সোমবার, ২২-এপ্রিল ২০১৯, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

আগুন নিয়ে রাজনীতি!

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল, ২০১৯ ১০:২৪ পূর্বাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বনানীর এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারকাজে সহকর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানা। সুউচ্চ মই (লেডার) দিয়ে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করছিলেন তিনি। উদ্ধারকাজের একপর্যায়ে তার শরীরে লাগানো নিরাপত্তা হুকটি মইয়ের সঙ্গে আটকে যায়। এতে তার পায়ের হাড় কয়েক টুকরো হয়ে যায়। পা শরীরের সঙ্গে কোনো রকমে আটকে ছিল। পেটে চাপ লেগে নাড়িভুঁড়িও থেঁতলে যায়। এতে মইয়ের সঙ্গে আটকে গিয়ে সোহেল বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিলেন। একপর্যায়ে তিনি কোনোমতে এক পায়ে ভর দিয়ে মই থেকে নেমে আসেন। তখন তাঁর পা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল, প্রচুর রক্ত ঝরছিল। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। সিএমএইচে সোহেলের শরীরে দুটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তিনি এখনও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। 
বনানীর অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের উদ্ধার প্রচেষ্টায় জীবন বাজি রেখেছিলেন অবিবাহিত সোহেল রানা। তার জীবনের অনেক পর্ব এখনো বাকী রয়ে গেছে। তবুও এই যে জীবন বাজি রাখা এর মধ্যে বিশেষ কোনো স্বার্থ তার ছিলো না, কোনো রাজনীতিও ছিলো না। কিন্তু এই আগুন নিয়ে রাজনীতি হয়েছে, হচ্ছে। সোহেলের মতো অনেক ফায়ার ফাইটারই জীবন বাজি রেখে এই আগুনের মুখোমুখি হয়েছিলেন শুধুমাত্র অন্যদের জীবন বাঁচানোর জন্য। কড়াইল বস্তির বাসিন্দা ছোট্ট নাঈমও এই মিছিলে সামিল হয়েছিলো একটি ফাটা পানির পাইপে পলিথিন পেঁচিয়ে পানি পড়া বন্ধ করে। 
তার ওই মুহূর্তের একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশংসায় ভাসতে থাকে সে। মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায়। ছোট্ট শিশু নাঈম রাতারাতি সেলিব্রেটি বনে যায়।
শিশুটির এমন কাজে মুগ্ধ হয়ে ও তার পরিবারে আর্থিক অসঙ্গতির কথা জেনে তাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন অনেকে। তাদের একজন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ওমর ফারুক সামি, যিনি নাঈমকে পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তার পড়াশোনার দায়িত্বও নিতে চান।
বিষয়টি আলোচনায় আসার পর টিভি উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় একান্ত সাক্ষাৎকার নেন নাঈমের। নাঈম সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় তার বাবা-মা সঙ্গে ছিলেন। প্রশ্নোত্তরের এক পর্যায়ে উপস্থাপক জয় নাঈমের কাছে জানতে চান পুরস্কারের সেই টাকাগুলো নাঈম নেবে কি-না? আর নিলেও সেই টাকা কীভাবে খরচ করবে?
জবাবে নাঈম জানায়, সেই টাকাগুলো সে এতিমখানার অনাথ শিশুদের জন্য দান করে দিতে চায়। ছেলের এ জবাবে সায় দেন তার মা-বাবাও। এসময় উপস্থাপক জয় পাল্টা প্রশ্ন করেন, এতিমখানায় কেন টাকা দিতে চায় নাঈম। জবাবে নাঈম জানায়, কয়েক বছর আগে খালেদা জিয়া এতিমের টাকা লুট করে খেয়েছে। তাই এই টাকা সে এতিমদের দিতে চায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই সাক্ষাৎকারটি ছড়িয়ে পড়লে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। শিশু নাঈমকে জয়ের এ ধরনের প্রশ্ন করাটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করতে থাকেন নেটিজেনরা। এ বিষয়ে নেটিজেনদের ভাষ্য, ‘শিশু নাঈম নিজ থেকে এসব কথা বলেনি। উপস্থাপক জয় তাকে কথাগুলো আগে থেকে শিখিয়ে দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারে শিশুটির কথা বলার ধরনেই তা প্রকাশ পেয়েছে।’
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নাঈমকে সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দেয়া সেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসীও তার কথা ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি জানান, পাঁচ হাজার ডলার নাঈমকে দেবেন না। নাঈম রাজনীতির শিকার জানিয়ে ওমর ফারুক সামি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নাঈমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন গণমাধ্যমকর্মী আমিরুল মোমিনিন মানিক। তিনি নাঈমের একটি সাক্ষাৎকার নেন। সেই সাক্ষাৎকারে মানিক শিশু নাঈমকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার মা কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন, তোমার পড়াশোনার খরচ বহন করছেন, তোমার নিজেরই টাকা দরকার, তাহলে তুমি কেন সে টাকা নিজে না রেখে এতিমদের দিয়ে দিতে চাও? এটা কী তোমার মনের কথা?’ নাঈমের সোজাসাপ্টা জবাব, ‘না, এটা বলতে তারা শিখিয়ে দিয়েছিল।’
এরপর প্রশ্নকর্তা বলেন, ‘যিনি তোমাকে টাকা দিতে চেয়েছিলেন তিনি এখন বলেছেন আর টাকা দেবেন না। তুমি কী টাকাটা চাও?’ নাঈমের জবাব, ‘আমি ওই কথা না বুঝে বলেছি, আমি টাকা চাই, আমার পড়াশোনার জন্য টাকা চাই।’
একই প্রশ্ন করা হয় নাঈমের মাকে। তিনি বলেন, ‘নাঈম ছোট মানুষ, তাই না বুঝে এসব বলেছে। আমি গরীব মানুষ, টাকাটা আমারই দরকার। সে টাকা অন্যদের দিয়ে দিলে আমার নাঈমকে আমি কীভাবে মানুষ করব!’ 
আগুন রাজনীতি এখানেই শেষ নয়। গুলশানে ডিসিসি মার্কেট- বনানী অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের জনমনে নানা প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় গ্রেফতারের ধরণ দেখে সেই প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে। 
দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তদন্ত বলছে, এফ আর টাওয়ারের ৮ম তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিলো। অথচ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১৮ থেকে ২৩ তলার মালিক বিএনপি নেতা তাসভির উল ইসলামকে। কিন্তু যে কোম্পানি এই ভবন নির্মাণ করেছে বা যারা ভবন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত তারা এখন পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। খোদ পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকেও সংবাদ সম্মেলন করে বলা হয়েছে ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনায় রাজউক, ভবন মালিক, আবাসন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবার গাফিলতি রয়েছে। পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান আবদুল বাতেন বলেছেন, ‘‘আমরা এই মামলায় রাজউক, জমির মালিক, আবাসন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ-এদের কার কী দায়িত্ব ছিল, কার কী অবহেলা ছিল, তা খতিয়ে দেখব।” এটা সত্য যে যার যার নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন না করায় এ ঘটনা ঘটেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, দায় যদি সবারই হয় তাহলে শুধুমাত্র দু’জনকে কেন গ্রেফতার করা হলো? বিশ্লেষকরা বলছেন, তাহলে কি বনানীর আগুন এখন রাজনৈতিক হয়ে উঠছে? 
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘রূপায়ণ তাসভির উল ইসলামকে ফ্লোরগুলো নিবন্ধন করে দেয়নি। তিনি দখলস্বত্বে আছেন। এ কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঠিকাদার কোম্পানি রূপায়ণের মালিক লিয়াকত আলী মুকুলকেও এই ঘটনায় আসামি করা হয়েছে। তবে পুলিশ তাকে পলাতক বলে দাবি করছে। 
বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মূল দোষীদের গ্রেফতার না করেই কে অবৈধভাবে দখল করেছে আগেই সেই আসামিকে গ্রেফতার করতে হবে কেন? তাসভির উল ইসলাম তো ভবন নির্মাণ করেননি। তিনি তো ক্রয় সূত্রে মালিক। নিয়মানুযায়ী দোষ হিসাব করলে প্রথমেই আসবে তাদের নাম, যারা ভবনটি নির্মাণ করেছেন। তাছাড়া তাসভির উল ইসলাম ভবনটির যে ফ্লোরগুলো ক্রয় করেছেন বা তার দখলে ছিল সেগুলোতে আগুন লাগেনি। 
তাসভির উল ইসলাম কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি এবং বিগত সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হয়ে সেখানে তিনি লড়েছেন। ইতিমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে তার মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির পক্ষে সংবাদ সম্মেলন ডেকে সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা বলেছেন, ‘বনানীর এফআর টাওয়ারের ২০-২২ তলার মালিক বিশিষ্ট শিল্পপতি তাসভিরুল ইসলাম প্রচলিত নিয়ম মেনেই এই অংশ ক্রয় করেছেন। নির্মাণে কোন ত্রুটি থাকলে জমির মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানি দায়ী হবেন, কিন্তু তাদেরকে গ্রেফতার না করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই ভবনের অগ্নিকা-ের সঙ্গে তাসভিরুল ইসলামের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তাই দেশের বিশিষ্ট একজন শিল্পপতিকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে হয়রানি করা হচ্ছে।’ এই এফআর টাওয়ারে প্রথম আগুন লাগে ২০০৮ সালে, এরপর ২০১১ সালে। পরে ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে এই বিল্ডিং কিছুটা কাৎ হয়ে যায়। তারপরও বিল্ডিংটা ব্যবহার হতে থাকে। রাজউক বা ফায়ার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ করেনি বা কারেকশন করার কথা শোনা যায়নি। কিন্তু এবারে আগুন লাগার পরে সব খোঁজ পড়লো। আর তাতেই আবিষ্কার হলো টাওয়ারটির কয়েকটি ফ্লোর নির্মাণে রাজউকের অনুমতি নেই। অবশ্য সত্যি সত্যি অনুমতি আছে কি নেই সেটাও নিশ্চিত করে কেউ জানে না। 
‘সাম্প্রতিক অগ্নিকা-ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে’
এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের মাত্র একদিনের মাথায় গুলশানে ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরির্দশনে গিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ সাংবাদিকদের বলেছেন, এই মার্কেটটি ভেঙে আন্তর্জাতিক মানের শপিং মল করার কথা ছিল। যেকোনও কারণে এটা হয়নি। কিন্তু এখন জনগণের স্বার্থে যেকোনও মূল্যে এটাকে ভেঙে মার্কেট তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, কাঁচাবাজারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আমার দুই পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তারা আজকেই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাবেন।
তিনি বলেন, যেসব ব্যবসায়ীর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাদের বিষয়ে সিটি করপোরেশন খোঁজ খবর নিচ্ছে। হানিফের এই বক্তব্য নিয়েও নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। আগুন নেভার আগেই তিনি সেখানে যেকোনো মূল্যে মার্কেট করার ঘোষণা কেন দিলেন- অনেক ব্যবসায়ী সেই প্রশ্ন তুলেছেন। 
হানিফের ওই বক্তব্যের পরপরই একইদিন অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কিছু তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। 
সম্প্রতি সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড গুলি নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো নাশকতা আছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ কারণে এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের প্রতি আহবান জানিয়েছেন তিনি। ৩০ মার্চ ডিসিসিআই মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় মেয়র এ আহ্বান জানান।
অনেক সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মনোমালিন্য বা ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে কেউ এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে কি না সে বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য ব্যবসায়ীদেরও পরামর্শ দেন তিনি।
এফ আর টাওয়ারের দুই নকশা!
বনানীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফ আর টাওয়ারের দুটি নকশা হাতে পেয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। একটি নকশায় ভবনটিকে ১৮ তলা ও অন্যটিতে ২৩ তলা দেখানো হয়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, এফ আর টাওয়ারের তদন্তের কাজে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ভবন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র চাওয়া হয়। ভবনটির কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটির কাছে একটি নকশা জমা দিয়েছে। তাতে ভবনের উচ্চতা ২৩ তলা দেখানো হয়েছে। কিন্তু রাজউক তদন্ত কমিটিকে যে নকশা দিয়েছে, তাতে উচ্চতা ১৮ তলা বলা আছে।
তদন্ত কমিটির সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ১৮ তলার নকশাটি তাদের কাছে আসল বলে মনে হয়েছে। ২৩ তলার নকশাটি সঠিক কি না, সে-সংক্রান্ত কাগজপত্রও রাজউক থেকে চাওয়া হয়েছে। রাজউক এ-সংক্রান্ত কিছু নথি সরবরাহ করেছে। তবে এ সংক্রান্ত রাজউকের মূল ফাইলপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কমিটি ছাড়াও এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকা-ের ঘটনাটি তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) পৃথক কমিটি করেছে। তবে সর্বশেষ খবর অনুযায়ী কোনো কমিটিই প্রতিবেদন দেয়নি। 
এই তদন্ত কমিটি গঠন, শোক প্রকাশ আর উদ্বেগের বিষয়গুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই থাকে। কমিটির তদন্ত শেষ হয়, প্রতিবেদন জমা হয়। কিন্তু প্রতিবেদনের সুপারিশমালা কীভাবে, কত সময়ে ও কাদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হবে এ নিয়ে কোন আলোচনা হয় না। বিশেষজ্ঞরা নানা বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিভিন্ন উপায় বাতলান। এক পর্যায়ে সব ঝিমিয়ে পড়ে। তাদের বাতলানো উপায়গুলোও আর তেমন গুরুত্ব পায় না। একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেখে দেশের মানুষ এক প্রকার আগুন ফোবিয়ায় ভুগছে। এর প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। সেখানে আলোচনা সমালোচনার পাশাপাশি চলছে নানা বিচার বিশ্লেষণ। হয়তো আরেকটি ইস্যু সামনে এলে আগুনের বিষয়টি সাময়িকভাবে ভুলে যাবে সবাই। কিন্তু আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘা সহজে শুকাবে না। 
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার উপকরণ নিয়ে প্রশ্ন
এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকা-ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার সরঞ্জামের স্বল্পতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন ফায়ার সার্ভিস যখন মহড়া দেয়, তখন আমরা দেখি তাদের জন্য ঠিকই রাবার ফোম, কপিকল রোপ সবই আছে। কিন্তু এফ আর টাওয়ারের মতো সুউচ্চ ভবনে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সেসব সরঞ্জাম কেন ব্যবহার করা হলো না? সেখানে ফায়ার সার্ভিসের ডজন ডজন ইউনিট আগুন নেভাতে ও আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করেছে কিন্তু ফোম ইউনিট সেখানে কেন যায়নি সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগুন থেকে বাঁচতে যারা লাফ দিয়েছিলেন তারা সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দেননি, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। রাবার ফোম সেখানে থাকলে আটকে পড়াদের অন্তত লাফিয়ে পড়ে জীবন দিতে হতো না। তাহলে এতো উঁচু থেকে লাফ দিয়ে বা ক্যাবল বেয়ে নামতে গিয়ে হাত পিছলে মানুষ পড়ে মৃত্যুবরণের দায়িত্ব কি ফায়ার ব্রিগেডের নয়? এটি কি এই বাহিনী এড়িয়ে যেতে পারে? এখানে প্রশ্ন, ফোম বা নেট যদি থাকেই তাহলে কেন ব্যবস্থা করা হলো না? নেট ধরলেও অনেকে বেঁচে যেতে পারতেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড হয়েছিলো রাতে। ক্যামিকেল ভর্তি এক ঘিঞ্জি মহল্লায়। ফায়ারসার্ভিসের পানিবাহী গাড়িও ঠিকমতো সেখানে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু এফ আর টাওয়ারে আগুন লেগেছে একেবারেই দিনে দুপুরে দেশের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায়। সেখানে ক্যামিকেল, গোডাউন বা কারখানাও ছিল না। তাহলে এই আগুন নেভাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কেন লাগলো? কেন এতগুলো মানুষকে আটকে পড়ে মৃত্যুবরণ করতে হলো? কেন লাফিয়ে পড়ে শেষ বিদায় নিতে হলো? 
এ আগুনের শেষ কোথায়?
বাংলাদেশে অগ্নিকাণ্ড কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। এগুলো মানব-সৃষ্ট বিপর্যয়। বছরের পর বছর ধরে এই বিপর্যয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু কারো টনক নড়ে না। ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, অগ্নি নির্বাপনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে অনিচ্ছুকতা, রাজউকের উদাসীনতা, ফায়ার সার্ভিসের আধুনিক প্রযুক্তিহীনতা এসবকে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। 
দেশের অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও নির্বাপন ব্যবস্থা উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ। অফিস-আদালত, কলকারখানা, বহুতল ভবনে, শিক্ষাঙ্গণের বেশিরভাগেই অগ্নি প্রতিরোধের কোন ব্যবস্থা নেই। আর আগুন লাগলে নির্বাপনী ব্যবস্থা হিসেবে ফায়ার সার্ভিস কেবলই পানি ব্যবহার করে। অথচ বিশেজ্ঞরা বলেছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগলে ওই বৈদ্যুতিক যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত পানি দিয়ে আগুন নেভানো যায় না। বরং পানির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে যা ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাতে পারে। দেশের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাব নেই। কিন্তু আগুন নেভানোর জন্য সেকেলে পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে তাদের বারবারই ব্যর্থ হতে হয়। 
চুড়িহাট্টার আগুনের পর সরকার, প্রশাসন, ভবনমালিকসহ নানামুখী আলোচনার কেন্দ্রে ছিল পুরান ঢাকার অপ্রশস্ত রাস্তা, বিল্ডিংগুলোতে রাসায়নিক কারখানা নির্মাণ ইত্যাদি। এ নিয়ে এক পক্ষ অন্যপক্ষের দিকে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, রাজউক, মন্ত্রণালয়সহ সবাই নিজেদের দোষ ঢাকতে দোষ চাপিয়েছে বাড়ির মালিক, কারখানার মালিকদের দিকে। এতে করে শেষ পর্যন্ত প্রকৃত দোষীকে চিহ্নিত করা এবং শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। চুড়িহাট্টার আগুনের তাপ মিইয়ে যেতে না যেতেই বনানীর আগুনের তাপে আলোচনার টেবিল আবারও গরম হয়ে উঠেছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরাই অগ্নিকাণ্ডকে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। এফআর টাওয়ারের আগুনকে সরাসরি হত্যাকাণ্ড বলেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী। জড়িতরা যতো শক্তিশালীই হোক তাদেরকে আইনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে এর পেছনে জড়িত রাঘব-বোয়ালদের বিচারের আওতায় আনা যাবে কি না তা নিয়ে সব মহলেই সন্দেহ আছে। কারণ অতীতের কোন উদাহরণ আমাদের শাসকগোষ্ঠী তৈরি করে যেতে পারে নি।
বনানীর বহুতল ভবন এফ আর (ফারুক রূপায়ন) টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আট বছর আগেও বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল ভবনটিতে। ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি ৭ দফা সুপারিশ জমা দিয়েছিল। কিন্তু সুপারিশ অনুযায়ী ভবনে আগুন প্রতিরোধে করণীয় কোনো নির্দেশনাই মানা হয়নি। গত ৮ বছরে তিন বার ভবন কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিশও দেয়া হয়। ওই নোটিশে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশ প্রদান করে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তা মানেননি ভবন কর্তৃপক্ষ বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার আগুন লাগার পর রাজউক বলছে ভবন নির্মাণে মূল নকশা মানা হয়নি। টাওয়ারের উপরের অংশের পাঁচটি তলা নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। রাজউক জানায় ওই তলাগুলো ভেঙে ফেলার জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আগুন লেগেছিল ৮ তলায় কিন্তু দোষারোপের ঠেলাঠেলিতে উপরের শুধু ৩ তলাকে সামনে নিয়ে আসা উদ্দেশ্যমূলক। অর্থাৎ ভবনের উপরের ৩ তলা নিয়ে রাজউক, ডিএনসিসি এবং সরকারের দায়িত্বশীল এমপি-মন্ত্রীদের মাথাব্যথা!
বলা হচ্ছে টাওয়ারের ২১, ২২ ও ২৩ তলা তাসভীর উল ইসলাম অবৈধভাবে দখল করে আছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি সরকারের বিরোধী পক্ষের লোক। দখলদারিত্বের জন্য তার শস্তি হতে পারে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় টাওয়ারের সকল মালিকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রয়োজন। এত বড় ঘটনার দায় শুধু একজন বা দুজনের উপর চাপানোর ঘটনা সত্যি দুঃখজনক। অগ্নিকাণ্ডের কিছুদিন আগে নাশকতার আশংকায় ভূমি মালিক একটি নোটিশও টাঙ্গিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে ওই নোটিশ টানানো এবং সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অনেকেই ধারণা করছেন এ অগ্নিকাণ্ড কি পরিকল্পিত!
অপরিকল্পিতভাবে নগরায়নের কারণে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও অপরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থার জন্য নগর পরিকল্পনাবিদরা দায়ী করছেন রাজউককে। রাজউক সুষ্ঠু নগরায়নের জন্য ডিটেইল এরিয়া প্লান (ড্যাপ) নামে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। কিন্তু রাজউক তাদের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিবর্তে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নতুন নতুন প্রকল্প বানাচ্ছে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে রাজউকের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত। তাদের কাউকে সরকার প্রচলিত আইনের আওতায় আনতে পারছে না। কাদের ছত্রছায়া বা পৃষ্ঠপোষকতায় তারা শক্তিশালী তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যদিও এককভাবে রাজউককে দোষারোপ করা যায় না কিন্তু অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকই দায়ী। এমনকি সরকারের খোদ এমপি-মন্ত্রীরাই রাজউককে দোষারোপ করছে। ভবন মালিকরা কাউকে তোয়াক্কা করে না। প্রত্যেক হাইরাইজ ভবনের মালিকদের পেছনে রাজনীতির হাত থাকে। তারা যেকোন উপায়ে তাদের বিল্ডিংকে লম্বা করার কাজে ব্যস্ত থাকে। প্রয়োজনে রাজনৈতিক ব্যক্তি, রাজউকের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যনেজ করে। কিন্তু তারা বিল্ডিং এর নিরাপত্তার বিষয় যেমন ফায়ার সেফ্টি, ইমার্জেন্সি এক্সিট, বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বরাবরই অনীহা প্রকাশ করে। বার বার অগ্নিকাণ্ডে লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আগুনে পোড়া জীবিত মানুষের হাহাকার যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে। নতুন নতুন নীতিমালা হচ্ছে, সংস্থা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কোন প্রকার কার্যকরী ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেউই। বলা হচ্ছে ঢাকা শহর একটি মৃত্যুপুরী। বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে শহরটি নিশ্চিহ্ন হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেজ্ঞরা। অপরিকল্পিত নগরায়ন, অনুমোদনহীন ভবন, ঘন জনবসতির কারণে ঢাকা শহর দিন দিন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। সেই সাথে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শহরের মানুষ আতঙ্কিত। বনানীর আগুনের ঘটনায় মেয়র সাঈদ খোকন রাজউকের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন ‘প্রতীকি হিসেবে রাজউক যেন একটি হলেও অবৈধ ভবন ভেঙ্গে দেখায়’। এখানে প্রশ্ন হলো রাজউক কি আদৌ পারবে অবৈধ ভবন ভাঙ্গতে? নাকি অবৈধ ভবন মালিকদের ক্ষমতার কাছে পরাজিত হবে? তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেবল রাজউক আর ভবন মালিকদের দোষারোপ করলে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছে না অভিজ্ঞজনরা। এইসব ঘটনার পেছনের কারণ বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৮ এপ্রিল ২০১৯ প্রকাশিত)