শুক্রবার, ২৬-এপ্রিল ২০১৯, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের প্রকল্পে টেন্ডার ঘাপলা: সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে ১৩ কোটি টাকা

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের প্রকল্পে টেন্ডার ঘাপলা: সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে ১৩ কোটি টাকা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৯ ০৭:৪৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলএসটি) স্থাপন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার ঘাপলা হয়েছে। অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ চক্র ও ঠিকাদারের কারসাজিতে এই প্রকল্পের ৮ টি প্যাকেজ থেকে সরকারের ১৩ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার ২৪৭ টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। শুধু এই ৮ প্যাকেজই নয় প্রকল্পের মোট ১৯ টি প্যাকেজের প্রত্যেকটিতেই টেন্ডার ঘাপলা হয়েছে। কোটি কোটি টাকার এই দুর্নীতি-জালিয়াতির ঘটনা তদন্তের দাবি জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।   
জানা যায়, ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালকের দায়িত্বে থাকা ডা. মোঃ আইনুল হক ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি স্থাপন প্রকল্পের জন্য ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের সংশোধিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। পিপিআর অনুযায়ী অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনা অনুসারেই ক্রয় কার্যক্রম শেষ করার কথা। অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনায় ক্রয়তব্য মালামাল/জিনিসের মূল্যও উল্লেখ থাকে। যার ওপর ভিত্তি করে ক্রয়কারী তার গোপনীয় দর নির্ধারণ করেন। সেক্ষেত্রে কোনোভাবেই গোপনীয় দর অনুমোদিত ক্রয় পরিকল্পনার বাইরে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ডা. মোঃ হায়দার আলী অনুমোদিত দরের বাইরে নিজের ইচ্ছেমত একটি দর ঠিক করে মূল্যায়ন কমিটিকে ম্যানেজ করে অনুমোদন নিয়ে কার্যাদেশ দিয়েছেন। এরফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালক ডা. মোঃ হায়দার আলী প্রকিউরিং এন্টিটি হওয়ায় এবং দরপত্র ইজিপিতে হওয়ায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের নির্মাণ কাজের  মোট ১৯ টি প্যাকেজের প্রত্যেকটিতে তার ইচ্ছেমত দর প্রস্তাব দেখিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দিয়েছেন। এসবক্ষেত্রে ডিপিপি বহির্ভূতভাবে খরচ করা হয়েছে যা যথযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিতও নয়।
যেমন আইএলএসটি গোপালগঞ্জের ৫ তলা বিশিষ্ট বয়েজ হোস্টেল নির্মাণ কাজের জন্য মহাপরিচালক (ডিজি) দর অনুমোদন করেছিলেন ৬ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা। এখানে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) গোপনীয় দর নির্ধারণ করেন ৮ কোটি ২৫ লাখ ৭ হাজার ২৪৩ টাকা। যা ডিজি অনুমোদিত দরের চেয়ে ১ কোটি ৫৫ লাখ ৮৪ হাজার ২৪৩ টাকা বেশি। এই প্যাকেজটির কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদার ২২.৪৯১ শতাংশ নিম্নদরে টেন্ডার সাবমিট করে।  সে অনুযায়ী ৬ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকার ২২.৪৯১ শতাংশ নিম্নদরে কার্যাদেশ হওয়ার কথা  ৫ কোটি ৮ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ টাকার।  কিন্তু এই প্যাকেজে কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে ৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার ৬১৬  টাকার অর্থাৎ এখানে ১ কোটি ২০ লাখ ৫৯ হাজার ৯১৯ টাকা বেশি। 
খুলনার ডুমুরিয়ায় বয়েজ হোস্টেলের জন্য ডিজি অনুমোদিত দর ছিলো ৬ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকা। এখানে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) গোপনীয় দর নির্ধারণ করেন ৮ কোটি ২০ লাখ ৮৩ হাজার ৭১৪ টাকা। অর্থাৎ এখানোও  ১ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার ৭১৪ টাকা বেশি।  এ প্যাকেজে ঠিকাদার ২৪.২৩৫ শতাংশ নিম্মমুল্যে দর দিয়েছিলেন। সঠিক হিসাবে ৬ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার টাকার ২৪.২৩৫ শতাংশ নিম্মমুল্যে ৫ কোটি ৭ লাখ ৪ হাজার ২১০ টাকার কার্যাদেশ হওয়ার কথা।  কিন্তু কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে ৬ কোটি ২১ লাখ ৯১ হাজার ২৯৯ টাকার। অর্থাৎ ১ কোটি ৬২ লাখ ১৮ হাজার ৭৮৯ টাকা বেশিতে। 
 নেত্রকোণার ৪ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য ডিজি দর অনুমোদন করেছিলেন ১১ কোটি ৬৩ লাখ ২৯ হাজার টাকার। কিন্তু পিডি গোপনীয় দর নির্ধারণ করেন ১৪ কোটি ৩১ লাখ ৬৪ হাজার ৭২১  টাকা।  যা ডিজির অনুমোদিত দরের চেয়ে ২ কোটি ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার ৭২১ টাকা বেশি। 
খুলনার ডুমুরিয়ার ৪ তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য ডিজি দর অনুমোদন করেছিলেন ১১ কোটি ৬৩ লাখ ২৯ হাজার টাকার। কিন্তু পিডি দর নির্ধারণ করেন  ১৪ কোটি ৫২ লাখ ৬৭ হাজার ৬৯৭ টাকা।  যা ডিজির অনুমোদিত দরের চেয়ে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৭ টাকা বেশি।  
নেত্রকোণায় ৫ তলা বিশিষ্ট গার্লস হোস্টেল নির্মাণের জন্য ডিজি দর অনুমোদন করেন ৪ কোটি ২৭ লাখ ২৪ হাজার টাকা। কিন্তু পিডি দর নির্ধারণ করেছেন ৫ কোটি ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫৬ টাকা। যা ডিজির অনুমোদিত দরের চেয়ে  ১ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৫৬ টাকা বেশি। 
এভাবে ডুমুরিয়া গার্লস হোস্টেলের জন্য ১ কোটি ৫ লাখ ৯০ হাজার  ৯০৯ টাকা,  গাইবান্ধার বয়েজ হোস্টেলের জন্য ৮৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫৩৪ টাকা,  নেত্রকোণার ৫ তলা বিশিষ্ট বয়েজ হোস্টেলের জন্য  ১ কোটি ৫১ লাখ ৬০ হাজার টাকা বেশি দর নির্ধারণ করেছে পিডি। 
এই ৮ টি প্যাকেজে সরকারের সর্বমোট  ১৩ কোটি ১২ লাখ ৮৭ হাজার ২৪৭ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। এভাবে ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে নির্মাণ কাজের মোট ১৯ টি প্যাকেজের প্রত্যেকটিই পিডি তার ইচ্ছেমতো দর প্রস্তাব দেখিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা ক্ষতি সাধন করেছে।  প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ডিপিপি বহির্ভূতভাবে  খরচ করা হয়েছে।  যা যথাযথ কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত হয়নি।
অথচ ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল অধিদফতরের পরিচালক যখন এই প্রকল্পের সংশোধিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুমোদন দেন  তখন এক্ষেত্রে  ডিপিপি, পিপিআর-২০০৮ এবং আর্থিক বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে পিডিকে লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন।  কোন অবস্থাতেই প্রাপ্ত বাজেট বরাদ্দের অতিরিক্ত দর নির্ধারণ করা যাবে না। বাজেট বরাদ্দের প্রত্যাশায় কোনো দর নির্ধারণ করা যাবে না এমন শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে যে কোনো আর্থিক ও অন্যান্য অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকিউরিং এন্টিটি ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকবেন বলেও শর্ত উল্লেখ করেন। অথচ ওইসব শর্ত লঙ্ঘন করে অনুমোদিত এপিপি দরের বাইরে বেশি দরে প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করেছেন পিডি  ডা. মোঃ হায়দার আলী।
সরকারের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার এই ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন ও দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য গত ২৫ ডিসেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ঘটনা তদন্তে সচিব কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেননি। বস্তুত এতে অভিযোগ উঠেছে কোটি কোটি টাকার এই দুর্নীতি-জালিয়াতিতে সচিবেরও হাত রয়েছে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)