শুক্রবার, ২৬-এপ্রিল ২০১৯, ০৪:২৯ পূর্বাহ্ন

একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণ

Sheershakagoj24.com

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারী, ২০১৯ ১১:২৬ পূর্বাহ্ন

সাঈদ তারেক: আজ ২৫শে জানুয়ারি। ৪৪ বছর আগে, ১৯৭৫ সালের এই দিনটিতে জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছিল সংবিধানের চতুথ সংশোধনী, যার মাধ্যমে দেশের রাজনীতির ধারার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। সব দল বিলুপ্ত হয়ে একটিমাত্র দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বলা যায় এই ঘটনা ছিল রাজনীতির এক টার্নিং পয়েন্ট। সাংবাদিকতার সুবাদে আমার সুযোগ হয়েছিল ঐতিহাসিক এই ঘটনার প্রত্যক্ষদশী হবার।
সংসদ ভবন তখন নাথালপাড়ায় (আজকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়)। অধিবেশন কক্ষের ভেতরে স্পীকারের আসনের বা পাশে সে সময় ছোট একটি প্রেস বক্স ছিল। ১৫/১৬জন সাংবাদিক সেখানে বসতে পারতেন। সাধারনত এক কাগজ থেকে একজন এবং সিনিয়ররাই বসতেন সেখানে। অন্যরা ওপরে প্রেস গ্যালারিতে বসতেন। আমি তখন দৈনিক গণকন্ঠের রিপোটার। আসফদ্দৌলা ভাই, শাহ আলম ভাই, মোস্তফা জব্বার এবং আমি- প্রধানত এই চারজনই গণকন্ঠ থেকে পালা করে সংসদ অধিবেশন কাভার করি। আমি চেষ্টা করতাম অধিবেশন কক্ষের ভেতরের প্রেসবক্সে বসতে। কারণ ওখান থেকে অধিবেশন দেখলে মনে হতো বুঝি নিজেই অধিবেশনে বসে আছি। অন্য সিনিয়রদের মধ্যে যাদের কথা স্মরণ করতে পারছি তারা হচ্ছেন, আতিকুল আলম, আতাউস সামাদ, গিয়াস কামাল চৌধুরী, তোজাম্মল আলী তোজা ভাই, সম্ভবত: মাসির হোসেন হিরু ভাই, রিয়াজউদ্দিন আহমদ, অবজারভারের আতিক ভাই, ইত্তেফাক থেকে সম্ভবত: শফিকুল কবির। আরও অনেকেই বসতেন নীচের প্রেস বক্সে, সবার নাম মনে করতে পারছি না।
কয়েকদিন আগে থেকেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল সংবিধানে আর একটা সংশোধনী আনা হচ্ছে। সব দল নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে, রাস্ট্রপতি পদ্ধতির শাষন কায়েম হবে, বঙ্গবন্ধু আজীবন প্রেসিডেন্ট হবেন। এসব নিয়ে পরিস্থিতি খানিকটা গুমোট ছিল। এর মধ্যে সংসদে সংবিধান সংশোধনী বিল আনা হলো। যতদুর মনে পড়ে এর ওপর দিনদুই আলোচনাও হলো। আওয়ামী লীগের সাংসদরা বিলের পক্ষে বক্তৃতা করলেন। বিরোধী গ্রুপের সাত সদস্য আতাউর রহমান খান, জাসদের মাইনুদ্দিন মানিক, আব্দুস সাত্তার, মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা এবং আরও দুই একজন বিলের সমালোচনা করলেন। কর্ণেল ওসমানী এবং ব্যরিস্টার মঈনুল হোসেন বিলের বিরোধিতা করলেন। তবে বিলের সমালোচনা করে সবচাইতে সুন্দর বক্তৃতাটি করলেন এ্যাডভোকেট সিরাজুল হক ( আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা)। প্রায় চল্লিশ মিনিট পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে সাবলীল ইংরাজিতে এই বিল কেন পাশ হওয়া উচিত নয় তার কারণগুলো ব্যখ্যা করলেন। আমি সেদিন নীচের প্রেসবক্সে। ট্রেজারী বেঞ্চ ছিল আমাদের মুখোমুখি। পনের বিশ গজ দুরেই প্রথম সারির কোনার সীটটায় বসতেন বঙ্গবন্ধু। সিরাজুল হক সাহেবের বক্তৃতার সময় সবার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছিলাম। বঙ্গবন্ধু বেশ মনোযোগ সহকারে শুনলেন। সব শেষে বঙ্গবন্ধু দাঁড়ালেন। বিলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেন। দেশের তৎকালীন পরিস্থিতিতে কেন একদলভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা দরকার তার কারণ ব্যখ্যা করলেন। সংসদ নেতার বক্তৃতার পর স্পীকার বিল ভোটে দিলেন। কন্ঠভোটে তা পাশ হলো। এরপর ডিভিশন। পক্ষের যারা তার ডান দিকের লবিতে গেলেন। বিপক্ষের কয়েকজন এলেন বা দিকের লবিতে। স্বাক্ষর করলেন। আমরা সাধারণত: বা দিকের লবি দিয়েই যাতায়াত করতাম। ডিভিশনের সময় আমরাও এলাম এই লবিতে। এ সময় দেখি নুরে আলম সিদ্দিকী সাহেব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। অধিবেশনে আসতে তার দেরী হয়ে গেছিল। ততক্ষণে ডিভিশন শুরু হয়ে গেছে। ডিভিশনের সময় অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সব গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। তিনি একটা গেট খুলে দিতে বললেন। বিরোধী সদস্যরা বললেন এটা তো না লবি। শুনে সিদ্দিকী সাহেব দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করলেন।
ডিভিশনের পর সবাই ফিরে এলেন অধিবেশন কক্ষে। বিল পাশের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে সবাইকে বেশ উৎফুল্ল মনে হলো। অনেকেই গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সালাম জানালেন, সিনিয়র কয়েকজন তার সাথে কোলাকুলি করলেন। শাহ মোয়াজ্জম হোসেনকে দেখলাম ছুটে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পা ছুয়ে সালাম করলেন। ওবায়দুর রহমানও সম্ভবত: তাকে অনুসরন করলেন। এর মাঝেই আমি চলে এলাম ট্রেজারি বেঞ্চ সংলগ্ন লবিতে। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে তার মুখ থেকে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া নেয়া। এসে দেখি সেখানে বেশ ব্যস্ততা। স্টাফরা ছোটাছুটি করছে। গুঞ্জন শোনা গেল বঙ্গবন্ধু এখনই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। লবিতেই একটা টেবিল লাগানো হলো। প্রেসিডেন্ট এলেন। অল্প সময়ের মধ্যে সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের শপথ নিলেন।
অনেক দিন আগের স্মৃতি, সব স্পষ্ট মনেও নাই। এ্ই প্রথম ছাপার অক্ষরে লিখলাম। তবে চেষ্টা করেছি তা যেন অতিরঞ্জতার দোষে দুষ্ট না হয়।