বুধবার, ২৬-জুন ২০১৯, ০৪:৫৩ অপরাহ্ন
বিনিয়োগকারীরা চরম হয়রানিতে পড়েন

এনবিআরের ই-টিআইএন বন্ধ ছিলো ১০ দিন

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:১১ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) প্রদানের সেবা রহস্যজনক কারণে অন্তত এক সপ্তাহ বন্ধ ছিলো। এ ব্যাপারে কোনো আগাম ঘোষণাও ছিল না এনবিআরের পক্ষ থেকে। এমনকি এই সংকট নিরসনে অর্থাৎ ই-টিআইএন ব্যবস্থা সচল করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি। এপ্রিলের প্রথমার্ধে একনাগাড়ে এতোদিন এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা বন্ধ থাকায় চরম বিপাকে পড়েন ইটিআইএন প্রত্যাশীরা। বিশেষ করে এই সেবা বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংক ঋণ ও লেনদেনসহ যাবতীয় কাজে টিআইএন নম্বর এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 
ই-টিআইএন খুবই সহজ একটি সেবা। এনবিআরের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই সেবাটি নেয়া যায়। অথচ এটি বন্ধ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী অন্তত এক সপ্তাহ এনবিআরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ৭ দিনে  ৩০০০ হাজার নতুন করদাতা তৈরি হতো। এই সেবাটির জন্য ধর্ণা দিতে গিয়ে ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে অনেককে। প্রায় দশ দিন ধরে এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ এই সেবা বন্ধের নেপথ্যে আইটি সংক্রান্ত সমস্যার কথা বলা হয়েছে। তবে এতবড় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে কী কারণে এতো সময় ধরে আইটিখাতে এই সমস্যা চললো তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, এনবিআর নাগরিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করছে। ট্যাক্স প্রক্রিয়া যাতে সহজ হয় সেজন্য ই-টিআইএনসহ তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।  
এসবের মধ্যে ই-পেমেন্ট, ভ্যাট অনলাইন, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও রয়েছে। জানা যায়, এনবিআরের এই পুরে আইটি উইংয়ের তদারকির দায়িত্ব বোর্ড প্রশাসনের। অথচ এই আইটিখাতে চলছে ব্যাপক সমন্বয়হীনতা। এনবিআরের এই সেক্টরে দক্ষ অভিজ্ঞ আইটি প্রকৌশলীও নেই।  বিভিন্ন সময়ে যারা এসেছেন তারাও এখানকার নানা আমলাতান্ত্রিক সমস্যা ও জটিলতা দেখে চলে গিয়েছেন। অথচ আইটিখাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তির বিকল্প নেই।  জানা যায়, এনবিআরের আইটি সেক্টরের লোকজনের নিজস্ব কোনো প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা নেই। সব কিছুর জন্যই তাদের বোর্ড প্রশাসনের অপেক্ষায় থাকতে হয়। যে কারণে এই সেক্টরের কর্মকর্তারা সময় মতো অনেক সঠিক সিদ্ধান্তও সময়মতো নিতে পারেন না। আর এসব কারণেই বিভিন্ন সময়ে এখানে যেসব মেধাবী, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তারা এসেছেন তারা আবার চলেও গিয়েছেন। ফলে এই সেক্টরে এনবিআরের জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ নিজস্ব কোনো আইটি টিম গড়ে উঠেনি। অথচ সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে একটি দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইটি টিম অত্যন্ত জরুরি। 
 ই-টিআইএন বন্ধের নেপথ্যে
আয়কর খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে ২০১৬ সালে। ওই বছরের নভেম্বরে অনলাইনে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। যদিও এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে। তখন পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় এটি। তখন থেকেই ডিজিটাল বা ই-টিআইএন প্রদান শুরু হয়। মূলত ই-টিআইএন পদ্ধতি চালু করার মধ্য দিয়ে কর বিভাগে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। এই কর্মসূচির অধীনে সিটিজেন সেনট্রিক ডিজিটাল সার্ভিসে একসঙ্গে ৪০ লাখ করদাতার ডাটাবেজ তৈরি হয়েছে। এনবিআরের নিজস্ব উদ্যোগে দেশিয় সফটওয়ার কোম্পানির মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের অন্যান্য সেবাও জড়িত। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআরে ডিজিটাল সেবা যোগ করা এর মধ্যে একটি সফল উদ্যোগ বলে বিবেচিত। কিন্তু এই সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা স্পষ্ট।  যে কারণে ১০ দিন ধরে এনবিআরে ই-টিআইএন সেবা বন্ধ ছিলো। 
জানা যায়, ই-টিআইএন সেবা মূলত জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির সঙ্গে জড়িত।  এনআইডি ছাড়া টিআইএন নেয়া যায় না। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সার্ভারের সঙ্গে এনবিআরের এই সার্ভিসটি ইন্টারনেট কানেকটিভিটিতে যুক্ত। কিন্তু সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন এনআইডি সার্ভারের নিরাপত্তা জোরদার করতে ভিপিএন (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নেয়। যে কারণে এনবিআরের ডাটাবেজের সঙ্গে এনআইডির ডাটাবেজ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু এনবিআরের পক্ষ থেকে এই সংযোগ দ্রুত পুনস্থাপনের জন্য তড়িঘড়ি কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে সপ্তাহখানেক এটি ঝুলে থাকে। সংশ্লিষ্টরা জানান,  এনবিআরের আইটিখাতটি দেখে বোর্ড প্রশাসন। কিন্তু বোর্ড প্রশাসন এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন। ফলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এনবিআরের পক্ষ থেকে সমন্বয়ও ঠিকমতো হয় না। 
তাছাড়া নির্বাচন কমিশনও এ বিষয়ে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সাভার বন্ধ রাখার আগে নির্বাচন কমিশনের উচিত ছিল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তা করেনি। এমনকি সাভার বন্ধ রাখার পর ভিপিএন’র সঙ্গে যুক্ত হয়ে তা পুনরায় কম সময়ের মধ্যে চালু করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নির্বাচন কমিশনের ছিল না। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকেও নিজেদের সমস্যার কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তাগাদা দেয়া হয়নি। বোর্ড প্রশাসনের এ ব্যাপারে দায়িত্বে অবহেলা ছিল লক্ষণীয়। আর এ কারণেই মাস থেকে সমস্যা ও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের। সরকারের এবং দেশের ক্ষতি হয়েছে, ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।
জানা যায়,  ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৭৬ (ঞযব ঘধঃরড়হধষ ইড়ধৎফ ড়ভ জবাবহঁব ঙৎফবৎ, ১৯৭২) এর ভিত্তিতে এনবিআর প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কাষ্টমস, মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর বিষয়ক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও প্রশাসনের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে এটি সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান চেয়ারম্যান, একই সাথে তিনি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব। এনবিআরে ১৬ টি সদস্যপদ রয়েছে। এরমধ্যে  কর ক্যাডারের ৮ জন, কাস্টমসের ৭ জন এবং একটি রয়েছে প্রশাসন ক্যাডারের। কিন্তু ২০১১ সালের আগ পর্যন্ত এসব পদগুলো পুরোপুরি এনবিআরের লোকজনের অধীনেই ছিলো। এনবিআর কাস্টমস, মূসক ও আয়কর অনুবিভাগের মাধ্যমে কাজ করে। আয়কর অনুবিভাগ বিসিএস (কর) এবং কাস্টমস ও মূসক অনুবিভাগ বিসিএস (কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ) ক্যাডার দ্বারা পরিচালিত হয়। তাছাড়া আইটি অনুবিভাগ এবং পরিসংখ্যান ও গবেষণা অনুবিভাগ নামে আরো দুটি অনুবিভাগ রয়েছে। তবে বিসিএস (কর) এবং বিসিএস (কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ) ক্যাডারের কর্মকর্তারা নানা বিষয়ে বঞ্চিত বলে তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা এবং অসন্তোষ বিরাজ করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা প্রশাসন ক্যাডারের দ্বারা শাসিত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতিপূর্বে এক সময় এই বোর্ডের কর্মকর্তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। ১৯৭৯ সালে সরকারের এক আদেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ’ নামে একটি বিভাগ সৃষ্টি করা হয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এর অধীনে নেয়া হয়। ওই আদেশে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব পদাধিকার বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করবেন। সেই থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রধান পদটি প্রশাসন ক্যাডারের অধীনে চলে যায়। এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের দ্বারা পরিচালিত অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগও এ সময় থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উপর একটি সুপার বডি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
২০১১ সাল পর্যন্ত বোর্ড প্রশাসনসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সদস্য পদ ছিল ৮টি। তার মধ্যে ৪টি ছিল কর ক্যাডারের সদস্যদের এবং বোর্ড প্রশাসন বাকি ৪টি পূরণ হতো কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দ্বারা। ২০১১ সালে কর ও কাস্টমস ক্যাডারে পদ বৃদ্ধির সুযোগে সদস্য (বোর্ড প্রশাসন) পদটি প্রশাসন ক্যাডার নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। সেই থেকে প্রশাসন ক্যাডারের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বোর্ড প্রশাসন। এই বোর্ড প্রশাসনের অধীনেই বর্তমানে আইটি অনুবিভাগ।
জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তারা বর্তমানে গ্রেড অনুযায়ী পদমর্যাদা ব্যবহারের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানে প্রশাসন ক্যাডারের গ্রেড-১ এর কর্মকর্তা থাকলে তিনি সচিব পদমর্যাদা ব্যবহার করেন, গ্রেড-২ এর কোনো কর্মকর্তা থাকলে তিনি অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদা, গ্রেড-৩ এর কোনো কর্মকর্তা থাকলে তিনি যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা ব্যবহার করতে পারছেন। কিন্তু এনবিআরে কর্মরত বিসিএস (কর) এবং বিসিএস (কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ) ক্যাডারের লোকজন বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তারা এসব পদমর্যাদা ব্যবহার করতে পারবেন না বলে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে।  
যদিও রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী সরকারি আদেশ, প্রজ্ঞাপন, এসআরও প্রভৃতি ক্ষেত্রে এনবিআরের কর্মকর্তাদের এসব পদমর্যাদা ব্যবহার করার অধিকার রয়েছে। অতীতে এটি ব্যবহারের প্রমাণও রয়েছে। কিন্তু এখন রুলস অব বিজনেস লঙ্ঘন করে তাদেরকে এই পদমর্যাদা ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে না। 
অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের বিভিন্ন প্রজ্ঞাপনে এনবিআর কর্মকর্তাদের পদাধিকার বলে সচিব, অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদা ব্যবহারের নজির রয়েছে। যেমন, ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (কাস্টমস)  থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা এস এম আকরাম নিজের পদমর্যাদা অতিরিক্ত সচিব উল্লেখ করেছেন। ১৯৭৭ সালের ১২ মের এক এসআরও-তে সৈয়দ মনসুর উল হক পদাধিকার বলে যুগ্ম সচিব, ২০০৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের এক এসআরও-তে মোহাম্মদ আলম পদাধিকার বলে নিজেকে অতিরিক্ত সচিব উল্লেখ করেছেন। ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শুল্ক বিভাগের প্রজ্ঞাপনে কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. ফরিদ উদ্দিন পদাধিকার বলে সচিব পদমর্যাদা এবং ১৮ সেপ্টেম্বর আয়কর বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে কর ক্যাডারের কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আমিনুল করিম পদাধিকার বলে সচিব পদমর্যাদা ব্যবহার করেছেন। ১৯৭৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রলালয়ের এক অফিস আদেশেও এটি স্পষ্ট করা হয়েছে। ওই আদেশে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের কাজও সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও ২০১৫ সাল থেকে এনবিআর কর্মকর্তাদের গ্রেড অনুযায়ী পদমর্যাদা ব্যবহারে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। এতে কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২২ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)