বুধবার, ২৪-অক্টোবর ২০১৮, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • বিরোধী দলগুলো জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে সংঘবদ্ধ হচ্ছে

বিরোধী দলগুলো জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে সংঘবদ্ধ হচ্ছে

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৯ জুলাই, ২০১৮ ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: সরকারবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ জন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সুবিধাভোগী দলগুলোর বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারসহ গণতন্ত্রের স্বার্থে বেশ কিছু দাবির ভিত্তিতে এই ঐক্য গড়ে তোলা বিএনপির মূল লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোটের শরীকরাও বরাবরই বিএনপির সঙ্গে ঐক্যমত পোষণ করছে বলে জানা গেছে। তবে যাদের নিয়ে এই ঐক্যের উদ্যোগ, তাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু শর্ত নিয়ে দেন-দরবার চলায় বিষয়টি এতদিনে আলোর মুখ দেখেনি। সর্বশেষ এ প্রক্রিয়া ভেতরে ভেতরে অনেকদূর এগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যেও এর প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি গত ২৯ জুন ১৪ দলের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের নামে চক্রান্তকারীরা এক হচ্ছে।
সূত্র বলছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি লন্ডনে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় ঐক্য নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে তারেক রহমান বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন বলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব। বিএনপি সূত্রের দাবি, ওই বৈঠক থেকেই ঐক্য প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য ফখরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপরই সম্ভাব্য ওই প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। 
অপরদিকে, একাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অন্যরাও তৎপর হয়েছেন। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ওইসব দলও বর্জন করেছিল। তারাও চান, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে সমান সুযোগ তৈরির ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। যেখানে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। যেহেতু একই ইস্যুতে বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন ২০ দলের দাবিও অভিন্ন, তাই জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐক্য আন্দোলনের পথ ত্বরান্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একটি মামলার রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর নানা কৌশলে তাকে শ্যোন অ্যারেস্টে আটকে রাখায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এটিও জাতীয় ঐক্য গঠনে গতি সঞ্চালন করছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। এদিকে যুক্তফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। যার প্রেক্ষিতে টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিতব্য একটি পৌরসভা নির্বাচনে বঙ্গবীরের মেয়রপ্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। সেই সাথে কাদের সিদ্দিকীর প্রার্থীর পক্ষে স্থানীয় বিএনপির নেতারা প্রচার মিছিলেও অংশ নিয়েছেন। যা জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট বিরোধী বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কোরবানীর ঈদের আগেই সেই ঘোষণা আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। আর সেটি সফল হলে ‘আওয়ামী লীগ তিনদিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না’- এমন কথাও বলছে বিএনপি। সেই সাথে ‘সরকারের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপি মহাসচিব এও বলেছেন যে, জাতীয় ঐক্যের জন্য বিএনপি জোরালো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 
সূত্রমতে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর এরই মধ্যে পাঁচ মাস চলে গেছে। কিন্তু বিএনপি এ পর্যন্ত কোনো কঠোর বা সহিংস কর্মসূচি দেয়নি। এর পেছনে মূলত মিত্র দেশ ও বন্ধুপ্রতীম রাজনৈতিক দলের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের পরামর্শ। তাদের পরামর্শকেই গুরুত্ব দিয়েছে একাধিকবার রাষ্ট্র পরিচালনাকারী এই দলটি। বিএনপির শুভাকাঙ্খীরা কেউই সহিংস কোনো কর্মসূচির পক্ষে ছিলেন না। বরং বারবার বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন সমমনারা। বিএনপিও সমমনাদের সেই পরামর্শে গুরুত্ব দেওয়ায় জাতীয় ঐক্য গঠনের পথ সহজ হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। 
দলীয় সূত্র বলছে, এখন জাতীয় ঐক্যের ব্যানারে সংঘবদ্ধভাবে যৌথ কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনে নামার চেষ্টা চলছে। যার মূল লক্ষ্য- ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে ‘বিদায় করা’ ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা। এই উদ্যোগ সফল হলে খালেদা জিয়ার মুক্তিতেও কোনো বাধা থাকবে না বলে মনে করছে বিএনপি। ফলে বিষয়টি সরকারের জন্যও বেশ মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের মাথাব্যথার আরও কারণ হলো, জাতীয় ঐক্যের এই প্রচেষ্টায় রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুশীল সমাজের বেশ ক’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীসহ কূটনীতিকরাও তৎপরতা চালাচ্ছেন। এমনকি এতে প্রতিবেশী দেশসহ বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার পূর্ব-পশ্চিমের বেশ ক’টি দেশের নেপথ্যে সহযোগিতা রয়েছে বলেও গুঞ্জন আছে। 
‘বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাজ্য’ 
গত ২৯ জুন, ঢাকায় সফররত যুক্তরাজ্যের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজধানীর বারিধারায় যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের বাসায় ওইদিন সন্ধ্যায় প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন- দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অপরদিকে ব্রিটিশ মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক। 
জানা গেছে, দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, খালেদা জিয়ার মামলা, খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচন ও আসন্ন তিন সিটির নির্বাচন এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। একইদিন ঢাকায় এসে দুপুরে যুক্তরাজ্য হাইকমিশনারের বাসায় সংবাদ সম্মেলনে মার্ক ফিল্ড বলেছেন, ‘বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায় যুক্তরাজ্য। যেখানে সব দল ভূমিকা রাখবে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের এখানকার নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।’ তিনি মনে করেন, নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হবে, তাতে জনমতের প্রতিফলন ঘটবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধি এবং ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকরাও একই কথা বলেছেন। 
বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে রাজি উদারপন্থী ৫ দল
বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী জোট হবে কি না সে প্রশ্নের মীমাংসা এখনো না হলেও মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যুতে আপাতত দলের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে সম্মত হয়েছে বিকল্পধারা, গণফোরামসহ উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত পাঁচটি দল। অন্য দলগুলো হলো আসম রবের নেতৃত্বাধীন জাসদ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, ৯ বা ১১ দফা দাবিতে ঐকমত্য হতে পারে। ওই নেতা বলেন, বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট সব দলকে একটি করে খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। ওই সব প্রস্তাবের মধ্যে কমন ইস্যুগুলোতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের সূচনা করা হবে।
এ প্রসঙ্গে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘জনগণের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি হতেই পারে। আমরা সব সময়ই চাই, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এসব ইস্যুতে আমরা যুগপৎ কর্মসূচিতে যেতেই পারি।’ গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন এখন সময়ের দাবি এবং পরিস্থিতি ওই দিকেই যাচ্ছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বেশ কিছু দাবির ভিত্তিতে আমরা একমত হয়েছি। এসব ইস্যুতে প্রথমে যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করা হবে। পরে রাজনৈতিক জোটও হতে পারে।’
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘আমরা বহুদিন ধরে ঐক্যের কথা বলছি। এরই মধ্যে যুক্তফ্রন্টও গঠন হয়ে গেছে। বিএনপির সঙ্গেও জোট গঠন হতে পারে।’
যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী অবশ্য বলেছেন, এ বিষয়ে বলার মতো সময় এখনো হয়নি, হলে জানানো হবে। জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিস্তারিত পরে জানাব।’ এই ঐক্যের নেপথ্যের উদ্যোক্তা ও গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কমন কিছু ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে যুগপৎ আন্দোলন হবে বলে শুনছি। বিএনপি এবার খুব আন্তরিক। প্রস্তাবনাগুলো তৈরি হচ্ছে।’
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে চান কাদের সিদ্দিকী
টাঙ্গাইলের বাসাইল পৌরসভা নির্বাচনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এ সিদ্ধান্ত পেয়ে দলটির নেতাকর্মীরা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন। ২৭ জুন রাতে পৌরসভার নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যৌথ সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের নৈরাজ্য বন্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও বিএনপি একসঙ্গে কাজ করবে।’ এ সময় খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা প্রসঙ্গেও কথা বলেন কাদের সিদ্দিকী। বঙ্গবীর বলেন, ‘যে বিচারক খালেদা জিয়াকে শাস্তি দিয়েছেন। একসময় হয়তো তাকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’ ওই সভা শেষে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, জেলা বিএনপির সভাপতি শামছুল আলম তোফা ও সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবালসহ বিএনপি ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতাকর্মীরা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ মনোনীত গামছা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী রাহাত হাসান টিপুর সমর্থনে উপজেলা সদরে মিছিল বের করেন।
জাতীয় ঐক্য হলে সরকার ৩ দিনের বেশি টিকতে পারবে না 
গত ২৮ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। যদি আমরা জাতীয় ঐক্যে সফল হই, তবে আওয়ামী লীগ সরকার তিনদিনের বেশি টিকে থাকতে পারবে না।’ এ সময় তিনি আরও বলেছেন, ‘আইনের মাধ্যমে খলেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। একমাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে তাকে বন্দী করা হয়েছে। আর রাজনৈতিকভাবেই তাকে মুক্ত করতে হবে।’ ‘দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে এটা শুধু বিএনপির নয়, এই মহাসংকট হচ্ছে পুরো জাতির। দেশ স্বৈরাচারী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।’ এমন বক্তব্যও বিএনপি মহাসচিবের। এর পরের দিন ‘বর্তমান সরকারের বিদায়ের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। রিজভী এদিন এক সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেছেন, ‘যত কূটকৌশলই অবলম্বন করুন না কেন, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতেই হবে এবং সংসদ ভেঙে দিয়ে আগামী জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই দিতে হবে।’ এর আগে লন্ডন সফরকালে সেখানে প্রবাসীদের হতাশ না হতে বলেছেন বিএনপি মহাসচিব। সেখানে এক অনুষ্ঠানে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফখরুল বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্যের প্রচেষ্টা চলছে।’ এটি দ্রুত সফল হওয়ার আশার কথা তখন বলেছিলেন মির্জা ফখরুল। এর এক মাসের ব্যবধানে ঐক্য সফল হলে ‘সরকার তিনদিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না’- এমন বক্তব্য সঙ্গত কারণেই আওয়ামী শিবিরে বেশ আলোচিত হচ্ছে।
তারপরও সংশয়
বর্তমান সরকারের সুবিধাভোগী নয়, এমন রাজনৈতিক দলগুলোর সবাই এ মুহূর্তে একমত যে, ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই। সরকার বিরোধী যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এর আঙ্গিকে ঐক্যজোটও গঠন করতে হবে। শুধু তাহলেই সফলতা আসবে। কিন্তু তারপরও কিছুটা সংশয় রয়েই যাচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। কারণ, ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে সেক্ষেত্রে নেতৃত্ব অর্থাৎ সমন্বয়কের কে দায়িত্ব পালন করবেন তা নিয়ে এখনও দ্বিমত আছে। বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, এলডিপির সভাপতি কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ- এই চার নেতাই প্রত্যেকে চাচ্ছেন তারা নিজেরা সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকতে। অন্যদিকে আবার বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ঐক্যজোটের নেতৃত্বে থাকলেও সেক্ষেত্রে কে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন তা নিয়েও কিছুটা মতভেদ আছে। 
এটি ছাড়াও ‘জামায়াত’ ইস্যুসহ আরও কিছু বিষয়ে পুরোপুরি ফয়সালা এখনও হয়নি। জামায়াতকে নিয়ে কিছু দলের এলার্জি এখনও রয়ে গেছে। তারা চাইছে জামায়াতকে জাতীয় ঐক্যের বাইরে রাখতে। কিন্তু, নানান ঘাত-প্রতিঘাতের পরও জামায়াত এখনও বেশ শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিতসম্পন্ন। তাই বিএনপি কোনও ক্রমেই জামায়াতকে ছাড়তে রাজি নয়। কৌশলগত কারণে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলেও দলটির সঙ্গে বিএনপির সমঝোতা বরাবরই আছে এবং থাকবে, এমন তথ্য বিএনপি সূত্রে জানা গেছে। তারা মনে করছেন, সরকার সবচেয়ে বেশি ভয় পায় জামায়াতকে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতের সঙ্গে তলে তলে সমঝোতার চেষ্টা করে আসছে। বিএনপি তাদের জোট থেকে জামায়াতকে বের করে দিলেই আওয়ামী লীগ লুফে নেবে। তাই সেই সুযোগ দিতে চায় না বিএনপি।
এসব জটিলতার পরও জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আশাবাদী। অবশ্য, শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলেও যুগপৎ আন্দোলন অর্থাৎ রাজপথের ঐক্যের মধ্য দিয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।  
সতর্ক সরকারি দল ও সুবিধাভোগীরা
বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছে সরকারি দল, তাদের শরীক ও ক্ষমতার সুবিধাভোগীরা। বিএনপি মহাসচিব সরকারবিরোধী আন্দোলনে যে ‘জাতীয় ঐক্য’ গড়ার কথা বলেছেন, তাকে ভোটের মাঠে পরাজিত ‘অশুভ শক্তি’র নতুন ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম। ২৯ জুন ঢাকার ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। ‘আবারও একটি গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে’ মন্তব্য করে আওয়ামী লীগ সভাপতিমন্ডলীর এই সদস্য আরও বলেছেন, “তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের নামে আবারও কিছু মুখ চেনা অশুভ শক্তি মাঠে নামার চক্রান্ত করছে। আন্দোলনে, নির্বাচনের মাঠে পরাজিত হয় এই ধরনের কিছু অশুভ শক্তি আছে; তারা সব সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ভয় পায়। তারাই জাতীয় ঐক্যের নামে ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করছে। এই ঐক্যে কারা আছে আপনারা সবাই জানেন। আমরা দেখেছি তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে অসাংবিধানিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনতে চায়। যেটা আমরা অতীতে দেখেছি।” এর আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার বলেছেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের চক্রান্তকারীরা নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তবে আমাদের কাছেও এ বিষয়ে খবর আছে। তারা মনে করছে আমরা কিছু বুঝি না, জানি না। আপনারা কোন দেশে গিয়ে কোথায় কার সঙ্গে কখন বৈঠক করছেন, সব খবর আমাদের জানা। এসব ষড়যন্ত্র করে কোনো লাভ হবে না।’ এদিকে দু’জন সম্পাদকসহ চার ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাদের কর্মকা- পর্যবেক্ষণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। 
অপরদিকে, সুযোগ বুঝে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ আগাম ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, আগামী নির্বাচনে তারা মহাজোটে থাকবেন। আর আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্প্রতি তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মহাজোটের কথা উল্লেখ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগামী নির্বাচনে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। সেই সাথে প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন যে, আগামী নির্বাচন সহজ হবে না। নৌকা যদি ফেল করে সেই দায় তৃণমূলকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি দায় নিবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী।  
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সরকারের মন্ত্রীদের কথায় মনে হচ্ছে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের তৎপরতা চলছে। বিরোধী দলগুলোর প্রচেষ্টা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও সুষ্ঠু এবং সবার অংশগ্রহণে জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা। আর ক্ষমতাসীনরা চাচ্ছেন তাদের অধীনেই নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। 
প্রসঙ্গত, ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে পাঁচটি দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ২৩৭টি আসনের মধ্যে ২২৮টিতেই জয়ী হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। 
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)