সোমবার, ১৭-জুন ২০১৯, ০৭:০৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা: হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার 

অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা: হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার 

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০৬:১৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই নয় বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে বড় জেলা শহরগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে অবৈধ ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল (ভিওআইপি) ব্যবসা। বিটিআরসি বলছে, দেশে প্রতিদিন অন্তত আড়াই কোটি মিনিট অবৈধ ভিওআইপি কল হচ্ছে আর এতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তবে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। কারণ এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিটিআরসির দুর্নীতিবাজরাসহ অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি। 
আর তাই কোনো কিছুতেই অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার রাস টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছে না। উল্টো দিনে দিনে পাল্লা দিয়ে অবৈধ ভিওআইপি কল বেড়েই চলেছে। এই অবৈধ ব্যবসার সুবাদে প্রতিবছর দেশ থেকে পাচার হচ্ছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। আর সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। বিটিআরসির তথ্য মতে, প্রতিদিন আড়াই কোটি মিনিট কল আসছে অবৈধ পথে। অনেকে মনে করেন, অবৈধ কলের সংখ্যা বিটিআরসি’র দেয়া সংখ্যার চেয়ে আরো অনেক বেশি। তিন বছর আগেও যেখানে বছরে আন্তর্জাতিক কল থেকে রাজস্ব এসেছে ২ হাজার ৭৫ কোটি টাকা সেখানে গত বছর এটি নেমে এসেছে অর্ধেকেরও কমে; মাত্র ৯শ’ ৮ কোটি টাকায়। বৈধ পথে কল সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরকার প্রতিবছর বিপুল অংকের রাজস্বই হারাচ্ছে না, বৈধ লাইসেন্সধারী আইআইজি অপারেটররাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, অবৈধ ভিওআইপি মারফৎ হাতিয়ে নেয়া হাজার হাজার কোটি টাকা কোথায় যাচ্ছে, কি হচ্ছে তারও কোনো হদিস মিলছে না। পাচার হচ্ছে- তথ্য কেবল এটুকুই।
অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে কারা জড়িত, সেটা অত্যন্ত সঙ্গত ও বড় প্রশ্ন। যারাই জড়িত, তাদের খুঁটি যে খুব শক্ত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে রাঘববোয়ালরা জড়িত থাকায় সরকারের উচ্চপর্যায়েও অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। বলা হচ্ছে, এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা এতই শক্তিশালী যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের কাছে অসহায় বোধ করেন। সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা যেকোনো মূল্যায়নে দুর্ভাগ্যজনক। 
বিটিআরসি’র যে সব অভিযান চালানো হয়, তাতে সরঞ্জামসহ যাদের আটক করা হয়, তারা আসল ব্যক্তি নয়। এর পেছনের রাঘব বোয়ালরা সব সময়ই অধরা থেকে যায়। সংস্থাটি তাদের খুঁজে বের করার কোনো উদ্যোগ নেয় না। অভিযোগ রয়েছে, বিটিআরসি’তেই এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন, যারা এই অবৈধ কারবারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। তাদের ছত্রচ্ছায়া ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই মূল হোতা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। 
প্রশ্ন উঠতে পারে, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীরা দৈনিক কত সিম ব্যবহার করছে? সিম ব্যবহার করে কীভাবেই বা তারা এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছে? বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের পর এটা কীভাবে সম্ভব? বায়োমেট্রিক ছাড়া সিম বিক্রি হওয়ার কথা নয়। বিভিন্ন অভিযানে যে হাজার হাজার সিম জব্দ করা হয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয়, মোবাইল ফোন অপারেটরদের মাধ্যমে ওইসব সিম অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীদের হাতে গেছে। গ্রামীণ ফোন, টেলিটক, রবি, বাংলালিংক প্রভৃতি অপারেটরের সিম পাওয়া গেছে। এটা সাক্ষ্য দেয়, অপারেটররা এই অবৈধ ব্যবসার সহযোগী। এর মধ্যে বিভিন্ন অপারেটরের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করেছে বিটিআরসি। কিন্তু সরকারের ক্ষতির তুলনায় এই জরিমানার পরিমাণ নিতান্তই কম। আরো কঠোর পদক্ষেপের সুযোগ থাকলেও তা অজ্ঞাত কারণে নেয়া হয় না। তাছাড়া শাস্তি আরোপের ক্ষেত্রেও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। দেখা যায়, বেশি অপরাধের জন্য কম শাস্তি, অন্যদিকে কম অপরাধের জন্য বেশি শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আবার কাউকে শাস্তির আওতায়ই আনা হচ্ছে না।
সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে হাই ফ্রিকোয়েন্সি রেডিওলিংক ব্যবহার করে ভিওআইপির অবৈধ ব্যবসা করছেন অনেকে। নিকেতন, গুলশান, বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, নিউ ডিওএইচএস, মিরপুর ডিওএইচএস, ধানমন্ডি ও উত্তরায় এই ব্যবসা চলছে অবাধে। রাজধানীর ভিআইপি এলাকা ছাড়াও দেশের বিভাগীয় ও বড় জেলা শহরে রেডিওলিংকের মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাঘব বোয়ালরা এই ব্যবসার সাথে জড়িত বলে সরকারের গত মেয়াদে জাতীয় সংসদেই অভিযোগ করা হয়েছিল। এমনকি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এর সাথে জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়। জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ অভিযোগ করে বলেন, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাঘববোয়ালরাই জড়িত। জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশে তিনি এ অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি ওই সব দুর্নীতিবাজের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। নোটিশে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ভিওআইপি ব্যবসার লাইসেন্সের অপব্যবহার করে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী রাজধানীর বিভিন্ন ঘর-বাড়ি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে অবৈধভাবে ভিওআইপি সরঞ্জাম স্থাপন করে বৈদেশিক কল চুরি করে যাচ্ছে। এসব অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের রাঘববোয়ালরা জড়িত। এ ছাড়া বিটিআরসি ও বিটিসিএল এর কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীও এর সঙ্গে জড়িত। নোটিশে তিনি ওইসব অবৈধ লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। যদিও বিটিআরসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যবসার সাথে জড়িতরা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। এ কাজে রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটকের সিম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি জানিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিআরসির সহায়তা ছাড়া এই অবৈধ কর্মকা- চালিয়ে যাওয়া কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়।
বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায়ীরা দৈনিক মাত্র এক লাখ সিম ব্যবহার করলেও বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। মোবাইল ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে অবৈধ ভিওআইপির এই ব্যবসা। বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালিত কয়েকটি অভিযানে এর প্রমাণ মিলেছে। এসব অভিযানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে উদ্ধার হয়েছে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার সরঞ্জাম। গত কয়েক বছর বিটিআরসি থ্রিজি বা ফোরজি ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেয়ার সময় এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন ২৯ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী তিন দিন হাইস্পিড মোবাইল ব্রডব্যান্ডের (থ্রিজি/ফোরজি) গতি কমিয়ে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় দেশে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল গড়ে প্রায় ১০০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এ বৃদ্ধির কিছু অংশ গ্রাহকেরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কল করতে না পারায় হয়েছে। তবে থ্রিজি বা ফোরজি মোবাইল ব্রডব্যান্ডের উপর নির্ভর করে দেশে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা আরো যে বাড়ছে এটা নিঃসন্দেহেই বলা যায়। এভাবে বৈধ ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তেমনি সরকারের রাজস্ব আয় বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
বিটিআরসির নিয়মানুসারে দেশের কোনো মুঠোফোন নম্বরে ২৪ ঘণ্টায় ২০০ মিনিটের বেশি মিনিট কল হলে তা অবৈধ ভিওআইপির ব্যবহার সন্দেহে বন্ধ করার কথা। আর ইন্টারনেট সংযোগে টানা ৫ ঘণ্টা আপলোডিং ও ডাউনলোডিং সমান মাত্রায় চালু থাকলে সেটিকেও বন্ধ করে দেয়ার কথা।
২০১৮ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে পরিচালিত দুটি অভিযানে দেখা গেছে, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় দেশের মোবাইল অপারেটরদের সিম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযানে পাওয়া প্রায় ৫৩ হাজার সিমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টেলিটক ও রবির সিম। এই দুটি অপারেটরের যথাক্রমে ২১ হাজার ১৮টি এবং ২০ হাজার ৭০৯টি সিম পাওয়া গেছে। বাংলালিংক ও গ্রামীণফোনের পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৬ হাজার ৬০২ এবং ৪ হাজার ৬৪৭টি সিম। এরকম অভিযানে কিছু অবৈধ ভিওআইপি কল টার্মিনেশন ব্যবসার কর্মচারী ও সরঞ্জাম আটক করা হলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে রাঘব বোয়ালরা। অভিযান দুটির পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিটিআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়, সিম বিক্রির পর কোথায় তা ব্যবহৃত হচ্ছে সেটি লক্ষ্য রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে মোবাইল ফোন অপারেটরদের। এজন্য তাদের বিটিআরসির কাছে জবাবদিহি করার কথা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সেইভাবে আইনটি জবাবদিহিতা আদায় করা হয় না।।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকার ঘোষিত অভ্যন্তরীণ মোবাইল কল রেট সর্বনি¤œ প্রতি মিনিট ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আন্তঃগামী কল রেটের যে হিস্যা মোবাইল অপারেটরেরা পায় তার মূল্য প্রতি মিনিট প্রায় ৩৩ পয়সা। এতে আন্তর্জাতিক আন্তঃগামী কলের চেয়ে অভ্যন্তরীণ কলের আড়ালে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে দেশের অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা আরো প্রসার হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ এসব ভিওআইপি ব্যবসায় তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়। এই সব সরঞ্জাম বিক্রির সময় বিক্রীত সরঞ্জামটি কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার দায়দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পক্ষকেই নিতে হবে। এই বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নেরও পরামর্শ তাদের। পাশপাশি কঠোর হাতে এই অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা দমনের জন্য প্রয়োজনে সম্প্রতি প্রণীত ডিজিটাল আইন ও অন্যান্য নিরাপত্তা আইনের আশ্রয় নেয়ার কথাও বলছেন তারা।
আয় কমছে প্রতিনিয়ত
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম ৯ বছরে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১২ হাজার ৭৪৪ কোটি ২১ লাখ ১২ হাজার ১০২ টাকা। তবে এই খাত থেকে এখন প্রতিনিয়ত আয় কমছে। সর্বশেষ অর্থবছরে মাত্র ৯০৮ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। বৈধপথে আন্তর্জাতিক কল ও রাজস্ব বাড়াতে সরকার কী ধরণের উদ্যোগ নিচ্ছে এমন প্রশ্নে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বলেছেন, আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল টার্মিনেশন রেট ১ দশমিক ৭৫ থেকে ২ দশমিক ৫০ সেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম জেলার ২৬টি স্থাপনায় অভিযান চালিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও র‌্যাব। অবৈধ ভিওআইপি অভিযানে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ৪২ হাজার ১৫০টি সিম ও প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষাধিক টাকা মূল্যমানের অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে অবৈধ ভিওআইপির অভিযোগে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকের ৭৭ হাজার ৫৯০টি সিম বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। অবৈধ ভিওআইপি অভিযানের অংশ হিসেবে সিডিআর এনালাইজার এবং জিও-লোকেশন ডিটেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে অবৈধ ভিওআইপিতে ব্যবহারের অপরাধে টেলিটকের ৭৭ হাজার ৫৯০টি শনাক্ত হয় এবং বন্ধ করে দেয়া হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অবৈধ ভিওআইপি কল টার্মিনেশন প্রতিরোধে চলমান অভিযানের অংশ হিসাবে সিডিআর এনালাইজের মাধ্যমে গত ১৮ নভেম্বর টেলিটকের ৩৩ হাজার ৫৩৪টি সিম অবৈধ ভিওআইপি কল টার্মিনেশনে ব্যবহৃত হওয়ায় সনাক্ত করা হয় এবং গত ১১ অক্টোবর একই কারণে টেলিটকের ৪৪ হাজার ৫৬টি সিম বন্ধ করা হয়।
অবৈধ ভিওআইপির বিরুদ্ধে বিটিআরসি ও র‌্যাবের প্রতিটি অভিযানেই মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিপুল পরিমাণ সিম জব্দ করা হয়। খাত সংশ্লিষ্টরা অপারেটরদের বিষয়ে বলেছেন, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হওয়ার পর এখন বায়োমেট্রিক ছাড়া সিম বিক্রি হওয়ার কথা নয়। তাহলে প্রতিটি অভিযানে যে এতো বিপুল সংখ্যক সিম জব্দ করা হয়, এসব সিম কীভাবে অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে যায়? ২০১৮ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে পরিচালিত দুটি অভিযানে দেখা গেছে, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় দেশের মোবাইল অপারেটরদের সিম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভিযানে পাওয়া প্রায় ৫৩ হাজার সিমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে টেলিটক ও রবি’র সিম। এই দুটি অপারেটরের যথাক্রমে ২১ হাজার ১৮টি এবং ২০ হাজার ৭০৯টি সিম পাওয়া গেছে। বাংলালিংক ও গ্রামীণ ফোনের পাওয়া গেছে যথাক্রমে ৬ হাজার ৬০২টি এবং ৪ হাজার ৬৪৭টি সিম। আর মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ বছরে ২৪টি অভিযান পরিচালনা করেছে বিটিআরসি ও র‌্যাব। এসব অভিযানে ১৫ হাজার ৪৭৬টি সিম জব্দ করা হয়েছে ও ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৩১৮টি সিম বন্ধ করা হয়েছে। ভিওআইপি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকা টেলিকম কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে জরিমানা বাবদ ৮৬০ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে গ্রামীণফোনকে। এই অপারেটরটিকে জরিমানা করা হয়েছে ৪১৮ কোটি ৪০ লাখ, রবি আজিয়াটাকে ১৪৫ কোটি, বাংলালিংকে ১২৫ কোটি, র‌্যাংকস টেলিকমকে ১৫০ কোটি, পিপলস টেলিকমকে ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় অবৈধ ভিওআইপিতে শীর্ষে থাকা রাষ্ট্রীয় টেলিকম অপারেটর টেলিটককে জরিমানার কথা বলাই হয়নি, যা অত্যন্ত রহস্যজনক।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)