মঙ্গলবার, ১৬-অক্টোবর ২০১৮, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-সংশয়

Shershanews24.com

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১২:১০ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছে। যদিও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে নির্বাচনের ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- কেউ নির্বাচন ঠেকাতে পারবে না। বর্তমান সরকারের অধীনেই সংবিধান অনুযায়ী যথা সময়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। নির্বাচনকালীন মন্ত্রিপরিষদ ছোট করার ও সংযোজন-বিয়োজনের আভাস দেয়া হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন আদৌ হবে কি না- এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় আছে। এর পেছনে নানা কারণও আছে। সরকারের পক্ষ থেকে যদিও জোর দিয়ে বলা হচ্ছে- ‘নির্বাচন ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই। উত্তরপাড়া থেকে এখন আর কেউ আসবে না। উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই।’
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের অধীনে ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে যায়নি বিএনপি-জামায়াতসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। একতরফা নির্বাচন বর্জন করেছিল তারা। এমন নির্বাচন হলে এবারও সেই নির্বাচনে যাবে না ক্ষমতার সুবিধাভোগী নয়, এমন রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে এক তরফা নির্বাচন ঠেকাতে সংবিধান প্রণেতা ডা. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যমঞ্চ তৈরি হয়েছে। তারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা আদায় ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন। এমন পরিবেশ নিশ্চিত না করে কোনো নির্বাচন করার চেষ্টা বন্ধ করার আল্টিমেটামও দেয়া হয়েছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যমঞ্চ থেকে। ড. কামালের আহ্বানে ২২ সেপ্টেম্বরের এই ঐক্যমঞ্চে বিএনপিসহ দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। যা আগে কখনো দেখা যায়নি। এরশাদের সময় বৃহৎ দুটি জোট হয়েছিল। এর বাইরে জামায়াত ও জাতীয় পার্টি ছিল। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ ও সরকারের ক্ষমতার সুবিধাভোগী ছাড়া সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং একমঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও জড়িত থাকার গুঞ্জন আছে। এমনকি বিভিন্ন এনজিও, বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ীরাও ডা. কামালের সঙ্গে আছেন বলে জানা যাচ্ছে। যা সরকারের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে শেখ হাসিনার অধীনে এ দেশে আর কোনো নির্বাচন হবে না, হতে দেয়া হবে না। কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কারাগারে আদালত বসিয়ে বিচার ও চিকিৎসার নামে তেলেসমাতি চলছে বলেও দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। 
গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা ৫ দফা দাবি দিয়েছেন। কিন্তু এর কোনোটিই মানতে রাজি নয় আওয়ামী লীগ সরকার। এর আগে ড. কামাল বলেছেন, ‘নির্বাচন নাও হতে পারে। নির্বাচনের পরিবেশ নেই।’ অপরদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রার্থী হতে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন থাকার বাধ্যবাধকতা ইস্যুতে আদালতে একটি রিট আবেদন হয় ২০১৪ সালে, যা আজও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই রিটের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা না করতে নির্দেশনা চেয়ে এরই মধ্যে উচ্চ আদালতে নতুন আরেকটি রিট আবেদন করা হয়েছে। এসব কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ, সংশয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে নির্বাচন নিয়ে। অনেকের মুখেই প্রশ্ন আদৌ নির্বাচন হবে তো? 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকারে উপদেষ্টা নিয়োগে আইনগত কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দিবে না। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কোনো দাবিও ক্ষমতাসীনরা মানবে না বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। 
নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের গুরুত্বপূর্ণ আরও ৩টি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। একটি হচ্ছে, দেশে মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মির্জা ফখরুলের আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পেছনে বড় একটি শক্তি এবং সবশেষ কারণ হলো, এসকে সিনহার ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’। 
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের সঙ্গে যে বৈঠক করে এসেছেন তা সরকারের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। আর বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ঠেকাতে সব ধরনের প্রচেষ্টা করেও তা বন্ধ করতে পারেনি সরকার। বাধ্য হয়ে সরকার বর্তমানে জাতীয় ঐক্য ইস্যুতে নমনীয় নীতি অনুসরণ করছে। যদিও বিরোধী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘গায়েবি’ মামলা ও গণগ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। তবে সরকারের জন্য এ মুহূর্তে অন্যতম গাত্রদাহ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার আত্মজীবনীমূলক বই (এ ব্রোকেন ড্রিম) প্রকাশ। সরকারের সঙ্গে তার বিরোধের নেপথ্যের কারণ, তাকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা, সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে নানামুখী চাপ দিয়ে দেশ ত্যাগ করানো এবং অসুস্থ সাজানোর পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে খোলামেলা লিখেছেন এসকে সিনহা তার বইয়ে। যা নতুন করে জাতীয় ও রাজনৈতিক আলোচনার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’ এখন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও বেশ আলোচিত হচ্ছে। ফলে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপের প্রশ্ন ও বিতর্ক ফের সামনে এসেছে। তাছাড়া, সদ্য সমাপ্ত সংসদ অধিবেশনে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সড়ক পরিবহন আইনসহ রেকর্ড সংখ্যক বিল পাস হয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে ও সরকারের শেষ সময়ে এসে এমন কর্মকা- ক্ষমতাসীনদের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আর নির্বাচনের আগে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে বলেই বিশ^াস অভিজ্ঞ মহলের। কিন্তু সরকারের এসব নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ফলে নির্বাচনে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে আশাঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য মঞ্চের আল্টিমেটাম
গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের ‘জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার’ সমাবেশ থেকে পূর্ব ঘোষিত ৫ দফা দাবি আদায়ে সরকারকে আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারসহ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ৫ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে সময় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দাবি আদায় না হলে আগামী ১ অক্টোবর থেকে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা। গত ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মহানগর নাট্যমঞ্চ থেকে এ আল্টিমেটাম ঘোষণা করা হয়। 
এদিন বেলা সাড়ে ৩টায় সমাবেশ শুরু হয়। এতে সূচনা বক্তব্য দেন ড. কামাল। তিনি বলেন, কার্যকর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই তাদের এই বৃহৎ ঐক্য। ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল সূচনা বক্তব্যে মানুষের ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন সমাবেশ থেকে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ ২০ দলের নেতারা এই সমাবেশে যোগ দেন। যাকে নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে কানাঘুষা এবং সংশয় ছিল সেই বি চৌধুরীও ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ৯টি লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে জাতীয় ঐক্য-প্রক্রিয়া। জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব দফা ও লক্ষ্য পাঠ করেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। জাতীয় ঐক্যের ঘোষিত ৫ দফা হলো- ১. আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে বর্তমান সংসদ ভেঙে দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ২. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। ৩.  সব রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারসহ গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে। ৪. নির্বাচনের একমাস আগে থেকে নির্বাচনের পর ১০ দিন পর্যন্ত মোট ৪০ দিন প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ৫. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের চিন্তা বাদ দিতে হবে। এই কর্মসূচি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঘোষণা করার কথা থাকলেও প্রশাসনের বাধার কারণে তা করা যায়নি। একইভাবে গণফোরামের ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে করা হবে ঘোষণা দেয়া হলেও অনুমতি না পাওয়ায় নাট্যমঞ্চে করতে হয়েছে। 
ফখরুলের যুক্তরাষ্ট্র সফর, সরকারে অস্বস্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও লন্ডনে ৫ দিনের সফর শেষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে’ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে নিউইয়র্ক যান বিএনপি মহাসচিব। এ সফরে তিনি জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব মেরোস্লাভ জেনকার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সাথেও বৈঠক হয়েছে তার। এসব বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন দেশের বর্তমান সরকারের ‘নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়নের তথ্য উপাত্ত’ উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে জাতিসংঘ ও ট্রাম্প প্রশাসনেরও করণীয় আছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান তিনি। এর পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে লন্ডনের উদ্দেশ্যে মির্জা ফখরুল ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন। লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। সূত্রমতে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ড. কামালের নেতৃত্বে যেকোনো বড় ছাড় দিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে অংশ নিতে মহাসচিবকে নির্দেশনা দেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি মহাসচিবের আকষ্মিক এ সফর রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যা অস্বস্তি ও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে ক্ষমতাসীনদের। 
খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা, চিকিৎসা নিয়ে তেলেসমাতি 
কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচার ও চিকিৎসার নামে তেলেসমাতি চলছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের শীর্ষনেতারা। বেগম জিয়ার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হচ্ছে উল্লেখ করে দলটির নেতারা বলেছেন, সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকদের দিয়ে তার সঠিক চিকিৎসা হবে না। এই কমিটির ৩ জন সদস্য আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। যে কারণে মেডিকেল বোর্ডের বক্তব্য সরকারের মন্ত্রীদের কথার সাথে মিলে যাচ্ছে। এমনকি বেগম জিয়ার জীবন নিয়েও শঙ্কিত বিএনপি নেতারা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ না দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের চিকিৎসকদের দিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠনকে দুরভিসন্ধিমূলক বলে মনে করেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। 
এর আগে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। সেখানে তারা বেগম জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। পরে বিএসএমএমইউ পরিচালক বলেছেন, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ভালো আছে। নতুন করে তিনি কোনো রোগে আক্রান্ত হননি। এই বোর্ডে আরও ছিলেন- কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তারেক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। গত ১৬ সেপ্টেম্বর বিএসএমএমইউ পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুনের হাতে এ প্রতিবেদন তুলে দেন মেডিকেল বোর্ডের প্রধান মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক এম এ জলিল। মেডিকেল বোর্ডের দেয়া ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খালেদা জিয়ার বাম হাতের সমস্যাসহ (বিকলাঙ্গতা) রিউমাটয়েড আর্থরাইটিস (বাতজনিত সমস্যা), সার্ভাইকাল স্পন্ডিলোসিস, লাম্বার স্পন্ডিলোসিস, বাম কোমরের অস্থিসন্ধিতে অস্ট্রিয়আর্থরাইটিস, অস্ট্রিয়পরিসিস, সিনাইল ট্রেমর, এলার্জি জনিত সমস্যার কারণে চোখ শুকিয়ে যাওয়ার লক্ষণ রয়েছে। এছাড়া তার ২ হাঁটুই প্রতিস্থাপিত। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে দেখা করে খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী রাজধানীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানায়। এরপর মেডিকেল বোর্ড গঠিত হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। 
এদিকে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে কারাগারে বিশেষ আদালতে তার বিচার কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে বলে আদেশ দিয়েছেন আদালত। বিএনপি বলছে, এ ধরনের আদালতে বিচার কাজ চালানো বেআইনি ও অবৈধ। এমন আদালতের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংবিধান প্রণেতা ও দেশের প্রধান আইনবিদ ড. কামাল হোসেন। তবে গত ২০ সেপ্টেম্বর কারাগারে স্থানান্তরিত আদালত বলেছেন, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিচারকাজ চলবে। কিন্তু, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচার বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব। গত ২১ সেপ্টেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আদালতের এ আদেশ জনগণ মেনে নিতে পারছে না। এ আদেশ পরিবর্তন হওয়া জরুরি। আমরা আবারও দাবি জানাচ্ছি, খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতলে চিকিৎসা দেওয়া হোক।’ 
অপরদিকে, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কাভার্ডভ্যান পোড়ানোর মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। ১৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ কেএম সামছুল আলম ওই আদেশ দেন। 
সুশীল সমাজ যা বলছে
জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা রয়ে গেছে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের জন্য রাজনীতি করেন। যদি সত্যিকার অর্থেই তারা মানুষের কল্যাণে রাজনীতি করেন, তাহলে তারা জনগণকে বিপদে ফেলবেন কেন?’ আর সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এবার সবার দাবি হওয়া উচিৎ একটাই, ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার’। অপরদিকে সুজন সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা হাফিজ উদ্দিন আহমদ মনে করেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনে এ মুহূর্তে জনগণের আন্দোলনে নামা উচিৎ। সেই সাথে ইভিএম সংযুক্ত করে আরপিও সংশোধনের সমালোচনা করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলেছেন, আইনকে অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ড. কামালের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে সুশীল সমাজ সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সব মিটিংয়ে উপস্থিত থাকছেন। অন্যরা এক মঞ্চে উপস্থিত না হলেও তাদের এতে সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বরের সমাবেশে যোগ দিয়েছেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন। শিগগিরই আরো অনেকে সরাসরি যুক্ত হবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে দাবি করা হয়েছে। 
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ প্রকাশিত)