শুক্রবার, ১৯-জুলাই ২০১৯, ০৬:৫১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • খাদ্য বিভাগের নীতিমালায় অগ্রগতি নেই: অবৈধ নিয়োগ-বদলি ঘুষ লেনদেন চলছে

খাদ্য বিভাগের নীতিমালায় অগ্রগতি নেই: অবৈধ নিয়োগ-বদলি ঘুষ লেনদেন চলছে

shershanews24.com

প্রকাশ : ৩১ মার্চ, ২০১৯ ০৮:৩০ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: দায়িত্বগ্রহণ করেই খাদ্য অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের লাগাম টানতে নীতিমালা তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। নীতিমালা তৈরির আগে সব ধরনের বদলি ও পদায়নেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন তিনি। ওই নীতিমালার জন্য কমিটিও গঠন করে দিয়েছিলেন নতুন খাদ্যমন্ত্রী। 
তবে ওই ঘোষণার পর প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নীতিমালা নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। তবে নীতিমালা তৈরিতে কোনো অগ্রগতি না থাকলেও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য থেমে নেই খাদ্য অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ের পদগুলোতে। ঢাকা বিভাগের অধীনে ইতিমধ্যে ওসি এলএসডি পদে ৩ জনকে পদায়ন করা হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে নেত্রকোনার পূর্বধলা, মাদারীপুরের শিবচর ও রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় এই পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া গত ১২ মার্চ ২০১৯ তারিখে রাজশাহী অঞ্চলের নওগাঁয় ৬ জনকে ওসি এলএসডি পদে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। এইসব বদলি ও পদায়নে মোটা অংকের ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও বলা হচ্ছে ২ জনকে শাস্তিমূলক বদলির কারণে এই রদবদল করতে হয়েছে, কিন্তু কেন ওই দুই কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হলো তার সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দিতে পারছেন না। শুধু বলছেন ‘উপরের নির্দেশে’।
এরই মধ্যে পরিদর্শক পদেও ২০০ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। যদিও এই পদোন্নতি দীর্ঘ দিনের প্রক্রিয়া ও কর্মকর্তাদের ন্যায্য দাবির মধ্যে ছিলো। তবে এটি করতে গিয়ে এর মধ্যে বেশ কিছু পদায়নে বাণিজ্য হয়েছে। যেটি নীতিমালা তৈরি হলে হয়তো ঠেকানো যেত।
 সূত্র জানায়,  নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এবারের বদলি ও পদায়নে ঘুষ বাণিজ্যের রেট ছিলো অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে চড়া। শুধু তাই নয়, নতুন মন্ত্রী দায়িত্বগ্রহণের আগেই যাদের বদলি ও পদায়ন হয়েছিলো তাদের কাছ থেকেও নতুন করে ঘুষ নেয়া হয়েছে মন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে। অথচ কথা ছিলো নীতিমালা হলে ওই সময়ে মন্ত্রীকে না জানিয়ে যেসব বদলি ও পদায়ন হয়েছিলো সেগুলো সংশোধন করা হবে। কিন্তু সেই নীতিমালা হওয়ার আগেই আরেক দফায় তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে তাদেরকে বহাল রাখার কমিটমেন্ট দিচ্ছে দালালচক্র। 
গত ৫ বছরে খাদ্য অধিদফতরের বদলি বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করতেন সদ্য বিদায়ী খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। ব্যাপক বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে এবারের মন্ত্রিসভায় কামরুলের ঠাঁই হয়নি। নতুন খাদ্যমন্ত্রী হন সাধন চন্দ্র মজুমদার। গত ৭ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রীরা শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার শপথ নিয়ে ভালোভাবে মন্ত্রণালয়ের কাজ বুঝে উঠার আগেই মাত্র ২ সপ্তাহের মধ্যে(৭-২১ জানুয়ারি)  খাদ্য অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ শীর্ষ কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে বদলি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। এই ঘটনা জানতে পেরে কর্মকর্তাদের ওপর ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ হন নতুন মন্ত্রী। ২২ জানুয়ারি খাদ্য অধিদফতরের ডিজি আরিফুর রহমানকে দফতরে ডেকে এর ব্যাখ্যা চেয়ে কড়া ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। ডিজিকে ডেকে এই অপকর্মের ব্যাখ্যা চান, একইসঙ্গে ক্ষোভও ঝেড়েছেন তিনি। ওই ঘটনার পর থেকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত খাদ্য অধিদফতরে মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের নিয়োগ ও বদলি স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।  বদলি-পদায়নকে একটি নিয়মের আওতায় আনতে বিধিমালা তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি।  সেই লক্ষ্যে কমিটিও গঠন করেন। 
সূত্র জানায়, ওই ঘটনার পরপরই খাদ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব সেক্টরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে কঠোর হওয়ার কথা ঘোষণা করেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দুর্নীতির সূতিকাগারগুলো চিহ্নিত করে সেখানে হানা দেয়ার কথাও বলেন। এ সময় মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন- বদলি, নিয়োগ ও টেন্ডার এই তিনটি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই সেক্টরের দুর্নীতি ৮০ ভাগ কমে যাবে বলে মনে করি। বাকিটুকু মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু মন্ত্রীর এই কঠোর হওয়ার ঘোষণার মধ্যেও খাদ্য অধিদফতরে বদলি-পদায়নে সেই ঘুষ বাণিজ্যের ভূত সক্রিয় রয়েছে। বরং ‘বদলি-পদায়ন বন্ধ’ এই অজুহাত তুলে আগের  চেয়ে ঘুষের রেটও বাড়ানো হয়েছে। 
খাদ্য অধিদফতরের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ বহুদিনের। লোভনীয় জায়গায় পদায়ন পেতে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিদের দফতরে ভিড় লেগেই থাকে। প্রভাবশালীদের তদবিরে অতিষ্ঠ সংশ্লিষ্টরা। ইতিপূর্বে খাদ্য অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ের আকর্ষণীয় পদ এসএমও, ওসি এলএসডি, পরিদর্শক, সহকারী খাদ্য পরিদর্শক, টিএফও থেকে শুরু করে ডিসি ফুড, আরসি ফুডের মতো সিনিয়র পদগুলোতে পদায়ন ও বদলির জন্য কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম মন্ত্রী হওয়ার আগে ওসি এলএসডি, এসএমও’র মতো পদগুলিতে বদলির জন্য ঘুষের রেট ছিলো গড়ে ২-৩ লাখ টাকা; ডিসি ফুড, আরসি ফুডের প্রতিটি পদের জন্য এই রেট ছিলো ৮-১০ লাখ টাকা করে। তবে অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম খাদ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিগত ৫ বছরে এই ঘুষের রেট অনেকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে ওসি এলএসডি, এসএমও পদে বদলি পদায়নে ক্ষেত্র বিশেষে এই ঘুষের রেট উঠেছে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। ডিসি ফুড, আরসি ফুডের মতো পদে বদলি ও পদায়নে রেট উঠেছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত। তবে ডিসি ফুড, আরসি ফুডের মতো পদগুলোতে সাধারণত মন্ত্রণালয় থেকে পদায়নের নিয়ম রয়েছে। অন্যগুলো অধিদফতরের ডিজিসহ অধীনস্থ কর্মকর্তারা করে থাকেন। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৫মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত)