মঙ্গলবার, ১৩-নভেম্বর ২০১৮, ০২:২১ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • মন্ত্রণালয়কে পাত্তা দিচ্ছে না প্রাণিসম্পদ অধিদফতর 

মন্ত্রণালয়কে পাত্তা দিচ্ছে না প্রাণিসম্পদ অধিদফতর 

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১৭ আগস্ট, ২০১৮ ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্যে: প্রাণিসম্পদ অধিদফতর পাত্তা দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়কে। সুনির্দিষ্ট একটি ঘটনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে অধিদফতরের ডিজি-কে বারবার চিঠি পাঠিয়েও জবাব মিলছে না। শুধু এটিই নয়, বরাবরই এমন আচরণ করছেন ডিজি। মন্ত্রণালয়কে অবজ্ঞা করে চললেও কখনই শাস্তি পেতে হয়নি উপপরিচালক হয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অতিরিক্ত ডিজির দায়িত্বে থাকা ডা. মো. আইনুল হককে। 
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পসহ নানা পন্থায় দর্নীতির মাধ্যমে ডিজির অবৈধ আয়ের ভাগ যায় মন্ত্রণালয়ে। ফলে লাগামহীন অপকর্ম করে এবং মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল আদেশ অমান্য করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। সর্বশেষ, পোল্ট্রি খাদ্য আমদানিসংক্রান্ত একটি অনিয়মের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তিন দফায় চিঠি দিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তারপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পশু ও পোল্ট্রি খাদ্য, পশুপুষ্টি উপকরণ এবং ভেটেরিনারি ওষুধ সামগ্রীসহ সংশ্লিষ্ট নানা উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করতে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের অনাপত্তি (এনওসি) সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের বর্তমান ডিজি রমরমা ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘুষের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে এনওসি সনদ। তাকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে আটকে যায় ছাড়পত্র। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানার পরও অভিযুক্ত ডিজির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এতে মন্ত্রণালয়ের সচিবের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 
এ সংক্রান্ত শীর্ষকাগজের কাছে থাকা কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, পশু ও পোল্ট্রি খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণ আমদানির অনুমোদন বা এনওসি সার্টিফিকেট পেতে গত বছর ২৩৮টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২০১৭ সালের ১০ আগস্ট ‘পশুপুষ্টি উপকরণ ও ভেটেরিনারি ঔষধ সামগ্রী আমদানির অনাপত্তি সনদ (এনওসি) প্রদান বিষয়ক কমিটি’র সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বর্তমান ডিজি ডা. মো. আইনুল হক সভাপতিত্ব করেন। তখন তিনি অধিদফতরের পরিচালক (প্রাণিস্বাস্থ্য ও প্রশাসন) এবং এ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ছিলেন। সভায় কমিটির ১০ সদস্যের সবাই উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় যাচাই-বাছাই শেষে ইসলাম এগ্রোভেট লিমিটেডের (২১৪ নম্বর) আবেদনপত্রসহ ১৫টি আবেদনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার ভিত্তিতে অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ৭টি প্রতিষ্ঠানকে আবেদনে উল্লেখিত পণ্যের আংশিক আমদানিতে অনাপত্তি সনদ বা এনওসি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। ৪১টি আবেদন অনাপত্তি (এনওসি) সনদ পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হয়। একই সাথে ইসলাম এগ্রোভেট লিমিটেডের ফিড মিল পরিদর্শন পূর্বক একটি রিপোর্ট প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ওই বৈঠকের রেজুলেশনে। পাশাপাশি আগের এনওসি সনদের মেয়াদ ১ বছর থাকলেও আইনুল হক ডিজির দায়িত্ব পাওয়ার পর গত বছরের ওই সভায় এই সনদের মেয়াদ ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত হয়। 
সূত্র বলছে, এ ক্ষেত্রে আইনুল হকের ইচ্ছার কারণেই সনদের মেয়াদ অর্ধেক করা হয়েছে। কারণ, প্রতিবার এনওসি সনদ দিতে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের সুযোগ পান ডিজি। এদিকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে কাগজপত্র দাখিলের ভিত্তিতে যে অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় সভায়; সেগুলোর ভেতর যারা ডিজির গোপন চাহিদার আলোকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েছে, তারাই চূড়ান্ত অনাপত্তি সনদ পেয়েছে। আর যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের সেই সনদ মেলেনি। এমনই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলাম এগ্রোভেট মিলিডেট’। প্রতিষ্ঠানটি পোল্ট্রি খাদ্য উপকরণ আমদানির জন্য ছাড়পত্র প্রদানের আবেদন করে। বৈঠকের রেজুলেশনে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলাম এগ্রোভেটের আবেদন অনুমোদনের ও মিল পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত হলে প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সব ধরনের কাগজপত্র জমা দেয়। কিন্তু অধিদফতর থেকে কিছুই জানানো হয়নি তাদেরকে। ফিডসিলটিও পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বারবার যোগাযোগ করার পরও।
অভিযোগ আছে, ডিজির দাবিকৃত ঘুষ পরিশোধে সম্মত না হওয়ায় ফাইলটি আটকে যায়। বারবার অধিদফতরে ঘোরাঘুরি করলেও ঘুষ ছাড়া কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে গত এপ্রিলের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হয়। এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়- ইসলাম এগ্রোভেটের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাদের পোল্ট্রি খাদ্য উপকরণ (শুকুর ব্যতিত) আমদানিতে অনাপত্তির বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে মতামত চেয়ে অধিদফতরের ডিজির কাছে চিঠি পাঠায়। চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ-২ অধিশাখার উপসচিব নিগার সুলতানা এই চিঠি পাঠান। 
এতে বলা হয়, “সূত্র: ইসলাম এগ্রোভেট লিমিটেডের পত্র নং আইএসএল/প্রাণিসম্পদ/২০১৮/১১০ তারিখ-০৪/০৪/২০১৮। সূত্রস্থ স্মারকে ইসলাম এগ্রোভেট লিমিটেড থেকে প্রাপ্ত আবেদনপত্র সংযুক্তিসহ এর ছায়ালিপি এতদসঙ্গে যুক্ত করে প্রেরণ করা হলো। উক্ত আবেদনপত্রে বর্ণিত বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে মতামত প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।” সেই সাথে ৮ পাতার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করা হয়। এই পত্রের শিরোনাম অর্থাৎ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ‘পোল্ট্রি খাদ্য উপকরণ (শুকুর ব্যতিত) আমদানির জন্য ছাড়পত্র প্রদানের আবেদন পত্রের উপর মতামত প্রদান।’ যার স্মারক নং- ৩৩.০১.০০০০.১১৮.২২.৪৬৮.১৭-২৫৩। 
এর পরে একই কর্মকর্তা মন্ত্রণালয় থেকে একই বিষয়ে দুই দফায় তাগিদ দিয়ে পত্র পাঠান। দ্বিতীয়টি পাঠানো হয় গত ১৫ মে (নথি নং- ৩৩.০১.০০০০.১১৮.২২.৪৬৮.১৭-৩১২) এবং সবশেষ চিঠিটি পাঠানো হয় গত ২ জুলাই। যার নথি নং- ৩৩.০১.০০০০.১১৮.২২.৪৬৮.১৭-৪২৬। ২ জুলাই প্রেরিত পত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে পাঠানো চিঠির সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, “সূত্রস্থ স্মারকের প্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান- ইসলাম এগ্রোভেট লিমিটেডের আবেদনপত্রের প্রেক্ষিতে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে কিনা এবং উক্ত বিষয়ে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কোনো পত্র দেয়া হয়েছে কিনা- এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু অদ্যাবধি উক্ত বিষয়ে এ মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। এমতাবস্থায়, এ মন্ত্রণালয়ের ১নং সূত্রস্থ (মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং- ৩৩.০১.০০০০.১১৮.২২.৪৬৮.১৭-৩১২ তারিখ: ১৫/০৫/২০১৮) স্মারকের নির্দেশনা অনুযায়ী চাহিত তথ্যাদি এ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।”
তৃতীয় দফায় মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি প্রেরণের পর এরই মধ্যে এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। অথচ দুর্নীতিবাজ ডিজি ডা. মো. আইনুল হক জবাব দেননি একটিরও। যা সরকারি চাকরির বিধান অনুযায়ী অসদাচরণ তথা অপরাধ। আইনানুযায়ী এ ক্ষেত্রে ডিজির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাকে কোনো শোকজ নোটিশও করা হয়নি। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিবের সঙ্গে দুর্নীতিবাজ উপপরিচালক, চলতি দায়িত্বে পরিচালক ও অতিরিক্ত দায়িত্বে মহাপরিচালক আইনুল হকের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। দু’জনের বাড়িও একই এলাকায়, মাত্র কয়েক কিলোমিটারের দূরত্ব। আর এ কারণেই ডিজি যত অপকর্ম করেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। উল্টো তার দুর্নীতির তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে তাকে পদোন্নতি দেয়ার জন্য অবৈধভাবে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল এমএসটিতে। যে কারণে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কৈফিয়তও তলব করেছিল। অবাক ব্যাপার হলো, প্রাণিসম্পদ সচিব তারপরও এই দুর্নীতিবাজ ডিজি আইনুল হককে দুর্নীতি-অপকর্মে প্রশ্রয় একের পর এক দিয়েই চলেছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৬ আগস্ট ২০১৮ প্রকাশিত)