শুক্রবার, ২২-ফেব্রুয়ারী ২০১৯, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে: দুশ্চিন্তায় ভারত 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে: দুশ্চিন্তায় ভারত 

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারী, ২০১৯ ০৫:৪৫ অপরাহ্ন

সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। এতে ভারত এবং চীন উভয়ই বেশ খুশি। নির্বাচনের পর প্রথম অভিনন্দন জানিয়ে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি নিজের অত্যন্ত উৎফুল্লতার প্রমাণ দিয়েছেন। একই সময়ে আনন্দবাজারসহ ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোও আওয়ামী লীগের ভূমিধস জয়ে বেশ ফলাও করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। 
কিন্তু এর রেশ কাটতে শুরু করে দু’একদিন যেতে না যেতেই। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরই ভারতীয় গণমাধ্যম, থিংকট্যাংকসহ রাজনীতিক মহলের সুর অনেকটা পাল্টে যায়। ভারত বুঝতে পারে, বাংলাদেশের রাজনীতির নাটাই অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন চীনমুখী। নতুন যে মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছে তাতে পুরোপুরিই চীনা প্রভাব বিদ্যমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদ গঠনসহ এখন সার্বিকভাবে সরকার পরিচালনা করছেন অনেকটাই চীনা স্টাইলে এবং চীনের পরামর্শে। চীনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। আর এ কারণে ভারত শুধু চিন্তিতই নয়, ভেতরে ভেতরে অনেকটা আতংকিতও হয়ে পড়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। 
ক্ষমতায় থাকাকালে চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই বিএনপির সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। তাইওয়ানকে স্বীকৃতি দেয়া নিয়ে ওই সময় চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল সেটি দীর্ঘ এতোদিনেও মিটমাট হয়নি। অন্যদিকে তেল-গ্যাস রফতানি করতে না দেয়ায় ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হয় তৎকালীন বিএনপি সরকারের। পরবর্র্তীতে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা গেরিলাদের সহায়তার অভিযোগও আনা হয় বিএনপির বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই সুযোগগুলোই কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসেছে এবং এখন পর্যন্ত বহাল-তবিয়তে আছে।
ক্ষমতায় থাকতে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে অবনতি হয় সেটির চূড়ান্ত রূপলাভ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এরপর অবশ্য ২০১৬ থেকে উভয় পক্ষই সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি অনেকটাই ভারতের কমিটমেন্টের উপর ভরসা করে এগিয়ে ছিল। অবশেষে ভারত সেই কমিটমেন্ট রক্ষা করেনি। আওয়ামী লীগ নেতারা ব্যক্তিগত আলোচনায় নিজেরা বলে থাকেন এবং বিশ্বাসও করেন, ভারত কখনো বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেবে না। অবশেষে সেটিই প্রমাণ হলো গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। 
কয়েক বছর আগেও চীন অন্য দেশের রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাতো না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ভারতের চতুর্পার্শ্বের প্রায় সবগুলো দেশই এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে। চীনের আগ্রাসী মনোভাব বুঝতে পেরে ভারত ইতিপূর্বে সম্পর্ক উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রস্তাব দিয়েছিল চীনকে। চীনও তেমনটিতে সায় দিয়েছিল। এই দু’টি চির বৈরি দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অবশেষে সেই সহাবস্থান আর ঠিক থাকছে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই বহিঃশক্তিগুলোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে বলা যায়, স্বাধীনতা থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল ভারতের হাতের মুঠোয়। এখানকার রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানান কায়দায় খেলেছে ভারত। মর্কিনীরাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক প্রভাব খাটাতো। অবশ্য, মার্কিনীরা যা কিছু করেছে বরাবর ভারতের সঙ্গে ভাব রেখেই। সর্বশেষ গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটিতেও ভারত একচেটিয়া খেলতে চেয়েছিল। ভারত প্রকাশ্যে বলেছে, নির্বাচনে কোনো রকমের প্রভাব খাটাবে না। তারা বাংলাদেশের জনমতকে সমর্থন দেবে। অর্থাৎ ভারত প্রকাশ্যে এটা বোঝাতে চেয়েছে যে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি তাদের জন্য বর্তমানে সমান পছন্দের। আদতে তা ছিল না। ভারত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে যে কাজ করেছে সেটি আর গোপন রাখা যায়নি। তবে নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের আচরণে ভারত অনেকটাই আশাহত হয়েছে। তারা বুঝতে পারছে, আওয়ামী লীগ এখন আর তাদের হাতের মুঠোয় নেই। অনেকটাই চীনা ফর্মূলায় চলবে এবারকার আওয়ামী লীগ সরকার। আর এ কারণেই ভারত বেশ চিন্তিত এবং উল্টো সূরে কথা বলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে যে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে সেটি এখন তারা বেশ ফলাও করে বলছে। যদিও এ নির্বাচনটি প্রথম বৈধতা পেয়েছে ভারতের কাছ থেকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীই টেলিফোনে অভিনন্দন জানানোর মধ্য দিয়ে নির্বাচনকে প্রথম বৈধতা দেন।
ভারতীয় থিংকট্যাংকগুলো যা বলছে
বাংলাদেশে গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যে ‘সুষ্ঠু ও অবাধ হয়নি’ এবং তার ফলাফলও যে ‘অবিশ্বাস্য’ - তা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই, বলছেন ভারতের রাজধানী দিল্লির কিছু গবেষক ও বিশ্লেষক।
দিল্লিতে এলেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা যে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে নিয়মিত যান, এমন একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা বিবিসিকে বলছেন এ কথাই - যার সাথে এ ব্যাপারে ভারতের সরকারি অবস্থান পুরোপুরি মেলে না।
দিল্লির অন্যতম প্রধান দুটি থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ও অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন- বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দলের রাজনীতিবিদরা ভারত সফরে এলেও তাদের প্রায়শই এই দুটি গবেষণাকেন্দ্রে আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়।
উভয় প্রতিষ্ঠানই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলে- তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে তাদের মূল্যায়ন কিন্তু রীতিমতো সমালোচনামূলক। 
বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত যেমন পরিষ্কার বলছেন, বাংলাদেশে বিরোধী জোট হয়তো এমনিতেও ক্ষমতায় আসতে পারত না- কিন্তু নির্বাচনী কারচুপির কারণেই তাদের আসন সংখ্যা এতটা কম হয়েছে।
তার কথায়, ‘রিগিং তো হয়েছে একশোবার- ভোটে রিগিং না-হলেও অবশ্য বিরোধীরা কম আসনই পেতেন, কিন্তু এরকম হাস্যকর সাতটা আসনে এসে তারা ঠেকতেন না।’
ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির আদর্শিক অভিভাবক বলে যাদের ধরা হয়, সেই আরএসএসের মুখপত্র ‘দ্য অর্গানাইজারে’ও এই বিষয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন ড: দত্ত।
সেখানেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, এই ধরনের একতরফা নির্বাচন স্বল্পমেয়াদে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে কিন্তু বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। 
কিন্তু ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন থাকলেও ভারত যেভাবে আগ বাড়িয়ে এবং তড়িঘড়ি চীনেরও আগে সেটাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, শ্রীরাধা দত্ত সেটাকে সমর্থন করতে পারছেন না।
“আমি তো বলব এটা একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত - আমরা সবাই জানি এটা একটা একতরফা নির্বাচন- তারপরও যেভাবে চীনকে টেক্কা দিতে আমরা আগেভাগে তাকে বৈধতা দিতে গেলাম সেটা আমি তো বলব বেশ বাড়াবাড়িই হয়েছে।”
‘২০১৪ সালের নির্বাচনের পরও আমরা শেখ হাসিনার সঙ্গে ঠিক একই জিনিসই করেছিলাম’, বলছিলেন ড: দত্ত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন যে বিতর্কমুক্ত নয়, সে কথা স্বীকার করেছে দিল্লির আর একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসও।
তাদের মন্তব্য প্রতিবেদেনও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র আসলে আজ অবধি এমন একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনই গড়ে তুলতে পারেনি যাকে কোনও বিরোধী দল ভরসা করতে পারে।
‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে, অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। তবে এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’, তথা ‘ভূমিধস বিজয়’ শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কারণ, এই ফলাফলের দাবি অনুযায়ী, ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়ে সরকার জিতেছে। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনে একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।
কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক ‘কিন্তু’ আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ার এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হলো, এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। তাই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তি।
যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। সবার চেয়ে আগে এ প্রসঙ্গে কাঞ্চন গুপ্তের লেখা এসেছে। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী থিংকট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের ভেতরের কোনো স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। আবার কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হলো, তিনি প্রবীণ সাংবাদিক, যার বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হলো, ‘বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’। ওই লেখার ভেতরের কিছু বুলেট বক্তব্য হলো,
যেমন- ১. সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও এ দেশে এখনো ‘কিছু আসে-যায় না’ এমন কয়েকটি দল রয়ে গেছে; এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় এটা বহুদলীয় রাষ্ট্র। ২. শেখ হাসিনার নিজস্ব কায়দায় চালানো ওয়ার অন টেররের তৎপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়া সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে- এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে। ৩. হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন।
তবে এসব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্তব্য হলো তার লেখার প্রথম বাক্য। লিখছেন, ‘প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী নামের যোগ্য কেউ নেই, এ কথা প্রমাণে জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন।’ এ ছাড়া তার দ্বিতীয় মন্তব্য, ‘বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে মনে হয় না।’ এই হলেন ভারতের মিডিয়ার অস্বস্তির প্রকাশ- কাঞ্চন গুপ্ত।
এমন দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য- প্রতিক্রিয়া হলো, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, ‘গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জন নয়।’ পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ওই দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য অগ্রগতি বয়ে আনবে না।’ তবে ভরত ভূষণও আগের কাঞ্চন গুপ্তের মতো মনে করেন, ‘বিরোধীদের পুননির্রবাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলেছেন, সেও আমল করবে না।’ তবে ভরত ভূষণের অভিযোগ আরো খাড়া। তিনি বলছেন, ‘সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে ফেলেছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন, এমন কর্তাব্যক্তিদের বিরোধীদের ওপর হামলার ইতিহাস আছে। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে।’
তবে তার মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলো, ‘ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হয়েছে, যেখানে ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা- এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এ ধরনের অবস্থা পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে।’ 
ভারতের একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখায়ও অনেক আশংকার কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সুমিতের পরিচয় হলো, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। তার লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় গত ৭ জানুয়ারিতে।
তার লেখার শিরোনাম হলো, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত।’ আর দ্বিতীয় শিরোনাম, ‘ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে।’
প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের সাথে আপস করেছে। ২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। ৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়।
এ ছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, ‘ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মনোযোগ দিচ্ছে না। ফলে সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করার জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না।’
চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন। এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, ৭ জানুয়ারি।
তার লেখার শিরোনাম, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিকত্ব রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত।’ রেডিক্যাল বলতে এক্ষেত্রে সাধারণভাবে সব ধরনের ‘সশস্ত্র রাজনীতি’ বুঝানো হয়েছে। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত ভোট ভিত্তির কথা মনে রাখি।’ এ ছাড়া তিনি বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ।’ এরপর তিনি মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, ‘এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে।’ 
তিনি হেফাজতের সাথে আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে। তাই তিনি বলতে চাচ্ছেন, এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হলো। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে ‘এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত।’ অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে শেখ হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
তার পুরো কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন। 
নির্বাচনের পরের দিন আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু তার একদিন পরেই সুর পাল্টে যায়। ১ জানুয়ারি প্রকাশিত পরের এই রিপোর্টের শিরোনাম হলো- ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা না পড়লে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। সার করে বললে আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।
তবে ভারতের এসব প্রকাশের সাধারণ সুর হলো, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে দেশটির জন্য বিপদ লুকানো বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই অস্বস্তি। আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হলো, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে লাভের ফসল যাচ্ছে চীনের ঘরে। যে ওই খালি জায়গার দখল পাচ্ছে। কারণ, গণতন্ত্রের বদলে উন্নয়নের রাজনীতি- হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ, ভারত চীনের কাছে এখানে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি হবে। তার কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই। যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক চীন। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং এক ভারত। 
যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দু’টি প্রতিষ্ঠানের মন্তব্য
চীন-ভারত দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। এশিয়ার সবচেয়ে বড় দুই শক্তি চীন এবং ভারত সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে, বাংলাদেশের গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে তার নজির সম্ভবত নেই।
এই দ্বন্দ্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এত তীব্র রূপ নিয়েছে যে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, এ বিষয়ে তাদের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক দুটি প্রতিষ্ঠান এনিয়ে দুটি লেখা প্রকাশ করেছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইস্ট এশিয়া ফোরামে’র প্রকাশিত নিবন্ধটির শিরোণাম, “চায়না এন্ড ইন্ডিয়াস জিওপলিটিক্যাল টাগ অব ওয়ার ফর বাংলাদেশ”। অর্থাৎ “বাংলাদেশ নিয়ে চীন এবং ভারতের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যুদ্ধ।”
আর নিউইয়র্ক ভিত্তিক ‘ওয়ার্ল্ড পলিসি রিভিউ’ ঠিক এ বিষয়েই ‘উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারসের’ একজন গবেষকের অভিমত ছেপেছে। তাদের লেখাটির শিরোণাম, হোয়াই ইন্ডিয়া এন্ড চায়না আর কম্পিটিং ফর বেটার টাইস উইথ বাংলাদেশ।” অর্থাৎ বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে কেন ভারত আর চীনের মধ্যে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
দুটি লেখাতেই বাংলাদেশের সঙ্গে চীন এবং ভারতের সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, নিরাপত্তা সহযোগিতা, বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচন এবং দেশটির ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য এই দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের বিষয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ রয়েছে।
ভারত এবং চীন, দুটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের রয়েছে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক এবং সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক। তবে এর মধ্যে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে ভারতের সঙ্গেই বাংলাদেশের সম্পর্কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
ইস্ট এশিয়া ফোরামে প্রকাশিত লেখায় ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় দুটি দেশই মূলত বাণিজ্যকেই ব্যবহার করতে চাইছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুটি দেশই সুবিধেজনক অবস্থানে আছে। দুটি দেশেরই বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দুই দেশের বাণিজ্যের একটি তুলনামূলক চিত্র তারা তুলে ধরেছেন তাদের লেখায়।
চীন বাংলাদেশে রফতানি করে প্রায় ১৬ হতে ১৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, অথচ বাংলাদেশে থেকে আমদানি করে মাত্র ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য। বাংলাদেশকে তারা বছরে একশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়। তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২৪ বিলিয়ন বা দুই হাজার চারশো কোটি ডলারের সাহায্য দেয়ার কথা ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে বছরে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কিন্তু আমদানি করে মাত্র ২৬ কোটি ডলারের। কিন্তু দুদেশের মধ্যে অনেক ইনফরমাল ট্রেড বা অবৈধ বাণিজ্য হয়, যা মূলত ভারতের অনুকুলে। এর পরিমাণ কমপক্ষে দুই হতে তিন বিলিয়ন ডলারের সমান হবে বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশে যে ভারতীয়রা কাজ করেন তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণও হবে দুই হতে চার বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশকে ভারত যে বৈদেশিক সহায়তা দেয় বছরে তার পরিমাণ পনের কোটি ডলারের মতো।
দুটি দেশই বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সাহায্যের প্রস্তাব দিচ্ছে। বাংলাদেশে বড় আকারে রেল প্রকল্পে আগ্রহী দুটি দেশই। গভীর সমূদ্র বন্দর স্থাপনেও ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে উভয় দেশের। কিন্তু এসব প্রকল্প খুব বেশি আগাচ্ছে না। ভারত বাংলাদেশের সুন্দরবনের কাছে যে কয়লা চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ পেয়েছে সেটি বেশ কিছু বাস্তব এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ফরেস্ট কুকসন এবং টম ফেলিক্স জোয়েনক বলছেন, অবকাঠামো খাতে চীন-ভারতের এই প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ খুব একটা লাভবান হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ম্যানুফাকচারিং এবং জ্বালানি খাতে চীন বা ভারত, কেউই বড় কোন বিনিয়োগে যায়নি। যদিও তারা এধরণের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।
চীন বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের সামরিক খাতে বড় সরবরাহকারী। ভারত এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল, এখন তারা দ্রুত চীনকে ধরতে চাইছে। কিন্তু ভারতের সামরিক সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে বাংলাদেশের।
রোহিঙ্গা সংকটও বাংলাদেশকে বুঝিয়ে দিয়েছে চীন এবং ভারত আসলে কেবল ‘সুদিনের বন্ধু। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদে যে কোন পদক্ষেপ চীন আটকে দিচ্ছে। এটাকে বাংলাদেশ বন্ধুত্বসুলভ কোন কাজ বলে মনে করে না। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও ভালো নয়। তারাও এই ইস্যুতে মিয়ানমারকে মদত দিয়ে যাচ্ছে।’
তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে দুই দেশের বাণিজ্য নীতি। দুটি দেশের কোনটিই বাংলাদেশকে রফতানির ক্ষেত্রে কোন ছাড় এখনো পর্যন্ত দিচ্ছে না। দুটি দেশই বাংলাদেশে রফতানির ক্ষেত্রে ব্যাপক আন্ডার ইনভয়েসিং এর সুযোগ দিচ্ছে, যেটি কীনা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম-নীতির লঙ্ঘন। যত অর্থ তারা বাংলাদেশকে ঋণ দেয়, তার চেয়ে আরও অনেক বেশি অর্থ তারা নিয়ে নেয় এভাবে।
কিন্তু এক্ষেত্রে চীন আছে সুবিধেজনক অবস্থানে। তাদের অর্থনীতি ভারতের তুলনায় অনেক বড়। বাণিজ্যেও তারা এগিয়ে। কাজেই বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের জন্য চীন যদি কোনদিন তাদের বাজার খুলে দেয়, এই চীন-ভারত দ্বন্দ্বে সুস্পষ্টভাবেই চীন জয়ী হবে, বাংলাদেশ ঝুঁকে পড়বে তাদের দিকেই।
অবশেষে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান দু’টির সেই ভবিষ্যতবাণীই ফলতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান দু’টি গত মাসে এমন রিপোর্ট প্রকাশ করে।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২১ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত)