রবিবার, ২১-অক্টোবর ২০১৮, ১০:১৭ অপরাহ্ন

তলোয়ার দিয়ে দাড়ি ছাঁচবেন না

Shershanews24.com

প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল, ২০১৮ ১১:১২ অপরাহ্ন

মোতাহার হোসেন: বাসের চাপায় পা হারানো রোজিনা মারা গেছেন। বাসের চাপায় পা হারানো আরেকজন রাসেল। তিনি মৃত্যু শয্যায়। এর আগে দুই বাসের ফাঁকে আটকে পড়ে কাটা হাত নিয়ে এতিম রাজীব মারা যান। আজ খবরের কাগজে দেখলাম, ধাক্কা দিয়ে ফেলে রাসেলের পায়ের উপর দিয়ে গ্রীন লাইন পরিবহনের বাস চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে প্রাইভেটকার চালক রাসেল বাম পা হারান। ঘটনাটি গতকাল শনিবার রাজধানীর হানিফ ফ্লাইওভারের ধোলাইপাড় ঢালের। এখন তিনি স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ যেন এক মৃত্যুর মিছিল।
এসব দেখে মনে পড়ল, বরেণ্য সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরীর একটি শিরোণাম। সম্ভবত সত্তরের দশকের কথা। শ্রদ্ধেয় গাফফার ভাই তখন হামিদুল হক চৌধুরীর মালিকানাধীন অবজারভার গ্রুপের বাংলা দৈনিক পত্রিকা পূর্বদেশ-এ কর্মরত। ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হলেও চাকরির কারণে তিনি ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর কঠোর সমালোচক। দৈনিক পূর্বদেশে, ওই সময় শেখ মুজিবুরের উদ্দেশ্যে গাফফার ভাইয়ের একটা উপসম্পাদকীয় এর শিরোনাম ছিল এরকম- “তলোয়ার দিয়ে দাঁড়ি ছাঁচবেন না”। এ নিয়ে তখন হৈচৈও কম হয়নি। দৈনিক ইত্তেফাকে জনাব আবুল ফজল ওই উপসম্পাদকীয়টির কঠোর জবাবও দিয়েছিলেন।


যাক, আমাদের আলোচ্য বিষয় আজকে এটি নয়। আলোচ্য বিষয়- সড়ক পথে নৈরাজ্য। এই নৈরাজ্যের বিষয়ে লিখতে গিয়ে গাফফার ভাইয়ের শিরোনামটি উনার অনুমতি না নিয়েই ধার করলাম।
সড়ক পথের নৈরাজ্য গত কয়েক বছর ধরেই ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আগেও ছিল। তবে এখনকার অবস্থা বড় নির্মম, বড় নিষ্ঠুর। গত ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে মিশুক মুনীরের ঢাকা আরিচা হাইওয়ের মানিকগঞ্জের ঘিওরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পর সারা দেশে হৈচৈ পড়ে যায়। বেপরোয়া ড্রাইভারদের কারিগরি শিক্ষার সাথে সাথে মানবিক শিক্ষার আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। এ বিষয়ে ব্যাপক জনমতও সৃষ্টি হয়। সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এর প্রেক্ষিতে বেপরোয়া ড্রাইভার / হেল্পারদের নিয়মের মধ্যে আনার জন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সরকারের একটি বিশেষ মহলের অশুভ হস্তক্ষেপের কারণে শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। ফলাফল ড্রাইভাররা হয়েছে আরো উদ্যত। আরো বেপরোয়া। ফলশ্রুতিতে এখন প্রতিদিন মানুষ মারছে, কারো হাত ছিঁড়ে নিচ্ছে, কারো বা পা। কাউকে আবার পাঠিয়ে দিচ্ছে একেবারে পরপারে। এ নৃশংসতা যেন থামছে না। বছরের ৩৬৫ দিনের একদিনও এমন যায় না যে, দেশের কোথাও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে না। কেউ না কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছে না-এমন একটি দিনও নেই।
একটি বেসরকারি হিসাব মতে, প্রতি বছর সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে আরও অনেকে। ঢাকা শহরের মাত্র একটি রুটে, একটি ক্ষুদ্র অংশ; জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে সংসদ ভবন এলাকায় উড়োজাহাজ মোড় পর্যন্ত রাস্তায় ও আশেপাশের এলাকায় ২০১৫ সাল থেকে এই পর্যন্ত ঊনচল্লিশ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১১৭ জন। মারাত্বক আহত হয়েছেন ৩২ জন। এছাড়া আজ রাজীবের হাত কাটছে তো কাল ফারুকের পা, পরশু মনিকার মাথা। তারপরদিন মনীষার ইজ্জত এবং জীবন। এভাবে চরম নৈরাজ্যে পরিবহন ব্যবস্থা। মনে হয় আমরা মগের মুল্লুকে বাস করছি।
শুধু সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্যের উপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন দেখলে অনুমান করা যায় কী দুর্বিষহ অবস্থায় আমরা মরে বেঁচে আছি। ব্যক্তিগত গাড়ি? সেটাও কি নিরাপদ? সোজা আপনার গাড়ির ছাদে উঠে যাবে, অতি দ্রুত চালিত কোনো বাস অথবা দুই বাসের রেষারেষিতে আপনার প্রাইভেট হয়ে যাবে স্যান্ডউইচ। দুই তিন অথবা আরো একদিন পত্রিকায় লেখালেখি হবে; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাদ প্রতিবাদ হবে। তারপর আরেকটি বড় ঘটনা সামনে এসে যাবে, ব্যাস! আপনি সেই কৃষাণ চন্দনের সেই বিখ্যাত গল্পের মত গাছ চাপা পড়ে থাকবেন। কেউ উদ্ধার করতে আসবে না।
অন্যদিকে মহিলা যাত্রীদের নিদারুন কষ্টের কথা বলে শেষ করা যাবে না। কী নির্যাতনই না হচ্ছে ওদের উপর। বাসে উঠার সময় একবার অকারণে হেল্পার গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। নামার সময় আরেকবার। বিশ্রীভাবে ঠেলা দিচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। এরপর সুযোগ পেলে সাত থেকে সত্তর কাউকে বাদ দিচ্ছে না। গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা। কোন গ্রহে বাস করছি আমরা! যেখানে মেয়েদের সামান্যতম নিরাপত্তা দিতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।

শুধু মেয়েদের কথাই বা বলছি কেন, যেখানে স্কুল কলেজ কিংবা সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের সামান্য নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। সেক্ষেত্রে এই ফ্লাইওভারের উন্নয়ণ দিয়ে আমরা কী করবো। ভীরু ভীরু বক্ষে প্রাণ এবং ইজ্জত দুটিই হাতে নিয়ে বাসে চড়ছেন আমাদের মা বোনেরা। ... এ লজ্জা আমরা ঢাকবো কী দিয়ে?
বছর কয়েক আগে সাংবাদিক বন্ধু, আমার আত্মীয় জগলুল হায়দার চৌধুরীকে সোনারগাঁ ক্রসিংয়ে একটি বাস মেরে ফেলে। এ নিয়েও হৈচৈ হয়েছিল। গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু পরে কিছুই হয়নি।  অনিময় তো দূর না হয়ে উল্টো বেড়েছে অনেক। নতুন করে যোগ হয়েছে, মরার উপর খাড়ার ঘার মত বাসে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যা। কিছু প্রভাবশালী মহলের আসকারা পেয়ে মাদকাসক্ত ড্রাইভার-হেল্পাররা এতটাই বেপরোয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম আইন মতে, শ্রমিকদের দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্ট হচ্ছে ৮ ঘণ্টা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের এ সব ড্রাইভার-হেল্পাররা একটানা ডিউটি করে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। তিন দিন ডিউটি করে পরের তিন দিন ঘুমায়। এ অনিয়মই বা কেন? একটা অশিক্ষিত লোক একটানা ১৮ ঘণ্টা ডিউটি করলে তার কাছে মানবিক আচরণ কি আশা করা যায়? এগুলো কি দেখার কেউ নেই!  
তাই এ সব অনিয়ম ও বেপরোয়া ড্রাইভারদের যারা আসকারা দিচ্ছেন তাদের প্রতি সবিনয়ে বলবো- ‘তলোয়ার দিয়ে দাড়ি ছাঁচবেন না – গাল কেটে যেতে পারে’। (তারিখ: ২৯ এপ্রিল ২০১৮)
লেখক: মোতাহার হোসেন, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও সাবেক পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএ

শীর্ষনিউজ/এইচএস