বুধবার, ২৪-অক্টোবর ২০১৮, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • ভিকারুননিসায় অবৈধ লেনদেনে ভর্তি: নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ মন্ত্রণালয়ও

ভিকারুননিসায় অবৈধ লেনদেনে ভর্তি: নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ মন্ত্রণালয়ও

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২২ জুলাই, ২০১৮ ১২:৫৪ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: রাজধানীতে মেয়েদের জন্য ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজকে অন্যতম মনে করা হয়। যে কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পছন্দের তালিকার প্রথমদিকে থাকে বেসরকারি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু একে পুঁজি করে গত ক’বছর ধরে অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে ভিকারুননিসা পরিচালকনা কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক প্রভাবে পদ দখল করা প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সদস্যদের সঙ্গে এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষও জড়িত বলে জানা গেছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিবাদ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা অধিদফতর এমনকি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বা নিয়ম-নীতিকেও পাত্তা দিচ্ছে না ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। প্রতিবছরই নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে কোটার নাম করে ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে অতিরিক্ত ছাত্রী ভর্তি করা হচ্ছে ভিকারুননিসায়। চলতি বছরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ২শ’র বেশি ছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে। যা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসকে শোকজ নোটিশও করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওই নোটিশকেও কোনো গুরুত্ব দেননি ভিকারুননিসা অধ্যক্ষ। এর আগেও শিক্ষার্থীদের থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের দায়ে বিদ্যালয়টির সাবেক এক অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিতও করা হয়েছিল। আর ২০১৬ ও ২০১৭ সালেও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির দায়ে অভিযুক্ত এই বিদ্যালয়টি।
অভিভাবকরা বলছেন, ভিকারুননিসাকে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এটি বর্তমানে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকরাও আগের মতো ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে পড়াচ্ছেন না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কোচিং বাণিজ্যে জড়িত। যা চলতি বছরের শুরুর দিকে দুদকের তদন্তে বেরিয়ে আসে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্টের পেছনে প্রতিষ্ঠানটির তেমন কোনো ভূমিকা নেই। বরং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নিরলস প্রচেষ্টা ও মেধাবীরা এখানে ভর্তি হওয়ার কারণেই পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো হচ্ছে। তারা এও বলছেন যে, শিক্ষার নামে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ ও তাদের বাণিজ্যিক কর্মকা- রোধে গভর্নিং বডিসহ সংশ্লিষ্ট দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় এক সময়ের ঐতিহ্যবাহী ও দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৌরব হারাবে ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
ঘুষ বাণিজ্যে ২০৯ শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে জবাব পায়নি মন্ত্রণালয় 
‘টাকার বিনিময়ে ও তদবিরের মাধ্যমে চলতি শিক্ষাবর্ষে আসনের চেয়ে অতিরিক্ত ২০৯ শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। এ ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সভাপতিসহ একাধিক সদস্য মূল ভূমিকা রেখেছেন। প্রতি শ্রেণিতে নির্ধারিত আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর মাধ্যমে মূলত স্কুলটিকে পুরোপুরি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।’ বিভিন্ন মহল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদফতরে এমন একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে। 
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে- এর জবাব চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব কামরুল হাসানের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত ২৭ মে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের কাছে পাঠানো হয়। তবে ৫ জুলাই, ১৮ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো জবাব দিতে পারেনি। আর অতিরিক্ত ভর্তিও বাতিল করা হয়নি। এ তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। 
সূত্র জানিয়েছে, কোনো ধরনের নিয়ম-নীতি না মেনে প্রতিবারের ন্যায় এবারও কিছু সুপারিশের মাধ্যমে ভর্তি করা হলেও অতিরিক্ত ২০৯ জনের বেশিরভাগই ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, বোনের কোটা, মুক্তিযোদ্ধার কোটা, বদলিসহ বিভিন্ন ইস্যু দেখিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম। তারা বলেছেন, শিক্ষার্থী ভর্তির নামে লাখ লাখ টাকা অবৈধ আয় করেছেন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা কমিটির ক’জন সদস্য। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু। 
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভর্তির আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি ভর্তি নীতিমালা জারি করা হয়। এরপরও অযৌক্তিকভাবে সুপারিশের অযুহাত দেখিয়ে নীতিমালা অমান্য করে নামিদামি স্কুলগুলো। ভিকারুননিসা স্কুলও তাই করেছে।
তবে গভর্নিং বডির সদস্য মুনসুর আলীর দাবি, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুপারিশে ভর্তি করা হয়েছে। অবশ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন এই জবাব চেয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই এই সদস্যের। আর প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম আশরাফ তালুকদার দাবি করেছেন, ২০৯ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন সুপারিশের ভিত্তিতে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তাদের সুপারিশেও কিছু ভর্তি করা হয়েছে। 
এ নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি যদি এই অনিয়মের সাথে জড়িত থাকে এবং এটি প্রমাণ হয়, তাহলে সেই কমিটি ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে বোর্ডের।’ 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০১৬ সালেও ভিকারুননিসায় অবৈধভাবে শিক্ষার্থী ভর্তির কারণে দুই সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কমিটির প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। গত বছরও ভর্তি নীতিমালা না মানার কারণে অভিযুক্ত হয়েছিল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ভর্তি নীতিমালা না মানায় ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিত করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই বছর ভিকারুননিসা স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ১০০ টাকা আদায় করেছিল।  
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)