মঙ্গলবার, ১৩-নভেম্বর ২০১৮, ০১:৪০ পূর্বাহ্ন

পরীক্ষায় ‘ফেল’ ইসি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট, ২০১৮ ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি নির্বাচন ছিল নুরুল হুদা কমিশনের জন্য জাতীয় নির্বাচনের আগে শেষ পরীক্ষা। এই নির্বাচনের সাথে কমিশনের সম্পর্ক ছিল পাস-ফেলের। সেই পরীক্ষায় নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পূর্ণরূপে ‘ফেল করেছে’ বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, সঙ্গত কারণেই কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংশয় ও অনিশ্চয়তা আরও বাড়লো। 
নির্বাচনের দিন সিলেট সিটিতে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও সেই ভোটও বাতিল চেয়েছেন বিজয়ী হতে যাওয়া আরিফুল হক চৌধুরীসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। সেই সাথে ব্যাপক কারচুপি হওয়া বরিশাল ও রাজশাহী সিটিতে নতুন করে ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছে বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। বরিশাল সিটি করপোরেশনে একজন মেয়র প্রার্থী ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। ইভিএমে ছিল না নৌকা ছাড়া অন্য মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক। সেই সাথে তিন সিটিতেই ভোটকেন্দ্র দখলের মহোৎসব দেখেছেন সংশ্লিষ্ট নগরবাসী। খুলনা ও গাজীপুরের ন্যায় এই তিন সিটির ভোটের বাস্তব অবস্থাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। অথচ ইসির নির্লিপ্ততা শেষবারের মতো প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ইসির ভূমিকা। কিন্তু বরিশালের ভোটে অনিয়মের কথা আংশিক স্বীকার করলেও সার্বিক নির্বাচন নিয়ে নিজেদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন সিইসি। যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের লাগামহীন অনিয়ম, কেন্দ্র দখল ও জালভোট প্রতিরোধ ইসির ব্যর্থতা, এমনকি প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এই কমিশন নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে বলে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করছেন। 
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা ও আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য অর্থাৎ সব দলের অংশগ্রহণমূলক করতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিকল্প নেই। তা না হলে জাতীয় জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আশার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট, গণফোরামসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠনের দাবি তুলেছেন।
কেমন ভোট হলো তিন সিটিতে?
কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া, সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত ও কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া, কেন্দ্র দখলে প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগের সহযোগীর ভূমিকা পালন করা, মেয়র প্রার্থীর ব্যালট ছাড়া শুধু কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যালট সরবরাহ, মেয়র প্রার্থীর ব্যালটে আগে থেকেই নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ভর্তি, ব্যালট পেপার বাহিরে নিয়ে সিল মেরে বুথে এনে বাক্সে ঢুকানো- এসবের কিছুই বাদ যায়নি তিন সিটির নির্বাচনে। সেই সাথে বরিশালে ইভিএমে শুধু নৌকা প্রতীক থাকা এবং একজন মেয়র প্রার্থীকে মারধরের ঘটনায় ইসির নিশ্চুপ থাকায় নানা প্রশ্ন দেখা হয়েছে। বিশেষ করে বরিশালে প্রায় সব কেন্দ্র দখল ও ব্যাপক কারচুপির প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন দলের মেয়র প্রার্থী ছাড়া সব প্রার্থী ভোট বর্জন করলেও সেটিকে ‘ভালো ভোট’ দাবি করায় নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন সিইসি। এমন অভিযোগ রাজনৈতিক দলগুলোর। 
রাজশাহীতে আ.লীগের সহযোগিতায় প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিশ : রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বেশিরভাগ কেন্দ্র ভোট শুরুর আগে থেকেই অবরুদ্ধ করে রাখে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। ওই কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পোলিং এজেন্টসহ অন্য দলের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের। পুলিশের সহযোগিতায় তাদের চড়-থাপ্পড় মেরে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি এলাকার পরিচিত জামায়াত ও বিএনপির ভোটারদের। সাধারণ ভোটাররা কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও প্রকাশ্যে নৌকায় সিল দিতে বাধ্য করা হয়েছে অনেকক্ষেত্রে। সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। 
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকা সমর্থকদের ১০ থেকে ১৫ জনের একেকটি গ্রুপ ব্যালট পেপার বাইরে নিয়ে সিল মেরে আবার ভেতরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ব্যালট আনা-নেয়া হয়েছে পুলিশের সামনেই। এ ব্যাপারে এক কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আবদুল্লাহিল শাফি বলেন, “বুথের ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়া যাবে না। ওপর থেকে নিষেধ আছে।” কার অনুমতি লাগবে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা বলেন, “তা আমি বলতে পারব না।” একইভাবে ওই কেন্দ্রের পাশের শাহারা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভেতরেও সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেননি প্রিজাইডিং অফিসার রঞ্জিত কুমার। এছাড়া ডাশমারী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। 
এদিকে, ৩০ জুলাই ভোটের দিন সকাল সাড়ে ১০টায় বুধপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের প্রধান গেটে তালা দেয়া। ভেতরে কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভেতরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থী আলাল তার বাহিনী নিয়ে প্রবেশ করেছেন। এর পর পুলিশ কেন্দ্রের প্রধান গেটে তালা দিয়ে রাখে। আধঘণ্টা পরে ভোটারদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব এসে আলাল ও তার বাহিনীকে বের করে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের দু’টি বুথে বিএনপির প্রার্থীর পোলিং এজেন্টকে জিম্মি করে ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকায় সিল মারতে থাকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় অন্য বুথে থাকা এজেন্টরা এসে এর প্রতিবাদ জানালে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ব্যালটে একতরফা সিল মারে। এমন চিত্র ছিল রাজশাহীর বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্রেই।
বরিশালে ইভিএমে শুধু নৌকা : অদ্ভূত কা- ঘটেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। অধিকাংশ কেন্দ্রেই মেয়র প্রার্থীর ব্যালট শেষ হয়ে যায় নির্ধারিত সময়ের আগেই। ২৭নং ওয়ার্ডের কলাডেমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসে ব্যালট ছিনতাই করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ভর্তি করে। এসময় নৌকার এজেন্টরাও নৌকায় সিল মারতে থাকেন। কর্তব্যরত সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “মেয়র প্রার্থীর ব্যালট শেষ। আওয়ামী লীগের লোকজন এসে সব নিয়ে গেছে।”
এদিকে, ২০নং ওয়ার্ডের সরকারি বরিশাল বিএম কলেজ কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ চলে। কিন্তু ডিসপ্লেতে নৌকা প্রতীক ছাড়া অন্য প্রতীক দেখা যায়নি। একই সমস্যা ছিল ১২নং ওয়ার্ডের ৫০নং কিশোর মজলিস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও। সেখানে ইভিএমে ত্রুটি দেখা দিলে ম্যানুয়ালি ভোট হয়। কিন্তু একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নগর সভাপতি জসীম উদ্দিনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ব্যালট ছিনতাই করে প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারে। ফলে শেষ হয়ে যায় মেয়র প্রার্থীর ব্যালট বই। 
ভোটের দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বরিশাল সরকারি মহাবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে বাসদের মেয়র প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার শিকার হন। মনীষা অভিযোগ করেন, ওই কেন্দ্রে তিনি গিয়ে দেখতে পান- নৌকা মার্কার পক্ষে জালভোট দেয়া হচ্ছে। নৌকা মার্কায় আগে থেকেই সিলমারা ব্যালট পেপার দেখতে পান তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে এর প্রতিবাদ করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের পোলিং এজেন্টরা তার ওপর চড়াও হয়। তাকে মারধর করে মেঝেতে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় মনীষা বাঁ হাতে আঘাত পান। 
বরিশাল সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ছয়জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নানা অনিয়মের কারণে ৫ জনই নির্বাচন বর্জন করে পুনরায় ভোটের আবেদন করেছেন। তারা হলেন- বিএনপির মো. মজিবর রহমান সরোয়ার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ওবায়দুর রহমান মাহবুব (হাতপাখা), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির আবুল কালাম আজাদ (কাস্তে), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মনীষা চক্রবর্তী (মই) ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোঃ ইকবাল হোসেন (লাঙ্গল)। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ (নৌকা) নিজেকে বিজয়ী দাবি করছেন। 
সিলেটে পুনর্র্নির্বাচন চেয়েছেন আরিফ : অনিয়মের ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচন চেয়েছেন সিলেটে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। ৩০ জুলাই দুপুরে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে জালভোট, কেন্দ্র দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের সামনেই কেন্দ্র দখল, ককটেল বিস্ফোরণ, কারচুপির ঘটনা ঘটছে, যা পুণ্যভূমি সিলেটকে কলঙ্কিত করেছে। তিনি বলেন, “এ ধরনের নির্বাচনে আমি বিজয়ী হলেও সেটি সুষ্ঠু বলে গ্রহণযোগ্য হবে না।” 
উল্লেখ্য, অনিয়মের কারণে সিলেটের দুই কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। ১৩২টি কেন্দ্রের মধ্যে বিএনপি (ধানের শীষ) মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ৯০ হাজার ৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। বিএনপি প্রার্থী ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। আর ওই দুই কেন্দ্রে ভোটার ৪ হাজার ৭৮৭ জন। অন্য কেন্দ্রগুলোর ভোট পড়ার আনুপাতিক হিসেবে বিএনপির প্রার্থীই জয়ী হবেন। তবে আনুষ্ঠানিকতার জন্য ওই দু’টি কেন্দ্রে আগামী ১১ আগস্ট ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ওই দুই কেন্দ্র হলো- ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের গাজী বোরহান উদ্দিন গরম দেয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১১৬) ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৩৪)। গত ১ আগস্ট ইসি এ তথ্য জানিয়েছে। 
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট সিইসি
বরিশাল সিটি করপোরেশনের ১৬টি কেন্দ্র ব্যতীত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নুরুল হুদা। তিনি বলেছেন, “সব মিলিয়ে নির্বাচন ভালো হয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট।” গত ৩০ জুলাই সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিইসি এসব কথা বলেন। নুরুল হুদা বলেন, “রাজশাহী সিটি নির্বাচনে ১৩৮টি কেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। সিলেটে ১৩৪টি কেন্দ্রের মধ্যে দু’টি কেন্দ্র ব্যতীত বাকি কেন্দ্রসমূহে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। বরিশালের ১২৩ কেন্দ্রের মধ্যে সকালের দিকে কিছু বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। আমরা বিস্তারিত তথ্য নিয়েছি। এই বিষয়ে একটি কেন্দ্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ১৫টি কেন্দ্রে অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় ওই কেন্দ্রগুলোর ফলাফল স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তী সময়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।” বরিশালে পাঁচ প্রার্থীর ভোট বর্জন প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, “এটা তো তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমরা ১৫টি কেন্দ্রের ভোটের ফলাফল স্থগিত করেছি। অন্যগুলোতে আমরা অনিয়মের ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে তথ্য পাইনি।” বরিশালের ভোট বর্জন করা প্রার্থীরা পুনরায় ভোট গ্রহণের লিখিত আবেদন জমা দিয়েছে নির্বাচন কমিশনে। এ ব্যাপারে সিইসি বলেন, “পুনরায় ভোটগ্রহণ করার মতো অবস্থা সেখানে পাইনি।” এক মেয়র প্রার্থীর ওপর হামলা ঠেকাতে না পারা কমিশনের ব্যর্থতা কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, “আক্রমণ হয়েছে কি না- সেটা আমরা তদন্ত করব। আর তিনি চাইলে কোর্টের আশ্রয় নিতে পারেন।”
তিন সিটির ফল নিয়ে নানা সমীকরণ
রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। এ নিয়ে চলছে বিচার-বিশ্লেষণ। রাজশাহী ও বরিশাল সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দুই মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে হেসে-খেলে জয় পেলেও সিলেটের চিত্রটা ভিন্ন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের লড়াই হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি। অনিয়ম-কারচুপি এবং নৌকা নিয়েও কেন কামরানের এই দশা, সেই আলোচনা এখন সিলেটের গন্ডি পেরিয়ে সারা দেশে। 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কামরান সজ্জন এবং সদালাপী হলেও দলীয় কোন্দল ও ভোটারদের সঙ্গে তার দূরত্বকেই মোটাদাগে দেখা হচ্ছে। তাছাড়া আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, প্রশাসন তাকে ব্যাপক কারচুপিতে সেইভাবে সহযোগিতা করেনি। আর এর ফলে খুলনা, গাজীপুর, বরিশাল ও রাজশাহীর ন্যায় এক চেটিয়া কেন্দ্র দখলে সফল হননি। অবশ্য সংখ্যালঘুদের সঙ্গেও কামরানের সম্পর্ক ভালো না থাকায় বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন আরিফুল হক। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কোনো সফলতা নেই বলেই মত সবার।
জানা গেছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কামরানের সঙ্গে থাকলেও ভেতরে ভেতরে বিরোধিতাই করেছেন। নির্বাচন ঘিরে বেশ কয়েক দিন শহরে অবস্থান করেও সেই কোন্দল মেটাতে পারেননি দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন। শুধু তা-ই নয়, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অনুসারীরা কামরানের পক্ষে ছিলেন না। ভোটের দিন অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে কামরানের ভোট কমেছে বলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের দাবি। উল্লেখ্য, ভোট দিয়ে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, “আরিফ ও কামরান দু’জনই ভালো প্রার্থী।” এ ছাড়া তিনি একজন হিন্দু কাউন্সিলর প্রার্থীকে ‘গুন্ডি’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, “ওই গুন্ডিটা যেন জিততে না পারে।” সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওই নারী কাউন্সিলর প্রার্থীর বিপক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলায় নারী এবং হিন্দুদের ভোটেও প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন সিলেটের অনেকে।
অপরদিকে, সিলেট সিটি নির্বাচনে দু’টি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে সনাতন ধর্ম ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভোট। অনেক আগে থেকেই কামরানের সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে এখানকার সংখ্যালঘুু ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষের। ধারণা করা হচ্ছে, লক্ষাধিক সনাতন ও মণিপুরির ভোট থেকে বঞ্চিত হয়েছেন কামরান। আবার এমনটাও শোনা যাচ্ছে যে, জামায়াত সিলেটে মেয়র প্রার্থী দিলেও ভেতরে ভেতরে তারা আরিফুল হককেই ভোট দিয়েছেন। মূলত আওয়ামী লীগকে শক্ত হাতে প্রতিহত করার কৌশল হিসেবেই বিএনপির পাশাপাশি জামায়াত সিলেটে মেয়র প্রার্থী দেয়। 
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, “নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, এখানে (তিন সিটি) তার কিছুই হয়নি। এটাকে বলে তামাশার নির্বাচন। দেশে স্বাভাবিক নির্বাচনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আমূল পরিবর্তন দরকার।” সিলেটে বিএনপি প্রার্থীর জয়লাভ প্রসঙ্গে দুদু বলেন, “এখানেও আওয়ামী লীগ ভোট ডাকাতি করতে করতে জনগণের সাথে আর পেরে ওঠেনি।”
তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের দাবি, সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, “আমরা ৪টিতে জিতেছি। তারা (বিএনপি) জিতেছে একটিতে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৯০ ভাগ আমরা জয় করেছি।” সিলেটে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন উল্লেখ করে সেতুমন্ত্রী বলেন, “আমি বলেছিলাম ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের জয় নিশ্চিত। সিলেটকে আমরা হার মনে করছি না, কারণ আমরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিলাম।”
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, “এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। কোনো মানেরই হয়নি।” সুজন সম্পাদক মনে করেন, “এ অবস্থায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না। এই নির্বাচন কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আমার মনে হয় না।”
জাতীয় নির্বাচনে ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন 
বিশ্লেষকরা খুলনা, গাজীপুরের পর তিন সিটির নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, তিন সিটিতেই ভোট কারচুপি হয়েছে। গণমাধ্যমে তা স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে আগামীতে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়। ফাইনাল পরীক্ষায়ও নির্বাচন কমিশন ফেল করেছে। দেশে ভবিষ্যতে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা মনে করছেন, নির্বাচন যে সুষ্ঠু হচ্ছে না, এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে চাইছে। সিলেট নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর জয়ও সেই পরিকল্পনার অংশ। ইসি পুরোপুরি লোক দেখানো কাজ করছে। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই নির্বাচন কমিশন ‘অনিয়মের ধারাবাহিকতাই’ বজায় রাখবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ তাসলিমা সুলতানা। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “ক্ষমতাসীন দল যদি এই নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে না দেয়, তাহলে মনে হয় না আমরা জাতীয় নির্বাচনে এর কোনো ব্যত্যয় দেখবো।” 
এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “এত আগে কিছু বলা যাবে না। যাব কিনা এটা তো এখন বলতে পারছি না। এটা নির্ভর করছে নির্বাচন আদৌ হবে কি না আর নির্বাচন কীভাবে পরিচালিত হবে সেটার ওপর। তবে এটা স্পষ্ট করে বলতে পারি যে, নির্বাচন কমিশনকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।”
নির্বাচন পর্যবেক্ষক শারমিন মুর্শিদ মনে করেন, “আমাদের কোনো নির্বাচনই ত্রুটিমুক্ত হচ্ছে না। ত্রুটিগুলো যে জাতীয় পর্যায়ে হবে না, সেটা বলা যাচ্ছে না।” শারমিন মুর্শিদ বিবিসিকে বলেছেন, “নির্বাচনের মান মূলত নির্ভর করে ইসির দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। সেই জায়গাটাতেও ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন যতোই দক্ষ হোক না কেন, দিনশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নির্বাচনের মানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে।” 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ আগস্ট ২০১৮ প্রকাশিত)