শুক্রবার, ২৬-এপ্রিল ২০১৯, ০৮:১১ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • নতুন সরকারের যাত্রা: একদিকে ফুলেল শুভেচ্ছা অন্যদিকে ক্ষোভ-হতাশা

নতুন সরকারের যাত্রা: একদিকে ফুলেল শুভেচ্ছা অন্যদিকে ক্ষোভ-হতাশা

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারী, ২০১৯ ১২:১৩ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর আওয়ামী লীগে এখন উৎসবের আমেজ। বিজয়ের রাত থেকেই ফুলেল শুভেচ্ছা আর অভিনন্দনে সিক্ত হচ্ছেন নির্বাচিতরা। ৭ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা শপথগ্রহণের পর সেই শুভেচ্ছায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শুভাকাক্সক্ষী, সুধীজন আর দলীয় নেতাকর্মীদের ফুলে ফুলে ভেসে যাচ্ছেন নতুন মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী উপমন্ত্রীরা। বাড়ি থেকে অফিস, সকাল থেকে রাত সবখানে সব সময় শুধু ফুল নিয়ে শুভাকাক্সক্ষীদের ভিড়। বলতে গেলে ফুল নিতে নিতে হাফিয়ে উঠছেন নতুন মন্ত্রীরা। একদিকে বিজয়ের আনন্দ উল্লাসে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন মাতোয়ারা, ঠিক অপরদিকে মনোনয়ন বঞ্চিত ও মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া নেতাদের মাঝে বিরাজ করছে ক্ষোভ-হতাশা। চারদিকের এতো আনন্দ উল্লাসের মাঝে এক ধরনের বিষন্নতা ঘিরে রেখেছে তাদের। নৌকার বিপুল জয়েও তাদের মনে আনন্দ নেই। এবার যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন তাদের বেশির ভাগই একেবারে নতুন। জাতীয় রাজনীতিতে ছিলেন অপরিচিত। কিন্তু মন্ত্রী বা এমপি হওয়ার পর তাদের বাসা বাড়ি অফিস সর্বত্রই নেতাকর্মীদের ভিড় লেগে আছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ভিড়ে ব্যতিব্যস্ত পরিবারের সদস্যরা। বলতে গেলে শুভেচ্ছা উপহার আর ফুল রাখার জায়গা পর্যন্ত খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে নতুন মন্ত্রী-এমপিদের। 
অপর দিকে মন্ত্রিত্ব হারানো ও মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের বাড়ি বা অফিস যেখানে একসময় রাতদিন ভীড় লেগেই থাকতো সেখানে দেখা গেছে একেবারে উল্টো চিত্র। একসময়ের মুখর বাড়ি বা অফিস এখন পুরো ফাঁকা, শুনসান, নীরব। সকালে দেড়-দু’শ লোক দেখে যেসব নেতার ঘুম ভাঙতো, অফিসে গেলেই নানা বিচার সালিশ আর তদবিরের কারণে খাবার খাওয়ার সময় থাকতো না এখন যেন দিন কাটে না তাদের। সুবিধাভোগীদের ভিড়ে যাদের কাছে যাওয়া ছিল প্রায় দুসাধ্য ; এখন এসব নেতাদের বাড়ি বা অফিস দেখলে মনে হবে এখানে কোন সময় লোকজনের আনাগোনাই যেন ছিল না। কাছের মানুষগুলো অপরিচিত হয়ে গেছে এসব সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের কাছে। মন্ত্রী থাকা অবস্থায় কিংবা দলের মনোনয়ন নিশ্চিতের আগে কোথাও গেলে বিমান বা গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই স্লোগানে স্লোগানে হাজার হাজার মানুষ যাদের বরণ করতো, সরকারি কর্মকর্তারা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো, মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাকে নিয়ে আসা হতো বা পৌঁছে দেয়া হতো, এখন আর নেই সেই ভিড়। কারণ, নেই মন্ত্রীত্ব অথবা কেউ পাননি দলের মনোনয়ন। ১৮ জানুয়ারি এমনই এক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। কয়েক দিন আগেও তাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের জটলা লেগে থাকতো। ঢাকা থেকে সিলেট ফিরলে ভিড় লেগে থাকতো ওসমানী বিমানবন্দরে। ভিআইপি লাউঞ্জে পড়ে যেত হুড়োহুড়ি-ধাক্কাধাক্কি। গলা ফাটানো স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে উঠতো বিমানবন্দর এলাকা। মোটর শোভাযাত্রা সহকারে তাকে নিয়ে আসা হতো বাসায়।
সেই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যখন সিলেটে ফিরলেন তখন তার হুইল চেয়ার ধরার মতোও কেউ ছিল না। সাবেক এপিএস জনিকে নিয়ে একা একাই ওসমানী বিমানবন্দর ত্যাগ করেন মুহিত। ১৯ জানুয়ারি বেলা একটা ৫০ মিনিটে নভোএয়ারের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে সিলেট যান তিনি। বিমান থেকে নেমে হুইল চেয়ারে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভিআইপি লাউঞ্জে। জনশূন্য ভিআইপি লাউঞ্জ তখন অনেকটা অপরিচিতই মনে হচ্ছিল মুহিতের কাছে। চিরচেনা পরিচিতমুখগুলো দেখতে না পেয়ে অনেকটা হতাশই মনে হচ্ছিল সাবেক এই অর্থমন্ত্রীকে। এতদিন যাদেরকে ‘কাছের মানুষ’ হিসেবে জানতেন তাদের মুখোশের অন্তরালের চেহারাটা হয়তো তখন ভাসছিল তার মনোচোখে! শুধু মুহিতই নন, মনোনয়ন না পাওয়া বা মন্ত্রীত্ব থেকে ছিটকে পড়া অনেক প্রভাবশালী নেতাই এ রকমের হতাশ, নিরলস সময় কাটাচ্ছেন। বেশি একটা কাজ না থাকলে বাড়ির বাইরে যান না এবং কারো ফোনও ধরেন না। 
একই অবস্থা বিরাজ করছে বিপুল ভোটে বিজয়ী মহাজোটের শরিকদলের নেতাদের মাঝেও। এবার শরিক ১৪ দলের কাউকেই মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়নি। এবারের মন্ত্রিসভা থেকে ছিটকে পড়েছেন হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো দলীয় প্রধানরাও। বড় বিষয় হচ্ছে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় মিত্র এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিই কোনো মন্ত্রীত্ব পায়নি। আওয়ামী লীগ চাইছে তারা বিরোধী দলেই থাকুক। এ নিয়ে জাতীয় পার্টির মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। ক্ষুব্ধ হয়েছেন মেনন, ইনুর মতো নেতারাও। জাতীয় পার্টির নেতারা নির্বাচনে জয়লাভের পর থেকেই বলে আসছেন তারা আগের মতোই সরকারের মন্ত্রী ও বিরোধী দলে থাকতে চান। কিন্তু এবার নতুন মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কাউকে জায়গাই দেয়া হয়নি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি, ১৪ দলের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।   
বিরোধী দলে থাকা নিয়ে ১৪ দলে মতবিরোধ 
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং মহাজোটের মধ্যে কোনো ধরনের বিবাদ নেই জানিয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে ১৪ দলের শরিকদের বিরোধী দলে থাকাই ভালো। এতে সরকারের ভুল সংশোধন এবং সমালোচনার সুযোগ থাকবে। ১৪ দলের শরিকেরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করলে তাদের জন্য ভালো এবং সরকারের জন্যও ভালো। গত ১৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশের প্রস্তুতি দেখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তবে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন- বিরোধী দলে গেলে ঐক্য থাকবে না, তারা সরকারেই থাকবেন। মেননের এই মন্তব্যের বিষয়ে কাদের বলেছেন, রাজনৈতিক জোটের প্রশ্ন যখন আসে, তখন তো আমরা একসঙ্গেই আছি। আমাদের জোট তো আমরা ভাঙিনি। 
১৪ দলের নেতারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক, আওয়ামী লীগ চায় কি না- এ প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিরোধী দল বা বিরোধী কণ্ঠ যত কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) হবে, পার্লামেন্টে থাকবে, ততই সরকারি দল কোনো ভুল করলে সেই ভুলটা সংশোধন করতে পারবে। কারণ বিরোধী দল না থাকলে তো একতরফা কাজ চলবে। বিরোধী দল থাকলে বিরোধিতা থেকে সরকারের কিছু শিক্ষণীয় বিষয় থাকবে। সমালোচনা থেকে শুদ্ধ হতে পারবে। সমালোচনা তো মানুষকে শুদ্ধ করে। 
একাদশ সংসদ নির্বাচনে মহাজোটভুক্ত দলগুলো সংসদের ২৮৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন ২২ টি পেয়েছে এই জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ১টি ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছে।  আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে মাত্র ৮টি আসন। যদিও বিএনপি জোটের নির্বাচিতরা এখনো সাংসদ হিসেবে শপথ নেননি। এই হিসাবে, প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দুটি দলই মহাজোটের। আর এতেই বেঁধেছে গোল। সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সংসদে বিরোধী দল কে হবে সেই সিদ্ধান্তও নিতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। বিএনপি জোটের নির্বাচিতরা শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় পুরো সংসদ হয়ে পড়ছে অনেকটাই একপেশে। কেননা এখন পর্যন্ত একাদশ সংসদে সব দলই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের। আর তাই এখন সংসদে বিরোধী পক্ষকে আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় পার্টিসহ অন্য শরিক দলের সাংসদদের বিরোধী আসনে বসাতে চাইছে আওয়ামী লীগ। বিশেষ করে তাদের দীর্ঘ দিনের সঙ্গী ১৪-দলের শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু), জাসদ (আম্বিয়া), জেপি, তরিকত ফেডারেশনকেও বিরোধী দলে ঠেলে দিতে চাইছে আওয়ামী লীগ। এজন্য ইতিমধ্যে শরিক দল থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি। এ ছাড়া মহাজোটের আরেক শরিক বিকল্পধারা বাংলাদেশও থাকছে বিরোধী দলে। অথচ জাতীয় পার্টি বাদে অন্য শরিকদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। 
আওয়ামী লীগ মনে করছে, ‘সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় বিরোধী দল শক্তিশালী না হলে সংসদ কার্যকর কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি না আসায় সে সময় জাতীয় পার্টি সরকারে ও বিরোধী দলে থেকেছে। এ নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। এবার বিএনপি বেশি আসন পায়নি। এ কারণে আওয়ামী লীগের শরিক অন্য দলগুলোকে বিরোধী দলে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যেন সংসদ জমজমাট থাকে। কোনো সিদ্ধান্ত যেন বিনা চ্যালেঞ্জে সরকার করতে না পারে।’ 
ইতিমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হয়েছে এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা)। আর সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ। অথচ এরশাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে জিতেছে। এরশাদের জাতীয় পার্টিকে এর আগে অনেকেই ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। এখন ১৪ দলীয় জোটের শরিকেরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। 
জাতীয় পার্টি আগের মতো এবারও সরকারের মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলে থাকতে চাইলেও দলটির বিরোধী দল হওয়ার বিষয়টি ‘নির্ধারিত’ হয়েছে সরকার প্রধানের ইচ্ছাতেই। এদিকে ১৪ দলের শরিকেরা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে, সেটিও আলোচনায় এনেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। যদিও তার আগে ১৪ দলের বেশ কয়েকজন নেতা বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। ১৪ দলের শরিক কয়েকটি দলের নেতারা এর আগে মন্ত্রিসভায় ছিলেন। এবার নতুন মন্ত্রিসভা থেকে তারা ছিটকে পড়েছেন। এ নিয়ে তাদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এবার শুধু বিরোধী দলে থাকতে হবে ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। জাপা সরকারের জোটসঙ্গী। এ অবস্থায় ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সাংসদদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন জাপা নেতারা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাপার কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, ‘কে বিরোধী দল হবে, সেটা সরকার দেখবে। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের সময় চেয়েছি আমরা।’
জাপার বৈঠকের একদিন পর ৪ জানুয়ারি দলটির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সই করা এক বিবৃতিতে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হবে। বিরোধী দলীয় নেতা হবেন এরশাদ নিজেই। তবে আগের মতো তার দলের কোনো সদস্য মন্ত্রী হবেন না।
১৪ দলের শরিকরা বলছেন বিরোধী দলের ভূমিকা হবে ‘স্ববিরোধী’ 
ক্ষমতাসীন জোটে থেকে বিরোধী দলের ভূমিকায় যাওয়া স্ববিরোধী অবস্থান বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা। এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জোটে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলেও শরিক দলের নেতারা মনে করছেন।
বিএনপি-জামায়াতের চার দলীয় জোট সরকারের সময় আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাম-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে ১৪ দল গঠিত হয়। ২০০৯ এবং ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত সরকারে ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে মন্ত্রী করা হয়।
তবে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ১৪ দলের শরিকদের বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ এককভাবে সরকার গঠন করে। এরপর থেকেই ১৪ দলের শরিকদের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হয়। 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ১৪ দল আছে, থাকবে। তবে শরিকরা বিরোধী দলে থাকলে তাদের জন্যও ভালো, আমাদের জন্যও ভালো। সংসদে তারা যদি বিরোধী দলের আসনে বসে দায়িত্বশীল বিরোধিতা করেন- সেটা সরকারের জন্যও ভালো, তাদের জন্যও ভালো।
আওয়ামী লীগের এই বক্তব্যকে স্ববিরোধী অবস্থান বলে মনে করছেন ১৪ দলের শরিক দলগুলোর নেতারা। তাদের মতে, ১৪ দলের অবস্থান কী হবে বা জোটের শরিকরা কী ভূমিকায় যাবে সেটা আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হতে পারে। শুধু আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। 
এ বিষয়ে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি এবং সদ্য সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, কোন দল কোন ভূমিকায় যাবে, সরকারের পক্ষ নেবে না বিরোধিতা করবে সেটা আওয়ামী লীগকে বলার বা সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার নেই। কোন দল কী ভূমিকা পালন করবে সেটা স্ব স্ব দল ঠিক করবে। এগুলো বললে বিভ্রান্তি হয়। আমরা এসব বক্তব্য আশা করিনি। এখন পর্যন্ত এসব বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো আলোচনা বা কথা হয়নি। আমরা অবিলম্বে বিষয়গুলো নিয়ে ১৪ দলে বসবো, জোটের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করে তারপর সিদ্ধান্ত হবে।
১৪ দলের শরিক দলগুলোর নেতারা জানান, নির্বাচনের পর এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো আলোচনা হয়নি। যে কথাগুলো বলা হচ্ছে, আলোচনা না করেই বলা হচ্ছে। 
ওই নেতারা বলেন, ১৪ দল গঠনের যে প্রেক্ষাপট ছিলো সেটা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দেশ গড়া। সেই সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। হয় তো আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করছেন, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে। আর সে কারণেই তারা এখন এসব কথা বলছেন।
১৪ দলের ওই নেতারা আরও বলেন, ১৪ দল যখন গঠন হয় তখন একটা সমঝোতা ছিলো একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন এবং সরকার গঠন। এই সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘদিন ১৪ দল একসঙ্গে রাজনীতি করে আসছে। এটা আওয়ামী লীগেরই মতামত ছিলো। সেটাকে সমর্থন দিয়ে তার ভিত্তিতেই ১৪ দলের পথ চলা। আওয়ামী লীগের এ বক্তব্যে ১৪ দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগ ১৪ দল রাখবে না কি তাদের মতো করে সাজাবে সেটা এখন স্পষ্ট নয় বলে জোট শরিকরা মনে করছেন। তবে ১৪ দল থাকা না থাকা সেটা আওয়ামী লীগের ওপরই নির্ভর করবে। ১৪ দল ভাঙার দায়িত্ব জোট শরিকরা নেবে না বলেও ওই নেতারা মন্তব্য করেন। ১৪ দলের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং সদ্য সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, শরিকদের বিরোধী দলের ভূমিকার কথাও বলা হয়েছে আবার ১৪ দল আছে, থাকবে সেটাও বলা হয়েছে। এই দুইটি বিষয় এক হলো না। তিনি বললেন, শরিকও হবো আবার বিরোধীও হবো, এ দুটো তো মেলে না, হাস্যকর হয়ে যায়।
এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা মনে করি ১৪ দলের প্রাসঙ্গিকতা এখনও আছে। আমরা সংসদে আমাদের যে ভূমিকা সেটা পালন করে যাবো। 
১৪ দলের আরেক শরিক বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরিফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, আসলে সরকারি দল যদি ঠিক করে দেয় কে বিরোধী দল হবে তাহলে সেটা তো আর বিরোধী দল হলো না। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে রাজনীতি করছি এখনকার প্রেক্ষাপটে যদি অন্য কোনো মূল্যায়ন হয় সেটাও আলোচনা করে বলা উচিত। তা না হলে যার যার মতো পথ বেছে নেবে। 
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার ব্যাপারে কোনো আলোচনাই হয়নি জানিয়ে ১৪ দলের শরিকরা বলছেন, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত মতামত জোটে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেও মনে করছেন নেতারা।
মন্ত্রিসভায় স্থান না পেয়ে মহাজোটের শরিকদলগুলোর নেতাদের মাঝে যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে বিদায়ী সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের কথা তা একেবারে স্পষ্ট।
৭ জানুয়ারি সচিবালয়ে শেষ কর্মদিবসে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, মন্ত্রিসভার আকার ছোট হওয়া এবং ১৪ দলের কোনও নেতাকে মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
রাশেদ খান মেনন বলেন, কথা ছিল আন্দোলন, নির্বাচন আর সরকার নিয়ে। কিন্তু শরিকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। ব্যাখ্যাও হয়তো চাওয়া হতে পারে। ১৪ দলের সমন্বয়কের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে, কেন মন্ত্রিসভায় রাখা হলো না। শরিকরা কেন মন্ত্রিসভায় নেই সেই ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও কোনও দাবি থাকবে না বলে উল্লেখ করেন মেনন।
মন্ত্রিসভার আকার শিগগিরই বড় করা হলে ১৪ দলের শরিকদের রাখা হবে কিনা জানতে চাইলে মেনন বলেন, সেটা তো অপমান করা। আমার মনে হয় এক দেড় বছরের মধ্যে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হবে না। 
‘উপ প্রধানমন্ত্রী’ হতে চান এরশাদ
দশম সংসদে বিরোধী দলে থাকলেও ‘ঐক্যমতের সরকারে’ও ছিল জাতীয় পার্টি। তাদের কয়েকজন নেতা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন এরশাদের স্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ। আর পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ ছিলেন মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এবারের নির্বাচনের পরও জাপার সংসদ সদস্যরা মহাজোট সরকারে থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও নিছক বিরোধী দল হয়েই থাকতে হচ্ছে জাতীয় পার্টিকে। তবে দুধের স্বাদ গোলো মেটাতে একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের নেতাকে ‘উপ প্রধানমন্ত্রী’ মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব তুলবেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
৬ জানুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে স্পিকারের কাছে শপথ গ্রহণের পর জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার কার্যালয়ে বসে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। 
এরশাদ বলেন, “বিরোধীদলের নেতার পদকে উপ-প্রধানমন্ত্রী ও দলের চিফ হুইপের পদকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য নতুন আইন করতে আমরা স্পিকারের কাছে অনুরোধ জানাব।”
তবে এরশাদের ওই আবদারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো আশ^াসের বাণী আসেনি। এসব নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে জাতীয় পার্টিতে। 
মুহিতের মন্তব্যে ক্ষোভ হতাশার সুর 
‘ঝেঁটিয়ে বিদায় নেয়ার চেয়ে স্বেচ্ছায় অবসর ভালো’- সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের এমন মন্তব্যকে ভালোভাবে নেননি বিশিষ্টজনরা। তাদের মতে, হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি এমন মন্তব্য করেছেন। শুধু মুহিত নয়, ক্ষমতাসীন সিনিয়র নেতাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত। দশম সংসদের মন্ত্রীদের শেষ কার্যদিবস ছিল ৭ জানুয়ারি। এদিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে হাসতে হাসতে সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ঝেঁটিয়ে বিদায় নেয়ার চেয়ে স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়ে ভালো করেছি। মন্ত্রী পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে ‘সৌভাগ্যবান’ মনে করছি। অবসর না নিয়ে ঝেঁটিয়ে বিদায় হয়ে যাওয়া, সেটার থেকে তো রক্ষা পেয়েছি। আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভালোই করেছি।
অথচ সংসদ নির্বাচনের আগে তিনিই বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী চাইলে আরও এক বছর দায়িত্ব পালন করতে চান। কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরই ঠিক উল্টো সুর। তার এমন মন্তব্যে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।
কেউ কেউ মনে করেন, তার বক্তব্যে কখনও ব্যালেন্স ছিল না। একেক সময় একেক কথা বলেছেন।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, তার মতো সিনিয়র নেতার কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশা করা যায় না। কয়েকদিন আগেই তিনি আরও এক বছর মন্ত্রিসভায় থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। হয়তো তাকে না রাখায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ হয়ে তিনি এসব কথা বলেছেন। এটা খুবই খারাপ মন্তব্য। অন্য সিনিয়রদের জন্যও অমর্যাদাকর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী অনেকদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের মুখে এমন মন্তব্য শোভা পায় না। তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন তা মোটেই শোভনীয় নয়। সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি (মুহিত) অর্থমন্ত্রী থাকাকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির বেহাল দশা হয়েছে। ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছিল। এর দায়-দায়িত্ব তাকে নিতেই হবে। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতকে তিনি সামান্য টাকা বলেছিলেন। জনগণের করের একটি টাকা বেহাত হলে সেটাও বড় দুর্নীতি। 
নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, আগের মন্ত্রিসভার নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান। মন্ত্রিসভায় শাজাহান খানের নাম না থাকায় ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেকে। গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর হাস্যোজ্জ্বল মুখে সংবাদ সংম্মেলনে বক্তব্য রেখে ব্যাপক সমালোচিত হন শাজাহান খান। ওই সময় দেশজুড়ে হওয়া সড়ক আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি ছিল তার পদত্যাগ। তারও আগে দুই বাসের চাপায় হাত হারানো এবং পরে রোজিনা আক্তারের মৃত্যুর পর দায়ী গণপরিবহন শ্রমিকদের শাস্তি নিশ্চিতের পক্ষে অবস্থান না নেওয়ায় তিনি সাধারণ মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এছাড়া, সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের বারবার ডাকা ধর্মঘটে সাধারণ মানুষ ভোগান্তি পড়ে। তখন মন্ত্রিসভা থেকে শাজাহান খানের পদত্যাগের দাবি ওঠে। এবার চূড়ান্তরূপে নতুন মন্ত্রিসভা থেকে তিনি বাদ পড়েছেন। এ নিয়ে শাজাহান খান শিবিরেও হতাশা বিরাজ করছে। শুধু শাহজাহান খানই নয়, বাদ পড়া অন্য মন্ত্রীদের প্রায় সবারই এমন বিধ্বস্ত অবস্থা যাচ্ছে এখন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)