রবিবার, ২১-জুলাই ২০১৯, ০৮:২১ পূর্বাহ্ন

বিএনপির সংসদে যাওয়ার নেপথ্যে কী?

shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ মে, ২০১৯ ০৭:৩৭ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংসদে যাওয়ার বিষয়টি এতোদিন নাকচ করে দিলেও অবশেষে অনেকটা আকস্মিকভাবেই সংসদে যোগ দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নির্বাচিত সদস্যরা। প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল। এর একেবারে শেষ দিনে এসে ২৯ এপ্রিল এ শপথ নিয়েছেন বিএনপির ৪ সদস্য। 
বিএনপি বলছে, দলীয় সিদ্ধান্তেই নির্বাচিত ওই ৪ সদস্য সংসদে যোগ দিয়েছেন। যদিও দলটির খোদ মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই শপথ গ্রহণ করেননি। এমনকি কয়েকদিন আগে বিএনপির আরেক সদস্য শপথ গ্রহণ করায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। কিন্তু এরইমধ্যে কী ঘটে গেল যে এতোটা নাটকীয়ভাবে  সংসদে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হলো বিএনপিকে। যদিও সংসদে যোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ রয়েছে বলে দলটি দাবি করে আসছিল। তবে এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে শপথ নিতে কোনো ধরনের চাপের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। নির্বাচিত ৪ সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সংসদে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে তারা যৌক্তিক মনে করেছেন। তবে বিএনপি মহাসচিবের এমন সাদামাটা বক্তব্যে কেউ বিশ^াস করতে পারছেন না। সাধারণ সচেতন নাগরিক থেকে শুরু করে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও এর হিসাব-নিকাশ মেলাতে পারছেন না। সবাই এর নেপথ্য কারণ খুঁজছেন- কেন বিএনপির শীর্ষমহল শেষ মুহূর্তে এমন অভাবিত সিদ্ধান্ত নিল?
সংসদে যোগ দেয়ার পেছনে সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনো সমঝোতা বা বেগম জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়ার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সে সম্পর্কে অবশ্য বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল থেকে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করেন, সরকারের নির্দেশেই বেগম জিয়া ১৪ মাস ধরে কারাবন্দি আছেন। জামিন পাওয়ার যোগ্য হলেও তাকে জামিন দেয়া হচ্ছে না। শীর্ষ নেতারা কখনো কখনো এমনও বলেছেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়, এটি নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। এজন্য সবাইকে রাজপথে নামতে হবে।’ বিএনপি সংসদে যাওয়ায় বেগম জিয়ার জামিন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে এমন আলোচনাও বিএনপির বিভিন্ন স্তরে রয়েছে। ৪ সংসদ সদস্যের মধ্যে দলের যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ শপথ নেয়ার পর সংসদে যোগ দিয়েই বেগম জিয়ার মুক্তির দাবিতে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। সংসদে দেয়া বক্তব্যে তিনি এও বলেছেন, ‘অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তারা সংসদে যোগ দিয়েছেন।’ এই বক্তব্যে সংসদে যেতে তাদের অনড় অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া যায়। নির্বাচিতরা শপথ গ্রহণের আগে বলেছেন, সংসদে যেতে তাদের ওপর জনগণের চাপ আছে। বিএনপির তরফ থেকে বলা হচ্ছিলÑ সরকার তাদের দলের এমপিদের শপথ নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে যেটিই হোক সংসদে যাওয়ার জন্য এক ধরনের চাপ যে ছিল সেটি স্পষ্ট। কূটনৈতিক মহল থেকেও তাদের কাছে বারবার জানতে চাওয়া হয়েছে তারা সংসদে যাবেন কি না।
অবশ্য, যে কারণেই হোক বিএনপি’র নির্বাচিত সদস্যদের সংসদে শপথ গ্রহণের বিষয়টিকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, সংখ্যায় কম হলেও বিএনপি এবং গণফোরামের সদস্যরা ইচ্ছা করলে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তারা জনগণের কথা বলতে পারবেন। মানুষের সুখ-দুঃখের কথাও সংসদে বলতে পারবেন।
নেপথ্যে কী?
বিএনপির সংসদে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক হয়েছে, তা নিয়ে বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের ভেতরেও একধরনের চাপ রয়েছে। তাদের নতুন নির্বাচনের দাবি নানা কৌশলে আদায় হতে পারে। বিদ্যমান বাস্তবতায় এই মুহূর্তে যেহেতু রাজপথে কঠোর কোনো আন্দোলনের সুযোগ নেই, সে ক্ষেত্রে সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচকভাবে দেখা যেতে পারে। তবে সিদ্ধান্তের আকস্মিকতায় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা বিব্রত অবস্থায় রয়েছেন। তারা পুরো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যে যত কথাই বলুক দ্বিতীয় ধাপে বিএনপির এই চার এমপির সংসদে যোগদানে দলটির জন্য একাধিক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদেশি যারা এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করছিল তাদের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। এর মধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও তৈরি হয়েছে। যদিও সরকার খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে গত কিছু দিনে। কিন্তু বিএনপি নেত্রী প্যারোলে মুক্তি নিতে মোটেই আগ্রহী নন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে বিদেশিদের প্রচ- চাপ আছে। সর্বশেষ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক টেলিফোন সংলাপের সূত্র ধরে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, খালেদা জিয়াকে যে সরকার জোর করে আটকে রেখেছে সেই প্রমাণ এখন বের হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে মনে করা হচ্ছে, খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য শিগগিরই হয়তো উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেতে পারেন। এছাড়া রাজনীতিতে আরো কিছু নতুন খবর আগামী কয়েক মাসে তৈরি হতে পারে।
শপথের পর এমপিদের প্রতিক্রিয়া 
দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে শপথ নিয়েছেন বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হারুনুর রশীদ। শপথ গ্রহণের পর সংসদ ভবনের সামনে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আজকের এই দিনটির জন্য গোটা জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়েছে। প্রকৃত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদ গঠিত হয়নি। তাই আমাদের দল ভোট ডাকাতির নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সংসদে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমরাও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এতদিন শপথ গ্রহণ করিনি। এখন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অনুমতি ও নির্দেশক্রমেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, ১৭ কোটি মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা সংসদে গিয়ে জনগণের পক্ষে কথা বলতে চাই। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানাতে চাই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কারও কারও ওপর শপথ নেয়ার জন্য চাপ ছিল। সাদা পোশাকধারী ও অন্যান্য এজেন্সির লোকেরা আমাদের কোনো কোনো সংসদ সদস্যকে শপথ গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছিল। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র নেই। কথা বলার সুযোগ নেই। তাই কথা বলতে সংসদে এসেছি। সংসদে যোগ দিয়ে আমরা আমাদের নেত্রীর (খালেদা জিয়া) মুক্তির দাবি জানাব। একই দাবি করেন উকিল আবদুস সাত্তার। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘উপরের নির্দেশেই সংসদে যোগ দিয়েছি।’ 
সংসদে কী করতে পারবে বিএনপি?
বিএনপির নির্বাচিত ৫ জন সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নিতে যাননি। ফলে তার পদটি শূন্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে বিএনপির এই ৫ জন সদস্য সংসদে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন? আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও জাতীয় সংসদে বিরোধী আসনে বসেছে ২২টি আসনের জাতীয় পার্টি। বিএনপি সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল হলেও তাদের সংসদের বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলছেন, সম্ভবত তারা সংসদে হুইপ পাবেন না। তবে তারা একটি পার্লামেন্টারি গ্রুপ হিসেবে সংসদে থাকবেন।
তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্টে যাওয়ার পর বিএনপির ৫ জন সংসদ সদস্য একটি গ্রুপ তৈরি করতে পারেন। সেখানে তারা নিজেদের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করে নিয়ে সংসদীয় কার্য পরিচালনা করতে পারেন। এভাবে একটি নতুন প্র্যাকটিস তৈরি হবে।’ সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের পার্লামেন্টে যে ঘটনা দেখা যাচ্ছে, এরকম এর আগে আর দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে নির্বাচন করার পর জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে বসেছে। আবার প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির ৫জন সদস্য পার্লামেন্টে এসেছেন, যারা আবার সংসদে বিরোধী দল নয়। বিএনপির এই ছোট গ্রুপের কার্যাবলী নতুন একটি উদাহরণ তৈরি করবে বলে বলছেন ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম। তারা কি দলের সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দিতে পারবেন? এ প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম বলছেন, এই সংসদ সদস্যদের জন্য যদি দলীয় হুইপ না থাকে, তাহলে কোন প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেয়ার সময় আর্টিকেল ৭০-এর ধারার প্রসঙ্গটি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে আরেকজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলছেন, যেহেতু তারা বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে গিয়েছেন, সেখানে কোন গ্রুপ গঠিত হলে সেটাকে বিএনপির পার্লামেন্টারি গ্রুপ হিসেবেই ধরা যাবে। সেই গ্রুপের সিদ্ধান্ত বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত হলে সেটি অন্যদেরও অনুসরণ করতে হবে। কেউ সেটির বিপক্ষে ভোট দিলে সেখানে আর্টিকেল ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘দলের কোনও নির্বাচনে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী রূপে মনোনীত হয়ে কোনও ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনও নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’
ফলে দলগতভাবে তাদের পরিচিতি হলে তখন এই ধারাটি প্রযোজ্য হবে বলে বলছেন মালিক। যদিও সেরকম সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করেন তিনি। এই দলের ওপর মূল দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে বলেই তিনি মনে করেন।
এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ বলছেন, ‘কোন সমঝোতা ছাড়া বিএনপির এই সদস্যরা আইন প্রণয়ন বা বিল অনুমোদনে খুব সামান্যই ভূমিকা রাখতে পারবেন। হয়তো তারা কোন আইনের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন, কিন্তু তাদের সংখ্যা কম হওয়ায় সেটি ঠেকাতে পারবেন না।”
শাহদীন মালিক আরও বলছেন, ‘২০১৬ সাল পর্যন্ত আইনগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছি, ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই যেভাবে আইনটি মন্ত্রিসভায় পাশ হয়েছে, কোনো সংশোধন ছাড়াই সেভাবে সংসদেও পাশ হয়েছে। সংসদে তার কোন পরিবর্তন হয়নি।’ সংসদ সদস্য হিসাবে সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্রে সরকারি দলের সংসদ সদস্য বা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যদের সঙ্গে তাদের কোন পার্থক্য থাকবে না। অন্যদের মতো তারা একজন সংসদ সদস্য হিসাবে যাবতীয় সুবিধা ভোগ করবেন।
 (সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ মে ২০১৯ প্রকাশিত)