বৃহস্পতিবার, ১৩-ডিসেম্বর ২০১৮, ১০:৪৭ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বাংলাদেশ ব্যাংক: রিজার্ভ লুটের পর এবার স্বর্ণ কেলেঙ্কারি

বাংলাদেশ ব্যাংক: রিজার্ভ লুটের পর এবার স্বর্ণ কেলেঙ্কারি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৭ জুলাই, ২০১৮ ০৪:২৬ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য:রিজার্ভ লুটের পর মহানিরাপত্তাবলয়ে থাকা ভল্টের স্বর্ণ কারসাজি নিয়ে আবারও আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অত্যন্ত সুরক্ষিত ভল্টে স্বর্ণের গরমিল নিয়ে তোলপাড় চলছে এখন সারাদেশে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। রিজার্ভ লুটের এই বিষয়টি এখন পর্যন্ত সুরাহা না হলেও ‘ভল্টের সোনা’ নিয়ে ফের নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রিজার্ভ লুটের ঘটনা তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রতিবেদন দিলেও কয়েক দফা সময় নিয়ে দুই বছরেও তা প্রকাশ করেনি সরকার।  একই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে এ পর্যন্ত ২৫ দফা সময় নিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসবের মধ্যেই ভল্টে রাখা স্বর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে নতুন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে শুল্ক গোয়েন্দাদের চালানো অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভয়ংকর এই স্বর্ণ কারসাজি ধরা পড়ে। চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি তথ্য প্রমাণসহ এই কারসাজির প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করেন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের ৮ সদস্যের কমিটি। অনুসন্ধানকালে ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশির ভাগের ক্ষেত্রেই চরম কারসাজি ধরা পড়ে। ভল্টে যেসব অলংকার ও বার রয়েছে জমা দেওয়ার সময় এগুলোতে ৮০ শতাংশই বিশুদ্ধ স্বর্ণ ছিলো। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায় ওই সব অলংকার ও বার এখন মাত্র ৪০ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণ দিয়ে তৈরি রয়েছে। এমনকি ৮০ ভাগ বিশুদ্ধ স্বর্ণে তৈরি ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের একটি চাকতি ও আংটি পুরোপুরিই মিশ্র বা সংকর ধাতু হয়ে গেছে। জমা রাখা ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ এখন ১৮ ক্যারেট হয়ে গেছে। ক্যারেটের মাধ্যমে সোনার মান নির্ধারিত হয়। আর মান অনুসারে সোনার দাম কমবেশি হয়। ২২ ক্যারেট বা ২১ ক্যারেটের সোনা এবং ১৮ ক্যারেটের সোনার দামে বড় অঙ্কের পার্থক্য রয়েছে। একটি উদাহরণ তুলে ধরে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে। এতে সরকারের বড় অংকের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। শুল্ক গোয়েন্দা বলছে, পরিদর্শন দল প্রতিটি রসিদের অনুকূলে জমা হওয়া সোনা যাচাই করেছে। তাতে দেখা গেছে, সোনার অলংকার এবং সোনার বারে ক্যারেটের তারতম্য করা হয়েছে। ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কম ক্যারেটে নথিভুক্ত থাকায় নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রির সময় অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রাপ্য টাকা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে। সোনার ক্যারেটের তারতম্য ঘটানোর কারণেও ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে স্বর্ণের হিসাব ও পরিমাপে গরমিলের কথা বলা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা অস্বীকার করছে। অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মহা নিরাপত্তা এলাকায় রক্ষিত ভল্টে স্বর্ণে কোনো হেরফের হয়নি। এমনকি শুল্ক গোয়েন্দাদের স্বর্ণ পরিমাপের মেশিনের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।  
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা: ইংরেজি বাংলার ক্ল্যারিকাল মিসটেকে ৪০ শতাংশ হয়েছে ৮০  
গত ১৭ জুলাই গণমাধ্যমে ভল্ট কারসাজির এই খবর প্রকাশের পর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ওই দিন বিকেলেই জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এস এম রবিউল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনার পরিমাণে কোনো হেরফের হয়নি।  ৮০ ভাগ বিশুদ্ধ স্বর্ণের চাকতি অন্য ধাতুতে পরিণত হওয়ার তথ্যও সঠিক নয়। তিনি বলেন, যিনি সোনার চাকতিটি ব্যাংকে জমা রেখেছিলেন, তিনি নিজে এসে সেটা পরীক্ষা করে লিখিত প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন যে চাকতিটি যেভাবে জমা রাখা হয়েছিল সেভাবেই আছে। এ ছাড়া এ চাকতির সোনার বিষয়ে করণিক ভুল (ক্ল্যারিকাল মিসটেক) হয়েছে। ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার (মহাব্যবস্থাপক) আওলাদ হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের দেওয়া সোনা জমা রাখার সময় সোনা ৪০ শতাংশই ছিল। কিন্তু ইংরেজি-বাংলার হেরফেরে সেটা ৮০ শতাংশ লিখে ভুলবশত নথিভুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার এই ভুলটি করেছিলেন। ‘২২ ক্যারেট সোনা ১৮ ক্যারেট’ হওয়ার তথ্যও সঠিক নয় বলে দাবি করেন নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকারের মাধ্যমে সোনার মান যাচাই করা হয়। তারা কস্টিপাথরে সোনার মান যাচাই করেন। অন্যদিকে শুল্ক গোয়েন্দারা সোনা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মেশিনের ব্যবহার করেছে। বাইরে থেকে ভাড়া করা মেশিনের মাধ্যমে তারা সোনার মান যাচাই করেছে। তাই সোনার মানের হেরফের হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। ২২ ক্যারেটের জায়গায় ১৮ ক্যারেট হওয়ার বিষয়টি দুটি ভিন্ন যন্ত্রে পরিমাপের কারণেই হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করছেন।
তাহলে কি শুল্ক গোয়েন্দার ওই প্রতিবেদন ভুল? বাংলাদেশ ব্যাংক কি সেটা প্রত্যাখ্যান করছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার (মহাব্যবস্থাপক) আওলাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ভুল হতে পারে। কারণ বাইরে থেকে ভাড়া করা মেশিন এনে তার মাধ্যমে তৈরি করা প্রতিবেদন মানার সুযোগ নেই।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রবিউল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ছয় স্তরের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে ঢুকতে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরকেও অনুমতি নিতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ কোনোভাবে এখানে প্রবেশ করতে পারে না। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে ঢুকে কেউ সোনা অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারেন না। 
এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, শুল্ক গোয়েন্দারা ডিজিটালি সোনার মান পরীক্ষা করে জমা করতে আসেন। আমরা ম্যানুয়ালি করি। তবে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। জাপান থেকে একটি মেশিন চার কোটি টাকা দিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেটি অনেক সময় ভুল প্রতিবেদন দিচ্ছিল। এটিতে পিতল দিলেও অনেক সময় সোনা বলে রিপোর্ট দেয়। তাই মেশিনটি ফেরত দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাচিত স্বর্ণকার আছেন। তিনি যাচাই-বাছাই করে সোনার মান নির্ধারণ করে দেন। কেন একজন স্বর্ণকারের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশ ব্যাংক- এমন প্রশ্নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য, এর আগে এমন পরিস্থিতি হয়নি। এখন বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা করা হবে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদন কতটা গ্রহণযোগ্য সেই প্রশ্ন রয়েছে। তাদের নিজস্ব কোনো মেশিন নিয়ে তারা আসেনি। আমরা আণবিক শক্তি কমিশনে সব সোনা পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তবে শুল্ক গোয়েন্দা সাড়া দেয়নি।
‘সব সোনা ঘরেই আছে, ঠিকই আছে’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে এই স্বর্ণ কারসাজির খবর প্রকাশের পরের দিন ১৮ জুলাই সচিবালয়ে বিশেষ বৈঠক ডাকেন  অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। দুই ঘণ্টাব্যাপী ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান, অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সহিদুল ইসলাম, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নূরুল আবছার, এনবিআর-এর সদস্য কালিপদ হালদারসহ এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী। কোনো রকমের তদন্তের উদ্যোগ না নিয়েই তিনি তড়িঘড়ি দাবি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনা ঠিকই আছে। কোনো কিছুই ভল্টের বাইরে যায়নি। জনগণের সম্পদ বাংলাদেশ ব্যাংকে সঠিকই আছে। জনগণ ও যেকোনো সংস্থা চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়ে তা দেখতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে সোনায় কোনো হেরফের হয়নি। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘সোনা বাইরে যাওয়ার কোনো কথাই নেই। ভল্টকেন্দ্রিক ছয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। যে সামান্য ফোরটি-এইটি হয়েছে সেটি ক্ল্যারিকাল ভুল। তবে ঘটনাটিকে আমরা ছোট করে দেখছি না। সামান্য ফাঁক দিয়েও বড় কিছু হয়ে যায়। সুতরাং আমি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব এবং নিজেদের লেভেলে বা অন্য কোনো সংস্থাকে দিয়ে আমরা আরো পর্যালোচনা করব। গভর্নর বলে গেছেন- আপনারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, যাকে দিয়ে দেখবেন দেখেন। আমাদের মধ্যে কোনো ভীতি বা সংশয় নেই। সব কিছু ঠিকই আছে। জনগণের সম্পদ বাংলাদেশ ব্যাংকে ঠিকই আছে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর সরকারকে আশ্বস্ত করেছে। অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাঁকে বিষয়টি জানাব। তখন মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন এটা আরো কিভাবে দেখা যায়। সামান্যতম সন্দেহ বা সংশয় থাকলেও তা যেন দূরীভূত হয়।’এম এ মান্নান বলেন, ‘জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দায়িত্বপ্রাপ্ত। এ ক্ষেত্রে কোথাও কোনো ধরনের গাফিলতি ঘটে থাকলে সেটা দেখার দায়িত্ব সরকারের। সরকার সে দায়িত্ব পালন করবে। আমরা আরো পর্যালোচনা করব। সংস্থাগুলোও নিজেরা বসবে, তাদের মধ্যে আরো কথা হবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সংবাদপত্রে যে পরিমাণের কথা বলা হয়েছে তা মোটেও সঠিক নয়। সোনা ঠিকই আছে, ঘরেই আছে। যে সামান্য ত্রুটি হয়েছে তা হলো ৪০-এর জায়গায় ৮০ লেখা হয়েছে। এটা লেখার ভুল। তার পরও আমরা ভল্টের পুরো সিস্টেম পর্যালোচনা করব। মাপজোখ পদ্ধতিসহ যেসব ব্যক্তি কাজ করে পুরোটাই পর্যালোচনা করব। সামান্যতম গাফিলতি পেলেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মন্ত্রী মান্নান বলেন, ‘এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে অনেক চিঠি চালাচালি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টেটমেন্ট দেখেছি। গভর্নর এখানে যেটা বলে গেলেন তার রেকর্ড রেখেছি। এনবিআর কর্তৃপক্ষও বিষয়গুলো বিবেচনা করেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক গত এক বছরেও কেন বলতে পারল না যে ক্ল্যারিকাল ভুল হয়েছে- এমন প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে তাঁদের মধ্যে কিছু আমলাতান্ত্রিক গাফিলতি রয়েছে। এক বছর ধরে চিঠি চালাচালি হয়েছে। একটা লিখিত চিঠির জবাব দিতে দুই মাস লাগছে।’ 
বাংলাদেশ ব্যাংক ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
ভল্টের স্বর্ণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও মন্ত্রীর পক্ষ থেকে স্বর্ণ গরমিলের কথা অস্বীকার করা হলেও শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সহিদুল ইসলাম বলছেন, জমা দেয়ার সময় সোনার যে মান (ক্যারেট) ছিল, পরবর্তী পরীক্ষার সময় তা পাওয়া যায়নি।
 তিনি বলেন, ‘এক বছরের বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান করে আমাদের আট সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ওই সব অনিয়ম পেয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও উপস্থিতিতে ওই অনুসন্ধান হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য উপস্থাপনের পাশাপাশি কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই যৌথ তদন্ত প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরও রয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. সহিদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে সোনা পরীক্ষা করে আমরা যা পেয়েছি, তদন্ত রিপোর্টে তা সঠিকভাবে উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠিয়েছি। প্রতিবেদনে সোনার ক্যারেটের পরিমাণের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আমরা সঠিকভাবে উল্লেখ করেই তা পাঠিয়েছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ক্যারেটের সোনা জমা নিয়েছে পরে পরীক্ষার সময় তা পাওয়া যায়নি। সে সময় ভিন্ন ক্যারেটের সোনা পাওয়া গেছে। মেশিনে ও সনাতন পদ্ধতি উভয়ভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দু’ভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। সবাই একমত হয়ে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে লিখিত পেলে পুনরায় তদন্ত করে দেখা যেতে পারে।
ক্ল্যারিকাল মিসটেক নাকি সংঘবদ্ধ চক্র?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে স্বর্ণ হেরফেরের এই ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এটিকে নিছক ক্ল্যারিকাল মিসটেক হিসেবে দেখতে নারাজ বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংক ও শুল্ক গোয়েন্দার মতো সরকারের প্রভাবশালী দুটি প্রতিষ্ঠানের পরস্পরবিরোধী তথ্য এই প্রশ্ন আরো ঘনীভূত করেছে। ব্যাংকের বেশ কিছু কর্মকা- পর্যালোচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি সংঘবদ্ধ একটি চক্রের কাজও হতে পারে। সরকারের শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভল্টে জমা রাখা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের সোনার চাকতি ও আংটি মিশ্র বা শংকর ধাতু হয়ে গেছে। শতকরা ৮০ ভাগ স্বর্ণ ছিল। পরে সেখানে শতকরা ৪০ ভাগ স্বর্ণ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২২ ক্যারেট সোনা হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট!
প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ‘শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের দেয়া সোনা জমা রাখার সময় খাঁটি সোনা ৪০ শতাংশই ছিল। কিন্তু ইংরেজি বাংলার হেরফেরে সেটা ৮০ শতাংশ লিখে ভুলবশত নথিভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত শখ জুয়েলার্সের স্বর্ণকার গিয়াসউদ্দিন এই ভুলটি করেছিলেন। চাকতিতে ইংরেজিতে ৪০ শতাংশ সোনা লেখা ছিল? কিন্তু এটা ভুলে ৮০ লেখা হয়েছিল? এটা ‘ক্লারিক্যাল মিসটেক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী ২২ ক্যারেটের জায়গায় ১৮ ক্যারেট হওয়ার বিষয়টির ব্যাপারে বলেন, ‘‘দুটি ভিন্ন যন্ত্রে পরিমাপের কারণে এ রকম হয়েছে? শুল্ক গোয়েন্দারা যখন সোনা জমা রাখেন, তখন হয়ত তাঁদের মেশিনে ২২ ক্যারেট দেখিয়েছিল, কিন্তু আমাদের মেশিনে সেটি ১৮ ক্যারেটই হয়েছিল?।”
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার ও শখ জুয়েলার্সের মালিক গিয়াসউদ্দিন জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘চাকতিতে কী পরিমাণ সোনা আছে তা লেখার দায়িত্ব আমার ছিল না। আমি সেটা লিখিও না। সোনা ওজন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যাধুনিক মেশিন আছে। ওই মেশিন বাতাসের চাপও আলাদা করতে পারে। আমার নাম বলা হলেও আমি সোনা পরিমাপ করি নাই। আমি শুধু সোনার গুণাগুণ পরীক্ষা করেছি। আমরা কস্টি পাথর দিয়ে প্রচলিতভাবে সোনা পরীক্ষা করি। আমাদের পরীক্ষায় ১৮ ক্যারেটের সোনা পাই। আধুনিক মেশিন নিয়ে পরীক্ষা করলে সামান্য হেরফের হতে পারে। তবে ২২ ক্যারেটের সোনা ১৮ ক্যারেট হবে, এটা অসম্ভব। এত হেরফের সম্ভব নয়। ২২ ক্যারেট বড়জোর ২১ ক্যারেট হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ‘‘আমাকে গত জানুয়ারি মাসে এ নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন। আমি তাঁদের এ সব কথাই জানিয়েছি।”
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভল্ট এলাকাকে মহানিরাপত্তা এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে যে ভল্টে স্বর্ণ থাকে সে ভল্টে ঢুকতে গেলে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পার হতে হয়। এ ছাড়া গেট পার হতে কার্ড পাঞ্চ করে ভেতরে ঢুকতে হয়। কলাপসিবল গেট তো আছেই। বের হওয়া ও প্রবেশের সময় দেহ তল্লাশি করা হয়। যে ভল্টে স্বর্ণ থাকে তাকে বুলিয়ন ভল্ট বলে। ভল্টের প্রধান ফটক থেকে ভল্ট পর্যন্ত তিনটি দরজা আছে। প্রতিটিতে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। এই ভল্টের ভেতরে আলাদা আলমারি আছে। সেগুলোর জন্য আছে আলাদা চাবি। এসব চাবি থাকে সিন্ধুকে। এর দায়িত্বে থাকেন দু’জন কর্মী। এর বাইরে সিসিটিভির ব্যবস্থা তো আছেই। ভল্ট বন্ধ হলে এখানে কেউ ঢুকতে পারেন না। শুধু কারেন্সি অফিসার, জয়েন্ট ম্যানেজার বুলিয়ন (স্বর্ণ), জয়েন্ট ম্যানেজার ক্যাশ ও ডিজিএম ক্যাশ ভেতরে ঢুকতে পারেন। এর বাইরে অন্য কেউ ঢুকতে হলে কারেন্সি অফিসারের অনুমতি নিতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে নিরাপত্তার দায়িত্বে ৭০ জন রিজার্ভ পুলিশ রয়েছে। যারা ব্যাংকের বাইরে কোথাও যায় না। তারা শুধু ব্যাংকের ভেতরেই দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকে ভল্টে কেউ ইচ্ছে করলেই এককভাবে ঢুকতে পারবে না। মূল ভল্টে প্রবেশের জন্য তিনটি চাবির দরকার হয়। এগুলো থাকে তিনটি পক্ষের কাছে। এর একটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার, আরেকটি শুল্ক কর্তৃপক্ষের এবং অপরটি তালিকাভুক্ত স্বর্ণকারের জিম্মায় থাকে। এসব চাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টের পাশে একটি সিন্দুকে সংরক্ষিত থাকে। তিনটি চাবির জিম্মাদারের কাছে থাকে সিন্দুকের চাবি। ফলে তিনজনের উপস্থিতি ছাড়া ভল্টে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বর্ণ গচ্ছিত রাখার বিষয়ে খাতাকলমে এত সব আটঘাট বাঁধা থাকার পরও কেন এর মান ও পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তা খুবই উদ্বেগজনক। অভিযোগ সত্য হলে এটি হবে বড় ধরনের বিপর্যয়। সে ক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে রক্ষকরাই ভক্ষক। আর তাদের শেকড় খুব গভীরে। যা এখন জনস্বার্থে বের করে আনতে হবে। না হলে জনমনে সংশয় ও প্রশ্ন আরও বাড়তে থাকবে। 
যে কারণে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে
ভল্টে স্বর্ণ কারসাজির ঘটনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কিছু কর্মকা- রহস্যের এবং প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে বছরের পর বছর ধরে স্বর্ণ জমা হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠানের কেন স্বর্ণ পরিমাপ বা মান পরীক্ষার নিজস্ব মেশিন নেই। বর্তমানে স্বর্ণ পরিমাপের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকতেও তারা কেন সনাতন পদ্ধতিতে কষ্টিপাথর দিয়ে স্বর্ণ পরিমাপ করছে? দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তারা ৪ কোটি টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে স্বর্ণ পরিমাপের একটি মেশিন কিনেছিলেন কিন্তু সেটি পিতলকেও স্বর্ণ হিসেবে দেখায়। পরে ওই মেশিন ফেরত দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, ৪ কোটি টাকার মতো বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে মেশিন কেনার আগে সেটি কেন পরীক্ষা করা হয়নি। অথবা ওই মেশিন ফেরত দেওয়া হলেও এত দিনেও কেন নির্ভুল মেশিন কেনা হয়নি।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান স্বর্ণ পরিমাপের জন্য কেন শুধুমাত্র একজন স্বর্ণকারের ওপর নির্ভর করেছে। চতুর্থত, শুল্ক গোয়েন্দাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ৯৬০ কেজির স্বর্ণালঙ্কার ও বারের বেশিরভাগেই কারসাজি করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো -এতো স্বর্ণের মধ্যে দুয়েকটির মান বা পরিমাপে সামান্য হেরফের হতে পারে। কিন্তু ৯৬০ কেজির বেশিরভাগেই এই হেরফের কিভাবে হলো? এত স্বর্ণ কিভাবে ২২ ক্যারেট থেকে ১৮ ক্যারেট হলো? 
পঞ্চমত, সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, শুল্ক গোয়েন্দারা  স্বর্ণ জমা রাখার সময় ৪০ ক্যারেটই ছিলো। তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার তা ভুলে ৮০ ক্যারেট লিখেছেন। কিন্তু স্বর্ণকার গিয়াস উদ্দিন দাবি করেছেন, তিনি শুধু স্বর্ণ যাচাই করেন। লিপিবদ্ধ করেছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। সুতরাং তার ভুল করার প্রশ্নই আসে না। আরো একটি বিষয় হচ্ছে- দুয়েকটি অলঙ্কার বা বারে ক্যারেট লেখায় এই ভুল ত্রুটি হতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগেই কিভাবে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণ ১৮ ক্যারেট হয়ে গেলো? অথবা কিভাবে ৪০ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণের জায়গায় ৮০ শতাংশ লেখা হয়ে গেলো। 
রহস্য এখানেই শেষ নয়। একটি উদাহরণ তুলে ধরে শুল্ক গোয়েন্দার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কাস্টম হাউসের একজন কর্মকর্তা গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছিলেন। যা ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ছিলো। জমা দেয়ার সময় ওই চাকতি ও আংটিতে ৮০ শতাংশই বিশুদ্ধ স্বর্ণ ছিলো। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬.৬৬ বিশুদ্ধ সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫.১২ শতাংশ। অর্থাৎ এর বেশির ভাগেই শংকর বা মিশ্র ধাতু মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।  কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ওই চাকতি ও আংটি আগের মতোই আছে। স্বর্ণ হেরফের হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে শুল্ক গোয়েন্দারা কি তাহলে ভুল বা মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়েছে! আর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে এক বছর ধরে পরীক্ষা করে মিথ্যা বা ভুল প্রতিবেদন দিয়ে তাদের লাভ কি? এছাড়া শুল্ক গোয়েন্দা বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এসব অনিয়মের প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। যেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার স্বাক্ষরও রয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুতেই ওই প্রতিবেদনের তথ্য অস্বীকার করতে পারে না।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তোলপাড়, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা স্বর্ণ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনবিআর সদস্যকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একইসঙ্গে অতি দ্রুত এই ঘটনার সমাধানের নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় এবং বিভিন্ন মহলের মন্তব্যে উষ্মা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টির দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্যকে গণভবনে ডেকে পাঠিয়ে এ নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টের সোনার হিসাব ও ওজনে গরমিল বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের দেওয়া প্রতিবেদন নিয়ে গণমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশ করায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বিষয়টির দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যানকে গণভবনে ডেকে পাঠান। রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান দেশে না থাকায় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (আন্তর্জাতিক চুক্তি) কালিপদ হালদার বৈঠকে অংশ নেন। সকাল ১১টার দিকে এ বৈঠক শুরু হয়ে ঘণ্টাব্যাপী চলে।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন প্রধানমন্ত্রী। শুল্ক গোয়েন্দাদের গোপনীয় প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি। এ সময় অতি দ্রুত যাতে এ সমস্যার সমাধান হয় সে বিষয়ে উভয়পক্ষকেই নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
ভল্টে স্বর্ণালংকার বদলে নকল জিনিস রাখা হয়েছে: ফখরুল 
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভোল্টে স্বর্ণালংকার বদলে নকল জিনিস রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, দেশে আজ দুর্নীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে! বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা রাখার পর সেটা বদলে মিশ্র ধাতু-জাতীয় জিনিস রাখা হয়েছে। এগুলোতো আপনা আপনি হয়নি! অলংকারগুলো বদলে সেখানে নকল জিনিস রাখা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে হ্যাকিং করে টাকা লুট করা হলো। যার প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যারা এর সঙ্গে জড়িত, তাদের হাত অনেক লম্বা। অর্থমন্ত্রী বারবার এই ধরনের লোকদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন, আশ্রয় দিচ্ছেন। তিনি সরকারের ইচ্ছা পূরণ করছেন। আর বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ ফোকলা করে দিচ্ছেন। গত বুধবার ১৮ জুলাই দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে তিনি এসব কথা বলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এর আগে রিজার্ভ চুরি হলো, আবার ব্যাংকের ভল্টে এই ধরনের ঘটনা -এটা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। এগুলো কিসের আলামত? এগুলো হচ্ছে স্বৈরাচারী সরকারের আলামত। তারা দেশটাকে লুটেপুটে খাওয়ার জন্য যেখানে যা করা দরকার তা আজকে করছে। 
১৭ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনাসভায় ড. মোশাররফ এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা আমরা দেখার জন্য অপেক্ষা করছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হওয়ার পরে যেভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, এই ভল্টের কারসাজির পর আবার যদি এ রকমের ধামাচাপা দেওয়া হয় তাহলে জনগণের কাছে একদিন সকলকে জবাবদিহি হতে হবে।’
তদন্ত কমিশন গঠন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি 
ভল্টে স্বর্ণ কারসাজির ঘটনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নিবার্হী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংকে আরো একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রকাশ পেল। আর সরকারেরই আরেকটি সংস্থা শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর তদন্ত করে এই কেলেঙ্কারির ঘটনা উদঘাটন করেছে। কিন্তু এরপর আমরা দেখছি অস্বীকার করার প্রবণতা। বাংলাদেশ ব্যাংক অস্বীকার করছে। আমরা আগে দেখেছি সরকারি প্রতিষ্ঠান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অস্বীকার করে। কিন্তু এবার সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রতিবেদন আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রত্যাখ্যান করছে, যা দুঃখজনক।” তাঁর কথায়, ‘‘অস্বীকার না করে সরকারের উচিত হবে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে স্বর্ণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসলে কী ঘটেছে, তা বের করে প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরা। এরইমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। নতুন করে কোনো আস্থাহীনতা তৈরি করা ঠিক হবে না। তাই যা ঘটেছে তা প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘আশা করি বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করবে এবং সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেবে। কী কী প্রক্রিয়ায় এটা করা হয়েছে, কারা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেটা বের করা তাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশ ব্যাংক এটা করতে না পারলে তাদের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে, তাদের কর্মকা- প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিষয়টি জেনে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এটি অকল্পনীয়। যারা কাস্টডিয়ান, তাদের হাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বিস্মিতই হতে হয়। ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘ব্যাংকে কাজ করার সূত্রে আমি জানি, এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকেন হাতে গোনা কয়েকজন। পরিদর্শন প্রতিবেদনে যে তথ্য এসেছে, সে তথ্য থেকে ঘটনার সময় যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে সব বের হয়ে আসবে। ঘটনাটিকে ছোট ভাবার কারণ নেই। ভল্টের মতো উচ্চ গুরুত্বের জায়গায় এমন অনিয়মকে গুরুত্ব না দিলে আরও বড় ঘটনা ঘটতে পারে।’
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)