বুধবার, ১৯-সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৭:১০ অপরাহ্ন
হজযাত্রী পরিবহনে বিমানকে অবৈধ সুবিধার সুযোগ নিচ্ছে সৌদি এয়ারলাইন্সও

বছরে দেশ থেকে চলে যাচ্ছে ৪শ কোটি টাকা

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট, ২০১৮ ০৪:১৫ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: চলতি বছর প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে একজন হজযাত্রী পরিবহনে সৌদি এয়ারলাইন্স ভাড়া পাচ্ছে ৫৭ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৮৯ হাজার টাকা। আর বাংলাদেশি হজযাত্রী পরিবহনে একই এয়ারলাইন্স জনপ্রতি ভাড়া নিচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। যা বেসরকারি হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশি একজন হজযাত্রী পরিবহনে সৌদি এয়ারলাইন্স বাড়তি পাচ্ছে ৮০ হাজার টাকারও বেশি। আর বাংলাদেশের সাধারণ যাত্রী পরিবহনের তুলনায় সেই বাড়তির পরিমাণ প্রায় তিন থেকে চারগুণ।
জানা গেছে, মূলত বিমান বাংলাদেশকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নিচ্ছে সৌদি এয়ারলাইন্স। যার মাধ্যমে এবার সৌদির বিমান সংস্থাটি বাংলাদেশি হাজীদের থেকে বাড়তি প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই টাকা হজযাত্রীদের পকেট থেকে জোর করে আদায় করা হচ্ছে। যা দেশের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশিদের লোটার সুযোগ করে দেওয়ার সামিল বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, বিমান বাংলাদেশকে বাড়তি সুযোগ দিতে গিয়েই সৌদি এয়ারলাইন্সকেও তাতে ভাগ বসানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। যদি হজযাত্রী পরিবহনে থার্ড ক্যারিয়ার ওপেন থাকতো বা তৃতীয় কোনো পক্ষকে হজযাত্রী পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে এই বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেত না বিদেশি এই এয়ারলাইন্সটিও। অথচ বাংলাদেশ বিমানকে অবৈধ সুবিধা দিতে গিয়ে প্রতিবছরই এভাবে সৌদি এয়ারলাইন্সকেও বাংলাদেশ থেকে ৩শ’ থেকে ৪শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এতে একদিকে বাংলাদেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ হজযাত্রীদের বাড়তি বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
যেভাবে সৌদি এয়ারলাইন্স বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে ৪শ কোটি টাকা
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে এবার সম্ভাব্য হজের তারিখ ২১ আগস্ট। হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে গত ১৪ জুলাই। শেষ ফ্লাইট ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে আগামী ১৫ আগস্ট। পবিত্র হজ পালন শেষে প্রথম ফিরতি হজ ফ্লাইট শুরু হবে ২৭ আগস্ট। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৮ জন হজযাত্রী পবিত্র হজ পালনের জন্য সৌদি আরব যাচ্ছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন ৬ হাজার ৭৯৮ জন। আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার জন। বিমান বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করে সৌদি এয়ারলাইন্স হজযাত্রীদের পরিবহন করছে। সেই চুক্তির ভিত্তিতে এবার বিমান বাংলাদেশ ১৮৭টি ফ্লাইটে ৬৪ হাজার ৯৬৭ জন এবং সৌদি এয়ারলাইন্স ৬১ হাজার ৮৩১ জন হজযাত্রী পরিবহন করবে।   
সূত্রমতে, হজযাত্রী পরিবহণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও সৌদি এয়ারলাাইন্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে অতিরিক্ত বিমান ভাড়া নির্ধারণ করে হজযাত্রীদের তা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। চলতি বছর হজযাত্রীপ্রতি সর্বোনিঘ্ন বিমান ভাড়া ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। যা গত বছরের চেয়েও ১৩ হাজার টাকা বেশি। অথচ একই সময় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সে ঢাকা-জেদ্দা-ঢাকা আসা যাওয়ার বর্তমান ভাড়া সাধারণ যাত্রীদের ক্ষেত্রে ৩৬ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। ওমরাহ যাত্রীদের আসা যাওয়ার ভাড়া ৪৯ হাজার থেকে ৫২ হাজার টাকা। অথচ একই ফ্লাইটে একজন হজযাত্রীকে ভাড়া গুণতে হচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ বা ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৭ টাকা। সেই হিসাবে বাংলাদেশি একজন হজযাত্রীর কাছ থেকে এবার বাড়তি বিমান ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কমপক্ষে ৫৮ হাজার ১৯১ টাকা। আর ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৮ জন ‘আল্লাহ ঘরের মেহমানের’ কাছ থেকে বিমান ভাড়া হিসাবে বাড়তি আদায় করা হচ্ছে ৭৪০ কোটি টাকার বেশি। যার অর্ধেকের মতো নিয়ে যাচ্ছে সৌদি এয়ারলাইন্স। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ প্রায় ৪শ কোটি।
এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হাজীসহ হাব নেতারা বারবার বলেছেন, এটা কোনো আইন হতে পারে না। বরং এটা সম্পূর্ণ বেআইনি ও জুলুম তথা হাজীদের হয়রানির সামিল। এ ক্ষেত্রে হজযাত্রীদের পরিবহনে বিমান ভাড়া কমানো কিংবা থার্ড ক্যারিয়ার উন্মুক্ত করে দেয়ার ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের আদেশও মানছে না বিমান মন্ত্রণালয়। আর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন সাধারণ সচেতন মানুষ।
হাব নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র বিমান বাংলাদেশ ও সৌদি এয়ারলাইন্সে হজযাত্রী পরিবহনের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। প্রতিযোগিতার বাজারে সুন্দর ও সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই থার্ড ক্যারিয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়া জরুরি। জেদ্দাগামী অন্যান্য এয়ারলাইন্সেও যাতে হাজীরা যাওয়া-আসা করতে পারেন সেই ব্যবস্থা থাকা উচিত।
সরকারের নির্ধারিত এই বিমান ভাড়াকে অযৌক্তিক দাবি করে প্রয়োজনে থার্ড ক্যারিয়ার চালুর দাবি জানিয়ে হজযাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অতিরিক্ত বিমান ভাড়া কমাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছিল হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)। কিন্তু তাতেও কোনো সুফল আসেনি।
হাব নেতাদের অভিযোগ, বিমান বাংলাদেশ নিজেরা তাদের ভাড়া নির্ধারণ করে। অথচ এটা করা উচিত ছিল তৃতীয় কোনো পক্ষের। নিয়মানুযায়ী এটা তারা করতে পারে না। এজন্য এভিয়েশন সম্পৃক্ত অন্য বিশেষজ্ঞদের এ ব্যাপারে দায়িত্ব দিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত ছিল। যেখানে ভারতে এ বছর বিমান ভাড়া গত বছরের চেয়ে কমানো হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের হজযাত্রীদের থেকে বাড়তি বিমান ভাড়া আদায় শুধু অযৌক্তিক ও অন্যায়ই নয়, আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সঙ্গে এটা বড় ধরনের ‘জুলুম’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধির কিংবা ভ্যাট প্রয়োগের অজুহাত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কারণ, তাহলে শুধু হজযাত্রীর বিমান ভাড়া বৃদ্ধি কেন? সাধারণ বিমানযাত্রী এবং ওমরাহ যাত্রীদের বিমান ভাড়াও বাড়ার কথা। তা করা হয়নি। বরং ওমরাহ যাত্রীদের ভাড়া আরও ৫০ ডলার কমানো হয়েছে। তাছাড়া, বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম কিছু বাড়লেও সৌদিতে দাম বাড়েনি। কিন্তু হজযাত্রীদের থেকে তিনগুণ-চারগুণ বাড়তি ভাড়া দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে সুযোগ নিচ্ছে সৌদি এয়ারলাইন্সও। যা সম্পূর্ণ অনৈতিক।
বাংলাদেশ ও ভারতের হজযাত্রীর ক্ষেত্রে বিমান ভাড়ার পার্থক্য
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারত থেকে এ বছর রেকর্ডসংখ্যক মুসলমান হজে যাবেন। হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া কমানোর কথা ঘোষণা করেছে ভারত। এয়ার ইন্ডিয়া, সৌদি এয়ারলাইন্স, ফ্লাইনাস এবং সৌদি আরবভিত্তিক অপর একটি বিমান সংস্থা এই ছাড় দিচ্ছে। ভারতের ২১টি বিমানবন্দর থেকে জেদ্দা ও মদিনাগামী বিমানে ওই ছাড় পাওয়া যাবে। স্বাধীনতার পর ভারত থেকে এই প্রথম ১ লাখ ৭৫ হাজার ২৫ জন হজে যাচ্ছেন। ঘোষণা অনুযায়ী, এবার ভারতের হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া ১৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য কলকাতা, চেন্নাই, গোয়া, নাগপুর, শ্রীনগর, মুম্বাই কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সৌদি এয়ারলাইন্সের জন্য আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু, কোচি, দিল্লি, হায়দরাবাদ, জয়পুর এবং ফ্লাইনাসের জন্য আওরঙ্গাবাদ, ভূপাল, গয়া, গোয়াহাটি ও রাঁচিতে কেন্দ্র খোলা হয়েছে।  
ভারতের কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী মুখতার আব্বাস নাকভি সম্প্রতি বিমান ভাড়া কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কলকাতা থেকে আগে ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫০ টাকা হজযাত্রীর ক্ষেত্রে বিমান ভাড়া ছিল। এবার তা ৮৯ হাজার ৫৮৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। মুম্বাই থেকে বিমানভাড়া ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকার পরিবর্তে ৫৭ হাজার ৮৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রীনগর থেকে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৩৫০ টাকা বিমান ভাড়া এখন ১ লাখ ১ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে। আহমেদাবাদ থেকে ভাড়া ছিল ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা, বর্তমানে তা ৬৫ হাজার ১৫ টাকা করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশি হজযাত্রীদের ক্ষেত্রে উল্টো বিমান ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ২০১৮ সালের হজ প্যাকেজে সর্বনিঘ্ন ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যাতে বিমান ভাড়া ধরা হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯১ টাকা। এদিকে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ প্যাকেজে বিমানভাড়া আরও বেশি, ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৭ টাকা।
হাবের সাবেক সভাপতি ইব্রাহিম বাহারের মতে, যদি থার্ড ক্যারিয়ারটা ওপেন হতো তাহলে এই যে স্বেচ্ছাচারিতা, দুটি মাত্র এয়ারলাইন্সের ওপর নির্ভরশীলতা এবং হাজীদের জিম্মি করা- এ বিষয়টির অবসান ঘটত।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী একেএম শাজাহান কামাল বলেছেন, ‘এ বছর যা হবার হয়ে গেছে।’ তবে আগামীতে কী হবে- সে বিষয়ে বিমানমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ২৩ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)