বৃহস্পতিবার, ১৩-ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • সাড়ে ১০ হাজার ভুয়া হজযাত্রী, রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ বাড়ালো মন্ত্রণালয়

সাড়ে ১০ হাজার ভুয়া হজযাত্রী, রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ বাড়ালো মন্ত্রণালয়

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ জুলাই, ২০১৮ ০৬:১৭ অপরাহ্ন

হানজালা শিহাব, ঢাকা: প্রতিবছর হজযাত্রী ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বা প্রতিস্থাপনের নামে হজ এজেন্সিগুলো ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে আসছে। এতে সঠিক সময়ে নিবন্ধন করেও শেষমুহূর্তে অনেকে হজে যেতে পারেন না। বিমানবন্দর থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে হজের ইচ্ছা পূরণ না হওয়ার যন্ত্রণা বুকে চেপে বাড়ি ফিরতে দেখা যায় হাজার হাজার হজযাত্রীকে। এ বছরও সেই পথ বন্ধ হয়নি। বরং আগের তুলনায় রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ দ্বিগুণ করেছে মন্ত্রণালয়। ফলে অবৈধভাবে বাড়তি টাকা আয়ের পথ যেমন সুগম হয়েছে এজেন্সিগুলোর জন্য, সেই সাথে প্রকৃত নিবন্ধিত হজযাত্রীদের জন্য প্রতিবছরের ন্যায় হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কাও বড়লো। তবে এ বিষয়ে চলতি বছরে কিছুই করার নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। 
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হজ এজেন্সিগুলো আগের মতো এবারও সাড়ে ১০ হাজার ভুয়া হজযাত্রী নিবন্ধন করে রেখেছে। এখন তাদেরকে রিপ্লেসমেন্টের জন্য মন্ত্রণালয়ে ধর্ণা দিচ্ছে। মূলত, প্রতিস্থাপনের নামে বাড়তি টাকায় নতুন হজযাত্রী নেওয়া হবে। যারা আগে তথা নির্ধারিত সময়ে নিবন্ধন করেননি। সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়াই হচ্ছে এজেন্সিগুলোর এই প্রতিস্থাপনের মূল লক্ষ্য। সেই ধান্দাই করছেন এজেন্সির মালিকরা।
এদিকে আগের বছরগুলোতে ৪ শতাংশ রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। অর্থাৎ এবার হজ এজেন্সিগুলো ৮% প্রতিস্থাপনের সুযোগ পাচ্ছে। আগামী ২৪ জুলাই, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে এজেন্সিগুলোকে আবেদনপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পেছনে এজেন্সিগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা এ অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
তবে এই রিপ্লেসমেন্টের অন্তরালে প্রকৃত নিবন্ধিত হজযাত্রীদের বাদ দিয়ে এজেন্সিগুলো নিজেদের ইচ্ছে মতো বেশি টাকায় নতুন লোক ঢুকিয়ে দেওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়ও। এ জন্য নিবন্ধিত সংশ্লিষ্ট সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তির কাছে মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হয়েছে বলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন। একই সাথে ধর্ম মন্ত্রণালয় ও সৌদি সরকারের আদেশ অমান্য করে হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার দায়ে ৪টি হজ এজেন্সিকে শোকজ করার কথাও জানিয়েছেন ধর্মসচিব মো. আনিছুর রহমান। 


সাড়ে ১০ হাজার ভুয়া হজযাত্রী 
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধিত ১ লাখ ২০ হাজার হজযাত্রীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ১০ হাজার ভুয়া হজযাত্রী রয়েছে। ধর্মমন্ত্রণালয়ের এক অনুসন্ধানে এ তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। 
ধর্মসচিব মো: আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, ভুয়া পাসপোর্ট অথবা জন্মনিবন্ধন দিয়ে হজ এজেন্সিগুলো নিবন্ধন করেছে। এখন তাদের বিপরীতে প্রতিস্থাপন চাওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে এজেন্সিগুলো অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সুযোগ নিতে পারে। 
সচিব বলেন, গত ২৫ এপ্রিল নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর অনুসন্ধান করলে এসব ভুয়া হজযাত্রী ধরা পড়ে। কিন্তু এ বছর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগামীতে এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
এদিকে হজযাত্রীর গুরুতর অসুস্থতা অথবা মৃত্যুজনিত কারণে আগে ৪ শতাংশ হজযাত্রী প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেয়ার পর নতুন করে আরও ৪ শতাংশসহ মোট ৮ শতাংশ হজযাত্রী প্রতিস্থাপনের সুযোগ দিয়েছে ধর্মমন্ত্রণালয়। 
এ বিষয়ে ২১ জুলাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব এসএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি বিজ্ঞপ্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বেসরকারি এজেন্সি মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হজযাত্রী প্রতিস্থাপনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। শুধু গুরুতর অসুস্থতা অথবা মৃত্যুজনিত কারণে হজযাত্রী প্রতিস্থাপন করা যাবে। এ জন্য উপযুক্ত চিকিৎসকের সনদ দাখিল করতে হবে। এজেন্সিকে তাদের নিজস্ব প্যাডে পরিচালক হজ অফিস বরাবর ২৪ জুলাই বিকেল ৫টার মধ্যে আবেদন করতে হবে। এর সাথে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার দুপুরে ধর্মসচিব মো. আনিছুর রহমান শীর্ষনিউজকে বলেন, ৪৯৫টি এজেন্সি ৬ হাজার ৪১৯ জন হজযাত্রী প্রতিস্থাপনের আবেদন করেছে। এর মধ্যে একটি এজেন্সিই ৭৭ জনের জন্য আবেদন করেছে। এছাড়া ৪৭, ৩৯, ৩৭, ৩৫ জনের জন্যও আবেদন করেছে কয়েকটি এজেন্সি। এ জন্য আমরা আগের ৪ শতাংশের সাথে এবার নতুন করে আরও ৪ শতাংশ হজযাত্রী প্রতিস্থাপনের সুযোগ দিয়েছি। বেসরকারি এজেন্সিগুলো যে ৬ হাজার ৪১৯ জনের বিপরীতে প্রতিস্থাপন চেয়েছে, সেসব হজযাত্রীকে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে মোবাইল ফোনে মেসেজ দেয়া হয়েছে। 
সচিব বলেন, ‘স্বচ্ছতার জন্য এটা করা হয়েছে। অনেক সময় ভালো ব্যক্তিকেও অসুস্থ বা মারা গেছেন দেখিয়ে হজযাত্রী প্রতিস্থাপন করে অবৈধ লেনদেন করে থাকে এজেন্সিগুলো। এবার যাতে সেটা করতে না পারে সে জন্য আগে থেকেই আমরা সতর্ক আছি।’ 
ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি বছর ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৯৮ জন হজযাত্রীর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন ১ লাখ ২০ হাজার। সেই হিসাবে ৮% হারে ৯ হাজার ৬শ জন রিপ্লেসমেন্টের সুযোগ নিতে পারবে এজেন্সিগুলো। 
সূত্র বলছে, রিপ্লেসমেন্ট বা প্রতিস্থান করা হজযাত্রীর ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা করে বেশি নিচ্ছে এজেন্সিগুলো। এর মাধ্যমে এজেন্সিগুলো প্রায় অর্ধ কোটি টাকা অবৈধ পন্থায় হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দা করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।  


শীষনিউজের সঙ্গে আলাপকালে ধর্মসচিব আনিছুর রহমান জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৪৫২ জনের ভিসা সম্পন্ন হয়েছে। হজ কার্যক্রমে অংশ নেয়া ৫২৮টি এজেন্সির মধ্যে ৫১১টি এজেন্সি গতকাল পর্যন্ত  ১ লাখ ৫ হাজার ৪৪২ জনের বিমান বাংলাদেশ ও সৌদি এয়ারলাইন্সের টিকিটের জন্য পে-অর্ডার ইস্যু করেছে। বাকি হজযাত্রীদের অনুকূলে বিমানের টিকিট ইস্যু করতে এজেন্সিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। 
গতকাল পর্যন্ত ৩৭ হাজার ২২২ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন বলেও জানিয়েছেন ধর্মসচিব। 
হজযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণায় ৪ এজেন্সিকে শোক
এদিকে সৌদি সরকারের নীতির ভিত্তিতে হজযাত্রী প্রেরণের ৭২ ঘণ্টা আগে তাদের মোয়াল্লেম, মক্কা ও মদিনায় ভাড়া বাড়ির ঠিকানাসহ বিভিন্ন তথ্য জানাতে এবং প্রত্যেকের পাসপোর্টের পেছনে এসব তথ্যের স্টিকার লাগিয়ে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ৪টি এজেন্সি সেই নির্দেশনা অমান্য করায় তাদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। ধর্ম মন্ত্রণায় থেকে গতকাল শনিবার এই নোটিশ দেওয়া হয়। এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। 
এ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে হজ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সৌদি সরকারের হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় থেকে হজযাত্রীদের জন্য মক্কা ও মদিনার ভাড়াকৃত বাড়ি/হোটেলের ঠিকানা ও মোয়াল্লেম নম্বর সম্বলিত স্টিকার পাসপোর্টে সংযুক্ত করে হজযাত্রীদের সৌদি আরব প্রেরণের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি যথাযথভাবে প্রতিপালনের জন্য একাধিকবার হজ এজেন্সিগুলোকে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু ৪টি এজেন্সি বিষয়টি প্রতিপালন না করে হজযাত্রীদের সৌদি আরব প্রেরণ করায় হজযাত্রীগণ বিপাকে পড়েছেন। যার ফলে সৌদি হজ মন্ত্রণালয় থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। 
ওই ৪টি হজ এজেন্সি হলো- আকবর ওভারসীজ (লাইসেন্স নং ৬১৬), মোবস্বের ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস (লাইসেন্স ১০৫৫), ক্যাসক্যাড ট্রাভেলস এন্ড ট্যুরস (লাইসেন্স ৭১৩) ও আল সেকেন্দর এন্ড ট্রাভেলস। 
এর মধ্যে আকবর এজেন্সি গত ১৬ জুলাই এসভি-৩৮৫৭ ফ্লাইটে ৮৯ জন হজযাত্রী প্রেরণ করেছে। কিন্তু কোনো যাত্রীর পাসপোর্টে মোয়াল্লেম ও বাড়ির ঠিকানা সংশ্লিষ্ট স্টিকার ছিল না। মোবাস্বের এজেন্সিও একই তারিখে এসভি ৩৮২৬ ফ্লাইটে ৪৯ জন হজযাত্রী প্রেরণ করে। তাদেরও মোয়াল্লেম ও ভাড়া বাড়ির সংশ্লিষ্ট তথ্য পাসপোর্টে সংযুক্তি করা হয়নি।
অপরদিকে, ক্যাসক্যাড এজেন্সি গত ১৮ জুলাই তোজাম্মেল হক ও শেফালী বেগম নামে দু’জনকে সৌদি আরব পাঠান। তারা দু’জন স্বামী-স্ত্রী হলেও তাদেরকে মক্কায় ভিন্ন বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা করে এজেন্সি। এছাড়া আল সেকেন্দার এজেন্সিও ১৮ জুলাই ২২২ জন হজযাত্রী পাঠায়। এর মধ্যে ৯০ জনের তথ্য সৌদি ই-হজ সেস্টেমে ‘প্রি-এ্যারাইভাল ডাটা আপলোড’ না করে মদিনায় প্রেরণ করেছে। 
এ নিয়ে সৌদির চরম আপত্তি ও কঠোর প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসে।
উল্লেখিত, ৪টি হজ এজেন্সিকে গত ২১ জুলাই পাঠানো শোকজ নোটিশে ধর্ম মন্ত্রণালয় বলেছে, কেন বাংলাদেশ এবং সৌদি হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন না করে- হাজীগণকে সৌদি আরবে প্রেরণ করেছেন, সে বিষয়ে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (হজ) এসএম মনিরুজ্জামান এ নোটিশে স্বাক্ষর করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার ধর্মসচিব শীর্ষনিউজকে বলেন, যারা সেখানে গেছেন তারা আগে থেকে ভাড়া করা বাড়িতেই উঠেছেন। হজযাত্রীদের থাকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে পাসপোর্টের সাথে বাড়ি নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য সংযুক্তির স্টিকার থাকলে বিমানবন্দর থেকে সহজে তাদেরকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। নয়তো বিমানবন্দরে নামার পর তাদের কিছুটা বিলম্ব হয়, হয়রানিতে পড়তে হয়। 
যাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছিল, তাদেরকে সৌদিতে অবস্থানরত ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হজ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এজেন্সিগুলোর সঙ্গে কথা বলে সমস্যার দ্রুতই সমাধান করেছেন। এ ধরনের সমস্যা আর হবে না বলে আশা করছেন ধর্মসচিব। 
শীর্ষনিউজ/এইচএস