মঙ্গলবার, ১৮-জুন ২০১৯, ০৮:৩৬ অপরাহ্ন

বিমান ‘ছিনতাই’ রহস্যের জট খুলেনি, আরো নতুন ঘটনা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০১৯ ০৯:৪১ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৪২ জন যাত্রীসহ বাংলাদেশ বিমানের দুবাইগামী একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা, কমান্ডো অভিযানে ছিনতাইকারী নিহত এবং তার কাছ থেকে খেলনা পিস্তল ও প্লাস্টিকের পাইপ উদ্ধারের ঘটনাকে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই ঘটনা নিয়ে সরকারের মন্ত্রীসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো একের পর এক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। ফলে বিমান নিয়ে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলছে না। বরং ঘটনাটি জটিল এক রহস্যজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
এদিকে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে ঘটেছে আরো নতুন দু’টি অস্বাভাবিক ঘটনা। গত ৫ মার্চ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তল্লাশী পার হওয়ার সময় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের সাথে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র স্ক্যানারে ধরা পড়েনি। এর তিনদিন পর ৮ মার্চ শাজালালে ঘটেছে একই রকমের আরেকটি ঘটনা। জনৈক মামুন আলীর সাথে থাকা পিস্তলও এদিন বিমানবন্দরের স্ক্যানারে ধরা পড়েনি। এসব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। বিমান সচিব মহিবুল হক অবশ্য বলেছেন, এক শ্রেণীর মানুষ মিডিয়া কাভারেজ পেতে অস্ত্র নিয়ে বিমান বন্দরে যাওয়া শুরু করেছেন। তিনি যদিও বিষয়টি হালকা করার জন্য এমন কথা বলেছেন, বাস্তবে এ ঘটনাগুলোকে কেউই হাল্কা চোখে দেখছেন না। বিশেষ করে বিমান ‘ছিনতাই’ নিয়ে যা যা ঘটেছে এখন পর্যন্ত সবাই সেইসব প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
২৪ ফেব্রুয়ারি উড়োজাহাজটি যখন চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের সামনে সংবাদ ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান বলেন, অস্ত্রধারী ব্যক্তিটি কমান্ডো অভিযানে নিহত হয়েছেন। তাঁর কাছে একটি পিস্তল ছিল। তাঁর বয়স ২৫ থেকে ২৬ বছর।
কিন্তু এর পরের দিন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা মডেল থানায় এ বিষয়ে যে মামলা দায়ের করেছে, সেটির এজাহারে পিস্তল বা কোনো অস্ত্র উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে, ‘দুষ্কৃতকারীর হাতে বোমা ও অস্ত্রসদৃশ বস্তু দেখা গেছে। সে দুটি পটকাজাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।’ এই মামলা দায়ের করার আগের দিন রাতে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওই যুবকের কাছে পাওয়া বস্তুটি খেলনা পিস্তল। তাঁর কাছে কোনো বিস্ফোরকও ছিল না। এদিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি বলেছেন, উড়োজাহাজের ভেতরে ওই যুবকের সঙ্গে প্যারা কমান্ডোদের গোলাগুলি হয়েছিল, তাতে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, পরে মারা গেছেন। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম নাইম হাসান বলেছেন, উড়োজাহাজের ভেতরে গুলি হলে এয়ারক্র্যাফটে ছিদ্র হওয়ার কথা, গুলির চিহ্ন থাকার কথা। সে ধরনের কোনো চিহ্ন বা প্রমাণ তাঁরা পাননি।
এ রকম পরস্পরবিরোধী কথাবার্তায় পুরো বিষয়টি বেশ রহস্যময় হয়ে উঠেছে। যেসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে উচ্চারিত হচ্ছে, সেগুলো এ রকম: পলাশ আহমদ নামের যুবকটির কাছে কি সত্যিই পিস্তল ও বিস্ফোরক ছিল? যদি থেকে থাকে, তাহলে সেসব নিয়ে তিনি বিমানবন্দরের কয়েক ধাপের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে উড়োজাহাজে উঠে বসেছিলেন কীভাবে? বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার ভেতরের কারও সহযোগিতা ছাড়া কি এটা করা সম্ভব? আর যদি তাঁর কাছে কোনো অস্ত্র ও বিস্ফোরক না-ই থাকত, তাহলে তাঁর ওপর কমান্ডো অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন পড়েছিল কেন? সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পরে উড়োজাহাজটির ভেতরে ওই যুবক যখন একা ছিলেন, তখন তাঁর ওপর কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করার কী যুক্তি ছিল? নাকি তাঁকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিতে আরও সময় দেওয়া যেত?
প্রথমে বলা হয়েছে, ছিনতাই চেষ্টাকারীর সঙ্গে প্যারা কমান্ডোদের এনকাউন্টার হয়েছে। কিন্তু এখন দাবি করা হচ্ছে ছিনতাই চেষ্টাকারীর কাছে থাকা পিস্তলটি একটি খেলনা পিস্তল ছিলো। তাহলে কীভাবে এনকাউন্টার হলো সেই প্রশ্ন উঠেছে। 
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। ঘটনাটি তদন্তের জন্য যথারীতি একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে যে প্রতিবেদন পেশ করবে, তা থেকে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে, এমন একটি আশ্বাস বিমানসচিবের বরাতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় ঘটনাগুলো সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য বিশদ প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশের দৃষ্টান্ত বেশ বিরল। অধিকাংশ ঘটনাই রহস্যাবৃত থেকে যায়। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। 
কর্তৃপক্ষের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য 
ছিনতাইকারী এবং তার সাথে থাকা অস্ত্র নিয়ে বেশ কিছু বিষয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, র‌্যাব ও সেনা দপ্তরসহ নানা পক্ষ থেকে যে বক্তব্য এসেছে তার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে সেনা অভিযানের পরপরই ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল নাইম হাসান বলেন, “পাইলট কন্ট্রোল টাওয়ারকে জানান যে, কথিত হাইজ্যাকার তার স্ত্রীর কোন বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চান।” “এক ফাঁকে একজন ক্রু বাদে সকল ক্রুই বের হয়ে আসতে পারেন। পরে সেই ক্রুও বের হয়ে আসেন। তখন শুধুমাত্র কথিত হাইজ্যাকার বিমানে ছিল।” তিনি সাংবাদিকদের আরও বলেন, “কথিত ছিনতাইকারী ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় আটক করা হয়েছে। তার কাছে একটি অস্ত্র ছিল এবং বুকে বোমা বাঁধা থাকতে পারে। সেরকম তার বাঁধা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “তিনি (কথিত বিমান ছিনতাইকারী) পাইলটের মাথায় অস্ত্র ধরে দাবি করেছিলেন যে, তার স্ত্রীর সঙ্গে সমস্যা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন।”
অন্যদিকে এয়ার মার্শাল নাইম হাসান জানান, “কথিত ছিনতাইকারীকে খানিকটা মানসিক ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে। সাধারণত ছিনতাই ঘটনা যেমনটা দেখা যায়, তেমনভাবে সে যাত্রী বা ক্রুদের জিম্মি করার সেরকম চেষ্টা করেনি।”
তবে কিছুক্ষণ পরেই চট্টগ্রাম সেনা দপ্তরের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান জানান, “কমান্ডোদের আত্মসমর্পণের অনুরোধে সাড়া না দেয়ায় এনকাউন্টারে প্রথমে আহত এবং ওই ব্যক্তি মারা যান। আমাদের কমান্ডোরা বিমানের ভেতর অভিযান চালানোর পর তাকে আত্মসমর্পণ করতে বলে। কিন্তু তিনি সাড়া না দিয়ে আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।” “তার সঙ্গে আমাদের এনকাউন্টার হয়। তিনি প্রথমে আহত হন। পরে তিনি মারা গেছেন বলে আমি জানতে পেরেছি।”  তার কাছে শুধুমাত্র একটি পিস্তল পাওয়া গেছে বলে তিনি জানান।
তবে বিমানবাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির প্রধান মফিজুর রহমান সেদিন রাত আটটার দিকে বিমানবন্দরের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ২৫-২৬ বছর বয়সী অস্ত্রধারী একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, “যাত্রী-ক্রু সবাই সুস্থ আছেন। আটক ব্যক্তির সঙ্গে তিনি নিজেই কথা বলে বিষয়টি সুরাহা করেছেন। কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।” ওই অস্ত্রধারীর দাবি-দাওয়া কী ছিল - এ বিষয়ে মফিজুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি উত্তর দেননি।
তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ওই ঘটনা মনিটরিং করা হয়েছিল বলে তিনি তখন উল্লেখ করেন।
এদিকে কমান্ডো অভিযানে ছিনতাইচেষ্টাকারী তরুণ নিহত হওয়ার পর তার কাছ থেকে এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে সেনাবাহিনী। সেসব আলামতের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, ৭ টুকরো প্লাস্টিকের পাইপ, ঘড়ি, বৈদ্যুতিক তার, চার্জ লাইটের ভাঙা অংশ স্কচ টেপ দিয়ে পেঁচিয়ে বোমা সদৃশ বস্তু বানানো হয়েছিল।  
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘উদ্ধার হওয়া আলামতগুলো আমরা দেখেছি। কয়েক টুকরো প্লাস্টিকের পাইপ পাওয়া গেছে, যেগুলো লাল রঙ করা ছিল। পাইপের দুপাশে লাল স্কচ টেপ মোড়ানো ছিল। এরপর পাইপগুলো এক করে স্কচ টেপ পেঁচিয়ে তার সঙ্গে লাল, হলুদ, কালো বৈদ্যুতিক তার মোড়ানো ছিল। পাইপগুলোর ওপর একটা ঘড়ি ও চার্জ লাইটের এলইডি লাইট যুক্ত সার্কিট বোর্ড লাগানো ছিল। প্রাথমিকভাবে দেখে যে কেউ এটাকে বোমা ভাবতে পারে।’
ছিনতাইচেষ্টার পরের দিন বিমান প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীও বলেছেন, পিস্তল খেলনা হতে পারে। তিনি বলেন,  ওই যুবকের কাছে প্লাস্টিকের পাইপ জাতীয় কিছু ছিল। 
দুটি ‘পটকা জাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ’ ঘটেছিল: মামলার বর্ণনা   
বিমান ছিনতাই চেষ্টার এই ঘটনায় নিহত পলাশ আহমেদসহ কয়েকজনকে আসামি করে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানায় মামলা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রযুক্তি সহকারী দেবব্রত সরকার বাদী হয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে থানায় মামলাটি করেন। এই বিমান ছিনতাইচেষ্টায় একজনই জড়িত ছিলেন বলে সব কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
অথচ পতেঙ্গা থানার ওসি সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন, বেবিচকের মামলায় পলাশ আহমেদের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামির তালিকায় রাখা হয়েছে।
মামলার এজাহারে পলাশের নাম উল্লেখ করে এই মর্মে বলা হয়েছে যে, “উক্ত আসামি তাহার সহযোগী অপরাপর অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহায়তায় উক্ত অপরাধ (বিমান ছিনতাই) সংঘটনের চেষ্টা করিয়াছে মর্মে প্রতীয়মান হয়।” অজ্ঞাতনামা এই আসামিদের ভূমিকার বিষয়ে এজাহারে আর কিছু বলা হয়নি। এজাহারেই আবার ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় ছিনতাইয়ের চেষ্টাকারী হিসেবে শুধু একজন দুষ্কৃতকারীর কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, “বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ১৫ মিনিট পরই পলাশ বোমা সদৃশ বস্তু ও অস্ত্র দেখিয়ে বিমানটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। কেবিন ক্রু সাগর ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একজন অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারী (পলাশ) বিমানের মাঝখান দিয়ে দৌড় দিয়ে সামনের ককপিটে ঢোকার চেষ্টা করে। তার হাতে বোমা ও অস্ত্র সদৃশ বস্ত দেখা যায়।”
“উক্ত দুষ্কৃতকারী তার কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে শুনতে হবে বলে চিৎকার করে। অন্যথায় সে বিমানটি তার কাছে থাকা বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করে দেবে মর্মে হুমকি দেয়।” পলাশ মারা যাওয়ার পর তার হাতে থাকা পিস্তলটি উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছিল। পরে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ জানায়, ওই অস্ত্রটি একটি খেলনা পিস্তল। বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীও একই কথা জানান।
এদিকে ওই বিমানের যাত্রীদের একজন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, পলাশ তার পিস্তল থেকে দুটি গুলি ছুড়েছিল। এমনকি এজাহারে বলা হয়, বিমান উড়ন্ত অবস্থায় পলাশ দুটি ‘পটকা জাতীয় বস্তুর বিস্ফোরণ’ ঘটিয়েছিলেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, ওই এয়ারলাইনসের যাত্রী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী মশিউর রহমান ফেসবুকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনিও বলেছেন, “ছিনতাই চেষ্টাকারী তার ব্যাকপ্যাকের ভেতরে হাত দিলেন এবং বের করে আনলেন একটি অস্ত্র, একটি লাইটার ও বিস্ফোরকের মতো দেখতে একটি ডিভাইস। তিনি দাঁড়ালেন। বন্ধ ককপিটের খুব কাছে সামনের সারির গ্যালারিতে চলে গেলেন এবং ইংরেজিতে বললেন- এই বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছে! অবিলম্বে ককপিটের দরজা খুলুন। যদি বিমানটি অবতরণ করে তাহলে আমি এটি উড়িয়ে দেবো।”
“পেছনের দিকে যারা বসা ছিলেন তারা বুঝতে পারেন নি সামনে কি ঘটছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ছিনতাইকারী সশস্ত্র অবস্থায়। তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে সামনের একটি ফাঁকা শৌচাগারের দরজায় একবার তার হ্যান্ডগান দিয়ে গুলি করলেন। বারুদের গন্ধ কেবিনের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।” “তার এক হাতে বিস্ফোরকের ফিউজ ধরা। আরেক হাতে একটি লাইটার নিয়ে দোলাতে লাগলেন এবং আমাদেরকে হুমকি দিতে লাগলেন যে, আমাদের সবাইকে উড়িয়ে দেবেন।”  
এদিকে এজাহারে আসামিদের অপরাধের বর্ণনা দিয়ে বলা হয়, “পলাশ আহমেদ বিমানের পাইলট, কেবিন ক্রু ও যাত্রীদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের হুমকি দিয়া জিম্মি করত আতঙ্ক সৃষ্টি করিয়া বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে।”
ঘটনাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষের দায়িত্বশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিশেষত দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রশ্ন, যার সঙ্গে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জাতীয় ভাবমূর্তি জড়িত। তা ছাড়া এ ধরনের কৌতূহলোদ্দীপক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জনসাধারণের জানার অধিকার আছে। তাই ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, সে বিষয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য সরকারি ভাষ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ মোমেনের মতে, কোনো উড়োজাহাজে কোনো একজন যাত্রীকে নিয়ে সমস্যা হতে পারে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অস্ত্র হাতে একজন ব্যক্তির উড়োজাহাজ পর্যন্ত চলে যাওয়া।
প্রথম কথা হচ্ছে, পিস্তল খেলনা হোক বা আসল, কোনোটাই বিমানবন্দরে নিয়ে ঢুকার কথা নয়। তার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তার অথবা বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা কারো না কারো সহায়তা। 
বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ে আরো বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হযরত শাহজালাল (রা.) বিমান বন্দর দিয়েই চট্টগ্রাম গেছেন। বিকাল সোয়া তিনটায় তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ফিরেছেন। এজন্য আগের দিন থেকেই হযরত শাহজালাল (রা.) বিমানবন্দরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রীর বিমান ঢাকায় পৌঁছার আগে থেকেই সব ধরনের বিমান ওঠানামা বন্ধ ছিল। বিমান বন্দরে ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তা ব্যুহ এড়িয়ে কি করে এই যুবক অস্ত্রসহ প্রবেশ করলো? স্বাভাবিকভাবেই যেখানে মাথা থেকে পায়ের জুতো পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয় সেখানে খেলনা পিস্তল নিয়ে যুবকটি কিভাবে বিমানে উঠলো?
 বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবে ছিনতাইচেষ্টার অবসান হলো তাতে আমরা অনেকটা অবাক হয়েছি। যে বিমান ছিনতাইচেষ্টা কোনো সংঘবদ্ধ জঙ্গি বা সন্ত্রাসী করেনি এবং বিমানের সব যাত্রী ও ক্রু নিরাপদে নেমে আসতে পেরেছেন, সেখানে উচিত ছিল ওই যুবককে জীবিত উদ্ধার করা। যেখানে যুবকটি মানসিকভাবেই বিপর্যস্ত ছিলেন, সেখানে ট্রাঙ্কুলাইজার বা অন্য কোনো উপায়ে তাঁকে নিষ্ক্রিয় করা যেত। এখন অনেক ধরনের গুলি আছে, যাতে মানুষ মারা যায় না, কিন্তু কাবু হয়। যুবকটিকে জীবিত উদ্ধার করা গেলে জানা যেত বিমান ছিনতাইচেষ্টাটি তিনি নিজের ইচ্ছায় করেছিলেন, না অন্য কারও প্ররোচনা ছিল। জানা যেত তাঁর পেছনে কোনো সংগঠন ছিল কি না? কিন্তু মারা যাওয়ার পর এর পেছনের রহস্য জানা যাবে না। এখন যা বলা হবে, তার সবই আন্দাজের ওপর। অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মিলবে না।
এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ভঙ্গ বা নানা ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনা যেকোনো দেশেই ঘটতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা ঘটেও। কিন্তু এমন কিছু ঘটলে সভ্য দুনিয়ার রেওয়াজ হচ্ছে, সরকারের তরফে ঘটনার নিয়মিত ব্রিফিং এবং ঘটনার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সংবেদনশীল বিশেষ কোনো তথ্য ছাড়া বাকি বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা। সেখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা সরকারের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করে। উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টা নিয়ে এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেস ব্রিফিং, সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমে দেওয়া দায়িত্বশীলদের বক্তব্য থেকে আমরা যা শুনেছি, তা আমাদের বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। এসব বক্তব্যের মধ্যে কোনো মিল নেই, বরং পরস্পরবিরোধী। এ ধরনের ক্ষেত্রে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে প্রতিটি কর্তৃপক্ষ নিজেদের কৃতিত্ব নিতে অথবা নিজেদের যে কোনো দায় নেই, তা প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, বিমানের উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টা ও এর ভাষ্য নিয়ে এক জটিল সমস্যায় পড়েছে বাংলাদেশ। অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে একজন যাত্রী উড়োজাহাজে উঠে পড়েছে-এই ভাষ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই বছর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কোনো কার্গো ফ্লাইট যেতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়াও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা ওঠাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কোনো স্থায়ী বিষয় নয়। এই উড়োজাহাজ ছিনতাইচেষ্টা আমাদের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনতে পারে। আবার যদি ভাষ্যটি এমন হয় যে, যিনি উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিলেন, তিনি আদৌ কোনো মারাত্মক অস্ত্র বা বিস্ফোরক নিয়ে ওঠেননি, তাহলে কমান্ডো অভিযানে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি জায়েজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১১মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত)