রবিবার, ১৮-আগস্ট ২০১৯, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতি: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে ৭ কোটি টাকা আত্মসাত 

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতি: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে ৭ কোটি টাকা আত্মসাত 

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৭:১৮ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজে প্রায় ৭ কোটি টাকা লুটপাটের বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ চক্র। দরপত্র অনুযায়ী ওই ভবনের ৯টি ফ্লোর নির্মাণের কথা থাকলেও খোড়া অজুহাত দেখিয়ে ৬টি ফ্লোর নির্মাণ করেই সংশোধিত প্রাক্কলন অনুমোদনের পায়তারা চলছে। ৯টি ফ্লোর নির্মাণে ৪৫ কোটি ২৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৬৭ টাকা খরচ বরাদ্দ হলেও ৬টি ফ্লোর নির্মাণেই খরচ দেখানো হচ্ছে ৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর এতে দরপত্রের ইঙছ এর দেয়া রেট অনুযায়ী এই ৬ ফ্লোরের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানো হচ্ছে। সে হিসেবে ৬৬ শতাংশ কাজ করে বরাদ্দের ৮৩ শতাংশ টাকাই খরচ দেখানো হচ্ছে। অথচ উল্টো সংশোধিত প্রাক্কলনের প্রতিবেদনে টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। 
ভবনের ভিত্তি ১৬ তলার উপযোগী নয় এমন অজুহাতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালার ছত্রছায়ায় থাকা দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারচক্র এই কারসাজি করেছে। এমনকি টেন্ডার অনুযায়ী ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে উন্নতমানের মোজাইক করার শর্ত থাকলেও পিপিআর লঙ্ঘন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো টাইলস লাগিয়ে আড়াই কোটি টাকা লোপাটের সব বন্দোবস্ত পাকা করে ফেলেছে। 
এভাবে নানা কায়দায় কোটি কোটি টাকা বাগিয়ে নিতে গিয়ে নির্মাণ শেষ করতেও বিলম্ব করছে। অথচ দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ কাজ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ করার কথা। এদিকে দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ করে ভবনের ৩ টি ফ্লোর অসমাপ্ত রাখার বিষয়ে সংশোধিত প্রাক্কলন অধস্তন কর্মকর্তারা অনুমোদনে অসম্মতি জানালেও ইইডি’র প্রধান প্রকৌশলী তাদেরকে চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অথচ নির্দিষ্ট সময়ে নির্মাণ কাজ শেষ না করা, নির্মাণ কাজে অতিরিক্ত ৭ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো, দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘন করে ঠিকাদারের ইচ্ছেমতো মোজাইকের পরিবর্তে টাইলস লাগিয়ে আড়াইকোটি টাকা অতিরিক্ত খরচসহ নানা অনিয়মের কোনো সুরাহাই হয়নি। প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালাকে এসব বিষয় অবহিত করলেও আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে তিনি উল্টো অবৈধ সংশোধিত প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে লিখিত নির্দেশ দেন। এমনকি এই বেআইনি অনুমোদনের জন্য বিভিন্নভাবে তাকে চাপপ্রয়োগ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত ১৭ জানুয়ারি নির্মাণ কাজে এসব অনিয়ম দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে প্রকল্পটি দ্রুত ও আইনানুগভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুপারিশসহ ইইডির প্রধান প্রকৌশলী বরাবর চিঠি দেন ইইডির ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ দেলোয়ার হোসেন। ওই চিঠিতে সংশোধিত প্রাক্কলনকে বেআইনি, অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক পরিমাপের বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এই চিঠির অনুলিপি শিক্ষামন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সচিব বরাবরও পাঠিয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। প্রধান প্রকৌশলীকে দেয়া ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন-
“মহোদয়ের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, মোজাইক পরিবর্তন করে তদস্থলে টাইলস স্থাপন না করার জন্য স্মারক ইইডি/ডি.এম.সি/বিবিধ/৫৮১ তারিখ: ২৩-১১-২০১৬ মূলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণকে নির্দেশ প্রদান করা হয় এবং স্মারক ইইডি/ডি.এম.সি/৩৬ তারিখ: ২৫-০৯-২০১৭ মূলে টাইলস না করার আইনগত ও প্রযুক্তিগত বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে। উপরোক্ত নির্দেশনার পরও নি¤œ স্বাক্ষরকারীকে (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) কোনো প্রকার অবহিত না করেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ব্যতিরেকে দুটি ফ্লোরের সিডিউল আইটেম মোজাইক পরিবর্তন করে তদস্থলে টাইলস স্থাপন করা হয়েছে। যা কোনোক্রমেই আইনগতভাবে সঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ মোজাইক না করার যুক্তি হিসেবে শব্দদূষণসহ অন্যান্য অযৌক্তিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তিহীন কারণ উল্লেখ করে অতিরিক্ত পরিমাপ প্রদান করে রিভাইজড প্রাক্কলন দাখিল করেছেন। তৎজন্য নির্বাহী প্রকৌশলী মহোদয়কে ইইডি/ডি.এম.সি/৭৮৭ তারিখ: ২৬-০৮-২০১৮ মূলে পত্র প্রদান করা হয়। গত ১৬-০৪-১৭ তারিখে মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় মোজাইক পরিবর্তন করে টাইলস স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।”
চিঠিতে আরো বলা হয়, “এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, দরপত্রটি মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের সময় অবশ্যই দরপত্রে দেয় মোজাইক আইটেমসহ অন্যান্য আইটেমের দর সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে (দরপত্র দলিলে মোজাইক ৪২ শতাংশ নি¤œদর, রড ও ঢালাই ৩০ শতাংশ উচ্চদরে)।  দরপত্র দলিল বিশ্লেষণে দরপত্রটি ঋৎড়হঃ ষড়ধফবফ বলে বিবেচিত হয়। কাজটির জন্য ৯ ফ্লোরের দরপত্র মূল্য ছিলো ৪৫.২৪ কোটি টাকা। বাস্তবে ৬ টি ফ্লোর করার জন্য  ৎবারংবফ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার পরিমাণ ৩৭.৭০  কোটি টাকা। দরপত্রের ইঙছ এর দেয়া রেট অনুযায়ী ৬ টি ফ্লোরের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। যদিও রিভাইজড প্রাক্কলনের প্রতিবেদনে টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দেখানো হচ্ছে। মূলত কম দরের আইটেম পরিবর্তন করে তদস্থলে নতুন আইটেম সংযোজন এবং বেশি দরের আইটেমের পরিমাপ অতিরিক্ত বৃদ্ধির ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে অনুমিত হয়। অনুমোদিত ফ্রন্ট লোডেড দরপত্রের কম দরের আইটেম পরিবর্তন এবং বেশি দরের আইটেমের ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি চ.চ.অ এর আইনের পরিপন্থি এবং ব্যক্তিগতভাবে (যে কোনো কর্তৃপক্ষের) লাভবান হওয়ার নিমিত্তে ঠিকাদারকে সুবিধা প্রদান বলে নি¤œস্বাক্ষরকারী মনে করেন। সেক্ষেত্রে দরপত্র মূল্যায়ন অনুমোদনসহ  স্টিয়ারিং কমিটিকে দরপত্রের আইনগত জটিলতার বিষয়টি অবহিত রেখে আইটেম পরিবর্তন অনুমোদনের দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।”
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন তার চিঠিতে আরো বলেন, “উপরোক্ত যৌক্তিক ও আইনি  বিষয়টি বিভিন্ন পত্র মারফত মহোদয়কে উল্লেখ করার পরও বেআইনি, অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক পরিমাপের প্রাক্কলনটি অনুমোদনের সুপারিশ করার জন্য নি¤œস্বাক্ষরকারীকে চাপ প্রদান করা হচ্ছে। এবং কাজটি সময়মতো শেষ না হওয়ার দায়িত্ব নি¤œস্বাক্ষরকারীর উপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা মোটেই যৌক্তিক নয়। এমতাবস্থায় প্রকল্পটি দ্রুত ও আইনানুগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নি¤œস্বাক্ষরকারী সদয় বিবেচনার জন্য মহোদয়ের নিকট নি¤েœাক্ত সুপারিশ পেশ করছেন। ১. দরপত্র মূল্যায়ন, অনুমোদন, সিডিউলে উপযুক্ত আইটেম থাকা সত্ত্বেও নতুন আইটেম সংযোজন, বেশি দরের আইটেমের পরিমাণ অতিরিক্ত বৃদ্ধির বিষয়ে তদন্ত পূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২. পত্রের মর্মানুযায়ী নি¤œস্বাক্ষরকারীর যুক্তিগুলির আইনগত ও প্রযুক্তিগত দিক উপস্থাপন পূর্বক সিডিউল মোতাবেক মোজাইক স্থাপনের কাজ করার জন্য স্টিয়ারিং কমিটিকে পুনরায় অনুরোধ জ্ঞাপন এবং ঠিকাদারকে নির্দেশ প্রদান। উপরোল্লিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করলে প্রকল্পটি দ্রুত, আইনানুগ ও আর্থিক সাশ্রয়ীমূল্যে বাস্তবায়ন হবে বলে নি¤œস্বাক্ষরকারী মনে করেন। সদয় বিবেচনার জন্য রিভাইজড প্রাক্কলনটি মহোদয়ের নিকট প্রেরণ করা হলো।”
যে অজুহাতে ১৬ তলা ভবন হচ্ছে না 
দরপত্র অনুযায়ী জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের একাডেমিক কাম প্রশাসনিক ভবনের ৮ম তলা থেকে ১৬ তলা পর্যন্ত মোট ৯টি ফ্লোর নির্মাণ করার কথা থাকলেও এর ৩টি ফ্লোর নির্মাণ না করেই বাজিমাত করতে চায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর। এর কারণ হিসেবে ভবনের ভিত্তি ১৬ তলার উপযোগী নয় এমন অজুহাত দেখান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মোহাম্মদ হানজালা। ২০১৭ সালের ১৬ এপ্রিল  শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় ইইডি’র প্রধান প্রকৌশলী জানান,  “প্রকল্পের ২০ তলা ভিতে ৭ তলা পর্যন্ত একাডেমিক ভবন পূর্বে নির্মিত হয়েছিলো।  ৮ম তলা থেকে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের সময় পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, পূর্বে নির্মিত কলামে ৬০ গ্রেডের পরিবর্তে ৪০ গ্রেডের রড ব্যবহার করা হয়েছে। কলাম দুর্বল হওয়ায় কিছু কিছু কলাম রেক্টেফিটিংয়ের মাধ্যমে স্ট্রেনদিং করা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ভবনটি পরীক্ষা করে এবং ভবনটি ১৩ তলার বেশি করা যাবে না মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।” 
দরপত্র অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ পাওয়া এই ভবনের নির্মাণ কাজ পরবর্তী ২৪ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন-প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ারও দেড় মাস পর কেন ১৬ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা যাবে না এই অজুহাত দেখানো হচ্ছে। এর আগে নির্মাণ কাজের শুরুতেই কেন এটি জানানো হয়নি। এছাড়া টেন্ডার অনুমোদনের আগেই কেন এটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়নি। ১৬ তলার জন্য বরাদ্দ নিয়ে নির্মাণ কাজ শুরুর ২ বছর পর কেন ১৩ তলার উপরে করা যাবে না বলে অজুহাত দেখানো হচ্ছে।
অপরদিকে ২০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা যাবে কি না সে বিষয়ে বুয়েট বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মতামত নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সভায়। এর জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচের বিষয়ে সংশোধন প্রস্তাবের সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এখানেও প্রশ্ন হচ্ছে ইইডি কেন অর্থ বরাদ্দের আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে অবহিত করলো না। পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া কীভাবেই বা তারা ১৬ তলার বরাদ্দ নিলো?
মোজাইকের বদলে টাইলস দিয়ে আড়াই কোটি টাকা লোপাটের ধান্ধা 
জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ফ্লোরে ফ্লোরে সিডিউল আইটেম মোজাইকের পরিবর্তে টাইলস দিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকা লোপাটের ধান্ধা করেছে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান হানজালা সিন্ডিকেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন কয়েকদফায় চিঠি দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিষেধাজ্ঞা দেয়া সত্ত্বেও সিডিউল আইটেম মোজাইকের বদলে ঠিকাদার টাইলস স্থাপন করেছে। মূলত অর্থ লোপাটের জন্যই তিনি এক্ষেত্রে অবৈধভাবে টাইলস স্থাপন করেছেন। উল্লেখ্য, টাইলসে মোজাইকের চেয়ে খরচ অনেক কম পড়ে।
২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর এক  চিঠিতে “সিডিউল আইটেম বাদ দিয়ে অন্য আইটেম ব্যবহার করলে দরপত্র দলিলের শর্ত যে ব্যত্যয় হবে” ঠিকাদারকে তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। ওই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফ্লোর বহুল ব্যবহার হয় বলে মোজাইক ধরা হয়েছে। মোজাইকের স্থায়িত্ব টাইলসের চেয়ে অনেক বেশি। বাজারে মোজাইকের মালামাল পাওয়া যায়। অতএব, ফ্লোরে সিডিউলে বর্ণিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মোজাইকের কাজসহ সমস্ত কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।” তারপরেও মোজাইকের বদলে অবৈধভাবে টাইলস স্থাপন করে দেওয়ান হানজালা সিন্ডিকেটের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স এন্ড দেশ উন্নয়ন লিমিটেড অতিরিক্ত ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯ হাজার ৪০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অথচ ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর ঢাকা জোনের নির্বাহী প্রকৌশলীকে এক চিঠিতে টাইলস লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা সংশোধিত প্রাক্কলন অনুমোদনকে সম্পূর্ণভাবে পিপিআর লঙ্ঘন বা বেআইনি বলে উল্লেখ করেন। ওই চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “দরপত্রে ফ্লোরে অতি উন্নতমানের মোজাইক করার নির্দেশনা থাকলেও তা পরিবর্তন করে টাইলস লাগানো হচ্ছে। উক্ত কাজটি না করার জন্য এবং চুক্তি মোতাবেক মোজাইকের কাজ করার জন্য ইতিপূর্বে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছিলো। যে যুক্তিতে মোজাইক পরিবর্তন করে টাইলস লাগানো হচ্ছে তা মোটেও প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয়। বর্ণিত মোজাইকের স্থায়িত্ব টাইলসের চেয়ে অনেক বেশি।” এছাড়া টাইলস লাগানোর ফলে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯ হাজার ৪০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর এসব আইনগত বাধা সত্ত্বেও মোজাইকের স্থলে টাইলস বসিয়ে ঠিকাদার যে অতিরিক্ত অর্থ লুটপাট করতে চেয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মোজাইক স্থাপনের সময় ভবনের ক্লাসে থাকা শিক্ষার্থীদের শব্দদূষণ থেকে বাঁচাতে টাইলস স্থাপন করা হয়েছে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে এমন যুক্তি দেখানো হলেও এটিকে ‘অজুহাত’ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন। ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “গত ২৫-৯-১৭ এবং ২৩-১১-১৬ তারিখ দুটি চিঠিতে আমি টাইলস ব্যবহার না করার প্রযুক্তিগত ও পি.পি.এ. এর আইনগত ব্যাখ্যা দিয়েছি। পরবর্তীতে ওই যুক্তি খন্ডন না করেই নির্বাহী প্রকৌশলী  ওই ভবনে  মোজাইকের স্থলে টাইলস স্থাপন করেছেন বা রিভাইজস এস্টিমেটের  ভেরিয়েশন আইটেম হিসেবে তা সন্নিবেশিত করেছেন। রিভাইজস এস্টিমেটের অনেক আইটেমে অযৌক্তিক পরিমাণের পরিমাপ প্রদর্শিত হয়েছে।”
কিন্তু এতোকিছুর পরেও এই অবৈধ সংশোধিত প্রাক্কলনে অনুমোদন দিতে ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ইইডির প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চিঠি লেখেন। এমনকি এই বেআইনি অনুমোদনের জন্য বিভিন্নভাবে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চাপপ্রয়োগ করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই চিঠিই প্রমাণ করে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান হানজালা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত বলেই বেআইনি হলেও অতিরিক্ত অর্থ লোপাটের জন্য সংশোধিত প্রাক্কলনে অনুমোদন দেয়ার জন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে চাপ দেয়া হচ্ছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)