বুধবার, ২২-আগস্ট ২০১৮, ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন

ফলবিপর্যয়ের দায় কার?

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৮ জুলাই, ২০১৮ ০৬:০৮ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গত নয় বছরে শিক্ষা নিয়ে ‘মহা এক্সপেরিমেন্ট’ হয়েছে। যার প্রতিফলন দেখা গেছে বিগত বছরের পাবলিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফলে। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ব্যাপক উত্থান-পতন লক্ষ্য করা গেছে এই সময়ে। যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সবশেষ চলতি বছরের এইচএসসির ফলাফলে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এইচএসসিতে এ বছর পাসের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী এখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি নানা ধরনের বিশ্লেষণ চলছে। 
গত ১০ বছরের এইচএসসি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সদ্য প্রকাশিত ২০১৮ সালের ফলাফলসহ গত তিন বছর ধরে এইচএসসিতে কমছে পাসের হার ও জিপিএ ফাইভ পাওয়ার সংখ্যা। এর আগে ২০১০ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ফলাফল ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ২০১০ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ৭৪.২৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ ছিল ২৮ হাজার ৬৭১টি। ২০১১ সালে পাসের হার বেড়ে হয় ৭৫.০৮% এবং ৩৯ হাজার ৭৫৯টি জিপিএ-৫। ২০১২ সালে পাসের হার ৭৮.৬৭%, জিপিএ-৫ বেড়ে হয় ৬১ হাজার ১৬২। এরপর ২০১৪ সালে ৭৮.৩৩ শতাংশ পাসের হার এবং জিপিএ-৫ বেড়ে হয় ৭০ হাজার ২০৬টি। 
সূত্রমতে, পরীক্ষার খাতায় কিছু লেখলেই যতবেশি সম্ভব ‘নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে’ পরীক্ষার্থীদেরকে পাস করিয়ে ও জিপিএ-৫ পাইয়ে দিতে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনার কারণে এভাবে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়তে থাকে। এ নিয়ে সেসময় প্রশ্ন তোলেন শিক্ষাবিদরা। তাগিদ দেন শিক্ষার মান বাড়ানোর। এই যখন প্রেক্ষাপট তখন, ২০১৬ থেকে নিচে নামতে থাকে এইচএসসির ফলাফল। ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত পাসের হার ক্রমশ কমে হয়েছে যথাক্রমে ৭৪.৭০%, ৬৮.৯১% ও ৬৬.৬৪%। পাশাপাশি জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও নেমেছে যথাক্রমে ৫৮ হাজার ২৭৬টি, ৩৭  হাজার ৭৩৬ এবং চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে হয় ২৯ হাজার ২৬২। 
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় ১০ লাখ ৭২ হাজার ২৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৮ জন। তবে মাদ্রাসা, কারিগরিসহ ১০টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন গড় পাসের হার ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এবার পাসের হারে সবচেয়ে এগিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড। এই বোর্ডে পাসের হার ৭০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৬০ দশমিক ২১ শতাংশ। 
ফলাফল বিপর্যয়ে দায় কার?
এইচএসসির এই ফলাফল উত্থান-পতনের দায় শিক্ষামন্ত্রী নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘বেশি পাস করলেও অপরাধ, কম পাস করলেও অপরাধ!’ বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বেড়ে যাওয়া আবার কমে যাওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কারণ, শিক্ষামন্ত্রী এখন বলছেন- সংখ্যাগত ফল নয়, মানের দিক লক্ষ্য রাখছেন তারা। আর এর আগের বক্তব্য ছিল, শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নতি ও গুণগত মান বাড়ার কারণেই শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে, জিপিএ-ফাইভও বেড়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর এ দ্বিমুখী বক্তব্যের কারণেই এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য তাকেই দায়ভার নিতে হবে বলে শিক্ষাবিদরা মন্তব্য করেছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষার ফলাফল কম-বেশি হওয়ার সাথে শিক্ষার মানের কোনো সম্পর্ক নেই।  
তারা বলছেন, ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য কি শিক্ষার্থীদের দায়ী করা হবে? তারা ঠিকভাবে লেখাপড়া না করার কারণেই কি ফল বিপর্যয় হলো? বস্তুত, আগের শিক্ষার্থীরা যে বেশি লেখা-পড়া করেছে আর এখনকার শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে- একথা বলার কোনো সুযোগ নেই। বরং শিক্ষামন্ত্রীও বলেছেন, শিক্ষার মান বেড়েছে। তার অর্থ দাঁড়ায় এখনকার শিক্ষার্থীরা বেশি পড়াশুনা করছেন। সুতরাং ফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করার সুযোগ নেই। একই যুক্তিতে এ দায় অভিভাবক বা শিক্ষকদের ঘাড়ে চাপানোরও সুযোগ নেই। তার মানে হলো, এর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব শিক্ষামন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।  
এ ক্ষেত্রে আগের পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁস হওয়ার জন্য যেমন মন্ত্রণালয়সহ শিক্ষা বোর্ডগুলো দায়ী, একইভাবে পরীক্ষার ধরণ বারবার পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ার দায়ও মন্ত্রণালয়ের ঘাড়েই বর্তায়। এছাড়া, একবার সবাইকে নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া আবার পরবর্তী সময়ে এসে ভালো করে খাতা দেখার নামে শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। এর ফলে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালে যারা পাস করেছেন এবং ২০১৮ সালে যারা উত্তীর্ণ হয়েছেন তাদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে? এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপেরিমেন্ট’ বা অভিজ্ঞতার গবেষণা হলেও শিক্ষার্থীদের ঠিকই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, এই ক্ষতি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার। এই ক্ষতি পুরো জাতির। যার সম্পূর্ণ দায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীদেরকেই নিতে হবে বলেও মত বিশ্লেষকদের। সেই সাথে এবারের এইচএসসি ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য কিছু কারণও চিহ্নিত করেছেন শিক্ষাবিদ, গবেষকসহ সংশ্লিষ্টরা। 
পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার নেপথ্যে
বিশ্লেষকরা কেউ আবার বলেছেন, এবার পাসের হার কমার বেশ কিছু যৌক্তিক কারণও আছে। পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় এবার অনেকেই ভালোভাবে না পড়ে পাসের সুযোগ নিতে পারেননি। ‘অস্বাভাবিকভাবে’ উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধারা বন্ধ করে খাতা দেখার চেষ্টা করেছেন পরীক্ষকদের অনেকেই। এ ছাড়া ইংরেজি ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র বেশ কঠিন হয়েছিল। আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে মানবিকের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক খারাপ করেছেন। 
শিক্ষা বোর্ড ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে উত্তরপত্র মূল্যায়নে একধরনের অসামঞ্জস্য ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নম্বর দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এখন একটি মডেল উত্তরপত্র করে তার ভিত্তিতে খাতা দেখা হয়। এ কারণে ঢালাও নম্বর পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে।
তবে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবার জন্য বাধ্যতামূলক ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি খারাপ করেছেন, যার ধাক্কা পড়েছে সার্বিক ফলের ওপর। এবার শুধু সিলেট শিক্ষা বোর্ড বাদে বাকি সাতটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যে। এবার ইংরেজির প্রশ্নপত্রও কঠিন হয়েছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, এবার আইসিটি এবং পদার্থ বিজ্ঞানেও গতবারের চেয়ে খারাপ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এবার প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধে পরীক্ষা শুরুর আধা ঘণ্টা আগেই পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। পরীক্ষা শুরুর ২৫ মিনিট আগে কোন সেট প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবে তা ঠিক করা হয়েছে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সুযোগ নিতে পারেননি পরীক্ষার্থীরা। আগে দেখা যেত পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে, বিশেষ করে এমসিকিউ প্রশ্নফাঁস হতো এবং সহজেই পরীক্ষার্থীরা তা সমাধান করতে পারতেন। এবার কড়াকড়ির কারণে দেখাদেখির প্রবণতাও কম ছিল। তবে এই কড়াকড়িগুলো আগে হয়নি কেন, সেটিই এ ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন। 
বারবার পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন : সিলেটের শমসের নগরের এক শিক্ষার্থী বলেছেন, এবার তার জিপিএ-৫ হাতছাড়া হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, ‘এবার পরীক্ষার হলে একটা ভয়ভীতির পরিবেশ ছিল। আর বারবার পরীক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তনে বেশ খানিকটা উদ্বেগ ছিল। যে সাবজেক্টের কারণে আমার এ-প্লাস মিস হয়েছে ওই সাবজেক্টের কোয়েশ্চন প্যাটার্নটা ভিন্ন ছিল।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ছাত্রী আরও বলেছেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একেক বছর একেক রকম প্যাটার্ন নিয়ে আসে। এবছর আমাদের শুরুতে বলা হলো, সারা বাংলাদেশ একই কোয়েশ্চেনে সবাইকে পরীক্ষা দিতে হবে। টিচাররাও আমাদের নার্ভাস করে দিয়েছিলো। এ সবই রেজাল্টে এফেক্ট করে।’
লিবারেল মার্কিংয়ের প্রভাব : শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমানের মতে, দেশে নানা সময়ে লিবারেল মার্কিং বা লিখলেই নাম্বার দেওয়ার প্রবণতা বলে একটি বিষয় সম্পর্কে শোনা গেছে। সেই কারণেও পাসের হার বেশি থাকতো বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, সেটিই বরং দেশের ক্ষতি করেছে। তিনি বলেছেন, ‘তখন হয়ত লিবারেল মার্কিং বা লিখলেই নম্বর দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল। এভাবে যোগ্যতা ছাড়াও অনেকে ভালো ফল করেছে। তারা জাতির অ্যাসেট না হয়ে বরং বার্ডেন হয়ে যায়।’ তিনি বলেছেন, ‘হতে পারে বেশি পাস দেখালে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হয়ত দেখাতে পারে যে দেশে শিক্ষার মান বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেশি জিপিএ পাওয়া মানেই যোগ্যতা নয়।’ 
যা বললেন শিক্ষামন্ত্রী
তবে টানা তিন বছর পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার আগের বছরের তুলনায় কমার কারণে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মোটেও হতাশ নন। তিনি বলেছেন, ‘শিক্ষায় সংখ্যাগত উন্নতি হচ্ছে। এখন তারা মানের দিকে জোর দিতে চান। এ জন্যই শিক্ষকদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে খাতা মূল্যায়নে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘পাসের হারের ক্ষেত্রে একটু কম। আশা করি, এটা উপলব্ধি করবেন যে, আমরা এখন জোর দিচ্ছি- যে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে সে সংখ্যাকে গুণগতভাবে উন্নত করার জন্য। গুণগত মান উন্নত করতে হলে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়, কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হয়। এ জন্য খাতা দেখার ক্ষেত্রে আমরা এখন অনেক কঠোর। যে শিক্ষকরা খাতা দেখেন, তারা কঠোরভাবে দেখেন।’ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সংবাদ সম্মেলন করে আরও বলেছেন, কেন এবার পাসের হার কম হল- এর কারণ বের করার চেষ্টা হবে। যখন বেশি পাস করেছে সবাই বিস্মিত হয়েছে। আমরা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি- বেশি পাস করাই দিচ্ছি এই জন্য। বেশি পাস করলেও আমাদের অপরাধ, কম পাস করলেও অপরাধ। 
ফল খারাপের কারণ বের করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ
১৯ জুলাই গণভবনে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘পরীক্ষার ফল কী কারণে খারাপ হলো- তা খুঁজে বের করে সেটার সমাধান করুন। ফল খারাপ নিয়ে বকাঝকা করবেন না, বকাঝকা ফল খারাপের কোনো সমাধান নয়।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সোনার মানুষ গড়ে তুলতে চাই, যারা সোনার দেশ গড়বেন। শিক্ষা এমনই একটি সম্পদ যে, কেউ তা কেড়ে নিতে পারে না। কোনো ছিনতাইকারী শিক্ষাকে কেড়ে নিতে পারে না। শিক্ষা থাকলে যে কেউ নিজের রোজগারের পথ বের করে নিতে পারে।’
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)