সোমবার, ১৫-অক্টোবর ২০১৮, ০২:১৩ অপরাহ্ন
  • এক্সক্লুসিভ
  • »
  • স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে ইজিপির আড়ালে ডিজিটাল দুর্নীতি

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে ইজিপির আড়ালে ডিজিটাল দুর্নীতি

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৪ জুলাই, ২০১৮ ০৬:০৪ অপরাহ্ন

শীর্ষকাগজের সৌজন্য: স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরে (এইচইডি) টেন্ডারে ইজিপির আড়ালে শ’শ’ কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ একটি সিন্ডিকেট এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। গত এক বছরেই দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ৯০টি নির্মাণ কাজ থেকে এই চক্রটি হাতিয়ে নিয়েছে কমপক্ষে ১৮০ কোটি টাকা। আর গত পাঁচ বছরে এই লুটপাটের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে দফতরের উচ্চ পর্যায়ে ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে কাজ না করেই বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদার নামের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী ব্যক্তি। যা এখনো অব্যাহত আছে। 
তথ্য রয়েছে, কাজ না করে বিল জমা দেয়ায় তাতে স্বাক্ষর করতে না চাওয়ায় মারধরের শিকার হচ্ছেন এইচইডির মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা। এর মধ্যে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নোমান হোসাইন চলতি বছরের গত ২২ মার্চ মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্স’র মালিক উজ্জলের হাতে সরকারি অফিসে কর্মরত অবস্থায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ চক্রের সেল্টার থাকায় ওই ঠিকাদারকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। এভাবে সারা দেশে এইচইডিতে কর্মরত দেড় শতাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা- ঠিকাদার নামের মাস্তানদের নির্যাতন ও হুমকি-ধমকির শিকার হয়ে অবৈধ বিলে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সূত্র বলছে, শুধু টেন্ডার, বিল পরিশোধেই অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে তা নয়। এইচইডির কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণসহ সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে প্রধান কার্যালয় থেকে অবৈধ প্রক্রিয়ায়। ফলে প্রতিটা ক্ষেত্রে ব্যাপকহারে দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য হচ্ছে। 
সূত্রমতে, পূর্ব পরিকল্পিতভাবে প্রতিটি কাজের প্রাক্কলন নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি অন্তর্ভূক্ত করে প্রাক্কলিত মূল্য ২০% বাড়িয়ে ধরা হয়, যা অবৈধ ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারকে জানিয়ে দেন এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হাবিব। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে তিনি প্রতিটা কাজ থেকে ৮ থেকে ১০% হারে নগদ পেয়ে থাকেন। তার অবৈধ এ লেনদেনে মধ্যস্ততা করেন তার ভাই কাশেম। তবে সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইচ্ছানুযায়ীই এসব হয়ে থাকে। এছাড়াও, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে কাজের মান তদারকি না হওয়াসহ দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে সংস্থাটি। এতে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ঠিকাদারদের স্বেচ্ছাচারিতায় নির্ধারিত সময়ে একদিকে শেষ হচ্ছে না নির্মাণ কাজ। রক্ষা হচ্ছে না কাজের মানও। বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে সরকার তথা জনগণের। সেই সাথে সঠিকভাবে তথা মানসম্মত নির্মাণ কাজ না হওয়ায় নব-নির্মিত ও সংস্কার হওয়া ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। এমনকি ভবন নির্মাণে রডের বদলে বাঁশ দেয়া হলেও দেখার কেউ নেই। সরকারি নিয়ম-নীতিও মানা হচ্ছে না টেন্ডার আহ্বান, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে। কোনো আইন-কানুন না মেনে প্রধান কার্যালয় থেকে সব কিছু পরিচালিত হওয়ায় অধিদফতরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা চরম ক্ষুব্ধ।
সূত্রমতে, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের (এইচইডি) প্রধান কার্যালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব দুর্নীতির সাথে সরাসরি জড়িত থাকায় এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলারও সাহস পাচ্ছেন না। কেউ কোনো প্রতিবাদ করলে হয়রানিমূলক বদলির শিকার হতে হয় মাঠ পযায়ের কর্মকর্তা তথা প্রকৌশলীদের। এসব কারণে প্রধান কার্যালয়ের কর্তাদের সঙ্গে এইচইডির মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের এ নিয়ে বিরোধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে ভেঙে পড়েছে সরকারি এ দফতরটির কাক্সিক্ষত সেবা কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এইচইডির মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সেই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগও দেয়া হয়েছে। এতে দাবি জানানো হয়েছে- এইচইডির সীমাহীন দুর্নীতি তদন্তের মাধ্যমে প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। কাজের মান নিয়ন্ত্রণসহ এইচইডির কাজে গতিশীলতা আনার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। একই সাথে ঠিকাদার নামের এক শ্রেণির মাস্তানদের হামলার শিকার হওয়ার বিষয়ে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা এ ব্যাপারে তাদের নিরাপত্তাসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। 
ইজিপির আড়ালে যেভাবে ডিজিটাল দুর্নীতি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে ছোট-বড় ৯০টি নির্মাণ কাজের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দরপত্র এইচইডির প্রধান কার্যালয় থেকে আহ্বান করা হয়। এসব কাজের প্রাক্কলন প্রণয়নে মাঠ প্রকৌশলীদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। প্রতিটি কাজের প্রাক্কলন নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি অন্তর্ভুক্ত করে প্রাক্কলিত মূল্য ২০ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে। এটি করা হয়েছে ওপি এবং ডিপিপির বরাদ্দের দোহাই দিয়ে। ২০১৭ হতে ২০২১ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদী ‘ফিজিক্যাল ফেসিলিটিস ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক ওপিতে স্থাপনাভিত্তিক প্রতিটি প্যাকেজে প্রাক্কলিত মূল্য গণপূর্ত অধিদফতরের নির্ধারিত দর হতে ২০ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। এর আগে ২০১১ হতে ২০১৬ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদী ওপি গণপূর্ত অধিদফতরের ২০১১ সালের দর অনুযায়ী প্রণয়ন করা হয়েছিল। ২০১৪ সালে গণপূর্ত অধিদফতরের নতুন রেট সিডিউল হলে ওই ওপি মার্চ, ২০১৫ সালে সংশোধন করা হয়। ২০১৪ সালের দর অনুযায়ী ওই ওপিতে স্থাপনাভিত্তিক প্রাক্কলিত মূল্য ছিল- ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপ-পরিচালকের কার্যালয় নির্মাণে ৪ কোটিতে সাড়ে ৪ কোটি, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ হতে ৫০ শয্যায় উন্নতি করণ কাজে ১২ কোটির পরিবর্তে ১৪ কোটি, ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে ২৭ কোটির পরিবর্তে ৩০ কোটি, নার্সিং কলেজ নির্মাণে ২২ কোটির স্থলে ২৮ কোটি, ম্যাটস নির্মাণে ২১ কোটির ক্ষেত্রে ২২ কোটি আইএইচটি নির্মাণ কাজে ৩০ কোটির পরিবর্তে ৩২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত ওই ওপির বরাদ্দ অনুযায়ী দাফতরিক প্রাক্কলন করে ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলে ২০ থেকে কোনো কোনো কাজে ২৫% পর্যন্ত নি¤œদরে দরপত্র দাখিল করে ঠিকাদারগণ কাজ নেয়। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত এক বছরে ২০১৪ সালের দর অনুসারে উপরে উল্লেখিত কাজের দাফতরিক প্রাক্কলন করা হয়েছে- ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ কাজে সাড়ে ৫ কোটি টাকা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উপ-পরিচালকের কার্যালয় নির্মাণে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যায় উন্নীত করণ কাজে ১৬ কোটি ৩৫ লাখ, ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে ৩০ কোটি, নার্সিং কলেজ নির্মাণে ৩৪ কোটি, ম্যাটস নির্মাণে ৩৪ কোটি, আইএইচটি নির্মাণ কাজে ৪০ কোটি টাকা। কাজের দর যদি একই থাকে সেক্ষেত্রে প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হয়। মূলত ঠিকাদারের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করার উদ্দেশ্যে উল্লেখিত ৯০টি কাজের প্রাক্কলনে বিভিন্ন আইটেম নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি অন্তর্ভূক্ত করে দাফতরিক প্রাক্কলন গড়ে ২০ বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ সরকারের অন্যান্য প্রকৌশল অধিদফতরের ন্যায় এইচইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী কাজের প্রাক্কলন করে তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হয়ে প্রধান প্রকৌশলীর অনুমোদন নেয়ার পর নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রাক্কলিত মূল্য বৃদ্ধি এবং দরপত্রে দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ হতো না। 
নিয়ম অনুযায়ী, ই-জিপি পদ্ধতিতে ক্রয়কারী দরপত্রের নোটিশ অনলাইনে দেয়ার সময় নোটিশের সাব-টেপে প্রাক্কলিত মূল্য না দিলে ওই নোটিশ পাবলিশ হয় না। এছাড়া উম্মুক্ত দরপত্রের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশের বেশি কিংবা নি¤œদরের কেহ দরপত্র দাখিল করলে তা নন-রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচিত হবে মর্মে এক বছর আগে পিপিআর সংশোধন করা হয়েছে। দরপত্র দাখিলের আগে যদি কেউ প্রাক্কলিত মূল্য জেনে যায় তাহলে একমাত্র তিনিই সঠিকভাবে ১০ শতাংশ নি¤œদরে নির্ভুলভাবে দশমিকের পর তিন সংখ্যা পর্যন্ত দরপত্র দাখিল করলে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে কাজ পাবেন। কাজের দাফতরিক প্রাক্কলন যদি বেশি করা হয় সেক্ষেত্রে কাগজে কলমে কোনো কাজ ১০ শতাংশ নি¤œদরে দেয়া হয়েছে মনে হলেও বাস্তবে ঠিকাদার বেশি দরেই কাজ পান। প্রকৃত ২০ কোটি টাকার কাজ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে ১০ শতাংশ নি¤œদরে কেউ (১০ কোটি মাইনাস ১০ শতাংশ দর অর্থাৎ  ৯ কোটি) = ৯ কোটি টাকায় পাবেন। কিন্তু ১০ কোটি টাকার কাজের প্রাক্কলনে যদি ২০ শতাংশ বেশি পরিমাণ অন্তর্ভূক্ত করে ১২ কোটি টাকায় করা হয় সেক্ষেত্রে কোনো ঠিকাদার ১০% নিম্নদরে দরপত্র দাখিল করেও (১২ কোট- ১০% নি¤œদর অর্থাৎ ১.২০ কোটি) = ১০.৮০ কোটি টাকায় কাজটির কার্যাদেশ পান। এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ১০ কোটি টাকার কাজের কার্যাদেশ ১০% নি¤œদরেও কোনো ঠিকাদার ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পেয়ে যান। এ ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (১০.৮০ কোটি-৯ কোটি)= ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এভাবে গত এক বছরে ই-জিপির আড়ালে ডিজিটাল দুর্নীতির মাধ্যমে ৯০টি কাজে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার দরপত্রে ১৮০ কোটি টাকা সরকারি অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। 
পিপিআর নীতিমালা লঙ্ঘন
এইচইডিতে কাজের দাফতরিক প্রাক্কলন গড়ে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে পিপিআরের বিভিন্ন শর্ত পদে পদে লঙ্ঘন করে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে অর্থের বিনিময় ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পিপিআর অনুযায়ী সরকারি অর্থ দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদনের জন্য যিনি দরপত্র আহ্বান করেন তাকে ক্রয়কারী বলা হয়। ক্রয়কারীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দরপত্র অনুমোদন করবেন। দরপত্র মূল্যায়নের পর অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ক্রয়কারী কার্যালয় প্রধান (এইচওপিই) কিংবা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয় কর্তৃক দরপত্র অনুমোদনের পর এনওএ প্রদান করা হয়। কিন্তু এইচইডিতে এসব নিয়ম-নীতি মানা হয় না। প্রধান কার্যালয়ের এইচওপিই যিনি হয়েছেন, তিনিই ক্রয়কারী সেজে পিপিআর-এর শর্ত লঙ্ঘন করে সকল কাজের দরপত্র আহ্বান করেছেন এবং করছেন। 
দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ ও ভাগবাটোয়ারায় হাবিব 
জানা গেছে, শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী পিপিআরের শর্তভঙ্গ করে এইচইডির প্রধান কার্যালয় থেকে সব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়। আর কাজের প্রাক্কলিত মূল্য প্রধান কার্যালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হাবিব তার ভাই কাশেমের নিকট গোপনে জানিয়ে দেন। হাবিব এবং কাশেম প্রতিটি কাজের দাফতরিক প্রাক্কলিত মূল্য কোনো একজন ঠিকাদারকে নগদ অর্থের বিনিময়ে জানিয়ে দিয়ে কাজ পাইয়ে দিতে সহায়তা করেন। তারা বিভিন্ন ঠিকাদারকে গোপনে জানায় যে, কাজের প্রাক্কলনে ২০% বেশি ধরা আছে। কাজে অনেক লাভ হবে। ১০% নি¤œ দরে নিলেও বাস্তবে কাজটি ৮% বেশি দরে পাবেন। কোনো একজন ঠিকাদারের নিকট থেকে ৮ থেকে ১০% টাকা নগদ নিয়ে তারা প্রাক্কলিত মূল্য জানিয়ে দেন। এভাবেই গত এক বছরে সকল কাজের ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ৪০ কোটি টাকার কাজে ৩ কোটি ২০ লাখ নগদ পেয়েছে সিন্ডিকেট। এভাবে ৩০ কোটি টাকার কাজে ২.৪০ কোটি, ২০ কোটি টাকার কাজে ১.৬০ কোটি টাকা হিসাবে হাতিয়ে নিয়েছে সিন্ডিকেট। 
প্রসঙ্গত, হাবিব ১৯৯৩ সালে হিসাবরক্ষক হিসেবে এইচইডিতে যোগদান করেন। দুবছর আগে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি এইচইডির প্রধান কার্যালয়ে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পান। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী গোলাম মোস্তফা তার চেয়ে তিন বছর আগে ১৯৯০ সালে হিসাবরক্ষক পদে যোগদান করেলেও অজ্ঞাত কারণে তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হন। 
প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দৌরাত্ম
তথ্যমতে, পিপিআরের আইটিটির ১০.১(সি) শর্ত মোতাবেক কোনো ঠিকাদারের টেন্ডার ক্যাপাসিটি দাফতরিক প্রাক্কলনের সর্বনি¤œ ৭০% হতে ৮০% এর বেশি থাকতে হবে। কোনো ঠিকাদারের হাতে বেশি পরিমাণ কাজ থাকলে ওই ঠিকাদার সর্বনি¤œ দরদাতা হলেও টেন্ডার ক্যাপাসিটি সূত্র মোতোবেক নন-রেসপনসিভ হবেন। কিন্তু এই শর্ত লঙ্ঘন করে এইচইডিতে মাত্র ৫-৬ জন ঠিকাদারকেই (৬টি হতে ১০টি পর্যন্ত কাজ দিয়ে) প্রায় ৫শ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের ঊচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার মাহবুবুর রহমান (মেসার্স এমএস এন্টারপ্রাইজ) ও মো. রফিকুল ইসলাম (মেসার্স ঢালী কনস্ট্রাকশন)। এমএস এন্টারপ্রাইজ সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের ৬০ কোটি টাকার কাজসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় আরও প্রায় ৫০ কোটি টাকার কাজ নিয়েছেন। কাজ নেয়ার পরেই কোনো কাজ না করে নিজের লোকদ্বারা মাপবহি লিখে এইচইডির উপ-সহকারী ও সহকারী প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর জোর করে আদায় করেছেন বলে অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। জোর করে বিল নেয়ার পর কোনো কাজ তিনি ঠিকমত করেন না। কলাম ও ছাদে নকশার অর্ধেক পরিমাণ রডও বাঁধেন না। এইচইডির প্রকৌশলীকে না বলে বা তাদের দেখার সুযোগ না দিয়ে খুব কম পরিমাণ সিমেন্ট এবং পাথরের বদলে ইটের খোয়া দিয়ে ঢালাই করেন। শুধু মাহবুবুর রহমান একাই নন, অন্য ঠিকাদদারাও ঠিকভাবে কাজ করেন না। এমনকি রডের পরিবর্তে ভবন নির্মাণে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠতা থাকায় মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা এ নিয়ে টু-শব্দটিও করার সাহস পান না। 
প্রভাবশালী ঠিকাদারদের কাছে প্রকৌশলীরা জিম্মি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কর্মরত উপ-সহকারী নোমান হোসাইন গত ২২ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টায় নিজ অফিসে কর্মরত ছিলেন। সেখানে মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের মালিক উজ্জল শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন নোমানকে। এমনকি নোমানকে মারধরের এক পর্যায়ে চেয়ার দিয়ে তার মাথায় ও শরীরে আঘাত করেন উজ্জল। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরে ও আঙ্গুলের হাড় ভেঙে যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। 
এইচইডি (স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর) ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ভুয়া কাজের বিল পরিমাপবহিতে লিখে এনে তাতে স্বাক্ষর দিতে বলেছিলেন ঠিকাদার উজ্জল। প্রকৌশলী নোমান তাতে রাজি না হওয়ায় সরকারি অফিসে তাকে নির্মম হামলার শিকার হতে হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে এইচইডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে ২৫ মার্চ সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে প্রতীকী কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েও প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের বাধা এবং হুমকি-ধমকির কারণে তা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রধান কার্যালয় থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। পরে ওই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে গুরুত্বহীনভাবে একটি মামলা দায়ের হলেও এতে তাকে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। বরং প্রতিবাদ কর্মসূচি আহ্বানের দায়ে গত ২৮ মার্চ একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীকে রাঙামাটিতে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। হামলাকারী ঠিকাদারের কোনো শাস্তি না হওয়ায় তিনি এখন প্রকৌশলী নোমানকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে চলেছেন। 
এ প্রসঙ্গে এইচইডির একাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ কাগজের প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘আমরা দেড়শতাধিক ডিপ্লোমা প্রকৌশলী- এইচইডিতে নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে কর্মরত আছি। বিভাগের সকল উন্নয়নমূলক কাজের প্রাক্কলন, কাজের মান নিয়ন্ত্রণ, অগ্রগতি নিশ্চিতকরণ এবং কাজের বিল প্রণয়নসহ যাবতীয় কাজ আমরাই করি। কিন্তু গত দুই বছরে আমরা ঠিকাদারদের দ্বারা প্রায়ই লাঞ্ছিত হচ্ছি। সেই সাথে দুর্নীতিবাজ ও ফাঁকিবাজ ঠিকাদারদের ইন্ধনেই প্রধান কার্যালয় থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের ঘন ঘন বদলি করা হয়। বদলির ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। এতে আমাদের স্ত্রী-সন্তানসহ একসঙ্গে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সন্তানদের লেখা পড়াও সঠিকভাবে করাতে পারছি না।’ এদিকে, এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজদের কারণে ঠিকাদার নামের মাস্তানরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাতে ভীত-সন্ত্রস্ত এইচইডির মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা। সেই সাথে তারা চরম ক্ষুব্ধও। 
জনবল সংকট ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতায় সরকারের উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে
এইচইডির কাজের ধরণ এলজিইডি এবং ইইডির মতো। ওই দুই দফতরের মতো এইচইডি গ্রাম, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেক্টরে বেশিরভাগ কাজ করে। দেখা গেছে, প্রতিটি উপজেলায় এলজিইডির দুজন সহকারী প্রকৌশলী ও ৩ থেকে ৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী থাকেন। ইইডির প্রতিটি উপজেলায় একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও জেলায় ১-২ জন সহকারী প্রকৌশলী কর্মরত আছেন। প্রতিটি জেলায় এলজিইডি ও ইইডির আলাদা কমপক্ষে ২৫ জন সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী কর্মরত থাকেন। কিন্তু এইচইডির জেলায় একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (অন্তত ১০টি জেলায় পদ শূন্য) ও ৬৪ জেলায় ৩৫ জন সহকারী প্রকৌশলী কর্মরত আছেন। 
সূত্রমতে, ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদী ওপিভুক্ত ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়নের জন্য এক বছর আগে এইচইডির জনবল ৬০০ জন হতে ২ হাজার ৫০০ জন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। কিন্তু অদ্যবধি তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে না। বরং যত টেন্ডার তত লাভ -এই নীতিতে বিশ্বাসী এইচইডি প্রধান কার্যালয়ের দুর্নীতিবাজরা মাঠ পর্যায়ে জনবল বাড়ানোর পরিবর্তে টেন্ডারে বেশি মনোযোগী। এতে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের সমন্বয়হীনতা বেড়েই চলছে। 
মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় নির্মিত ভবনে রড দিলো না বাঁশ দিলো, ঢালাইয়ে সিমেন্ট কী পরিমাণ দিলো ঠিকাদার, কাদা-মাটিযুক্ত বালি দিলো না সঠিক উপকরণ দিয়ে নির্মাণ কাজ করলো- তা দেখার কেউ নেই। কারণ, প্রতিটি জেলায় একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর পক্ষে ৭০/৮০টি কাজ পরিদর্শন করা আদৌ সম্ভব নয়।’ তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিটি জেলায় গড়ে ৫০টি মেরামত বা সংস্কার কাজ, ১০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন নির্মাণসহ আরও অন্তত ১০ থেকে ২০টি কাজ চলমান। একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর মাসে একটি কাজ দ্বিতীয়বার পরিদর্শন করা সম্ভব হয় না। বর্তমান জনবল দিয়ে এইচইডির সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি টাকার কাজ তত্ত্বাবধায়ন করা সম্ভব। কিন্তু এইচইডির অধীন বর্তমানে সরকারের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান। যা কোনোভাবেই সঠিক পরিদর্শন, তত্ত্বাবধান করা যাচ্ছে না। ফলে জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের এই মহা উদ্যোগ কার্যত স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে চলেছে। অনেক ক্ষেত্রেই কাজ না করে বিল নিয়ে যাচ্ছে প্রভাশালী ঠিকাদার নামের একশ্রেণির মাস্তান। আবার কাজ যা হচ্ছে তাও সঠিক মানের হচ্ছে না। এতে সরকারের উদ্যোগ কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সময়ের মতো কখনোই এইচইডিতে টেন্ডারে এত দুর্নীতি হয়নি। প্রতি বছর অন্তত ১৮০ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতিবাজরা পকেটে পুরছেন। দুর্নীতি ঠেকানো গেলে সরকারি এই টাকায়বছরে অন্তত ৭০০টি করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা সম্ভব। তাই এইচইডিতে চলমান উন্নয়ন কাজের অন্তরালে প্রতিবছরে শ’ শ’ কোটি টাকা লুটপাট বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন অধিদফতরেরই সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সেই সাথে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা দুদকে অভিযোগও করেছেন গত মে মাসে। এখন মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা প্রধানমন্ত্রী ও দুদকের পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছেন বলে শীর্ষকাগজ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ০৪ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)