্যাতন করলো আমাকে। ঘৃণ্য সে নির্যাতনের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলেও প্রাণে বেঁচে গেলাম আমি। তবে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেক কিশোরী ও তরুণীকে চোখের সামনে মরতে দেখেছি। শানুয়ারার বাড়ি মংডুর বলির বাজার গ্রামে। নিজ বাড়িতে ঘটে যাওয়া সেনাবাহিনী ও রাখাইন মগ সন্ত্রাসীদের নৃশংসতার কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শানুয়ারা বলেন, নির্যাতনের পরও টলতে টলতে তিনি শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে অন্য সন্তানদেও খুঁজে ফিরছিলেন একসঙ্গে পালানোর জন্য। কিন্ত সন্তানদের সবাইকে আমি পায়নি। ছোট বাচ্চাটি নিয়ে যখন ছুটছিলাম, তখন সেনাবাহিনী ও রাখাইনের বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা আমাকে ঘিরে ফেলে  আমার কোল থেকে ছোট ছেলেটিকে কেড়ে নিয়ে আগুনের মধ্যে ছুড়ে মারলো। এরও আগে একইভাবে দুই মেয়ে এবং স্বামীকেও তারা ধরে আগুনে ফেলে দিয়েছিলো। এরপর আমি বাকি দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়াতে থাকি। শানুয়ারা জানান, বলির বাজার থেকে সীমান্তে আসতে তাঁর সময় লেগেছে তিন দিন। পথে নিজে কিছু মুখে দেননি। কয়েকজনের কাছ থেকে চেয়ে দুই সন্তানকে সামান্য খাইয়েছেন। পরিশেষে শানুয়ারা সন্তানদের নিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান। এখন তিনি টেকনাফের একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে অবস্থান করছেন।
মিয়ানমারের অস্ত্র ভান্ডার
আলজাজিরার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কিনেছে রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে। এ ছাড়া ভারত, ইউক্রেন ও ইসরাইল মিয়ানমারের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। বিমান: সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে মিয়ানমারের কাছে সবচেয়ে বেশি বিমান বিক্রি করেছে চীন, ১২০টি। এরপর রাশিয়া ৬৪টি বিমান বিক্রি করেছে মিয়ানমারের কাছে। এ ছাড়া পোল্যান্ড ৩৫টি, জার্মানি ২০, সাবেক যুগোসøাভিয়া ১২টি, ভারত ৯টি, সুইজারল্যান্ড ৩টি ও ডেনমার্ক একটি বিমান বিক্রি করেছে তাদের কাছে। ক্ষেপনাস্ত্র: মিয়ানমারের কাছে সর্বাধিক ২৯৭১ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছে রাশিয়া। প্রভাবশালী প্রতিবেশী চীন ১০২৯টি ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছে। এ ছাড়া বেলারুশ ১০২টি, বুলগেরিয়া ১০০টি ও ইউক্রেন থেকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে মিয়ানমার। নৌযান : মিয়ানমার নৌবাহিনীতে রয়েছে ২১টি নৌ-জাহাজ কেনা হয়েছে চীনের কাছ থেকে। এ ছাড়া ভারত ও সাবেক যুগোসøাভিয়ার কাছ থেকে কেনা হয়েছে ৩টি করে। কামান: চীন ১২৫টি কামান বিক্রি করেছে মিয়ানমারের কাছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় সামরিক জান্তাশাসিত দেশটির কাছে সার্বিয়া ১২০টি, রাশিয়া ১০০টি, ইসরাইল ২১টি, উত্তর কোরিয়া ১৬টি ও ভারত ১০টি কামান বিক্রি করেছে। সাঁজোয়া যান: মিয়ানমারের কাছে সর্বাধিক ৬৯৬টি সাঁজোয়া যান বিক্রি করেছে চীন। এরপরই আছে ইসরাইলের অবস্থান, ১২০টি। এ ছাড়া ইউক্রেন ৫০টি ও ভারত ২০টি সাঁজোয়া যান বিক্রি করেছে মিয়ানমারের কাছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যের ভিত্তিতে তারা বলছে, মিয়ানমারের অধিকাংশ যুদ্ধবিমান, সাঁজোয়া যান, কামান ও নৌজাহাজ এসেছে চীন থেকে। আর দেশটির ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের প্রধান সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া।  
তারেকের বউ হতে না পেরে ক্ষুব্ধ সুচি
রোহিঙ্গাদের ওপরে সুচির আক্রোশের মূল কারণ ভেঙে যাওয়া প্রেম। ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তারেক হায়দার নামের এক পাকিস্তানী ছাত্রের প্রেমে পড়েছিলেন সুচি। কিন্তু সেই প্রেম পরিণতি পায়নি। সুচি তারেকের বউ হতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সুচিকে তারেক বিয়ে করতে পারেনি। এরপর থেকেই ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী হয়ে যায় সুচি। ইংরেজি এবং পরিবেশবিদ্যা নিয়ে পড়ার ইচ্ছায় অক্সফোর্ডে এসেছিলেন সুচি। কিন্তু সুযোগ পাননি। অবশেষে ভর্তি হন দর্শনে। সেখানে তার আলাপ হয় তারেকের সঙ্গে। সুচির জীবনীকার বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম বলেছেন, ‘সংস্কৃতিগতভাবে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সুচি এবং তারেক গভীর প্রেমে জড়িয়েছিলেন। সুচির দাম্পত্য জীবনে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। প্রেম নিয়ে সুচি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, তৃতীয় বিভাগে কোনও রকমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। অক্সফোর্ডের পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে তারেক পাকিস্তানে ফিরে যান। সুচি চাইলেও তারেক তাকে বিয়ে করেননি। এরপরে শোকে বিমর্ষ হয়ে পড়েন সুচি। পপহ্যাম লিখেছেন, ‘সুচি প্রায় এক বছর বিরহে বিমর্ষ ছিলেন। এই সময়ে ইংল্যান্ডে সুচির পুরনো পারিবারিক বন্ধু স্যার পল গর বুথ ও মিসেস বুথের পুত্র ক্রিস্টোফার সুচির প্রয়াত স্বামী মাইকেল অ্যারিসের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ১৯৭২ সালে তারা বিয়ে করেন।
বিশ্ব রাজনীতির গ্যাড়াকলে রোহিঙ্গারা
আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের অবস্থাকে নরকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অসহায় রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে বিশ^ নিশ্চুপ। নানা সমীকরণ সেখানে চলছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ঘিরে ফেলতে মিয়ানমারকে চায়। এজন্য তারা নিশ্চুপ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যে ভারত ’৭১ সালে প্রায় ১ কোটি বাঙালি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছিল সেই ভারত রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের সাথে হাত মিলিয়ে ফেললো। রাশিয়ার সমর্থনও মিয়ানমারের জুলুমের পক্ষে। গণচীনতো শুরু থেকেই বৈশ্বিক স্বার্থে মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বসে আছে। ইউরোপ দায়সারাভাবে টুকটাক কথা বলছে। রোহিঙ্গারা সকল অর্থেই আজ অস্তিত্ব বিপন্ন অসহায় ও হতভাগা এক জাতিগোষ্ঠি। প্রথমে রাশিয়া বলেছে, একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ আন্তঃধর্মীয় বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে। অবশ্য পরে বলেছে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ভিত্তিতে বাংলাদেশে মিয়ানমারের সমস্যার সমাধান হতে পারে। চীন প্রথম বলেছে, মিয়ানমারের পাশে আমরা আছি। পরে বলেছে, দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হতে পারে দু’দেশের মধ্যে। প্রথমে ভারত বলেছিলো, ভারত মিয়ানমারের পাশে রয়েছে। পরে তারা মধ্যবর্তী অবস্থানে গিয়ে বলেছে, আমরা শরণার্থীদের পাশেও আছি। দরকার হলে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবো। গণহত্যার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। তারা পেছন থেকে সকল কলকাঠি নাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে।
বিশ্ব নেতাদের বক্তব্য
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি টাকেডা আলেমু বলেছেন, রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য শেখ হাসিনার সরকারকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে লবিং আরো জোরদার করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন লন্ডনে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে সহিংসতা চলছে তা অগ্রহণযোগ্য, এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাঁর সঙ্গে থাকা যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচিকে তাঁর নৈতিকতাবোধ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সুচিকে নৈতিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। জানা গেছে, তার দেশ সুচির নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। বৃটেনের লেবার পার্টির প্রধান জেরেমি করবিন সুচিকে বলেছেন, নৃশংসতা বন্ধ করুন। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেশে ফিরিয়ে নিন। ভুলে যাবেন না, আমরা আপনার মুক্তির জন্য রাজপথে ছিলাম। সবকিছু ভুলে গেলে চলে না। অতীতকে মনে রাখতে হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভূক্ত অনেক দেশই মিয়ানমারের বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পার্লামেন্টও রাখাইনে রোহিঙ্গা নাগরিক হত্যা ও নির্যাতনের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
শুরুতে কথা বলেছে তুরস্ক। তারপর পর্যায়ক্রমে-  ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তান। সবমিলিয়ে মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদের ভাষা নন মুসলিমদের মতো জোরালো ছিলো না। তাদের নিন্দার ভাষা খুবই দুর্বল ছিলো। এটাকে দায়সারা গোছের বলা যায়। বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসুফ বিন আহমাদ আল-ওথাইমিন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে বাংলাদেশে এসে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরাইলের এক নম্বর বন্ধু সৌদি আরব দীর্ঘদিন চুপ থাকার পর মুসলিম দেশগুলোর চাপে অবশেষে মিয়ানমারের গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে দায়মুক্ত হতে চেয়েছে। বিত্তশালী মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো এখনো চুপচাপ রয়েছে।
জাতিসংঘে শেখ হাসিনার ভূমিকা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনসহ বিশ্বনেতাদের কাছে মিয়ানমার সরকারের জাতিগত নির্মূল অভিযানের বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। বিশ্বের কাছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদানসহ বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মানবিক পদক্ষেপ তুলে ধরেছেন তিনি। তিনি ওআইসিকেও ছয়দফা গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
দ্বি-পাক্ষিক আলোচনার নেপথ্য
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া ও চীনের কথায় দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় যাওয়া যাবে না। তাহলে কোনও সমাধান আসবে না। সমাধান হতে হবে বহু-পাক্ষিক বা জাতিসংঘের মাধ্যমে। এর বাইরে গেলেই চলমান রোহিঙ্গা সমস্যা স্থায়ী হয়ে যাবে। এটি বাংলাদেশ কোনোভাবেই চাইতে পারে না।
(সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত)