রবিবার, ২১-অক্টোবর ২০১৮, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

লোভী মানুষের কাছে বিপন্ন বসুন্ধরা

Shershanews24.com

প্রকাশ : ০২ মে, ২০১৮ ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

মালবী গুপ্ত : আমাদের হাতে নাকি আর মাত্র ৬০০ বছর সময় আছে? নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে হলে তার আগেই নাকি পাড়ি দিতে হবে অন্য কোনো সৌরজগতে, অন্য কোনো গ্রহের সন্ধানে? নচেৎ মনুষ্য জাতির ধ্বংস অনিবার্য।

সদ্য প্রয়াত বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিভেন হকিং-এর এই বক্তব্য নিয়ে কিছু দিন আগেই বেশ শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের পৃথিবীকেই না বলা হয় ‘মাদার আর্থ’ বা ‘মা বসুন্ধরা’?

মায়ের মতোই যে সন্তান-স্নেহে সমস্ত প্রাণীকুলকে লালন, পালন করে চলেছে। নিজের সমস্ত সম্পদ উজাড় করে আমাদের জীবন ধারনের যাবতীয় উপাদান সে জুগিয়ে যাচ্ছে।
তাহলে সেই মায়ের কোল ছেড়ে পালানোর এমন পরামর্শ কেন?

আসলে হকিং-এর আশঙ্কা ছিল ক্লাইমেট চেঞ্জ এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স- এই দুটি বিষয়ই পৃথিবীকে ক্রমশ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স না হয় হালের বিষয়। কিন্তু পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, পৃথিবীতে তার ধ্বংসাত্মক প্রভাব, তার প্রতিরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে নানা আলাপ আলোচনা করতে করতে তো আমরা কয়েক দশক পারও করে ফেললাম।

সেই ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল আমেরিকায় প্রায় ২ কোটি মানুষ তো পথে নেমেছিলেন আমাদের এই নীল গ্রহের পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদে। সরব হয়েছিলেন শিল্পোন্নয়নের ফলে গত ১৫০ বছর ধরে যে বিপুল দূষণ পৃথিবীর জীব-বৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে তার প্রতিবাদে। সেই থেকেই তার ক্ষয়িষ্ণু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে এক একটি ‘থিম’ নিয়ে ফি বছরই তো ২২ এপ্রিল ধুমধাম করে ‘আর্থ ডে’ বা ‘বসুন্ধরা দিবস’ পালিত হচ্ছে।

ছেদ পড়ছে না জলাভূমি, বন্যপ্রাণী, জীব-বৈচিত্র্য, পরিবেশ ইত্যাদি নিয়ে নানা দিবস পালনেও। কিন্তু মনে হচ্ছে, সেই সব বার্ষিক উদযাপনের ঢক্কা নিনাদ আমাদের কর্ণকে যতটা বিদীর্ণ করছে, ততটা বুঝি স্পর্শ করছে না আমাদের হৃদয়কে। করলে যা ভাবা হয়েছিল তার থেকে এত বেশি দ্রুততায় মেরু বরফ গলে যেত না। ধরিত্রীর বুক থেকে এত নির্মমতায় বছরে ১ কোটি ৮০ লাখ একর (জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও-এর হিসাবে) অরণ্যের আচ্ছাদনকে উপড়ে ফেলা হত না। বিলুপ্ত হয়ে যেত না প্রতি ৫ মিনিটে ১টি করে প্রজাতিও। আর এই সব কিছু ধ্বংসের মূলেই যে দ্বিপদ বিশিষ্ট প্রাণী আমরা, একমাত্র আমরাই দায়ী, তাতে সন্দেহের বুঝি আর কোনো অবকাশ নেই।

যদিও এই ব্যাপারে পৃথিবীর নানা প্রান্তের পরিবেশ বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশক ধরে আমাদের সতর্ক করে চলেছেন। কিন্তু আমরা তাতে ভ্রুক্ষেপ করিনি। প্রসঙ্গত আমার মনে পড়ে যাচ্ছে পৃথিবী সম্পর্কে গান্ধীজীর সেই বিখ্যাত উক্তিটি - "Earth provides enough to satisfy every man's needs, but not every man's greed."

বস্তুতই অবিবেচক, লোভী মানুষের যেন তর সয়নি। তা না হলে বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই, সেই প্রসারিত লোভের হাত পৃথিবীর বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের ভাঁড়ারকে এমন দ্রুত নিঃশেষ করে ফেলার তুমুল প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত?

যে প্রতিযোগিতায় সামিল হয়ে প্রায় সব দেশই কম বেশি এই পৃথিবীর স্থল-জল-অন্তরীক্ষকে নিয়ত এমনই বিষিয়ে তুলছে, যাতে প্রতিদিনই একটু একটু করে নষ্ট হচ্ছে তার বাসযোগ্যতা। অবশ্য আমার মনে হয়, অনেকেই হয়তো ভাবছেন- তাতে কি?

জীর্ণ পোশাকের মতো এই পৃথিবীকে ত্যাগ করে নিখিল বিশ্বে অন্য কোনো বাসভূমি তো খুঁজে নিলেই হয়। হ্যাঁ, সেই চেষ্টা শুরুও হয়ে গেছে। সেই অন্বেষণে বিজ্ঞানীরা তো প্রায়ই নিত্য নতুন গ্রহের সন্ধানও পাচ্ছেন।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই, যে গ্রহ গ্রহান্তরেই মানুষ পাড়ি দিক না কেন, মানুষ তো সেই একই মানুষ থাকবে? যে শুধু নিজের নয়, পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুলকেই তার বিবিধ ক্রিয়া কর্মের মাধ্যমে বিপন্ন করে তুলছে। আমার ভয় হচ্ছে, মাত্র কয়েক হাজার বছরেই যে পৃথিবীর বাসযোগ্যতাকে এমন হুমকির মুখে ফেলতে পারে, সেই মানুষ তো পরবর্তী আবাসস্থলকেও আরও দ্রুততায় বিনষ্টের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কারণ ধ্বংসের নিত্য নতুন আয়ুধ তথা প্রযুক্তি রোজই তো তার করতলগত হচ্ছে। তা শেষ পর্যন্ত যত আত্মধ্বংসীই হোক না কেন, তা প্রয়োগে সে যে পিছু হটে না, তার অযুত প্রমাণও সে সতত ছড়িয়ে রাখে।

আসলে মানুষ যেদিন থেকে সভ্য হতে শিখেছে সেদিন থেকেই নিজের অস্তিত্বের গোড়ায় সে কুঠারাঘাত করে চলেছে। কারণ একদিন নিজের প্রয়োজনে যে প্লাস্টিক সে তৈরি করেছিল, আজ সেই প্লাস্টিকই তার কাছে হুমকি হয়ে উঠছে। এই বছর ‘প্লাস্টিক দূষণ অবসান’ থিম নিয়ে ‘বসুন্ধরা দিবস’ পালনে ১৯২টি দেশের প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি মানুষকে তাই পথে নামতে হয়েছে। যে প্লাস্টিক বর্জ্যে আমরা কেবলই নদী নালা খাল বিল বুজিয়ে চলেছি, ভরিয়ে তুলছি সাগর।

গার্ডিয়ান পত্রিকার একটি প্রতিবেদন তো জানাচ্ছে, সামুদ্রিক প্রাণীজগৎও এতটাই বিষিয়ে উঠছে যে, মাছের মাধ্যমে আমাদের শরীরেও সেই প্লাস্টিক ঢুকে পড়ছে। তাতে ভবিষ্যতে হয়তো মানবদেহের হরমোনও ওলোট পালোট হয়ে যেতে পারে। আশঙ্কা, ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রে মাছের থেকে প্লাস্টিকের ওজন বেশি হয়ে যাবে। কিন্তু এত জেনেও শেষ পর্যন্ত কটি দেশ প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? আমরা ব্যক্তিগতভাবেই বা ক'জন প্লাস্টিক ব্যবহারে বিরত থাকব? তার পুনর্ব্যবহারেও কি দেশে দেশে তত উৎসাহ দেখা যাবে?

আমার তা মনে হয় না। বরং যতই হুমকি হয়ে উঠুক না কেন প্লাস্টিক দূষণের ভার ‘মা বসুন্ধরা’র বুকের উপর ক্রমশ পাথর হয়েই চেপে বসবে। কারণ মানুষ নিজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তোলার সর্বনাশের এক নেশায় মেতে উঠেছে যে।

লেখক: মালবী গুপ্ত, সাংবাদিক, কলকাতা।

শীর্ষনিউজ/এইচএস