শুক্রবার, ১৯-জুলাই ২০১৯, ০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন

আমরা কি গরুর জাতি হতে চলেছি?

shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ মে, ২০১৯ ০৮:০২ অপরাহ্ন

ভূইয়া সফিকুল ইসলাম: আমরা কি গরুর জাতি হতে চলেছি, না ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছি তা এক বার ভেবে দেখতে হবে। এশিয়ায় কয়েক হাজার বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তার মধ্যে সেরা হিসেবে ৪৫০ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি তালিকা হয়েছে, যাতে নেপাল ভুটানের মতো দেশের অবস্থান থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই। ভারতের আছে অর্ধশতাধিক, আর পাকিস্তান? অবাক করার মতো সংখ্যা বটে—তারও ৯ টি বিশ্ববিদ্যালয় এ সেরার তালিকায় আছে। ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ এ বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও এ তালিকায় নেই।
অন্যদেশ নিয়ে কথা বলতে চাই না। প্রতিবেশি ভারতে ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসলেও যথাযথ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তারা ক্ষমতায় আসে। সেখানে সেকুলার লোকজনও বিজেপিকে ভোট দেয়। দেয় এ জন্য যে ভারতের বৃহত্তর মধ্যবিত্ত সেকুলার শক্তিকে উপেক্ষা করে বিজেপি কখনো প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে যেতে পারবে না, যতই তারা রামরাজত্বের কথা বলুক। বাস্তবে দেখাও গেছে তাই, বিজেপির হাত দিয়ে এমন প্রগতিশীল আইন পাশ হয়েছে, যা আমার সেকুলার বাংলাদেশে পাশ করা অসম্ভব। 
ধর্মান্ধ-মিলিটারিধর্ষিত গণতন্ত্রের পাকিস্তানের চেয়েও আমাদের অবস্থা অন্ততঃ নয় গুণ খারাপ। তাদের ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় আছে, আমাদের একটিও নেই। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কেন, এদেশের সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলে গেছে বর্বর ম্যানেজমেন্টর হাতে। রাজধানীর এক নামকরা স্কুলের এক শিক্ষক সেদিন দুঃখ করে বলছিলেন, আমরা এমন এক সভাপতি পেয়েছি, তিনি যে কি বলেন আর কী ভাষণ দেন, শুনতে লজ্জা লাগে। তবে রাজাকার চরিত্রের যে-সব শিক্ষক আছেন, তারা ওনাকে খুব তাল দেন। তাদের সাথে ওনার সম্পর্কও মধুর। আমরা যারা কিছু লেখাপড়ার চর্চা করি, বঙ্গবন্ধুকে বুকে লালন করি, তারা বরং কর্নারাইজড। বললাম সভাপতি সাহেবের পরিচয় কি? একটু হেসে বললেন, শ্রমিকলীগ নেতা। এই শ্রমিকলীগ নেতা, ছাত্রলীগ নেতা, আর আওয়ামীলীগ নেতারা এখন সকল প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার (মানে সকল প্রতিষ্ঠানকে কান ধরে উঠবস করাচ্ছেন)। ফেনীর যে মাদ্রাসাটির সুপার সিরাজদৌলা সম্প্রতি ধর্ষণান্তে নুসরাত জাহান নামক আলেম পরীক্ষার্থী ছাত্রীটিকে নিজ ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পুড়িয়ে মারলেন, সে মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের শক্তিশালী লোকজনও আওয়ামীলীগ নেতা।আর ইতোপূর্বে জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত সিরাজদৌলার শক্তির উৎস ছিল তারাই।
এ ভাবেই চলছে। বিএনপি আসলে জিয়ার চশমা, আওয়ামীলীগ এলে বঙ্গবন্ধুর তকমা। এ দিয়েই নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির চেয়ার থেকে, শহর-গ্রামের স্কুল-মাদ্রাসার পরিচলনা কমিটি। দেশে প্রকৃত শিক্ষানুরাগী লোক, রিটায়ার্ড শিক্ষক, চাকুরে বা অন্যান্য পেশার যোগ্য মানুষগুলো যেন মরে হয়েছে !
ভেবেছিলাম বিজ্ঞানমনষ্ক শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে, সেকুলার সংস্কৃতির চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা করে, শিক্ষাঙ্গনে প্রকৃত শিক্ষিত ও সৎ লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ একবিংশ শতাব্দীর প্রগতির রেসে এগিয়ে যাবে, দেশ থেকে তাড়াবো অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকার। কিন্তু বাস্তবে দেখছি তার উল্টা, প্রগতির জায়গায় অধোঃগতি, অন্ধকারের জায়গায়—আরো অন্ধকার। আওয়ামীলীগের যে সব নেতা আজ একটি প্রাইমারি স্বুলের নেতৃত্ব দিচ্ছে, আমার জানা মতে, তারা প্রায় সবাই সুবক্তা। প্রতিষ্ঠানের যে কোনো অনুষ্ঠানে মাইক হাতে পেলে পল্টনের মাঠ মনে করে তারা এমন ভাষণ শুরু করে যে কোমলমতি ছেলে-মেয়ে তাদের জ্ঞান-গরিমায় হতভম্ব হয়ে যায়। আমাদের জিডিপির হিসাব, মাথা পিছু আয় বৃদ্ধির হিসাব তাদের ঠোঁটস্থ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনেক কিছু নিজের স্মরণে না থাকলেও এ-সব নেতাকর্মীর মুখস্ত রয়েছে। আর এর সাথে মাঝে মাঝে টংকার দিয়ে বলে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। আমাদের কোমলমতি ছাত্রদের সামনে এরাই আদর্শ—এরাই নেতা !
জাতীয় প্রগতি আর শতকরা দু-পাঁচ জনের অগাধ সুযোগ-সুবিধার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে এক জিনিস নয়, সে বোধটুকু আজ নির্লজ্জ নেতৃত্বের অন্তর থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। সমগ্র পৃথিবীর নয়, শুধুমাত্র এশিয়ার ৪৫০টি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের নামটি কেনো স্থান পায়নি। দলীয় ভিসি, দলীয় শিক্ষক আর দলীয় ক্যাডারের লালসায় ও-গুলো পচে উঠেছে। জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপীঠের পচনকে বলা যেতে পারে মগজে পচন। ওই মগজই দেশে নেতৃত্ব দেবে। প্রাইমারী স্কুল থেকে দেশের সর্বোচ্চ চেয়ারে ওরাই একদিন বসবে। প্রগতির সাথে যে আলোকায়নের প্রশ্ন জড়িত তা কে এদের মনে করিয়ে দেবে? তবে, আমাদের পরম হিতৌষী দেশ-নায়কেরা প্রগতির সংঙ্গাটা যে ভাবে বদলিয়ে দিয়েছেন তাতে আর কোনো অসুবিধা হবার নয় (!)। আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির নামে বোগল বাজাব। বলবো, এই তো প্রগতি!
(বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব)
০৭.০৫.২০১৯