শুক্রবার, ২১-জুন ২০১৯, ০১:৩৩ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রশ্নপত্র অব্যবস্থাপনার কবলে এবারের এসএসসি পরীক্ষা
মুদ্রণ ও বিতরণেই চরম অরাজকতা

প্রশ্নপত্র অব্যবস্থাপনার কবলে এবারের এসএসসি পরীক্ষা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৭:১৪ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: বিগত বছরগুলোতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তুঙ্গে থাকলেও এবার প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও বিতরণেই চরম অরাজকতা হয়েছে। কখনো নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে অনিয়মিতদের জন্য তৈরি করা পুরনো সিলেবাসের প্রশ্নপত্র, আবার পরীক্ষার্থীদের হাতে যাচ্ছে ভুল মুদ্রণ আর ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নপত্র। এসব কারণে পরীক্ষার তারিখ পর্যন্ত পেছাতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পরীক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েছে পরীক্ষা শুরুর পৌনে এক ঘণ্টা আধা ঘণ্টা পর। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীরা যেমন মানসিক চাপে পড়েছে। তাদের মাঝে অস্থিরতাও বেড়েছে। তেমনি উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন অভিভাবকারও। প্রশ্নপত্রে ভুলের ছড়াছড়ির খবরে  উদ্বিগ্ন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শঙ্কা, ভুলের কারণে তারা নম্বর কম পেতে পারে, কেউ কেউ ফেলও করতে পারে। তবে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তাদের উত্তরপত্র অন্যভাবে মূল্যায়ন করা হবে। তার অর্থ কী দাঁড়াচ্ছে এই, ভুল লিখলেও পূর্ণ নম্বর দেয়া হবে অথবা গড় হারে সবাইকে পাস করে দেয়া হবে। যদি তা-ই করা হয় সেটি হবে আরেক ধরনের অরাজকতা। কারণ সেক্ষেত্রে ভালো-খারাপের কোনো মূল্যই থাকবে না। এমন মত দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
আইসিটির প্রশ্নপত্রে ক্যারিয়ার শিক্ষার প্রশ্ন
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ছিল আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়ের পরীক্ষা, যাতে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন ছিল ২৫টি। প্রথম পৃষ্ঠায় আইসিটির ১৩টি প্রশ্ন থাকলেও অন্য পৃষ্ঠায় যে ১২টি প্রশ্ন ছিলো তা আইসিটির নয়, ক্যারিয়ার শিক্ষার। আইসিটি বিষয়ের পরীক্ষাটি বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নে হওয়ায় যশোর বোর্ডের ওই দিনের এসএসসি -সমমানের পরীক্ষা বাতিল করা হয়। পরের দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি ক্যারিয়ার শিক্ষার পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও পরীক্ষাটি অভিন্ন প্রশ্নে হওয়ায় সারা দেশেই এই পরীক্ষা বাতিল করা হয়। যশোর বোর্ডের এই আইসিটি পরীক্ষার জন্য নতুন করে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। ক্যারিয়ার শিক্ষা পরীক্ষাটি মূলত অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য ছিলো। যা সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নের আলোকে অনুষ্ঠিত হয়। ক্যারিয়ার বিষয়ের অর্ধেক প্রশ্ন যশোর বোর্ডে ছাপা হয়ে যাওয়ায় সারা দেশের অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের এ পরীক্ষা নেয়া হবে ২ মার্চ দুপুরে। এই ঘটনার পর যশোর বোর্ড থেকে দাবি করা হয়েছে, বিজি প্রেসের মুদ্রণজনিত ত্রুটির কারণে একই প্রশ্নপত্রে দুই বিষয়ের প্রশ্ন ছাপা হয়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ আব্দুল আলীম জানান, ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের প্রশ্নপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা ঠিক থাকলেও দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ছাপা ছিল ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের প্রশ্ন। পরীক্ষা শুরু হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই বিষয়টি নিশ্চিত হন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এর পরই আমরা তা জানতে পারি। পরবর্তী সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে আইসিটি পরীক্ষাটি স্থগিত করা হয়েছে।’
যশোর প্রিপারেটরি হাই স্কুল কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী কৌশিক জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নৈর্ব্যক্তিক পরীক্ষা শুরু হয়। তাদের কক্ষে ‘ঘ’ সেট প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। এই প্রশ্নপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং অপর পৃষ্ঠায় ক্যারিয়ার শিক্ষার প্রশ্নপত্র ছিল। পরীক্ষা শুরুর প্রায় ২০ মিনিট পর সেই প্রশ্নপত্র নিয়ে যান শিক্ষকরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এ নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হইচই শুরু হয়। ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিলে ছেলেমেয়েরা কী ফল করবে এমন প্রশ্নের মুখে পরীক্ষাসংশ্লিষ্টরা বিষয়টি নিয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই পরীক্ষাটি বাতিল ঘোষণা করে বিবৃতি দেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর মাধবচন্দ্র রুদ্র। 
চট্টগ্রাম ও ঢাকা বোর্ডে ভুল প্রশ্নপত্রে এসএসসি পরীক্ষা
এসএসসি-সমমান পরীক্ষার প্রথম দিনেই চট্টগ্রাম ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু কেন্দ্রে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের জন্য তৈরি প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হয়েছে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের। পরীক্ষার প্রথম দিনেই জানা যায়, এ দিন বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষা ছিলো। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের যে প্রশ্ন দেয়া হয় তা ছিলো পুরানো সিলেবাস অনুযায়ী করা। এ জন্য কেন্দ্র সচিবদের অবহেলাকে দায়ী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে তাদেরকে শোকজও করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের ৭ টি কেন্দ্রে এই ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়া হয়। এছাড়া কক্সবাজারের ৩ কেন্দ্রেও ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়।
অপরদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মাদারীপুরের কালকিনিতে একটি, মুন্সীগঞ্জে একটি এবং নেত্রকোনার একটি কেন্দ্রেও এই ধরনের ভুল প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছে।
পুরনো প্রশ্নে ৭৯ পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা, ডিসির বাসভবন ঘেরাও 
এসএসসির প্রথম দিনেই মুন্সীগঞ্জে এ ভি জে এম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২০১৮ সালের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কেন্দ্রের ৭৯ জন পরীক্ষার্থী পুরনো প্রশ্নপত্রে বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষা দিয়েছে। এই ঘটনায় পরীক্ষা শেষে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জেলা প্রশাসকের বাসভবন ঘেরাও করে। এ বিষয়ে কেন্দ্র সচিব ও কে কে গভঃ ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক মো. মনসুর রহমান বলেন, ‘সাংঘাতিক ও মারাত্মক একটি ভুল। যার কারণে ছেলেরা খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় ৮০ জন পরীক্ষার্থীকে পুরনো প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে দেয়। কেন্দ্র সচিব ও কক্ষ পরিদর্শকের গাফিলতির কারণে এটা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০১৭ সালের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ২০১৯ সালের প্রশ্নে পরীক্ষা দিবে। ২০১৬ সালে বই পরিবর্তন হয়েছে। ২০১৬ সালের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের সিলেবাসে পরীক্ষা দিবে। যার কারণে পরীক্ষায় যে প্রশ্ন এসেছে তার অনেকাংশেই মিল নেই। শিক্ষার্থীরা মন খারাপ করে পরীক্ষা দিয়ে মিছিল করেছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে আমার স্কুলের এ প্লাস পাওয়ার মতো শিক্ষার্থীরা ছিল।’
শিক্ষার্থীরা জানায়, সৃজনশীল অংশের প্রশ্নটি ২০১৮ সালের দেয়ায় পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন বিষয়টি জানালেও সংশ্লিষ্টরা আমলে নেননি। ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবকরা বলেন, পুরনো প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। প্রথম পরীক্ষাতেই এরকম গণ্ডগোল। এ বিষয় নিয়ে ছেলে-মেয়েরাও অনেক চিন্তিত।
পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা, ২৬ শিক্ষককে অব্যাহতি
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার খাসেরহাট সৈয়দ আবুল হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে প্রথম দিনেই পুরনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেয়ায় কেন্দ্র সচিবসহ ২৬ শিক্ষককে অব্যাহতি দেয়া হয়। এর আগে এই ঘটনার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। ওই কেন্দ্রে মোট ৬০৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে প্রায় পরীক্ষার্থীকে ২০১৮ সালের পুরনো প্রশ্নপত্র দেয়া হয়। পরীক্ষা চলাকালীন এ সমস্যার প্রতিবাদ করলেও পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে কোনো সমাধান করা হয়নি। পরে পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা কালকিনি-খাসেরহাট সড়ক অবরোধ-বিক্ষোভ করে। প্রায় দুই ঘণ্টা পরে জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে সড়কের অবরোধ তুলে নেন শিক্ষার্থীরা।
মোবাইল ফোন নিয়েই কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীরা, ৩ শিক্ষককে অব্যাহতি
গত ৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর কাটিরহাট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে স্মার্টফোন দিয়ে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে ম্যাসেঞ্জারে ফাঁসের চেষ্টাকালে এক পরীক্ষার্থীকে হাতেনাতে ধরে ফেলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। 
এ সময় কেন্দ্রে তল্লাশি চালিয়ে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে জব্দ করা হয় আরও ৬ টি মোবাইল। পরে দায়িত্বে অবহেলার কারণে কেন্দ্রের ৩ শিক্ষককে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। 
বাংলার বদলে গণিতের প্রশ্ন
প্রথম দিনের পরীক্ষায় চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি কেন্দ্রের জন্য থানা ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র যাছাই করে নেয়ার সময় ভুল করে ১০১ কোডের (বাংলা প্রথমপত্র) বদলে ১২৬ কোডের (উচ্চতর গণিত) কয়েক প্যাকেট এমসিকিউ প্রশ্নপত্র চলে যায়। এসব নিয়ে ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। 
গণিতের প্রশ্নে মুদ্রণ ত্রুটি
এসএসসির গণিত পরীক্ষার দিন কিছু কেন্দ্রে গণিতের ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র সঠিকভাবে ছিল না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরীক্ষার্থীদের অনেকেই অভিযোগ তোলে, তাদের কক্ষে গণিতের ইংরেজি ভার্সনের যে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়, তার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার একাধিক প্রশ্ন ছাপায় সমস্যা ছিলো। বাঁ পাশের লেখা কাটা পড়ে। এরপর তাদের বাংলায় লেখা প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। ফলে তাদের সমস্যায় পড়তে হয়।
সংসদে তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী 
এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনেই প্রশ্নপত্র বিতরণে অনিয়মের ঘটনায় সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের ক্ষোভ ও তোপের মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।
এ সময় সংসদে শিক্ষামন্ত্রী জানান, ওই ঘটনার জন্য দায়ীদের ইতোমধ্যে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ঘটনায় কোন শিক্ষার্থী যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সংসদ অধিবেশনে নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর পর্বে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি উত্থাপন করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু শিক্ষামন্ত্রীর কাছে জানতে চান, কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে ভিন্ন প্রশ্নে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। যা তাদের শিক্ষা জীবনের ওপর প্রভাব ফেলবে। এ বিষয় মন্ত্রণালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে?
জবাবে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, সারাদেশে এসএসসি পরীক্ষার প্রায় ৪ হাজার কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্র সচিবসহ যাদের ভুলের কারণে এটা ঘটেছে, ইতোমধ্যে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রথম দিনে যারা ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা যাতে কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য তাদের খাতা ভিন্নভাবে দেখা হবে। আগামীতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান জাতীয় পার্টির আরেক সংসদ সদস্য মোঃ ফখরুল ইমাম। তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী নৈতিকতা বিরোধী বক্তব্য দিলেন। যারা ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছেন তাদের কোন মানদ-ে নম্বর দেবেন? সিলেবাসের বাইরের প্রশ্নে তারা পরীক্ষায় কী লিখল? তারা না লিখলেও কী নম্বর দেবেন? বরং তাদের সিলেবাসে নতুন প্রশ্নে তাদের আবারও পরীক্ষা নেয়া যায় কিনা? জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নতুন করে পরীক্ষা নিলেও তো একই মানদণ্ড নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ আগের যে প্রশ্নে অন্যরা পরীক্ষা দিয়েছে, একই প্রশ্নে আবারও পরীক্ষা নেয়ার সুযোগ নেই। আর নতুন প্রশ্ন করলে তো আলাদাই হলো। তবে, সমাধান কী? এ বিষয়ে যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প কোন প্রস্তাব থাকলে তা মন্ত্রণালয়কে জানানোর অনুরোধ জানান তিনি। 
এসএসসির প্রশ্নের হিসাবে গরমিল 
এবার পরীক্ষার প্রথম দিন থেকেই দেখা গেছে, বেশ কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর চেয়ে প্রশ্নপত্রের সংখ্যা কম। বিশেষ করে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ওই সমস্যা বড় আকারে দেখা দেয়। ফলে কিছু কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে প্রশ্নপত্র ফটোকপি করে। আবার কিছু কেন্দ্রে অন্য জায়গা থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করে চাহিদা মেটানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এসএসসির ফরম পূরণ করার নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়। এ কারণে আগে পাঠিয়ে দেওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে শিক্ষার্থীর সংখ্যা মেলেনি। ফলে কোথাও অন্য কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করতে হয়। আবার কোথাও বিকল্প উপায়ে ফটোকপি করে প্রশ্নপত্র দিতে হয় পরীক্ষার্থীদের হাতে।
এবারের এসএসসির ফরম পূরণ শুরু হয়েছিল গত ৭ নভেম্বর, যা প্রথম দফায় শেষ হয় ২২ নভেম্বর। তবে কয়েক দফা বাড়িয়ে বিলম্ব ফিসহ ফরম পূরণ করার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয় গত ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এর পরও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে কিছু শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছে।
জানা যায়, চলতি বছর পরীক্ষার আগে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করার সুযোগ না দিতে চাপ ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রথম দফায় যারা শুধু নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করেছিল তাদেরই ফরম পূরণের তথ্য পাঠায়। কিন্তু যখন সময় শেষ হয়ে যায় আর দুদকের চাপও কমে যায় তখন বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও উত্তীর্ণ দেখিয়ে বিশেষ বিবেচনায় বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে ফরম পূরণের আবেদন করে। আবার অনিয়মিত শিক্ষার্থী যারা নির্দিষ্ট সময়ে ফরম পূরণ করেনি, তাদের অনেকেও শেষ সময়ে ফরম পূরণ করতে চায়। ফলে বিশেষ বিবেচনায় তাদের ফরম পূরণ করা হয় শেষ মুহূর্তে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষায় পাস না করা এবং শেষ মুহূর্তে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের জন্য বড় অঙ্কের টাকাও আদায় করে।
জানা যায়, গত ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় পরীক্ষা শুরু হওয়ার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র উত্তোলন করতে গিয়ে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায় পরীক্ষার্থীর তুলনায় গাজীপুরের টঙ্গীর সিরাজ উদ্দিন বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে ৩৭টি এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ৩৮টি প্রশ্নপত্র কম। দুজন কেন্দ্র সচিবই ঘটনাটি পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্যাগ অফিসারকে জানান। জানানো হয় জেলা প্রশাসককেও। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশ্নপত্র ফটোকপি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়।
সিরাজ উদ্দিন বিদ্যানিকেতন পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব এবং ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ওয়াহি দুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কেন্দ্রের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী ফরম ফিলাপের পরপরই শিক্ষা বোর্ডে প্রশ্নের চাহিদাপত্র পাঠাতে হয়। আমরা ওইভাবেই চাহিদাপত্র পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর দুই দিন আগে বোর্ড আরো ৩৭ জনের প্রবেশপত্র পাঠায়। ফলে পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র উঠিয়ে দেখা যায় ওই ৩৭ জনের প্রশ্ন কম।’ তিনি আরো বলেন, ‘এসব পরীক্ষার্থী বিভিন্ন স্কুল থেকে এসে ফরম ফিলাপ করেছিল। নিয়ম অনুযায়ী যে স্কুল থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হয়, ওই স্কুল থেকেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এসব পরীক্ষার্থীকে কিভাবে ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে তা বোর্ডই ভালো বলতে পারবে। যেহেতু বোর্ড প্রবেশপত্র দিয়েছে তাই দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রশ্ন ফটোকপি করে সরবরাহ করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমাদের কাছে ওই সব পরীক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের যে তালিকা ছিল, পরীক্ষা শুরুর পর দেখা যায় এর চেয়ে ৭৫ জন বেশি। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দিলেও বোর্ড প্রশ্নপত্র পাঠায়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুমিল্লার দেবীদ্বারে দুয়ারিয়া এজি মডেল একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গত ২ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা শুরু হওয়ার ৪৫ মিনিট পর প্রশ্নপত্র হাতে পায় শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্র সচিবকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই কেন্দ্রে ৪ নম্বর প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খুঁজে পাননি শিক্ষকরা। অথচ ওই প্যাকেটের প্রশ্নপত্রেই পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এসএমএস পাঠানো হয়। পরে জেলা সদর থেকে যাওয়া পরিদর্শন টিমের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিম আরাকে সঙ্গে নিয়ে উপজেলার ৯টি পরীক্ষা কেন্দ্রের সাতটি থেকে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র নিয়ে ৪৫ মিনিট পর শিক্ষার্থীদের হাতে ৪ নম্বর সেটের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়।
দায় নিয়ে ঠেলাঠেলি 
এবারের এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় নান ধরনের অনিয়ম-অরাজকতা হলেও এর দায় নিতে চাচ্ছে না কেউই। এই নৈরাজ্যের জন্য এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দুষছেন। তাহলে এসব ভুল ও অনিয়মের দায় কে নেবে সেই প্রশ্ন রয়েই গেছে। অন্য বিষয়গুলোর মতো যথারীতি এই ক্ষেত্রেও একে অন্যের প্রতি দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেউ বলছে, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কেন্দ্র সচিব দায়ী। কেউ বলছে, বিজি প্রেস দায়ী। আবার কেউ বলছে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড দায়ী। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেছেন, পরীক্ষার প্রশ্নের এ ত্রুটির দায় বোর্ডের নয়, বিজি প্র্রেসের। তবে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিজি প্রেসের ভুলের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থী দুর্ভোগে পড়ল। দুটি পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় অন্য পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাধার সৃষ্টি হবে। কিন্তু এই ভুলের দায় কে নেবে? যশোর বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল আলিম বলেন, প্রশ্নপত্রের এ ধরনের ভুলটি বোর্ডের নয়। এটি মুদ্রণজনিত ত্রুটি। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বা বিজি প্রেস  বলতে পারবে। তিনি যশোর বোর্ডের সব অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীকে ঘটনাটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহবান জানান। এ ধরনের ত্রুটির সাথে বোর্ডের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, ভুল মানুষের হয়, তবে এ ধরনের ভুল হওয়াটি সঠিক ছিল না। আন্তঃবোর্ড সমন্বয় কমিটির আহবায়ক ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, এ ঘটনাটি শুধু যশোর বোর্ডে ঘটেছে। তবে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা এ ব্যাপারে বিজি প্রেসের সাথে বৈঠক করে জানার চেষ্টা করব। তদন্ত করেও দেখা হবে। আমরা পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। কেন এবং কিভাবে এ ধরনের ভুল হলো খুঁজে বের করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন গণমাধ্যমকে বলেন, এবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে না বা হয়নি। এ জন্যই এমনটা ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
‘অবহেলার ভয়ংকর এক দৃষ্টান্ত’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা, প্রশ্নপত্রে ত্রুটির মতো ঘটনা পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের বড় ধরনের গাফিলতির প্রমাণ দেয়। আর তাদের ক্ষমার অযোগ্য ভুলের কারণে দায় বহন করতে হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। পরীক্ষার প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া হয় পুরোনো পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য করা প্রশ্নপত্র দিয়ে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কিন্তু তার আগেই ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, সেইসব পরীক্ষার্থীর খাতা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
অন্য বিষয়গুলোর মতো যথারীতি এই দুই ক্ষেত্রেও একে অন্যের প্রতি দায় চাপানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কেউ বলছে, ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য কেন্দ্র সচিব দায়ী। কেউ বলছে, বিজি প্রেস দায়ী। আবার কেউ বলছে, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড দায়ী। দায় যারই হোক না কেন; মূলত তার শিকার শিক্ষার্থীরা। যারা গত দুই বছর ধরে চূড়ান্ত এ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই ঘটনাগুলো তাদের সেই প্রস্তুতিতে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)