শুক্রবার, ২৪-মে ২০১৯, ০৮:০৭ পূর্বাহ্ন
দুদকের সুপারিশ ফাইলবন্দি

সড়ক বিভাগে দুর্নীতি লুটপাট চলছেই

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৪ মে, ২০১৯ ০৮:৩৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত ৯ বছরে দেশে নতুন সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নে ৪৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও ব্যয় হয়েছে ১৩ হাজার ৭০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। আর ওই অর্থবছরেই রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এই হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল দশা রয়েই গেছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট-২০১৯’ প্রতিবেদনেও সড়ক অবকাঠামোর মানের ভিত্তিতে প্রণীত সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র নেপাল ছাড়া অন্য সব দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের প্রতিবেদনেও সড়কব্যবস্থার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা সুখকর নয়। সরকারের হাইওয়ে ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (এইচডিএম) হিসাব বলছে, সারা দেশে ‘দুর্বল’ সড়কের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৫২৮ কিলোমিটার; ‘খারাপ’ তালিকাভুক্ত সড়কের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৮২ কিলোমিটার, আর ‘খুব খারাপ’ সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৮৪৩ কিলোমিটার। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালের অধিকাংশ ভূমি পাহাড়ি, ফলে সেখানে টেকসই সড়ক নির্মাণ করা কঠিন। কিন্তু বাংলাদেশে তিন পার্বত্য জেলা ছাড়া প্রায় পুরোটাই সমতল। সে ক্ষেত্রে যদি সড়কব্যবস্থার অবনতি ঘটে থাকে তার দায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ কোনোভাবে এড়াতে পারে না। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সড়ক নির্মাণে প্রয়োজনীয় অনেক শর্তই সংশ্লিষ্টরা মানেন না। সড়কের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি, অনিয়মই এইখাতের ভরাডুবির অন্যতম কারণ। সড়কে হাজার হাজার অনিয়ম দুর্নীতির মধ্যে একটি উদাহরণ দিলেই তা আরো স্পষ্ট হবে। টাকার অংকের দিক থেকে বিবেচনা করলে এটি একটি ছোট ঘটনা। কিন্তু এটিকে ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে বিবেচনা করলে সড়ক বিভাগের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। হবিগঞ্জ শহরের প্রধান সড়কের সংস্কারকাজে এই অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে, ৩১ লাখ টাকার এই সংস্কার কাজ এক রাতেই শেষ করে দিয়েছেন ঠিকাদার। আর দিনের বেলা ১২ ঘণ্টা না পেরোতেই উঠে গেছে নতুন কার্পেটিং! 
জানা গেছে, হবিগঞ্জ শহরের প্রধান সড়ক মেরামতের জন্য গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর দরপত্র আহ্বান করে সওজ বিভাগ। ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স ৩১ লাখ টাকায় মেরামতের এ কাজ পায়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরুই করেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি রাতে তারা শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় মেরামত কাজ করে। এক রাতেই তারা কাজটি শেষ করে বলে দাবি করে। কিন্তু পরের দিন দুপুরের মধ্যেই সংস্কার কাজের চিহ্ন পুরোপুরি মুছে যায়!
স্থানীয়রা বলছেন, রাত ১২টায় কাজ শুরু করে ভোর হওয়ার আগেই শেষ হয়েছে। আবার সন্ধ্যার আগেই সব উঠে গেছে। এ রকম সড়ক মেরামতের কাজ জীবনেও দেখিনি! রাতের আঁধারে এত নিম্নমানের কাজ আমাদের বোকা বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। ৩১ লাখ টাকার কাজ ৩১ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই উধাও! এমন দুর্নীতিবাজদের এখনই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। শহরের প্রধান সড়ক মেরামতের এ কাজে অনিয়মের প্রমাণও পেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, সংস্কার কাজে নতুন কার্পেটিং ১২ মিলিমিটার পুরু করার কথা থাকলেও করা হয়েছে ২ থেকে ৩ মিলিমিটার। আর সড়ক ১৮ থেকে ২২ ফুট প্রশস্ত করার কথা থাকলেও করা হয়েছে মাত্র ৮-১০ ফুট করে। সড়কখাতের এই দুর্নীতি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত সুপারিশও দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।  সড়ক ও জনপথ বিভাগকে দুর্নীতির আখড়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে স্বাধীন এই সংস্থার দেয়া এক প্রতিবেদনে।
দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে গঠিত ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সংক্রান্ত দুদক প্রাতিষ্ঠানিক টিমে’র অনুসন্ধানেও বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক নির্মাণে পদে পদে অনিয়ম হচ্ছে। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট, খোয়া ও বিটুমিন ব্যবহার। ঠিকমতো মাটি ও বালু না ফেলা। সময়মতো কাজ শেষ না করে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়ানো, দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি টাকা আত্মসাৎ। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদার নিয়োগ ও সড়ক নির্মাণে পদে পদে দুর্নীতি হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি।
এই প্রতিবেদনে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র যেমন উপস্থাপন করা হয়েছে তেমনি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দুর্নীতি রোধে ২১ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। এই সুপারিশ  মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়েও পাঠিয়েছে দুদক।
কিন্তু, ইতিমধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও সড়ক মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর সেইসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আর এ কারণে সড়ক বিভাগে দুর্নীতি-লুটপাট আরো বিস্তার লাভ করছে।
দুদকের ২১ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি নেই
সারা দেশে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিদিনই চলছে সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের কাজ। এসব কাজে অধিকাংশ জায়গায়ই চলে কোটি কোটি কিংবা হাজার কোটি টাকার অনিয়ম আর দুর্নীতি। সওজের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে প্রভাবশালী ঠিকাদাররা হাতিয়ে নিচ্ছেন সরকারি অর্থ, বিনিময়ে কর্মকর্তারা নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের উৎকোচ। এ ছাড়া স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করা, কাজ পেতে ঠিকাদারদের প্রকাশ্য সিন্ডিকেট পদ্ধতি, উৎকোচের বিনিময়ে কাজের মান ঠিক না রাখা, কাজ ফেলে রাখা, উদ্দেশ্যমূলক ডিজাইন পরিবর্তন, বেনামে সরকারি প্রকৌশলীদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, ভুয়া বিল-ভাউচার, উদ্দেশ্যমূলক অতিরিক্ত প্রাক্কলনসহ বহুবিধ উপায়ে চলছে সরকারের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কাজ।
সওজ’র দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে গত বছরের মার্চে ২১ দফা সুপারিশ পাঠায় দুদক।  দুদক সচিবের স্বাক্ষরে পাঠানো ওই সুপারিশে বলা হয়েছিল- নিম্নমানের ইট, বালি ও খোয়া দিয়ে সড়ক নির্মাণের মধ্য দিয়ে যে দুর্নীতি হয় তা বন্ধ করতে হবে। সড়কের কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে। স্পেসিফিকেশনের চেয়ে কম বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে- এটা বন্ধ করতে হবে। প্রভাবশালীদের চাপ থেকে প্রকৌশলীদের সুরক্ষা দিতে হবে। প্রকল্পের কাজে দরপত্রে টেকনিক্যাল ফাইন্যান্সিয়াল অফার মূল্যায়নে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নির্মাণকাজে গাফিলতি ও ঠিকাদার নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
দুর্নীতির উৎস : দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সওজের কাজের ক্ষেত্রে ইজিপি টেন্ডারিং প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেও টেন্ডারের শর্তানুসারে প্রদত্ত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ও ঠিকাদারের চাপে অথবা পরস্পর যোগসাজশে একশ্রেণির প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন। ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছে। কাজ পাওয়ার জন্য অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরামর্শক সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তাদের উৎকোচ প্রদান করতে হয়। ফলে ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজের মান বজায় রেখে প্রকল্প শেষ করা ঠিকাদারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।’
এক্ষেত্রে নির্মাণ কাজের এস্টিমেশন ও ডিজাইন দুর্নীতির আরেকটি উৎস। অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, যেমন টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, নেগোসিয়েশনের নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে সাপোর্টিং বা এজেন্ট ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণ কাজের ডিজাইন পরিবর্তন, নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার, টেন্ডারের শর্তানুসারে কাজ বুঝে না নেয়া ইত্যাদি দুর্নীতির উৎস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেরামত বা সংস্কার কাজের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি কর্তৃক বেনামে অথবা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ পরিচালনা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ এবং ঠিকাদার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর অনৈতিক সুবিধালাভ দুর্নীতির উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে কাজের গুণগতমান এবং পরিমাণ বজায় না রাখাও দুর্নীতির অন্যতম উৎস। পরিমাণগত দুর্নীতির উৎসের উল্লেখযোগ্য নিয়ামকগুলো হচ্ছে- সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত উপাদানের সঠিক অনুপাত নিশ্চিত না করা এবং সড়কের পুরুত্বের পরিমাণ টেন্ডারের স্পেসিফিকেশনের চেয়ে কম থাকা। নির্ধারিত টাইম ফ্রেমের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না করে প্রকল্প মূল্য এবং সময় বৃদ্ধি করে দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করা হয়।
দুর্নীতি রোধে দুদকের সুপারিশ : দুদকের সুপারিশে বলা হয়, সড়ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে খোয়া, যা সাধারণত পাথর বা ইট থেকে তৈরি হয়। উন্নতমানের খোয়া ছাড়া সড়ক নির্মাণ করা হলে এর স্থায়িত্ব প্রত্যাশা করা যায় না। আর উন্নতমানের খোয়া তৈরির জন্য প্রয়োজন পাথর, পিকেট বা ঝামা ইট অথবা ১নং গ্রেডের ইট। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের অধিকাংশ টেন্ডারে স্পেসিফিকেশনে বর্ণিত এসিভি যথাযথভাবে পেতে গেলে পাথর বা ঝামা ইট অথবা ১নং গ্রেডের ইট ব্যবহারের প্রয়োজন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের চাপে অথবা প্রকৌশলীদের দায়িত্বে অবহেলা কিংবা পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের জন্য সড়ক নির্মাণে পাথর, ঝামা অথবা গ্রেড-১ এর ইটের খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের ইট দিয়ে নিম্নমানের খোয়া তৈরি করে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে স্পেসিফিকেশন অনুসারে এসিভি নিশ্চিত করা হচ্ছে না। সড়ক নির্মাণে এ দুর্নীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। সড়কে ব্যবহত ইট বা খোয়ার এসিভি সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে এবং সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে তা প্রত্যয়ন করতে হবে। পরে ল্যাবরেটরিতে নিরূপিত এসিভির কোনো তারতম্য ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে দুর্নীতির মামলা করলেই এভাবে কাজের প্রবণতা কমে আসবে বলে দুদকের সুপারিশে বলা হয়েছিল।
সুপারিশে বলা হয়, প্রতিটি সড়কের ক্ষেত্রে ডিজাইন অনুসারে সড়ক নির্মাণের সময় সড়ক বেডের রেশিও ক্যালিফোর্নিয়া বেয়ারিং রেডিও বা সিবিআর নিরূপণ করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। একক ক্রসিং মূল্য বা এসিভির মতো সিবিআরের ক্ষেত্রেও বিচ্যুতি ঘটলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুপারিশে আরো বলা হয়, ‘সড়ক নির্মাণে টেন্ডারের শর্তানুসারে উন্নত বালি ব্যবহার না করে নিম্নমানের বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল বিভাগের অধ্যাপক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নির্মাণকাজে বিশেষজ্ঞ, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে সততার সুখ্যাতি রয়েছে এমন প্রকৌশলীদের নিয়ে একাধিক মনিটরিং কমিটি গঠন করা দরকার। এসব কমিটি শুধু নির্মাণকাজের গুণগতমান এবং পরিমাণের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী কিংবা সরকার নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট প্রদান করবে। এছাড়া সওজের নিজস্ব মনিটরিং ইউনিট গঠন করা যেতে পারে এবং সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধির আলোকে মনিটরিং ইউনিট কাজের পরিমাণগত ও গুণগত মানের বিষয়ে রিপোর্ট প্রদান করবে। মনিটরিং ইউনিটের চূড়ান্ত রিপোর্ট ব্যতীত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল দেয়া যাবে না।’
সুপারিশে বলা হয়, ‘নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নির্মাণের ফলে বৃষ্টিপাত ও বন্যায় সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।’
এতে আরও বলা হয়, ‘সড়ক নির্মাণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিটুমিন। সরকারিভাবে বিটুমিন আমদানির দায়িত্বে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি। প্রাথমিকভাবে বিটুমিনের গুণগতমান নিশ্চিত করার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুণগত মান ঠিক থাকলেও স্পেসিফিকেশন অনুসারে যে পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার করার কথা তার চেয়ে কম বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। মাঠ প্রকৌশলীরা ঠিকাদার কর্তৃক ব্যবহারের জন্য নির্মাণ সাইটে মজুদ করা বিটুমিন পরীক্ষা করে এর মান নিশ্চিত করবেন। এক্ষেত্রে গ্রেড মানের তারতম্য হলে ঠিকাদার, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক আইনে মামলা করা যেতে পারে।’
দুদকের সুপারিশে বলা হয়, ‘সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মাধ্যমে উচ্চ দরে বা বড় মাপের টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সাধারণত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অথবা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদমর্যাদার পদগুলো সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত পদ। এ জাতীয় পদের কর্মকর্তাদের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের সরাসরি দায়িত্বে না রেখে সুপারভাইজিং ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।’
সড়ক নির্মাণে মাটির কাজে দুর্নীতির আরেকটি উৎস বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়। এজন্য এ কাজে মন্ত্রণালয় মনিটরিং টুলস যেমন- পরিদর্শন, অডিটিং, রিপোর্টিং ইত্যাদি প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রণয়ন এবং দরপত্রের টেকনিক্যাল ফাইন্যান্সিয়াল অফার মূল্যায়নে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তির কথাও বলা হয়েছে।
সুপারিশে আরও বলা হয়, ‘সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ার সার্বিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরামর্শক সংস্থার প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণ ও পূর্ব যোগ্যতা মূল্যায়ন করে ঠিকাদারদের নিবন্ধন এবং সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন এবং তা ওয়েবসাইটসহ সর্বত্র প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। ই-জিপি অনুমোদন অথবা সুপারিশের ক্ষেত্রে যাতে কোনো জালিয়াতি বা দুর্নীতি না হয় সে জন্য ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।’
প্রকল্পের ক্রয়, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে গণশুনানি ও ‘সামাজিক নিরীক্ষার’ আয়োজন করা যেতে পারে বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, পিপিআর ও পিপিএ সম্পর্কে ঠিকাদারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সুপারিশে বলা হয়, ‘ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল দেয়ার আগে তার কাজের পরিমাণগত ও গুণগতমান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে। হিসাবরক্ষণ অফিসগুলোতে এ মর্মে একটি নির্দেশনা প্রেরণ করা প্রয়োজন। কোনো বিল সামাজিক নিরীক্ষা ছাড়া প্রদান করা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন।’
সুপারিশে বলা হয়, ‘প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়ের পর প্রকল্প পরিদর্শন বা তদারকিকরণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্মাণ বা মেরামত ও সংস্কার কাজে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য যে টিম এস্টিমেট করবেন, তারা বাস্তবায়ন কাজে জড়িত হতে পারবেন না।’
ওভারলোডিংয়ের ফলে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে সুপারিশে বলা হয়, এটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ‘মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১২’-এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহারও সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুর্নীতির উৎস উল্লেখ করে সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পে গাড়ি ক্রয়ের যৌক্তিকতা নিরূপণ করেই গাড়ি ক্রয় করা উচিত। এছাড়া নির্মাণকাজে গাফিলতি কিংবা এজেন্ট ও ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটালে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
দুদকের সুপারিশ ফাইলবন্দি
সাম্প্রতিককালের হিসাবে ইউরোপ মহাদেশে সড়ক নির্মাণে খরচ হয় প্রতি কিলোমিটারে ২৯ কোটি টাকা, চীনে ১৩ কোটি ও ভারতে ১০ কোটি। আর এদিকে অবিশ্বাস স্যভাবে বাংলাদেশে গড়ে লাগে ৫৯ কোটি টাকা, যা ভারতের ছয় গুন। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হতে যাচ্ছে ৯৫ কোটি টাকা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থ ব্যয়ের এই বিশ্বরেকর্ড গড়ে আমরা কী রকমের সড়ক তৈরি করছি? বিশ^ব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন থেকে জানা গেলো, অবকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নিম্নতম। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সড়ক অবকাঠামো সূচকে ১০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২ দশমিক ৯, ভারতের ৩ দশমিক ৮, চীনের ৪ দশমিক ৬, পাকিস্তানের ৩ দশমিক ৮ ও শ্রীলংকার স্কোর ৫ দশমিক ১। এই দুটি চিত্র থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সড়ক নির্মাণে কী হারে দুর্নীতি-লুটপাট হচ্ছে! কিন্তু, দুর্নীতির এসব চিত্র প্রকাশ হওয়ার পরও এমনকি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যসহ সুপারিশমালা পেশ করার পরও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরের। সড়ক-মহাসড়ক খাতের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে গত বছরের মার্চে ২১ দফা কর্মকৌশল পেশ করেছে দুদক। ইতিমধ্যে এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে দৃশ্যমান কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর। আর তাই এ খাতে দুর্নীতিবাজদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে, জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)