বুধবার, ১২-ডিসেম্বর ২০১৮, ১০:৪৭ অপরাহ্ন

নির্বাচন কমিশন কী ঠুঁটো জগন্নাথ?

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০৬:০০ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে : স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। বিচারপতি এম ইদ্রিস কমিশনের অধীনে। তাঁর কমিশনের মেয়াদ ছিল ১৯৭২ সালের ৭ জুলাই থেকে ১৯৭৭ সালের ৭ জুলাই। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ এই কমিশনের অধীনে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সর্ব প্রথম সেই নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও ভোটারদের জন্য সুখকর ছিল না। সেই নির্বাচনের চিত্র জীবন্ত হয়ে উঠেছে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘বিপুলা পৃথিবী’র বর্ণনায়। ওই সময় ড. আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন “৭ মার্চ ১৯৭৩ দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের ভোটকেন্দ্র ক্যাম্পাসের সন্নিহিত এলাকায়। দুই গাড়ি করে আমরা একসঙ্গে ভোট দিতে গেলাম- উপাচার্য ইন্নাছ আলী, রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, ইংরেজি বিভাগের মোহাম্মদ আলী আর আমি। স্বাধীন দেশে এই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছি- মনের মধ্যে প্রচ- উৎসাহ। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে সব উৎসাহ দপ করে নিভে গেলো। জানলাম, আমাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে।”
ক্ষমতাসীন দলগুলি কখনোই চায়নি যে, ভোটের মাধ্যমে জনগণ তার স্বাধীন ইচ্ছা প্রকাশ করুক। শাসকশ্রেণি সবসময়ই ভুগেছে ভোটাতঙ্কে। ১৯৯১ এর আগে কোন সরকার নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন-শক্তিশালী, যোগ্য করে তুলতে চায়নি। সেই থেকে পরপর অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মান অর্জিত হয়েছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও  অর্থাৎ ২০০৮ সালে হুদা কমিশন যে সকল প্রাতিষ্ঠানিক ইতিবাচকতা অর্জন করেছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে রাজনৈতিক সরকারের আমলে সেগুলি ভেস্তে যায় এবং ভোট কালচার বদলাতে থাকে। যার একটি বড় উদাহরণ দশম জাতীয় সংসদ  নির্বাচন।
দেশে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস খুব লম্বা নয়। দেশটির জন্মের পরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক শাসনে কেটেছে ১৭ বছর। ১৯৯০ সালের পরে নির্বাচনমুখী সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি ধারা গড়ে উঠতে গিয়েও মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার। এখানে সংসদীয় ধারার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবসময়ই স্বেচ্ছাচারিতায় পর্যবসিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন পিষ্ঠ করেছে জনগণকে। ফলে ক্ষমতাসীন কোনো দলের পক্ষেই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের রেকর্ড নেই। কারণ দলের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য সেটি মোটেই স্বস্তির নয়। বর্তমান সরকারি দল ও তার মিত্ররাও বর্তমান দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প কিছু ভাবতে চাচ্ছে না। তারা সবাই এখন এটিকে ‘সাংবিধানিক’ মনে করছেন এবং এর বাইরে চুল পরিমাণও নড়বেন না- এই বক্তব্য জোরে সোরে জানান দিতে ভুল করছেন না। অন্যদিকে, বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জোরে সোরে তুলেছেন। এজন্য তারা প্রয়োজনে সংবিধানের মধ্যে থেকে সমাধানের পথও খুঁজে দিয়েছেন। 
নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দাবি বিএনপির। ক্ষমতাসীনরা অবশ্য মনে করে নির্বাচনে পুলিশসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে তারা দেশরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সেনাবাহিনীকে নিয়োগের প্রয়োজন মনে করছেন না। নির্বাচন কমিশন সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং ক্ষমতাসীন দলও তাই চায়। এ ব্যাপারে অন্যান্য দলের অবস্থান অনড়, তারা ইভিএম ব্যবহার চান না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পরবিরোধী দাবি মেটানোর ক্ষমতা কমিশনের কতটুকু আছে এবং সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার ‘ইচ্ছাশক্তি’ আদৌ আছে কি না? যদিও সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা আছে, সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন যেকোনো আইন করতে পারবে- কিন্তু কোনো কমিশনই এ পর্যবেক্ষণকে আমলে নিয়ে কোনো আইন করেছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই। সুতরাং এই নির্বাচন কমিশনও গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাবে এবং নতুন কোনো নজির স্থাপন করবে বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের অতীত বলে, এখানে সবসময় নির্বাচন কমিশন সেই কার্যক্ষমতাই দেখিয়েছে, যেরকমটি নির্বাচনকালীন সরকার চেয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার, রাজনৈতিক দলীয় হলে তাদের বিজয়ই অক্ষুণ্ন থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে, ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। সে অর্থে নির্বাচন কমিশন সব সময় দলীয় সরকারের ইচ্ছাকেই প্রধান্য দিয়েছে।
অন্যদিকে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলেও তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছেন, নির্বাচন কমিশন সেভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। স্বাধীন-সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বাংলাদেশে তার কোনো প্রমাণ অতীতে কোনো নির্বাচন কমিশন দেখাতে পারেনি। সুতরাং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের অতীত কর্মকা- পর্যালোচনা করলে যে কেউ বলতে পারবে, নির্বাচনকালীন সরকারের ইচ্ছাকে বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রয়াসী হওয়ার মত সাহস বর্তমান নির্বাচন কমিশন দেখাবে- আপাতত এর চেয়ে দুরাশা আর কি হতে পারে!
সংবিধানমতে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে কমিশনের যদি কিছু করার না থাকে, তাহলে অন্তত তফসিল ঘোষণার পরে নির্বাহী প্রতিষ্ঠানের ওপরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা অর্জন করতে পারে। সরকারের মন্ত্রীরা সরকারি কাজে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন, এটি মেনে নিয়ে কমিশন পূর্বতনদের নজির অব্যাহত রাখছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে এটিই সবচেয়ে বড় অন্তরায়। রাজনৈতিক সমঝোতার ব্যাপারে যেহেতু ইসি’র কিছু করণীয় নেই, অনুকূল পরিবেশ ও বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টিতে তারা অন্তত নির্বাহী বিভাগের লাগামটি টেনে ধরতে পারে।
কিন্তু অতীতের মতো বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে হয় না। ইতিপূর্বে সিইসি আজিজ কমিশন, রকিব কমিশনের সাথে দৃশ্যত বর্তমানটিও একাকার হয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গেলো নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহতা, দুর্বলতা, মেরুদ-হীনতা ও পরাধীনতার যে নজির রেখে গিয়েছিল সেটি অব্যাহত থাকছে। ফলে ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটালে, মেরুদ- সোজা করে না দাঁড়ালে জনগণের আস্থা-বিশ্বাস সহসাই ফেরানো যাবে না।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স প্রকাশিত “বাংলাদেশের শাসন পরিস্থিতি ২০১৪-১৫” সংক্রান্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল কেউ সংবিধান লংঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। কিন্তু অকার্যকর নেতৃত্ব ও নির্বাহী বিভাগের চাপে কার্যত এমন ব্যবস্থা নেয়ার কোনো নজির নির্বাচন কমিশনের নেই। ফলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন বহুদূরের লক্ষ্য হিসেবে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর প্রভাব খাটানো, অনাস্থা ও বর্জন কমিশনকে বিতর্কের মধ্যে ঠেলে দেয়।
ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন
যেসব দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়নি, সেসব দেশে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা আবিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশেও ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ওপর অনাস্থা ও নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ হলে সেখানে বিরোধীরা ভোটে কাক্সিক্ষত ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে। ফলে বিরোধী দলগুলো আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে ভোটে যেতে আগ্রহ হারায়। ২০০৮ সালের  ২৯ ডিসেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই নির্বাচনে ভোটে কারচুপির অভিযোগ থাকলেও ওই কমিশন তার পরের দুই কমিশন থেকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও নিজেদের মতো করে পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী কাজী রকিব উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছিল মেরুদ-হীন নির্বাচন কমিশন। তারা সরকারের ইচ্ছার বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মতো একটি বাজে উদাহরণ তৈরি করেছিল রকিব কমিশন। যে নির্বাচনে ১৫৩ জনকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা দেয় রকিব কমিশন। সাধারণ মানুষ কীভাবে সেই ভোট বর্জন করেছিল তার একটি নজির হচ্ছে ৪৭টি ভোট কেন্দ্রে একজন ভোটারও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে এরশাদ তার মনোনয়পত্র প্রত্যাহার করে নেয়ার পরও তাকে নির্বাচিত ঘোষণা দেয় রকিব কমিশন। এই বাজে নজিরের কারণেই সরকারের আজ্ঞাবহ কমিশনের ওপর সাধারণ ভোটার ও বিরোধী দলগুলো কোনো আস্থা রাখতে পারছে না। বর্তমান সিইসির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলো রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও এনেছে। তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণিত। কেউ কেউ বলছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার না হলে তিনি এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইতেন। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ আসার পর সাধারণ ভোটাররা তার ওপর আরও আস্থা হারিয়েছেন। এছাড়া সিইসি হওয়ার পর তার এ যাবৎকালের কর্মকান্ড অধিকাংশই চরমভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম নুরুল হুদা দেশের ১২তম প্রধান নির্বাচন কমিশনার।  তিনি ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নির্বাচন কমিশনের ইতিহাস টানলে দেখা যায়, ১৯৭২-৭৭ পর্যন্ত দেশের প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি এম ইদ্রিস।  
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম। তিনি ১৯৭৭ সালের ৮ জুলাই দায়িত্ব নেন। অব্যাহতি নেন ১৯৮৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি।  আট বছর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিচারপতি চৌধুরী এটিএম মাসুদ দায়িত্ব নেন ১৯৮৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি পূর্ণ পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করেন ১৯৯০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। এরশাদের আমলে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এই কমিশনের অধীনে।  
১৯৯০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সিইসি’র দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। তবে মাত্র দশ মাস দায়িত্ব পালন করেন। ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বিচারপতি সুলতান হোসেন খানের পর বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ সিইসি হিসেবে নিযুক্ত হন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করে তার কমিশন। তিনি ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের সময় মাগুরা জেলায় একটি বিতর্কিত উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে মেয়াদ শেষ হওয়ার আট মাস আগেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন সেই সময়ের প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আব্দুর রউফ।  
বিচারপতি একেএম সাদেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিযুক্ত হন ১৯৯৫ সালের ২৭ এপ্রিল।  তার কমিশনের অধীনেই হয় ১৯৯৬ সালের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। তার মেয়াদ ছিল ১৯৯৬ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত।  ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সাবেক আমলা মোহাম্মদ আবু হেনা ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল সিইসি’র দায়িত্ব নেন। এই প্রথম কোনো আমলাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়। তাঁর অধীনে ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি ২০০০ সালের ৮ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।  
অষ্টম সিইসি হিসেবে এমএ সায়ীদ দায়িত্ব নেন ২০০০ সালের ২৩ মে।  তিনি ২০০৫ সালের ২২ মে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।  অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তাঁর কমিশনের অধীনে। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত কমিশন আজিজ কমিশন। বিচারপতি এমএ আজিজ ২০০৫ সালের ২২ মে সিইসি’র দায়িত্ব নেন। ব্যাপক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সময় ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফখরুদ্দীন আহমদ তফসিল বাতিল করেন। ২১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন এম এ আজিজ।  
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এমএ আজিজের উত্তরসূরী হন এটিএম শামসুল হুদা। তাঁর কমিশন ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করে। তাঁর মেয়াদ ছিল ২০০৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সিইসির দায়িত্ব নেয় কাজী রকিব উদ্দিন আহমদ। সাবেক এই সচিবকে নিয়োগ দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের ওই মেয়াদেই সংসদে বাতিল হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই এই কমিশন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরিচালনা করে, যেখানে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। দেশে নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ আর নির্বাচন কমিশনকে বির্তকের মুখে ফেলে অবশেষে ৫ বছর মেয়াদ শেষ হবার পর ২০১৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান রকিব।  ৫ বছরের এই কমিশন চরমভাবে সমালোচিত হয়েছে দেশে বিদেশে। মেয়াদকালে এ কমিশন যতগুলো নির্বাচনের আয়োজন করেছে, বেশিরভাগই পড়েছে প্রশ্নের মুখে। দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে জন্ম দিয়েছে নানা সমালোচনা ও সংশয়ের।
ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে হওয়া দশম এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়ে বলে দাবি করে কাজী রকিব উদ্দিন কমিশন। তবে নির্বাচন কমিশনের সেই হিসাব, দেশ-বিদেশের কোনো মহলই বিশ্বাস করতে পারেনি। বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করায় বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ওই নির্বাচন বর্জন করেন। তবে কমিশন কোনো সমালোচনাকে পাত্তা দেয়নি। বরং নির্লজ্জভাবে সাংবাদিকদের কাজী রকিব উদ্দিন বলেন, “৯৮ শতাংশই শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। কোনোরকম সহিংসতা হয়নি।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, সব ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। কিন্তু নির্বিঘেœ ভোটাধিকার প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই ভোটের সময় একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের জন্য আন্দোলন করে আসছে। একইসঙ্গে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, দক্ষ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। বিএনপির ভাষায়, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ। এদের অধীনে কখনোই নিরপেক্ষ ভোট সম্ভব নয়। এরা ঠুঁটো জগন্নাথ। বিরোধীদের এই দাবি যে পুরোপুরিই সত্য, ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে তা একেবারেই স্পষ্ট হয়েছে। ওইসব নির্বাচনের বেশিরভাগই প্রশ্নবিদ্ধ ছিলো। ফলাফলে ছিলো ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন। 
তবে কমিশনকে আস্থায় আসতে হলে বিরোধী দলগুলোর ন্যায়সংগত দাবির সঙ্গে একমত হয়ে তা মানতে হবে। সরকারের ইচ্ছামতো কোনো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল করা ও ইচ্ছার আলোকে কাউকে নিবন্ধন দেয়া ইসির কাজ নয়। ইসিকে কাজের মাধ্যমেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরি করার দায়িত্ব ইসিরই। বর্তমান প্রশাসন যে ব্যাপকভাবে দলীয়করণ হয়ে আছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে প্রশাসন নিরপেক্ষ করা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনকালে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে দায়িত্ব দিতে ইসির আপত্তি থাকার কথা নয়। এর নজির ইতোপূর্বে ছিল। বরং সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে থাকার সুযোগ দিলে নির্বাচনের সময় সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটবে না। ভোটাররা তো এর বিপক্ষে নেই। তারা সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে চায়। নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশ করে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চায়। এই নিশ্চয়তা দেয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ১২ নভেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)