বৃহস্পতিবার, ১৩-ডিসেম্বর ২০১৮, ১০:০৯ অপরাহ্ন

প্রার্থী মনোনয়নই আওয়ামীলীগের বড় চ্যালেঞ্জ

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর, ২০১৮ ০৮:২০ অপরাহ্ন

ড. এম হাসান: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা জনাব ওয়াজেদ জয় সাহেবের উক্তি “ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগ আগামী নির্বাচনে আরো বেশি জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে।” উনার এ কথার সাথে আমি সম্পূর্ণরূপে ঐক্যমত পোষণ করছি। কারণ আওয়ামীলীগ সরকার দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর ক্ষমতায় থেকে জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে সচেষ্ট আছে। আওয়ামীলীগ সরকার নিজ অর্থে পদ্ধা সেতু করার সাহস দেখিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড গড়েছে, ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে, কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাওরায়ে হাদীসকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবী মাস্টার্স ডিগ্রীর সমমান প্রদান করেছে। যারফলে আওয়ামীলীগের প্রতি আলিম সমাজের পূর্বের নেতিবাচক মনোভাব অনেকাংশে দূর হয়েছে। বিশেষ করে হিফাযাতে ইসলাম তথা কওমী আলিমদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ফাযিল ও কামিল মাদরাসার শিক্ষকদের বেতনভাতা বৃদ্ধিসহ ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকদের বেতনভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে আলিম সমাজ স্বাগত জানিয়েছে। কারণ বিগত দিনগুলোতে ক্ষমতায় থাকা চারদলীয় ঐক্যজোটের সরকার এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধার্মিকতা ও সৎ সাহসের কারণে এটির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছে না বলে অনেকের অভিযোগ। যুক্তির খাতিরে তাদের এ অভিযোগ মেনে নিলাম। তাহলে এ ব্যর্থতার দায়ভার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর? দলীয় সংসদ সদস্যদের? না কি বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের? আমি মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দায়ভার থেকে মুক্ত। কারণ বাংলাদেশের সকল সমস্যা সমাধানের শেষ কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথা যে শেষ কথা তার প্রমাণ তিনি বারবার রেখে চলেছেন। তবে দলীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এ দায়ভার থেকে মুক্ত নয়। কারণ দলীয় সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ স্ব স্ব নির্বাচনী এলাকায় এতটাই বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে তাদের পক্ষে দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঠে নামা কঠিন হয়ে পড়বে। অপরদিকে আমাদের সাধারণ জনগণ ভাল-মন্দের বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এমনকি সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এখন ঘরের শত্রু বিভীষণ। প্রতিটি আসনেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের সাথে বর্তমান সংসদ সদস্যদের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকা ও দশম সংসদ নির্বাচনে কোন কোন আসনে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সাথে প্রতিদ্বন্ধীতার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩০০ আসনের জন্য ১৫০০ জন সম্ভাব্য প্রার্থী আওয়ামীলীগের মনোনয়ন ফর্ম সংগ্রহ করলেও আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা বেড়ে ২৫০০ জনে গিয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি বড়দলে এ ধরণের সমস্যা স্বাভাবিক বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এ স্বাভাবিক বিষয়টি যে দলের জন্য কখনো কখনো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেটি আমরা সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে উপলব্বি করেছি। যার মাশুল তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরই দিতে হচ্ছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একটি সরকারের পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকা যথেষ্ঠ নয়। যার প্রমাণ আমরা দেখতে পেয়েছি। বর্তমান সরকারের শাসনামলে বেশ কিছু সেক্টরে যেভাবে উন্নতি সাধিত হয়েছে, তা বিগত যেকোন  সরকারের দশ বছরের শাসনামল থেকে অনেক বেশি। বাংলাদেশের জনগণের মানসিকতা এমন যে, আজকে কোন রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার এক সপ্তাহের ব্যবধানে পূণরায় নির্বাচন দিলে বাংলাদেশের জনগণ ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিপক্ষেই রায় দিতে বদ্ধপরিকর। তাহলে বিচার-বিশ্লেষণ কোথায়? এমন মনোভাব পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে না। সে চিন্তা থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছে না বলে  কোন কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা। তার সাথে যুক্ত হয়েছে দলের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ। তবে ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই বলে অধিকাংশের অভিমত। নতুন সংযোজন গ্রিন সিগনাল! মাঝে মাঝে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, প্রায় ১০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে কেন্দ্র্র থেকে গোপনে গ্রিন সিগনাল পাঠানো হয়েছে। আওয়ামীলীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার প্রতিনিধিদের জানিয়েছেন, সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই কে মনোনয়ন পাবেন, তা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলে যারা মনোনয়ন পাবেন না, তারা মাঠে থাকবেন না। এমনকি তারা চুড়ান্ত প্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করতে শুরু করবেন। এর ফলে প্রকাশ্যে পারস্পরিক বিরোধ ত্বরান্বিত হবে। তাই গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামীলীগ। 
কিন্তু একমাস যেতে না যেতে আবার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন। আজকে বেশকিছু অনলাইন পত্রিকায় শিরোণাম আসছে “মনোনয়ন বঞ্চিতদের মাঠ খালির নির্দেশ আওয়ামীলীগে”। এমন সিদ্ধান্ত অনেক পূর্বেই আসার প্রয়োজন ছিল। কারণ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রচারণা যতো বাড়বে ততোই দলে বিভক্তি বাড়বে। এমনও নজির আছে, একই আসনে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঢাকায় এসে কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে সাক্ষাত শেষে নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে নিজেদের দলীয় প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে প্রাধানমন্ত্রীর সম্মতির কথা জানান দিচ্ছেন। এতে সাধারণ নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। অবস্থাভেদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থার ভিন্নতা রয়েছে। প্রথমত: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে যে সমস্ত সিনিয়র কেন্দ্রিয় নেতা কোন প্রকার প্রতিদ্বন্ধিতা ছাড়াই সংসদ সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই দলের মধ্যে বিরোধিতার সম্মুখিন হবেন না। তারপরও কিছু কিছু আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা সোচ্চার। দ্বিতীয়ত: যে সমস্ত আসনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থীরা একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন এবং দল মনোনীত প্রার্থীরা বিজয় লাভ করেছিলেন সেসমস্ত আসনে সমস্যা সব থেকে প্রকট। এ সমস্ত আসনে গতবারের দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অধিকতর ক্লিন ইমেজ ও তৃণমূলের পছন্দের প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া নিরাপদ। কারণ হিসেবে বলতে চাই, দশম সংসদ নির্বাচনে যারা নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছিলেন তারা নিজেদের পেশি শক্তি বৃদ্ধির জন্য জামায়াত ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন প্রকার সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিড নেতাদের দৌরাত্বে সাধারণ ত্যাগী নেতা-কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এমনও দৃষ্টান্ত আছে, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা এমনকি জেলা আওয়ামীলীগের বড় বড় পদে থাকার পরও শুধুমাত্র দলীয় সংসদ সদস্যদের রোষাণলে পড়ার কারণে অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একইভাবে তাদের সমর্থনপুষ্ট সাধারণ কর্মীরাও মানবতার জীবন-যাপন করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন কোন মাননীয় সংসদ সদস্য অধিক (আর্থিক) মুনাফার আশায় জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের বিভিন্ন প্রকার সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। আবার কোন কোন মাননীয় সংসদ সদস্য আর্থিক সুবিধার আশায় দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, চাঁদাবাজী, মাদক ব্যবসাকে প্রশ্রয় দিয়ে দলের ইমেজ নষ্ট করেছেন। অপরদিকে গতবারের বিদ্রোহীদের অধিকাংশই বিএনপি ও জামায়াত থেকে আশ্রয় নিতে আসা অনুপ্রবেশকারীদের লালন করে চলেছেন। তাদের ধারণা, দলীয় মনোনয়ন পেতে হলে মিছিল মিটিংয়ে লোক সমাগম অধিক হওয়া জরুরি। তাই শুধুমাত্র মনোনয়ন পাওয়ার কৌশল হিসেবে এমনটি করছেন বলে অধিকাংশের অভিমত। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা একে অপরকে জনসমক্ষে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, আমি দলীয় মনোনয়ন না পেলে দলের অপর প্রার্থী কিভাবে বিজয় লাভ করে তা দেখে ছাড়বো। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা জামায়াত ও বিএনপি সমর্থকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে মিছিল মিটিং-এ এনে নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তাছাড়া দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিদ্রোহী প্রার্থীরা বর্তমান দলীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে জনগণকে এমনভাবে ক্ষেপিয়ে তুলছেন যে, দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। একই চিত্র দলীয় সংসদ সদস্যের সমর্থকদের মধ্যেও। তাই এই দু’য়ের মাঝে সমন্বয় একান্ত জরুরি। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে বহিস্কারের ভয় দেখিয়ে একজন নেতার প্রকাশ্যে বিরোধিতা থামানো গেলেও গোপন বিরোধিতা থামানো যাবে না। তাই অধিক সংকটযুক্ত আসনগুলোতে বর্তমান সংসদ সদস্য ও একই দলের গতবারের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বাদ দিয়ে সর্বজন গ্রহণযোগ্য নতুন কাউকে মনোনয়ন দিলে একদিকে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ বাড়বে, অপরদিকে নিজ দলের ভোট অন্য কোথাও যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। তাছাড়া অধিকাংশ আসনেই পরিবর্তনের হাওয়া বিরাজ করছে। এখনই ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মুল্যায়নের উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশের মানুষ আবেগ প্রবণ ও শান্তিকামী তাই তারা শান্তিপ্রিয় মানুষকে পছন্দ করে। তারা পারস্পরিক বিশৃংখলাকারীদের পছন্দ করে না। সর্বোপরি আগামী নির্বাচনে বিদ্রোহীদের ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত সময়ের দাবি। এভাবে চলতে থাকলে হাইকমান্ড বলে কিছুই থাকবে না। তাই দলের শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে আগামী সংসদ নির্বাচনে সর্বজন গ্রহণযোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের দলীয় প্রার্থী মনোনীত করুন। 
(লেখক: শিক্ষক ও গবেষক)