শুক্রবার, ১৯-এপ্রিল ২০১৯, ০২:১৮ পূর্বাহ্ন

পাক-ভারত: পরমাণু যুদ্ধ কী আসন্ন?

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০১৯ ০৯:৪৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: পাকিস্তান ভারতীয় পাইলট অভিনন্দনকে ফিরিয়ে দেয়ায় শান্তির আশা জাগলেও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। 
শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ উত্তেজনা কোথায় গিয়ে থামে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। বিমান হামলা-পাল্টা হামলার পর্ব শেষ হওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হবে। কিন্তু এরপর ভারতীয় সাবমেরিনের পাকিস্তানি পানিসীমায় অনুপ্রবেশ, ভারত কর্তৃক রাশিয়ার পরমাণু ডুবোজাহাজ ভাড়া নেওয়া এবং ভারতীয় নৌপ্রধানের পানিপথে সন্ত্রাসী হামলা হতে পারে বলে সতর্কবাণীতে মনে হয় বড় ধরনের কোনো আঘাত বা পাল্টা আঘাতের শঙ্কা রয়েই গেছে। এদিকে বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো রীতিমতো পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। 
প্রভাবশালী ব্রিটিশ গণমাধ্যম এক্সপ্রেস ডট ইউকে ৬ মার্চ এক প্রতিবেদনে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের শঙ্কার কথা জানিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের একটি সাবমেরিন পাকিস্তানের আটকে দেওয়ার খবরে এই যুদ্ধের আশঙ্কা বেড়েছে।
নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওজ ডটকমও এক বিশ্লেষণে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেছে। অ্যাক্সিওজ ডটকম বলছে, ভারতে সামনে লোকসভা নির্বাচন। আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অপরীক্ষিত। ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা আছে। বিশ্বে প্রভাবশালী দেশ এবং শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। তবে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ পরমাণু যুদ্ধের আশংকা নাকচ করে দিয়েছেন আগেই। পরমাণু যুদ্ধ বাঁধলে পাকিস্তানের জয় নিয়েও সন্দেহ পোষণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা শেষ হয়ে যায়নি, এদের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করা না গেলে এই দেশ দু’টির মধ্যে এই আশঙ্কা থেকেই যাবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস। 
গত ৭ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, দেশ দুটি আন্তরিক না হলে এদের আবারও গুরুতর সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘যে সমস্যাটি এত তীব্র ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী অনুভূতিতে নাড়া দিয়ে যায়, সেটার সমাধান ভেতর থেকেই আসতে হবে। ভারত, পাকিস্তান এবং কাশ্মীরের মানুষদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, এবং এর প্রধান ব্যক্তিরা এবিষয়ে কোনও গুরুতর আগ্রহ দেখায়নি, কিন্তু এটাই হচ্ছে বাস্তবতা’ বলা হয় সম্পাদকীয়তে। 
‘এই দেশ দুটি বিপদজনক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল। ভারত পাকিস্তানকে আক্রমণ করে এবং আকাশে দ্বন্দ্বযুদ্ধে লিপ্ত হয়। এরপরের বারের সংঘাত, বা তার পরেরটা, এর চেয়ে অনেক বেশি অচিন্তনীয় হতে পারে’ সতর্ক করে দেয়া হয় টাইমসের সম্পাদকীয়তে।
গবেষকরা বলছেন, পরমাণু অস্ত্রধর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে প্রাণ ও প্রকৃতির ওপর যে ধ্বংসযজ্ঞ হবে তাতে অন্তত ২০০ কোটি মানুষ প্রচ- ঠা-া, খরা ও খাদ্যাভাবের প্রভাবে প্রাণ হারাবে। দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ব্রিটেনের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এক্সপ্রেস ডট ইউকে ২০১৩ সালের এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ৬ মার্চ দেশ দুটির সীমান্তে গুলি বিনিময় হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট দেবেন্দ্র আনন্দ জানান, ৬ মার্চ  ভোর থেকে গুলি ও মর্টার ছুঁড়ে পাকিস্তান সেনারা। বেলা বাড়তেই হামলার বেগ বাড়ে। ভারতীয় সেনারাও যোগ্য জবাব দিয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ৫ মার্চ নৌশেরা ও পুঞ্চের কৃষ্ণঘাঁটি লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এদিকে ৫ মার্চ পাকিস্তান দাবি করে, ৪ মার্চ রাতে ভারতের একটি সাবমেরিন তাদের জলসীমায় প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা সফলভাবে সেটি আটকে দিতে সক্ষম হয়। 
ফের হামলা চালাবে নয়াদিল্লি!
গত কয়েকদিন ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার বক্তব্যে ফের হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একবার হামলা করেই আমরা ক্ষান্ত হবো, এটা মনে করার যুক্তি নেই। সন্ত্রাস হলে প্রয়োজনে সন্ত্রাসীদের ঘরে ঢুকে হামলা চালাবো। এমনকি ভারতের সামরিক কর্মকর্তাদের মুখেও ফের হামলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাকিস্তানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ভারতকে পরমাণু ডুবোজাহাজ ভাড়া দিচ্ছে রাশিয়া 
চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ ইজারা নেয়ার চুক্তি করেছে ভারত। তিন বিলিয়ন ডলারের এ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে ১০ বছরের জন্য পরমাণু শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ ইজারা দেবে রাশিয়া। 
আক্রমণের কাজে ব্যবহারে-সক্ষম আকুলা শ্রেণির পরমাণু ডুবোজাহাজকে ভারত চক্র-৩ হিসেবে নামকরণ করবে। ২০২৫ সালের মধ্যে চক্র-৩’কে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
দামসহ অন্যান্য বিষয়ে কয়েক মাসব্যাপী নানামুখী আলোচনার পর দুই দেশের মধ্যে এ চুক্তি সই করা হয়। সরকারি পর্যায়ে এ চুক্তি হয়েছে ৭ মার্চ। অবশ্য, চুক্তির বিষয়ে কোনো কথা বলতে অস্বীকার করেছেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
ভারতকে এ নিয়ে তিনটি ডুবোজাহাজ ইজারা দিল রাশিয়া। 
দুই দেশই পরমাণু অস্ত্র বাড়াচ্ছে
সুইডেন ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) ২০১৮ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের হাতে ১৩০ থেকে ১৪০টি ওয়ারহেড বা পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের অস্ত্রভিত্তিক প্লুটোনিয়াম তালিকা এবং পারমাণবিক নিক্ষেপ প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে এই তালিকা তৈরি করেছে। এছাড়া ইউরেনিয়াম উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। পাকিস্তানও পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন এবং উৎক্ষেপণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ১৪০-১৫০টি ওয়ারহেড রয়েছে বলে হিসেব পাওয়া যায়। আসছে দশকে তা আরো অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট।
এই দুই দেশের হাতে যে পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র আছে তা দিয়ে পৃথিবীকে কয়েকবার ধ্বংস করা যাবে। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ ভবিষ্যদ্বানী করেছিলো ২০২৮ সালের মধ্যে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু যুদ্ধ হতে পারে। 
পাকিস্তান ও চীন সীমান্তে ২২৯ সেনা কর্মকর্তা পাঠাচ্ছে ভারত
সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে ভারত সরকার। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের অনুমোদন পেয়ে পাকিস্তান ও চীন সীমান্তে বদলি করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর ‘যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ’ ২২৯ জন কর্মকর্তাকে। 
৮ মার্চ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করতে সেনা সদর দপ্তর থেকে ২২৯ জন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ অফিসারকে অন্য স্থানে বদলি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডেপুটি চিফ অফ মিলিটারি অপারেশন’ নামে একটি নতুন পদ তৈরির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে মানবাধিকার রক্ষা এবং নজরদারির মতো বিষয়গুলো।
‘অচিন্তনীয় পরিণতি ঘটতে পারে ভারত-পাকিস্তানের’
যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলোতে সতর্ক করা হয়েছে, কাশ্মির নিয়ে বিরোধ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শুরু হয়ে যেতে পারে পারমাণবিক যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে অব্যাহতভাবে তৎপর রয়েছে সন্ত্রাসীরা। ওই সেনা কর্মকর্তা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের নেতৃত্বে থাকা জেনারেল জোসেফ ভোটেল। তিনি মনে করেন, এই অঞ্চলে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করতে হবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। ওদিকে সিনেটর মিট রমনি মনে করেন, কাশ্মির সমস্যার সমাধান না হলে এ অঞ্চল থেকে শান্তি দূরে থাকবে। ৭ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের হাউস কমিটি অন আর্মড সার্ভিসেসে জেনারেল জোসেফ বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বাইরে সক্রিয় জঙ্গিরা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্য অব্যাহত হুমকি হয়ে উঠেছে।
পাশাপাশি তারা ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনায়ও ভূমিকা রাখছে। এরই মধ্যে ৮ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে এ বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চলমান সংঘাতের বিপজ্জনক পরিণতি হতে পারে।
এতে আরো বলা হয়, দুই দেশই বিপজ্জনক ভূখন্ড অতিক্রম করেছে। ভারত হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানে। দু’পক্ষই আকাশ পথে লড়াইয়ে লিপ্ত। এর পরবর্তী কোনো সংঘাত বা এরপরের কোনো ঘটনা অচিন্তনীয় পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। 
আরো একধাপ এগিয়ে রিপোর্ট করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তাতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে আটলান্টিক ম্যাগাজিন তার এক লেখায় বলেছে, দুই দেশই তার জনগণ থেকে সত্য আড়াল করছে এবং তারা নীরবে যুদ্ধ পরিহার করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আনার চেষ্টায় রত, তখন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের দূত আসাদ মাজিদ খান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তার দেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সিনেটর মিট রমনিকে তিনি বলেছেন, দখলীকৃত কাশ্মিরের মানুষের আত্মমর্যাদার বৈধ অধিকার যতদিন ভারত অস্বীকার করবে ততদিন দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসবে না। তাই আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক এই মূল সমস্যাটি সমাধান করতে আগ্রহী পাকিস্তান।
ওদিকে কংগ্রেশনাল শুনানিতে জেনারেল জোসেফ বলেছেন, পাকিস্তানকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তামূলক সহযোগিতা স্থগিতই আছে। তবে দু’পক্ষের মধ্যে কিছু সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত আছে। যা থেকে দু’পক্ষের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সামরিক সহযোগিতার গুরুত্ব প্রকাশিত হয়। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তারা অবস্থান করছে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরানের পাশাপাশি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হবে।
‘পাক-ভারত উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নাটের গুরু ইসরাইল’
ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত জিইয়ে রাখতে ইসরাইল যে ভূমিকা রাখছে ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি রবার্ট ফিস্ক সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমি যখন প্রথম সংবাদ প্রতিবেদনটা শুনি, তখন মনে হয়েছিল গাজায় অথবা সিরিয়ায় ইসরাইলি বিমান হামলার খবর শুনছি। খবরের প্রথম শব্দগুলোই ছিল ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে’ বিমান হামলা। একটা ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার’ (নির্দেশনা আর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র) ধ্বংস করা হয়েছে, অনেক ‘সন্ত্রাসী নিহত’। সেনাবাহিনী তাদের সৈন্যদের ওপর ‘সন্ত্রাসী হামলার’ পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
খবরে বলা হয়, একটা ইসলামি ‘জিহাদি’ ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে। এরপর যখন বালাকোটের নাম শুনলাম, তখন বুঝলাম এটা গাজা কিংবা সিরিয়ার খবর নয়- এমনকি লেবাননেরও না- এটা ঘটেছে পাকিস্তানে। এটা বিস্ময়কর। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতকে কেউ গুলিয়ে ফেলতে পারে কীভাবে?
তবে ধারণাটা একদমই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তেলআবিবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নয়া দিল্লিতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দূরত্ব আড়াই হাজার মাইল। কিন্তু, তারপরও একটা কারণে সংস্থাগুলোর গতানুগতিক ও বহু ব্যবহারে জীর্ণ ভাষায় এই দুই মন্ত্রণালয়ের ভাষায় অনেক মিল আছে।
মাসের পর মাস ধরে ইসরাইল অক্লান্ত পরিশ্রমে ভারতের বিজেপি সরকারের সঙ্গে একটি ‘ইসলামবিরোধী’ গোপন এবং রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক জোট বেঁধেছে। এই অনানুষ্ঠানিক, স্বীকৃতিবিহীন জোটটি হয়েছে এমন সময়ে যখন ভারত ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। 
অতএব, ভারতীয় মিডিয়াগুলো যে পাকিস্তানের ভেতরে জইশ-ই-মোহাম্মদের (জেইএম) ‘সন্ত্রাসীদের’ ওপর ইসরাইলের তৈরি রাফায়েল স্পাইস-২০০০ ‘স্মার্ট বোমা’ ফেলার কথা ফলাও করে প্রচার করছে, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।
ইসরাইলের এমন অনেক লক্ষ্যের ওপর হামলার বড়াইয়ের মতোই পাকিস্তানে ভারতীয় অ্যাডভেঞ্চার সামরিক সাফল্যের চেয়ে হয়তো কল্পনাই বেশি। ইসরাইলে তৈরি ও ইসরাইলের সরবরাহ করা জিপিএস-পরিচালিত বোমায় নিহত ‘৩০০-৪০০ সন্ত্রাসী’ হয়তো পাথর আর পাখির চেয়ে বেশি কিছু নয়।
কিন্তু, ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্যদের ওপর যে বর্বর হামলার দায় জেইএম স্বীকার করেছে তাতে অবাস্তব কিছু নেই। এতে নিহত হয়েছে ৪০ ভারতীয় সৈন্য। এ সপ্তাহে অন্তত একটি ভারতীয় বিমান গুলি করে ভূপাতিত করার ঘটনাও কাল্পনিক নয়। ২০১৭ সালে ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ভারত। দেশটি ইসরাইলের আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার, গোলাবারুদ এবং বিমান থেকে মাটিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল ৫৩০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে। এগুলোর বেশিরভাগই পরীক্ষা করা হয়েছে ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ার বিভিন্ন লক্ষ্যে হামলার সময়।
ইসরাইল নিজেই তাদের ট্যাংক, অস্ত্র এবং জাহাজ মিয়ানমারের সামরিক স্বৈরশাসকদের কাছে বিক্রির বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। মিয়ানমার সংখ্যালঘু, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম, জনগোষ্ঠী নিধনের চেষ্টা করায় পশ্চিমা দেশগুলো এই সরকারের ওপর অবরোধ আরোপ করেছে। কিন্তু ভারতে ইসরাইলের অস্ত্র ব্যবসা প্রকাশ্য ও বৈধ এবং দুই দেশই এটা ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাচ্ছে।
ইসরাইলিরা তাদের নিজস্ব ‘বিশেষ কমান্ডো’ এবং প্রশিক্ষণের জন্য নেগেভ মরুভূমিতে পাঠানো ভারতীয় সৈন্যদলের নিয়ে যৌথ মহড়ার ফিল্ম রেকর্ড করেছে। গাজা এবং অন্যান্য বেসামরিক লোকজন ভর্তি এলাকায় হামলা চালিয়ে ইসরাইল কথিত যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সেটাই শিখতে চায় ভারত।
ভারতের ৪৫ সেনা প্রতিনিধির মধ্যে কমপক্ষে ১৬ জন ছিলেন কমান্ডো, একটা সময়ের জন্য ইসরাইলের নেভাটিম এবং পালমাচিমের বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করেন। জাতীয়তাবাদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইল সফর করার পর গত বছর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে যান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই সময় তিনি ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে ‘ইসলামপন্থীদের হামলায়’ ১৭০ জনের নিহত হওয়ার কথা স্মরণ করেন।
মোদিকে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় এবং ইসরাইলিরা সন্ত্রাসী হামলার কথা খুব ভাল করেই জানে। আমরা মুম্বাইয়ের ভয়াবহ বর্বরতার কথা মনে রেখেছি। আমরা দাতে দাঁত চেপে পাল্টা হামলা করব, আমরা কখনও হাল ছাড়ব না।’ বিজিপির বক্তব্যগুলোও একই রকম।
তবে মোদির নেতৃত্বে ডানপন্থী ইহুদিবাদ এবং ডানপন্থী জাতীয়তাবাদকে এই দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি না বানাতে সতর্ক করেছেন কয়েকজন ভারতীয় বিশ্লেষক। এই দু’টি দেশই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে লড়াই করেছিল।
ব্রাসেলসের গবেষক শাইরি মালহোত্রার লেখা ইসরাইলের হারেটজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের পর সবচেয়ে বেশি মুসলিম রয়েছে ভারতে- প্রায় ১৮ কোটি। ‘ভারত-ইসরাইল সম্পর্ককে সাধারণভাবে দেশ দুটিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও লিকুদ পার্টির চিন্তাধারার স্বাভাবিক মিলন বলে অভিহিত করা হচ্ছে’ গত বছর লেখেন তিনি।
হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা “একটা বয়ান তৈরি করেছে, যেখানে বলা হয়, হিন্দুরা ঐতিহাসিকভাবে মুসলিমদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে।” দেশভাগ এবং তারপর পাকিস্তানের সঙ্গে টালমাটাল সম্পর্কের কথা মনে আছে এমন হিন্দুদের কাছে এটা খুব আকর্ষণীয় একটা ধারণা।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, হারেটজে মালহোত্রা বলেছেন, “ভারতে ইসরাইলের সবচেয়ে কট্টর ভক্তরা হচ্ছেন ‘ইন্টারনেট হিন্দু’। ইসরাইল ফিলিস্তিনে যা করছে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেভাবে লড়ছে মূলত তার জন্যই এরা ইসরাইলকে ভালোবাসে।”
ভারত, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘ইসলামি সন্ত্রাসের শিকার’ হওয়ায় এদের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক জোটের দাবি করেন কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিবেক দেহেজিয়া। মালহোত্রা অধ্যাপক দেহেজিয়ারও সমালোচনা করেন তার লেখায়।
বাস্তবতা হচ্ছে, ২০১৬ সালের শেষে ভারত থেকে ২৩ জন আরব বিশ্বে আইএসের হয়ে লড়াই করার জন্য দেশ ছাড়ে। অথচ, মাত্র পাঁচ লাখ মুসলিম নাগরিকের দেশ বেলজিয়াম থেকে গিয়েছেন এমন ৫০০ জন যোদ্ধা।
মালহোত্রার যুক্তি হচ্ছে, ভারত-ইসরাইলি সম্পর্ক ভাবাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তোলার পরিবর্তে বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি করা উচিৎ।
কিন্তু, ইসরাইল যখন ভারতে এত এত অস্ত্র সরবরাহ করছে, তখন হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভেতর ইহুদিবাদী জাতীয়তাবাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাবে কীভাবে তা বুঝা যাচ্ছে না। ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে ১৯৯২ সাল থেকে।
ভারতীয় পাইলটের সঙ্গে বন্দি হয়েছিলো ইসরাইলি পাইলট 
২৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের পর পাকিস্তানের মেজর জেনারেল আসিফ গফুর দুই পাইলটকে ধরার দাবি করেছিলেন, যার মধ্যে একজন উইং কামন্ডার অভিনন্দন ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে অভিনন্দনকে ফেরত দেয়া হলেও আরেকজনের বিষয়ে কেউই মুখ খোলেনি। সেই পাইলটকে নিয়ে এখন রহস্য দানা বাঁধছে। তবে এই রহস্যের কিছুটা ফাঁস করে দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জাফর হিলালী। পাকিস্তানের একটি টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ওই পাইলটদের একজন ইসরাইলি। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন। এখন তাকে ছাড়াতে ইসরাইল সৌদি আরবের দ্বারস্থ হয়েছে। যে কারণে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। 
ইসরাইল পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু: পাকিস্তানি মন্ত্রী
পাকিস্তানের সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী মুহাম্মাদ খান বলেছেন, তার দেশ কখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে না। এর কারণ হিসেবে তিনি ইসরাইলকে পাকিস্তানের প্রধান শত্রু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আলী মুহাম্মাদ খান ৭ মার্চ পাকিস্তান পার্লামেন্টের অধিবেশনে বলেন, “আমরা কখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেব না। ইসরাইল পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু।” পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মুশাররফের একটি মন্তব্যের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আলী মুহাম্মাদ খান এ মন্তব্য করেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা জেনারেল মুশাররফ সম্প্রতি দুবাইতে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের চির প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে তেল আবিবের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ইসলামাবাদের প্রতি আহ্বান জানান।
আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে?
পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। এ দু’দেশের যুদ্ধক্ষমতা বা প্রতিরক্ষা সামর্থ্যরে মধ্যে ইতোমধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য এসেছে বলেই মনে হচ্ছিল । এই ভারসাম্যই দু’পক্ষের মধ্যে একে অন্যকে আক্রমণ থেকে নিবৃত্ত করতে পারে।
আশঙ্কার বিষয় হলো- যুদ্ধ সব সময় পরিকল্পনা অনুসারেই সংঘটিত হয় না। অনেক সময় পার্শ্ব-অভিনেতাদের ভূমিকাও রণহুঙ্কার বাজিয়ে দেয়। পাক-ভারত যুদ্ধের ব্যাপারে বড় শঙ্কাটি এখানেই। ব্রিটিশ পত্রিকা ইনডিপেন্ডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি রবার্ট ফিস্ক, পাক-ভারত উত্তেজনার ব্যাপারে একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিবন্ধ লিখেছেন। এতে তিনি বালাকোটে ভারতীয় বিমান হামলার পুরো ঘটনার সাথে ইসরাইলি অপারেশনের অদ্ভুত মিল প্রত্যক্ষ করেছেন। ইসরাইলের সাথে গত দেড় দশকে ভারতের সম্পর্ক অনেক দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। দু’দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী প্রতিপক্ষ দেশ সফর করেছেন। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক দিনব্যাপী ইসরাইল আর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ভারত সফর করেছেন। দু’দেশের মধ্যে সরকারপ্রধান পর্যায়ের এটি সম্ভবত প্রথম সফর।
এই সফরে কৃষি ও প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তার পাশাপাশি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরক্ষা খাতে তাৎপর্যপূর্ণ সহায়তা চুক্তি হয়েছে। মোদি তার বক্তব্যে ভারতের কাশ্মির ও ইসরাইলের ফিলিস্তিন সঙ্কটের প্রতি ইঙ্গিত করে দুটোকে একই ধরনের সন্ত্রাসী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। দুই নেতার পুরো সফরকালীন অনুষ্ঠান ও চুক্তিগুলোকে পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, উভয় দেশের নেতারা বিদ্যমান দ্বন্দ্বে দুই দেশকে একই পক্ষের মিত্রশক্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।
ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক যুদ্ধ উত্তেজনাকে দু’দেশের বিরোধ নিষ্পত্তি থেকে উৎসারিত কোনো ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা হয় একরকম। কিন্তু এটাকে সভ্যতার দ্বন্দ্ব হিসেবে মূল্যায়ন করে কৌশল ঠিক করা হলে বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা নেয়। সাধারণভাবে যেটি মনে করা হয় তা হলো- নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি ও তার দল ভারতীয় জনতা পাার্টির আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য লোকসভা নির্বাচনে জয়ের জন্য একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব জাগিয়ে তোলা দরকার। সে জন্য এই যুদ্ধোন্মাদনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাকিস্তানের বক্তব্যে একাধিকবার এই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ও মমতা ব্যানার্জির মতো শীর্ষ বিরোধী নেতারা রাজনৈতিক স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহারের সমালোচনা করেছেন।
এসবে মনে হয়, ভারতের যুদ্ধংদেহী অবস্থা সৃষ্টির জন্য বিজেপি সরকারের একটি রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু বিষয়টির গভীরতা সম্ভবত এর চেয়েও বেশি। তুর্কি দৈনিক ইনি সাফাকের সম্পাদক ইব্রাহিম কারাগুল পাক-ভারত যুদ্ধের পেছনে ভিন্ন একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেছেন, পাক-ভারত যুদ্ধ এখনি কেন? তার পর্যবেক্ষণ অনুসারে কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ এবং জিংজিয়াং বা পূর্ব তুর্কমেনিস্তানে উইঘুর মুসলিমদের ইস্যুতে চীনা সরকারের সাথে যে সংঘাত সেটি ভারতীয় ও চীনা সভ্যতার সাথে ইসলামী সভ্যতাকে মুখোমুখি করার একটি আয়োজন।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সভ্যতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে মুসলিমদের সাথে ইহুদি-খ্রিষ্টান, চীন, রাশিয়া ও ভারতের মুখোমুখি অবস্থা সৃষ্টির এ প্রয়াসের শেকড় অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। অনেক জনপদেই স্বাধীনতা, স্বাধিকার অথবা বেঁচে থাকার গোষ্ঠীগত অধিকারের বিষয়টি বেশ যৌক্তিক। কিন্তু এসব যৌক্তিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার- চেতনা এবং ন্যায়বিচার বোধকে ব্যবহার করে অনেক দেশ ও জাতিকে ফাঁদে ফেলে ধ্বংস করা হয়েছে। সংঘাত লাগিয়ে দেয়ার জন্য যারা একসময় উসকানি দেয় যুদ্ধ বা সংঘাত লেগে যাওয়ার পর তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণের পথ ধরে মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় যা হয়েছে এবং হচ্ছে তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর অনেক কিছু স্পষ্ট হবে।
স্যামুয়েল পি হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত তত্ত্বটি গত কয়েক দশক ধরে ছিল বেশ আলোচিত। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর হান্টিংটনের এ তত্ত্ব দিয়ে পাশ্চাত্যের সামনে ইসলামিক সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে আসা হয়। হান্টিংটনের এই তত্ত্বকে পরে এডওয়ার্ড সাঈদসহ বেশ ক’জন লেখক পাল্টা বক্তব্য দিয়ে খ-ন করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যের নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে সেটি এতটাই গভীরে প্রোথিত হয় যে, পরের কয়েক দশকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই’-এর নামে বৈশ্বিকভাবে যা হয়েছে তার পরিণতি অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক। এ লড়াইয়ের শিকার জনপদগুলোকে অবলোকন করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিধর কয়েকটি দেশ ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন এখন ক্ষতবিক্ষত। এ দেশগুলো রাষ্ট্র হিসাবে কতটা দাঁড়াতে পারবে- সেটিই এখন প্রশ্নের মুখে। এর বাইরে আঞ্চলিকভাবে শক্তিমান দেশ সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর এবং সুদানেরও রয়েছে নানা সমস্যা। হয়তো বা নিজ দেশের জনগণের সাথে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা হয়েছে অথবা আঞ্চলিকভাবে শক্তিমান এক দেশকে অন্য দেশের সাথে সংঘাতে লাগিয়ে রাখা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দুরবস্থার জন্য জাতীয় বা আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবশ্যই দায় রয়েছে। তবে এর পেছনে সূক্ষ্মভাবে কাজ করছে ইসরাইল। উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরিতুল্য পরিস্থিতিতেও মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিমান দেশ হলো পাকিস্তান। আমেরিকানরা মনে করেন, বিশ্বের কাছে ইরাকের চেয়েও বড় হুমকি হলো পাকিস্তান। কারণ তাদের কাছে পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। 
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এর প্রজাতন্ত্রগুলো স্বাধীন হয়ে যায়। এ সময় রাশিয়ান ফেডারেশনের কয়েকটি ককেশাস অঞ্চল স্বাধীনতা বা অধিক স্বায়ত্তশাসন চায়। এর মধ্যে চেচনিয়ার সংগ্রাম একপর্যায়ে সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ লাভ করে। দাগেস্তানসহ আশপাশের কয়েকটি প্রজাতন্ত্রেও এর রেশ ছড়িয়ে পড়ে। এর পেছনে নানাভাবে ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের। পুতিন ক্ষমতায় আসার পর নির্মমভাবে এই বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন করেন। কিন্তু রাশিয়ার মতো একটি বিশ্ব শক্তির সামনে মুসলিম হুমকি নেতৃত্বের মানসপটে বেশ বড়ভাবে থেকে যায়। সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে অন্য অনেক কারণের মধ্যে একটি ছিল চেচনিয়ার সেই স্বাধিকার সংগ্রাম। তথাকথিত ইসলামিক স্টেটে অনেক চেচনিয়াও ছিল।
কাশ্মিরের ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশের জন্যই। দেশ বিভাগের মধ্যে এই সঙ্কটের বীজ নিহিত রয়েছে। বিজেপি সরকার গত পাঁচ বছরে যেভাবে এ সঙ্কটকে মোকাবেলা করেছে, তাতে সমস্যাটিকে অনেক জটিল করা হয়েছে। আর এ সময়টাতে ভারতের সাথে ইসরাইলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সর্বব্যাপী রূপ নেয়।
গত এক দশক ধরে ইসরাইলের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে শুরু করেছে। বিশেষভাবে গত পাঁচ বছর কাশ্মিরের স্বাধিকারকামীদের দমন কৌশল অনেকখানি ইসরাইলি পরামর্শক ও সহায়তা নির্ভর হয়ে গেছে। এর আগে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন করতে পেলেট গান ব্যবহার অথবা যখন তখন নির্বিচারে গুলি করে মারার দৃষ্টান্ত ছিল না। এখানে যে অপারেশন এখন চলছে, তার সাথে ইসরাইলের ফিলিস্তিন অপারেশনের মিল খুঁজে পেয়েছেন রবার্ট ফিস্কের মতো ব্যক্তি।
এই বিষয়টিই হলো সবচেয়ে বড় উদ্বেগের। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র হলো কাশ্মির। এখানে অসহিষ্ণুতা চরম পর্যায়ে ঠেলে দিয়ে দুই দেশকে যুদ্ধে জড়ানোরই চেষ্টা হচ্ছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বালাকোটে অভিযান এর একটি অংশ হতে পারে। এখন বিজেপি ও মোদির নির্বাচনের সাফল্যের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে পাকিস্তান আক্রমণ বা কাশ্মিরে বিপর্যয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে সাফল্য যতটা দূরে যাবে, ততটাই বেপরোয়া হতে পারে মোদি ও তার রাজনৈতিক সহযোগীরা। ভারতের সাথে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ব্যবসায় চুক্তিবদ্ধ ইসরাইল তাতে মদদ দিতেই পারে।
পাকিস্তান ও ভারত দু’দেশেই যুদ্ধে না জড়ানোর ব্যাপারে ব্যাপক জনমত ও বিশেষজ্ঞ বক্তব্য থাকার পরও দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে যুদ্ধ প্রলয়ঙ্করী রূপ নেয়ার আশঙ্কা এখানেই। ২০০৬ সালে পাকিস্তানকে চার ভাগে বিখ- করার যে পরিকল্পনা মার্কিন ডিফেন্স জার্নালে প্রকাশ করা হয়েছিল, তার সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এ জন্য রাষ্ট্রিক বিরোধকে ইসলামী সভ্যতার সাথে ইহুদি-খ্রিষ্টান-হিন্দু-চৈনিক সভ্যতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টির একটি সন্তর্পণ প্রচেষ্টা চলছে। ইব্রাহিম কারাগুলের ইঙ্গিত ছিল এর প্রতি। তিনি এও বলেছেন ভারত ও চীনের সাথে কোনোভাবেই মুসলিম বিশ্বের যুদ্ধে জড়ানো উচিত হবে না। মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা বিষয়টি সম্ভবত উপলব্ধি করতে পারছেন। যার কারণে পাক-ভারত উত্তেজনা যাতে যুদ্ধে রূপ না নেয়, তার জন্য তারা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের পরিণামদর্শী অনেক নেতাই ধ্বংসকারী এ ফাঁদে দু’দেশের জনগণকে ফেলতে চাইছেন না। যদিও বেশির ভাগ ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা উসকানিমূলক। পাকিস্তানের গবেষক সংস্থা জিন্নাহ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জাহিদ হুসেইন বলছেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। সুতরাং ভারতের পক্ষে যে কোনো বিপজ্জনক নীতি গ্রহণ করা এবং পরিস্থিতি চূড়ান্ত খারাপ হওয়ার আগ পর্যন্ত তা চালিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকা- যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তখন কিন্তু আর পিছু হটার উপায় রইবে না।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, নাকি ভালোর দিকে যাবে- সেই উত্তর জানতে অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত)