বৃহস্পতিবার, ২৩-মে ২০১৯, ০৩:৩১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • আগ বাড়িয়ে বক্তব্য দেয়ায় গণপূর্ত প্রকৌশলীকে শাস্তিমূলক বদলি
সোহরাওয়ার্দীর অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রহস্যের জট খোলেনি 

আগ বাড়িয়ে বক্তব্য দেয়ায় গণপূর্ত প্রকৌশলীকে শাস্তিমূলক বদলি

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৪ মে, ২০১৯ ০৮:২৮ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অগ্নিকা- নিয়ে রহস্যের জট খোলেনি। অগ্নিকাণ্ডের পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও কোত্থেকে কীভাবে এই আগুন লেগেছিল- এসব প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি। একেক কর্তৃপক্ষ একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। বলতে গেলে অগ্নিকাণ্ডের দায় নিয়ে রীতিমতো ফুটবল খেলা চলছে। 
এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য গণপূর্ত অধিদফতর শেরে বাংলা নগর শাখার ইএম বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়ী করেছেন হাসপাতালের কর্মকর্তারা। যদিও তদন্ত কমিটি বলছে, এই আগুনের শুরু হয়েছিল বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে। আর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বলছে, এই অগ্নিকাণ্ডে গণপূর্তের কেউ জড়িত থাকতে পারে এমন কোনো তথ্য নেই। 
সংশ্লিষ্টদের পরস্পরবিরোধী এমন বক্তব্যে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে। এদিকে এই অগ্নিকাণ্ড নিয়ে গণমাধ্যমে আগ বাড়িয়ে বক্তব্য দেয়ার অপরাধে গণপূর্ত অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী আলী আকবর সরকারকে খাগড়াছড়িতে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। কিন্তু কেন আগ বাড়িয়ে তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়। 
জানা যায়, উপসহকারী প্রকৌশলী আলী আকবর সরকার গণপূর্ত প্রধান কার্যালয়ের পেকু বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর অগ্নিকাণ্ড সংক্রান্ত কোনো বিভাগেরও তিনি সংশ্লিষ্ট নন। এমন কোনো দায়িত্বও তার ছিলো না।  কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ‘এই অগ্নিকাণ্ডের দায়দায়িত্ব গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এড়াতে পারেন না’ বলে আগ বাড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ একই সময়ে খোদ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের দায়দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে গণপূর্তকে দায়ী করে আগ বাড়িয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার দায়ে সম্প্রতি উপসহকারী প্রকৌশলী আলী আকবর সরকারকে খাগড়াছড়িতে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। 
তবে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে তার একাধিকবার বদলির আদেশ হয়েছিলো। কিন্তু দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা সেসব আদেশকে নানা কায়দায় অকার্যকর করে গণপূর্তের প্রধান কার্যালয়ে দাপটের সঙ্গেই বহাল ছিলেন।
শুধু তাই নয়, বদলি আদেশ ঠেকাতে উচ্চ আদালতে রিট মামলাও দায়ের করেছিলেন তিনি। 
মূলত সরকারি চাকরি করলেও সরকারি কোনো আদেশ একেবারেই মানতে নারাজ কথিত এই নেতা। এর আগে ২০১৬ সালে গণপূর্ত অধিদফতর থেকে তাকে সাভার গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়েছিল, অথচ সেখানে যোগদান করেননি তিনি। এরপর বদলি করা হয় খুলনায়, যাননি সেখানেও। উল্টো বদলি আদেশের বিরুদ্ধে রিট করেন। তবে রিটটি খারিজ হয়ে যায়। সরকারি নির্দেশ অমান্য করেও মাসের পর মাস বেতন নিয়েছেন এই কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে তার কাছে কৈফিয়ত চান প্রধান প্রকৌশলী ও পূর্ত সচিব। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। 
জানা যায়, চাকরি না করেই মাসের পর মাস তথ্য গোপন করে বেতন-ভাতাদি তুলে নিয়েছেন জুনিয়র এই প্রভাবশালী প্রকৌশলী। সেই সঙ্গে দাফতরিক আদেশ লঙ্ঘন ও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করার দুঃসাহসিক কাজটিও করেছেন তিনি। ‘ব্রেক অব সার্ভিস’ ও কর্মস্থলে না থেকে সরকারি টাকা ভোগের দায়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু হলেও ওই সময় নতুন করে তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে পদায়ন করা হয়। জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্যরা এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ কর্মকর্তার বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত ও বেআইনিভাবে নেয়া সরকারি টাকা ফিরিয়ে নেয়ার তাগিদ দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
জানা গেছে, ২০০৪ সালে চাকরিতে যোগ দেয়া আলী আকবর সরকারের উত্থান ঘটে কবির আহমেদ ভূইঞা গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী থাকাকালে। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় আলী আকবর সরকার ছিলেন কবির আহমেদ ভূইঞার ডান হাত। এই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেই থেকেই দাফতরিক নির্দেশনা অমান্য ও লাগাতার চাকরি বিধি লঙ্ঘন যাচ্ছেন আলী আকবর। এই কর্মকর্তা এক যুগের চাকরি জীবনে যেমন নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে লিপ্ত হয়েছেন তেমনি ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে উপার্জন করেছেন কাড়ি কাড়ি অর্থ। কবির আহমেদ ভূইঞার ডান হাত হওয়ায় তার প্রভাবে তটস্থ থাকতেন ঊর্ধ্বতনরাও। চেইন অব কমান্ড ভেঙে একের পর এক অনিয়ম ও লুটপাট শুরু করেন তিনি। যে কারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কর্তৃৃপক্ষ ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর তাকে সাভার গণপূর্ত বিভাগ থেকে খুলনা গণপূর্ত বিভাগে বদলির আদেশ জারি করে।
তবে দাপুটে এই কর্মকর্তা দাফতরিক নির্দেশ লঙ্ঘন করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে চার্জ না দিয়ে বানোয়াট মেডিকেল সার্টিফিকেট যুক্ত করে ওইদিনই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে অবগতির জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর একটি দরখাস্ত পাঠান। কিন্তু কোনো ছুটির আবেদন করেননি। ডাক্তারি সনদপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি একুইট ভাইরাসে আক্রান্ত। ডাক্তার নাকি তাকে ১৫ দিন বেড রেস্টে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ওই সার্টিফিকেটে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা ওষুধের বর্ণনা নেই। এর পরদিন ১০ অক্টোবর আলী আকবর সরকারকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে শূন্যপদে ওইদিনই জীবন কুমার ভৌমিককে চাঁদপুর গণপূর্ত বিভাগ থেকে এনে পদায়ন করা হয়। তার যোগদানপত্র ১৩ অক্টোবর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী গ্রহণ করে ওইপদে সাময়িকভাবে পদায়নকৃত উপসহকারী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিনের কাছ থেকে দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার নির্দেশ দেন। এর পরপরই ধূর্ত এই আলী আকবর তার বদলির আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। একমাস মামলা চলার পর ২২ নভেম্বর আপিল বিভাগ তার রিট খারিজ করে দেন। এরপর তিনি দীর্ঘ ৬ মাস কোথাও যোগদান করেননি। অথচ এই সময়ে তিনি অবৈধভাবে মাসিক বেতন ভাতাদি উত্তোলন করেছেন।
প্রকৌশলীদের অভিযোগ, আলী আকবর সরকারের ব্রেক অব সার্ভিস হয়েছে এবং চাকরি না করে বেতন নিয়ে সরকারি চাকরির বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। একই স্থান থেকে একই সময়ে তিনি ও তার স্থলে কর্মরত অপর কর্মকর্তা দু’জনই বেতন উত্তোলন করেন কীভাবে?
অভিযোগ রয়েছে, গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে অনেক সহকর্মীকে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদে যোগ দিতে নিষেধ করে আলী আকবর বলেছেন, এই সরকার আর ক্ষমতায় আসবে না। কিন্তু নির্বাচনের পরে পুরোটাই উল্টে গেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ নামে একটি সংগঠন বর্তমান থাকলেও একই নামে আরেকটি সংগঠন করার উদ্যোগ নেন তিনি। এরইমধ্যে আগুন নিয়ে আগ বাড়িয়ে বক্তব্য কাল হয়ে দাঁড়ায় আলী আকবরের জন্য। কিন্তু তিনি কেন, কার স্বার্থে দায়িত্বের বাইরে গিয়ে এই বক্তব্য দিয়েছেন তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আগুন রহস্যময় হয়ে উঠছে যে কারণে 
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন কোত্থেকে লেগেছিল, তা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। এই ঘটনা তদন্তে গঠিত অন্তত দুটি কমিটি বলেছে শর্ট সার্কিটে আগুন লেগেছিলো। কিন্তু তারপরও রহস্য থেকে যায়। কারণ প্রথমে চারতলা এই হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ড থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে হাসপাতালের পরিচালক উত্তম বড়ুয়া সাংবাদিকদের বলেছিলেন। তিনি বলেন, শিশু ওয়ার্ডে প্রথম আগুন লেগেছিল, পরে তা অন্য তলায় ছড়িয়ে পড়ে। এদিন হাসপাতালের এক কর্মচারীও তার পরিচালকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তিন তলায় প্রথম আগুন জ্বলতে দেখেছেন।
তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান বলেছেন, আগুন প্রথমে লেগেছিল নিচ তলার স্টোর রুমে। সেখান থেকে তা উপরে ছড়িয়ে পড়ে। তিন তলায় আগে আগুন লাগার বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আগুনের ধর্ম নিচ থেকে উপরে ওঠে, উপর থেকে নিচে নামে না।
আলী আহাম্মেদ বলেন, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও স্টোরে অনেকগুলো কক্ষে তা জ্বলছিল, সেগুলোতে ঢুকে ঢুকে নেভাতে হয়েছে তাদের। “ভেতরে ছোট ছোট আগুন আছে, স্মোক আছে। তবে আগুনটা বড় হচ্ছে না। আমরা এখন রুমগুলো চেক করে দেখছি,” রাত সোয়া ৮টায় বলেছিলেন তিনি অবশ্য এর আধা ঘণ্টার মধ্যে আগুন পুরোপুরি নেভানো হয়।
এই অগ্নিকা-ের কারণ কী, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে না চাইলেও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এই আগুন লাগতে পারে। আগুনের সূত্রপাত ঘটার পরপরই হাসপাতালটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। সোয়া ৭টার দিকে বিদ্যুৎ ফিরে আসে।
আগুন লাগার পর তা নেভানোর সরঞ্জাম খুঁজে না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এক রোগীর স্বজন মো. আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “আগুন লাগার পর আধা ঘণ্টা খুঁজেও নেভানোর সরঞ্জাম খুঁজে পাই নাই, তখন যদি নেভানোর সরঞ্জাম পেতাম, তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না।”
সরকারি এই হাসপাতালে অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা থাকলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না বলে মত প্রকাশ করেছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহাম্মেদ।
এ ব্যাপারে গঠিত দুটো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন লেগেছিল। নিচতলায় মেডিসিনের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এ এইচ এম ফিরোজের কক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে দাবি করা হয়। পরে পাশের স্টোররুমে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আগুন নিচতলা থেকে দ্বিতীয় তলা এবং তিন তলায় শিশু ওয়ার্ডে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার সময় হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষ থেকে ১২টি কম্পিউটার চুরি হয়েছে। ঘটনায় গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে এ রকম আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। তবি অভিযোগ এসেছে, এই দুটি তদন্ত কমিটিই অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তাদের মতামত পেশ করেছে। তারা যথাযথভাবে তদন্ত কাজ চালায়নি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কথা বলে অগ্নিকান্ডের ঘটনাকে তড়িঘড়ি চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর এ কারণেই বিষয়টি তাদের কাছে রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)