বৃহস্পতিবার, ১৩-ডিসেম্বর ২০১৮, ১০:৪৪ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • গবেষণার নামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় প্রমোদ ভ্রমণ

গবেষণার নামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় প্রমোদ ভ্রমণ

Shershanews24.com

প্রকাশ : ১০ আগস্ট, ২০১৮ ১০:৪১ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: কৃষির গবেষণায় দেয়া সরকারি বরাদ্দের অর্থে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বারবার যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো ব্যয়বহুল দেশে প্রমোদ ভ্রমণ করছেন। এমনকি প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য কৃষি গবেষণা খাতের অর্থ দিয়ে পিএইচডি’র ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা কোনও যুক্তি বা সরকারি নীতিমালার মধ্যে পড়ে না। তারপরও ডিপিপির মধ্যে অবৈধভাবে অন্তর্ভুক্ত করে এ ধরনের ডিগ্রি অর্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দেখা যাচ্ছে, নিজের ভ্রমণে যাওয়ার বিষয়ে সরকারি আদেশে কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নিজেই স্বাক্ষর করেছেন। এভাবে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কৃষি গবেষণা বাবদ সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা হরিলুট হয়েছে। নতুন করে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মন্ত্রণালয়ের ‘ধান্দাবাজ’ কর্মকর্তারা। গবেষণার নামে এই প্রমোদ ভ্রমণের তালিকায় থাকা একজন কর্মকর্তা এরই মধ্যে পিআরএল-এ গেছেন। এছাড়া আরও ২/৩ জন আছেন, যাদের চাকরির মেয়াদ মাত্র কয়েক মাস বাকি আছে। পুরো বিষয়টি জানা-জানি হওয়ায় এ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সচিবালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কৃষি গবেষণা কাজে সংশ্লিষ্টরা। সেই সাথে অভিযুক্ত দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও হরিলুট হওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গবেষণার নামে কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় প্রমোদ ভ্রমণ 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত ২০১৭-’১৮ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণা ও উদ্ভাবনী খাতে প্রথম ব্যয়বরাদ্দ রাখা হয় ১০ কোটি টাকা। কিন্তু একজন অতিরিক্ত সচিব মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র এক সচিবকে ভুলভাল বুঝিয়ে গবেষণা ফান্ডের বিশাল অঙ্ক নানা কৌশলে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লুটপাট করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতিমধ্যে তারা ৫ সদস্যের টিম গবেষণার অর্থ নিয়ে ২ বার যুক্তরাষ্ট্র এবং একবার কানাডায় ভ্রমণ করেছেন, যাকে এক রকমের প্রমোদ ভ্রমণ বলেই আখ্যায়িত করা যায়।
এ বিষয়ে শীর্ষকাগজের কাছে থাকা কাগজপত্র পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গবেষণা উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তাদের কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গবেষণা উইংয়ের না হয়েও ওই কর্মকর্তারা বারবার বিদেশ ভ্রমণ করছেন গবেষণার নামে। তারা বস্তুত গবেষণার অন্তরালে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা তছরুপ করছেন বলে অভিযোগ মিলেছে। এর মধ্যে ওই টিম এক দফায় যুক্তরাষ্ট্রে যান গত বছরের  ১২ অক্টোবর। যেখানে ‘এক্সপোজার ভিজিট’ হিসেবে অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়। দ্বিতীয় দফায় একই বছরের ৫ ডিসেম্বর ৫ সদস্যের দল যুক্তরাষ্ট্রে যান। যেখানে ‘ট্রেনিং প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ’ উল্লেখ করা হয় সরকারি আদেশে। এছাড়া চলতি বছরের ১৪ মার্চ তৃতীয় ধাপে ‘নলেজ শেয়ারিংয়ের’ নামে কানাডায় যায় একটি দল। তবে প্রত্যেকবারই একজন অতিরিক্ত সচিবসহ তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব (বর্তমানে উপসচিব) মোস্তারী খানম এই ভ্রমণে ছিলেন। এর মধ্যে নিজের সফরের বিষয়ে মোস্তারী খানম সরকারি অফিস আদেশে তিনিই স্বাক্ষর করেছেন। যা সরকারি নিয়ম-নীতির বিরোধী। শুধু তাই নয়, ১৪ মার্চে নলেজ শেয়ারিংয়ের নামে কানাডায় যে ভ্রমণ করেছেন, সেক্ষেত্রে  জিও ভাগ করে দু’জনের জন্য সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রেরণ করা হয়। বাকি চারজনের জন্য মন্ত্রণালয় হতে জিও করিয়েছেন। যা জঘন্য অপরাধ। যেহেতু একই তারিখে একই সফর (৩০ এপ্রিল থেকে ৯ মে’২০১৮) তারা বাস্তবে যাওয়া আসা করেছেন বলে তথ্য রয়েছে। 
সূত্র বলছে, তারা মূলত, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাঙালিদের মাধ্যমে ইনভাইটেশনপত্র এনে ভ্রমণে যান। আর ভ্রমণে গিয়ে তারা সেখানে অবস্থানরত তাদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাসায় দাওয়াত খেয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। যা পরে দেশে ফেরার পর তারা নিজেরাই আড্ডায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। তারা এই প্রমোদ ভ্রমণের মাধ্যমে প্লেজার ছাড়াও মোটা অঙ্কের অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করেছেন বলে জানা গেছে।   
বিষয়টি মন্ত্রাণলয়, সচিবালয়সহ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, খামারবাড়ি এবং কৃষি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট দফতর ও কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া কৃষি গবেষণায় নিয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও অনেকে বিষয়টি জানার পর এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। 
তারা বলছেন, বাংলাদেশের কৃষি পণ্য ও আবহাওয়ার সাথে ভারত, নেপাল, ভূটান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মিল রয়েছে। যদি কৃষি গবেষণার জন্য সফর করতে হয়, তবে এসব দেশে হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার কৃষি পণ্য ও আবহাওয়ার সাথে বাংলাদেশের কোনো মিল নেই। সুতরাং গবেষণার কথা বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় সফরের উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ। অন্তত কৃষি গবেষণার নামে সরকারি অর্থে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা ভ্রমণের কোনো সুযোগ নেই। 
তাছাড়া, যদি যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা সফর করতেও হয় সেটা তো তারাই করার দাবি রাখেন, যারা কৃষি নিয়ে গবেষণা করেন এবং কৃষি বিষয়ক কর্মকর্তারা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বারবার এই বিদেশ সফর প্রমাণ করে, এটি গবেষণা কাজে নয়। বরং সরকারি অর্থ আত্মসাত এবং প্রমোদ ভ্রমণই মূখ্য উদ্দেশ্য। 
সূত্র মতে, প্রতিবার সফরে একেকজন ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে তুলেছেন। যার সিংহভাগ তারা পকেটে ঢুকিয়েছেন। আর সরকারের মহৎ উদ্যোগগুলো দুর্নীতিবাজ এসব আমলাদের কারণেই বিফলে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 
সরকারি অর্থে পিএইডি গবেষণা
সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রাপ্ত কাগজপত্রে দেখা গেছে, জাতীয় কৃষি প্রযুক্তি কর্মসূচি (এনএটিপি) দ্বিতীয় পর্যায়, প্রকল্পের অর্থে ১৪/১২/২০১৭ তারিখে পিএইচডির জন্য বিদেশে স্কলারশিপ বাগিয়ে নেন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব (বর্তমানে উপসচিব) মোস্তারী খানম। এই কোর্সে মেয়াদ দেখানো হয়েছে ৪২ মাস। তার পিএইচডি গবেষণার পুরো অর্থ প্রকল্প থেকে দেওয়া হচ্ছে। এর আরেকজন উপসচিব ফারহানা আইরিসকেও একইভাবে বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য এনএটিপি (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প থেকে অর্থ দেওয়া হয়। যদিও সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী এভাবে বিদেশে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য অর্থ দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ এই প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরি করার সময়ই কৌশলে দুর্নীতিবাজরা নিজেদের সুবিধার জন্য ডিপিপিতে এমন অবৈধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। 
দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের প্রস্তুতি সম্পন্ন
সূত্র বলছে, নতুন করে গবেষণার টাকায় দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একই সিন্ডিকেট। এ জন্য সরকারি আদেশও করিয়ে নিয়েছেন। এখন শুধু উড়াল দেওয়ার অপেক্ষা তাদের। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ঈদুল আজহার পর এই সফরে চিলিসহ দক্ষিণ আমেরিকার বেশ ক’টি দেশে প্রমোদ ভ্রমণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এই টিমে রাখা হয়েছে ভাগ্যরানী বণিক নামে পিআরএল-এ থাকা একজন সাবেক কর্মকর্তাকেও। আরও যারা আছেন, তাদের মধ্যে ২ থেকে ৩ জন চলতি বছর অবসরে যাচ্ছেন। 
এভাবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় সরকারি অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে হরিলুটের প্রবণতা আরও বেড়েই চলবে বলে আশঙ্কা সবার।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৩ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)