শুক্রবার, ১৯-অক্টোবর ২০১৮, ০১:৫২ অপরাহ্ন

  ইউরোপীয় দ্বীপ রাষ্ট্র অস্ট্রিয়া এবং নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২০ জুন, ২০১৮ ০৯:২৩ অপরাহ্ন

বুলবুল তালুকদার: আনুমানিক আমরা কোটি বাঙালি দেশ ছেড়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বৈধ-অবৈধ ভাবে বসবাস করি । সেই সুত্রে আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় গত ২৮ বছর যাবত্ ইউরোপীয় দ্বীপ রাষ্ট্র অস্ট্রিয়ায় আছি । ইউরোপে থাকার সুত্রে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকারের শাসন ব্যবস্থা কেমন বা কি পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশী হওয়ার সৌভাগ্যে বিষয়টিতে বেশ আকর্ষণ বোধ করি । কেননা আমরা রক্ত দানের একটি স্বাধীন দেশ, প্রায় অর্ধশতাব্দী পার করতে চলেছি । কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমরা ইচ্ছা বা অনিচ্ছার কারণে অথবা যে কোনো অক্ষমতার কারণে আজ অব্দি একটি সঠিক রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি । এই সঠিক রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থা বলতে, একটি নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কথাই বলছি । সত্যি বলতে, যত যুদ্ধক্ষয়িষ্ণু দেশই আমরা ছিলাম, তারপরেও যুদ্ধ জয়ী একটি স্বাধীন দেশের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে ৪৭ বছরে একটি নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা হওয়া উচিত ছিলো বা সম্ভব ছিলো । যে দেশটির জন্য মানুষ রক্ত দিতে কোনো প্রকার দ্বিধান্বিত ছিলো না, যে দেশটি রাজনীতিবিদদের পরিকল্পনায় যুদ্ধ জয়ী হয়, সেই দেশটির ৪৭ বছর পরে একটি নিয়মতান্ত্রিক সঠিক শাসন ব্যবস্থা পাবে না ! এই যুদ্ধ জয়ী স্বাধীন দেশে এটা ভাবতেই বিস্মিত হতে হয় । লক্ষ্যণীয় যে এই দেশটি কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে প্রায় সময় রাজনীতিবিদরাই পরিচালনা করেছেন ! এখন বলতেই হয়, সেই রাজনীতিবিদরা আমাদের একটি নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা দিতে চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন । চুড়ান্ত শাসন ব্যবস্থার বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যার নিশ্চয় কোনো প্রয়োজন নেই। ধারণা করি, বিষয়টি সমগ্র দেশবাসী অবলোকন করছেন এবং অবগত আছেন । একটি ছোট্ট গল্প বলি, তাহলেই আমাদের প্রিয় রাজনীতিবিদদের সম্বন্ধে কিছুটা পরিষ্কার বুঝা যাবে । গল্পটি এরকম : একটি বাচ্চা তার মা-কে বলছে, আমি বড়ো হয়ে যুদ্ধবিমানের পাইলট হবো । মা বলছে আচ্ছা বাবা তুমি যুদ্ধবিমান যখন চালিয়ে যাবে, আমি বুঝবো কি করে ? সেই যুদ্ধবিমানটি তুমিই চালিয়েছো বা তুমিই সেটার পাইলট ? ছেলের উওর- মা , আমি কি এত বোকা ? আমি যখন যুদ্ধবিমানটি আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে চালিয়ে যাবো, তখন আমাদের বাড়ির উপর একটি বোমা ফেলে যাবো । তখন তুমি বুঝে নিবে, আমিই সেটার পাইলট ছিলাম । দুঃখ হয়, আমাদের রাজনীতিবিদরা অনেকটা সেই পাইলটের মতন । যে রাজনীতিবিদদের পরিকল্পনায় একটি দেশ পৃথিবীর ভুখন্ডে স্বাধীন পতাকা তুলে ধরলো । সেই রাজনীতিবিদরাই এখন, সেই স্বাধীন দেশে কথিত রাজনীতির বোমা মেরে মেরে, আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, আমরা রাজনীতিবিদ ! 
অনেক অযথা কথা হয়ে গেলো । এখন ইউরোপের দেশ অস্ট্রিয়ার নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কথা বলার চেষ্টা করি । কি পদ্ধতিতে এই দেশটি চলে, তা বিশদ বলতে গেলে অনেক বলতে হবে। চেষ্টা থাকবে অল্প কথায় শাসন ব্যবস্থাটি পরিষ্কার তুলে ধরার । অস্ট্রিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা । এটি একটি ফেডারেল রাষ্ট্র, উদার নীতির ভিত্তিতে আইনের শাসন দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয় । ডেমক্রেটিক নীতি বা গণতন্ত্রিক নীতি বলতে তাকেই বুঝায়, যে সমস্ত রাষ্ট্রআইন জনগণ থেকে উত্পন্ন হয় । অস্ট্রিয়া একটি প্রতিনিধি গণতন্ত্র, অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় । এটি ফ্রি এবং গোপন ভোটে নির্ধারিত হয় । আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো, সরাসরি গণতন্ত্র, যা গণভোট এবং গণমত দ্বারা নিশ্চিত করা হয়। আমার একটি ভিন্ন লেখায় এই ফ্রি এবং গোপন ভোট সমন্বয়, কিভাবে হয় সেটা বিস্তারিত উল্লেখ আছে । ফেডারেল রাষ্ট্র নীতি , অর্থাত্ অস্ট্রিয়া একটি একাত্মতাবাদী রাষ্ট্র নয় । অস্ট্রিয়া ৯ টি অঙ্গ রাজ্যের সমন্বয়ে একট কনফেডারেশন । অঙ্গ রাজ্যেগুলির নিজস্ব আইন রয়েছে ফেডারেল সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে এবং তাদের নিজ নিজ রাজ্য সংবিধানে । ফেডারেল আইন দ্বারা অঞ্চল গুলো নিয়ন্ত্রিত হয় । অস্ট্রিয়ায় কেবলমাত্র সাংবিধানিক শাসন দ্বারা আইনের শাসন নিশ্চিত করা হয়। সমস্ত রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপ কেবল আইন দ্বারা অনুমোদিত হয়, ক্ষমতার বিচ্ছিন্নতা ( রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ) এবং স্বাধীন আদালতের মাধ্যমে । আইন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে, আইনগুলি সাংবিধানিকভাবে তৈরি করা হয়েছে। লিবারেল বা উদারনীতির নীতি নির্ধারিত মৌলিক ও স্বাধীনতার মাধ্যমে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করে । সকল নীতির মধ্যে এটি সাংবিধানিকনীতি হিসেবে স্বীকৃত । উল্লেখযোগ্য নীতিটি মানবাধিকার ( এইচআর) সাংবিধানিক স্থায়ী ইউরোপীয় কনভেনশন এবং ১৮৬৭ সালের মৌলিক আইন দ্বারা নিশ্চিত করা হয় , যেমন : ○ বিধি গোপনীয়তা এবং ○ নির্বিচারে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা । অস্ট্রিয়ার জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ কেবল মাত্র জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন । ভোটের ফলাফল সমানুপাতিক হারে জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধি গৃহীত হয়। ফলে দেখা যায় প্রতিসময় রাজনৈতিক দলগুলোকে জোটবদ্ধ ভাবে ক্ষমতা আহরণ করতে হয়। ফলাফল স্বরূপ প্রায় সময় ক্ষমতার একটি ভারসাম্যের প্রতিফলন ঘটে । ১৭ ই জুলাই ১৯৮৯ সালে ততকালিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড: “আলোইস মোক ” অস্ট্রিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ পাওয়ার আবেদন করেন । পরবর্তীতে ২ জুন ১৯৯৪ সালে সাংবিধানিক আইনে একটি গণভোট হয় এবং গণভোটের শতকরা ৬৬,৫৮ % , যা সার্বিক ভোটের দুই তৃতীয়াংশ দ্বারা অস্ট্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার জন্য জনমানুষের অনুমতি লাভ করে । ১ জানুয়ারি ১৯৯৫ হতে অস্ট্রিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য পদ লাভ করে । অস্ট্রিয়া দ্বীপ রাষ্ট্রির প্রতিবেশী দেশগুলো, জার্মানি এবং চেক প্রজাতন্ত্র উওরে , স্লোভেনিয়া এবং ইতালি দক্ষিণে , স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরি পূর্বে, লিক্টেনএস্টাই এবং সুইজারল্যান্ড পশ্চিমে অবস্থিত । দেশটি আয়তনে ৮৩, ৮৭৯ কিলো স্কোয়ার মিটার । ২০১৬ এর জরিপ অনুসারে বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যা ৮.৭৪৭ মিলিয়ন । ভিয়েনা অস্ট্রিয়ার রাজধানী শহর ।  ১৮৬৭ খ্রিঃ অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি মিলে ইউরোপে একটি দ্বৈত রাজতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা ছিলো । পরবর্তীতে কালের বিবর্তনে নানান উথান পতনের ঘটে । সর্বশেষে অস্ট্রিয়া ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মান রেইচের অংশ ছিলো । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে অস্ট্রিয়া পুনরায় স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯৫৫ সালে অস্ট্রিয়া স্থায়ী নিরপেক্ষতা ঘোষণা করে এবং জাতিসংঘে যোগদান করে । অস্ট্রিয়ায় ৯ টি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট রয়েছে । দীর্ঘদিন যাবত্ প্রকৃতির তিন রঙের অস্ট্রিয়ায় ( সাদা , সবুজ এবং স্বর্ণালি ) বসবাস আমার তা উপরেই উল্লেখ করেছি । এই তিন রঙের অস্ট্রিয়ার কথা আমার ভিন্ন এক লেখায় বিশদ বিবরণ আছে, এখানে আর লিখছি না । লেখার শেষে অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যখাতের ছোট্ট বিবরণ দিয়ে শেষ করবো । বিষয়টি হলো স্বাস্থ্য বীমা । অস্ট্রিয়ায় দুই ধরণের স্বাস্থ্য বীমা আছে । ১ ) বাধ্যতামূলক বীমা বা সংবিধিবদ্ধ স্বাস্থ্য বীমা । ( প্রয়োজনীয় চিকিত্সার শতভাগ নিশ্চয়তা ) ২ ) ব্যক্তিগত সম্পূরক বীমা । ( অতিরিক্ত সেবা জন্য বীমা ) অস্ট্রিয়ায় কর্মক্ষমহীন, বেকার এবং পেনশনভোগিরাও সংবিধিবদ্ধ স্বাস্থ্য বীমার আওতাভুক্ত এবং শিশুরা কোনো আবেদন ছাড়াই সংবিধিবদ্ধ স্বাস্থ্য বীমার অন্তর্ভুক্ত হয় । জরিপে দেখা যায় অস্ট্রিয়ায় এখনও প্রায় এক লক্ষের মতন মানুষ বিভিন্ন কারণে সংবিধিবদ্ধ স্বাস্থ্য বীমার বাহিরে আছে । তবে প্রয়োজনে অস্ট্রিয়ার সরকার তাদের ক্ষেত্রে সোসাল অরগানাইজেশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করে । পৃথিবীর নানান ঘাত প্রতিঘাতের বর্তমান রাজনৈতিক ডামাডোলে অস্ট্রিয়া সহ সমগ্র ইউরোপের অবস্থান ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা রইলো। অস্ট্রিয়া দীর্ঘজীবী হোক ।
সাবেক ছাত্রনেতা, অষ্ট্রিয়া প্রবাসী